কন্যাশিশু : আগামী পৃথিবীর স্বপ্ন
মহালয়ায় মাতৃপক্ষের আলো জ্বলে, মৃন্ময়ী মায়ের বন্দনা করি; অথচ ঘরের নারীর চোখের জল আমরা আজও দেবীর অর্ঘ্য ভাবি না।
একটি শিশুর জন্ম মানেই একটি নতুন পৃথিবীর জন্ম। তার ছোট্ট মুঠোর মধ্যে লুকিয়ে থাকে অসংখ্য সম্ভাবনা, তার চোখের স্বচ্ছ দৃষ্টিতে ভবিষ্যতের আলো। কিন্তু সেই শিশুটি যদি কন্যা হয়, তবে আজও পৃথিবীর বহু প্রান্তে তার জন্মের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়ে যায় বৈষম্যের দীর্ঘ ছায়া। কোথাও তার জন্ম আনন্দের বদলে উদ্বেগ নিয়ে আসে, কোথাও তার শিক্ষার অধিকার প্রশ্নের মুখে পড়ে, কোথাও আবার অল্প বয়সেই তার শৈশবকে বিদায় জানিয়ে দেওয়া হয়। অথচ একটি মেয়েশিশুর স্বপ্নও তো একটি ছেলেশিশুর স্বপ্নের মতোই মূল্যবান। তার হাসিও সমান উজ্জ্বল, তার ভবিষ্যতের অধিকারও সমান।
প্রতি বছর ১১ অক্টোবর বিশ্বজুড়ে পালিত হয় আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস। জাতিসংঘের উদ্যোগে ২০১২ সাল থেকে এই দিনটি পালিত হয়ে আসছে। কন্যাশিশুর অধিকার রক্ষা, লিঙ্গবৈষম্যের অবসান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিষেবায় সমান সুযোগ এবং নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করাই এই দিবসের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। কিন্তু একটি দিবস কেবল ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ হয়ে থাকলে তার সামাজিক তাৎপর্য সীমিত হয়ে যায়। প্রকৃত প্রশ্ন হল—বছরের বাকি ৩৬৪ দিন আমরা কন্যাশিশুর প্রতি কতটা ন্যায়বিচার করতে পারছি?
আমাদের সমাজে এখনও বহু পরিবারে সন্তান হিসেবে মেয়েকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ সমান নয়। ছেলের পড়াশোনাকে ভবিষ্যতের বিনিয়োগ এবং মেয়ের পড়াশোনাকে অনেক সময় ‘অতিরিক্ত’ বলে মনে করা হয়। ছেলের হাতে বই তুলে দেওয়া হয়, আর মেয়ের হাতে তুলে দেওয়া হয় সংসারের কাজ। ছেলের স্বপ্নকে বলা হয় ‘ক্যারিয়ার’, মেয়ের স্বপ্নকে অনেক সময় বলা হয় ‘বাড়াবাড়ি’। এই মানসিকতার পরিবর্তন না ঘটলে কন্যাশিশুর প্রকৃত ক্ষমতায়ন সম্ভব নয়।
শিক্ষা একটি মেয়ের জীবনের সবচেয়ে শক্তিশালী দরজা খুলে দিতে পারে। শিক্ষা তাকে শুধু অক্ষরজ্ঞান দেয় না; তাকে প্রশ্ন করতে শেখায়, নিজের অধিকার বুঝতে শেখায়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস দেয়। শিক্ষিত কন্যা ভবিষ্যতে শুধু নিজের জীবনকে পরিবর্তন করে না, একটি পরিবার, একটি সমাজ, এমনকি একটি প্রজন্মের চিন্তাভাবনাকেও বদলে দিতে পারে। তাই কন্যাশিশুর শিক্ষাকে দয়া বা অনুগ্রহ হিসেবে দেখা নয়, তাকে তার মৌলিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।
তবে শিক্ষার সুযোগ পেলেই সব সমস্যার সমাধান হয় না। নিরাপত্তা, পুষ্টি, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার এবং মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশ—সবকিছুর সঙ্গেই কন্যাশিশুর বিকাশ জড়িত। ডিজিটাল যুগে এসে নতুন ধরনের বৈষম্যও তৈরি হয়েছে। অনেক মেয়েশিশু এখনও প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে পিছিয়ে। ফলে শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রের ভবিষ্যৎ সুযোগ থেকেও তারা বঞ্চিত হতে পারে। নতুন পৃথিবীর দরজা যদি প্রযুক্তির মাধ্যমে খুলে যায়, তবে সেই দরজার চাবি কন্যাশিশুর হাতেও পৌঁছে দিতে হবে।
কন্যাশিশুর প্রতি বৈষম্য শুধু অর্থনৈতিক বা সামাজিক নয়; এর শিকড় অনেক গভীরে, আমাদের সংস্কার ও মানসিকতার মধ্যেও। ‘মেয়েরা এটা পারে না’, ‘মেয়েদের এত দূর পড়াশোনা করে কী হবে’, ‘মেয়েদের বেশি স্বাধীনতা দেওয়া ঠিক নয়’—এই ধরনের বাক্যগুলি আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ হলেও একটি শিশুর আত্মবিশ্বাসকে ধীরে ধীরে ক্ষয় করে। শিশুর মন অত্যন্ত কোমল। সেখানে বারবার সীমারেখা টেনে দিলে একসময় সে নিজের সম্ভাবনার সীমাও ছোট করে ফেলে।
অন্যদিকে, যখন একটি মেয়েকে বলা হয়—‘তুমি পারবে’, তখন সেই কয়েকটি শব্দ তার জীবনের গতিপথ বদলে দিতে পারে। একজন শিক্ষক, একজন মা-বাবা, একজন অভিভাবক কিংবা সমাজের কোনো একজন মানুষের উৎসাহ কখনও কখনও একটি শিশুর ভবিষ্যতের ভিত তৈরি করে দেয়। তাই কন্যাশিশুর ক্ষমতায়ন শুরু হতে পারে আমাদের ঘর থেকেই—তার কথা মন দিয়ে শোনা, তার পছন্দকে সম্মান করা, তাকে প্রশ্ন করতে দেওয়া এবং ভুল করার অধিকার দেওয়ার মধ্য দিয়ে।
আজকের কন্যাশিশুই আগামী দিনের বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, শিক্ষক, শিল্পী, প্রশাসক, শ্রমজীবী, কৃষক, উদ্যোক্তা কিংবা সমাজকর্মী। কিন্তু তার পরিচয় কেবল ভবিষ্যতের কোনো পেশার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সে প্রথমত একজন মানুষ, যার নিজস্ব স্বপ্ন আছে, ভালোবাসা পাওয়ার অধিকার আছে, নিরাপদে বেড়ে ওঠার অধিকার আছে এবং নিজের জীবনের সিদ্ধান্তে অংশগ্রহণের অধিকার আছে।
আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস তাই কেবল মেয়েদের নিয়ে একটি আনুষ্ঠানিক উদ্যাপন নয়; এটি আমাদের সামাজিক বিবেকের সামনে রাখা একটি আয়না। সেই আয়নায় নিজেদের মুখ দেখতে হবে। আমরা কি সত্যিই কন্যাশিশুকে সমান মর্যাদা দিচ্ছি? আমরা কি তার স্বপ্নের পাশে দাঁড়াচ্ছি? নাকি এখনও জন্মের মুহূর্তেই তার ভবিষ্যতের ওপর অদৃশ্য কিছু নিষেধাজ্ঞা লিখে দিচ্ছি?
একটি কন্যাশিশু যখন বিদ্যালয়ের পথে হাঁটে, তার কাঁধে শুধু বইয়ের ব্যাগ থাকে না—থাকে একটি সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ। সে যখন আকাশের দিকে তাকিয়ে স্বপ্ন দেখে, তখন সেই স্বপ্নে শুধু তার নিজের জীবন নয়, একটি বদলে যাওয়া সমাজের ছবিও ফুটে ওঠে। তাই তার পথের কাঁটা সরানো মানে শুধু একটি শিশুকে এগিয়ে দেওয়া নয়; মানবসভ্যতার পথকেই একটু বেশি আলোকিত করা।
আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব—কন্যাশিশুর জন্য এমন একটি পৃথিবী তৈরি করা, যেখানে তার জন্ম কোনো প্রশ্নের কারণ হবে না, তার শিক্ষা কোনো বোঝা হবে না, তার স্বপ্ন কোনো অপরাধ হবে না এবং তার স্বাধীনতা কোনো ভয়ের বিষয় হবে না। যে দিন একটি মেয়ে তার পরিচয়কে লিঙ্গের সীমায় নয়, মানুষের মর্যাদায় খুঁজে পাবে, সেদিনই আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবসের প্রকৃত সার্থকতা আসবে। কারণ কন্যাশিশু কেবল আগামী দিনের নারী নয়—সে আজকের পৃথিবীরই একজন পূর্ণ মানুষ, আর তার স্বপ্নের মধ্যেই লুকিয়ে আছে আগামী পৃথিবীর সকাল।
...........................................
উৎপল সরকার
নিউটাউন, জেলা আলিপুরদুয়ার
কর্মসূত্রে শিলিগুড়ির বাসিন্দা

Comments
Post a Comment