(গুচ্ছকবিতা)
জননীর পাঁচ অধ্যায় ।। মইনুদ্দিন সরদার
আঁচলের আকাশ
জ্বরের রাতে কপাল ছুঁয়ে জেগে থাকা দুটি হাত,
ঘুমের ভেতর স্বপ্ন বুনে আগলে রাখা দিন ও রাত।
ঝড় এলে যে বুক পেতে দেয়, ভোলে নিজের সব আঘাত,
মায়ের আঁচল শৈশব জুড়ে ছিল আমার প্রথম প্রভাত।
হাঁটতে শেখার প্রথম পথে ধরেছিল যে স্নেহের হাত,
ভুলের ভেতর শাসন মিশিয়ে গড়ে তুলেছে মানবচিত্ত।
অন্ধকারে পথ হারালে দেখিয়েছে আলোর প্রভাত,
মায়ের চোখে দেখেছি আমি ভালোবাসার অবিরত জ্যোতিপাত।
অভাব ছিল, তবু মুখে ছিল না কোনো অভিযোগের কথা,
নিজে কষ্ট সয়ে দিয়েছে সন্তানের মুখে সুখের ব্যথা।
ছোট্ট ঘরের চার দেয়ালে গড়ে তুলেছে স্বপ্নগাঁথা,
মায়ের মতো আপন মানুষ খুঁজে পাওয়া বড়ই বৃথা।
আজও যখন ক্লান্ত মনে নেমে আসে বিষণ্ন সময়,
মায়ের মুখের একটুখানি হাসি জাগায় নতুন পরিচয়।
পৃথিবীজুড়ে যতই দেখি সুখ-দুঃখের বিস্ময়,
মায়ের আঁচলেই খুঁজে পাই নিরাপদ এক আশ্রয়।
দু'হাতের প্রার্থনা
ভোরের আলো ফোটার আগে জেগে ওঠে যে দুটি হাত,
সন্তানেরই মঙ্গল চেয়ে কাটায় নীরব দিন ও রাত।
নিজের সুখের হিসাব ভুলে রাখে ভালোবাসার পাত,
মায়ের প্রার্থনায় জড়িয়ে থাকে জীবনের গভীর প্রভাত।
সিজদায় কিংবা নীরব ধ্যানে উচ্চারিত হয় কত নাম,
সবার আগে সন্তানেরই ভবিষ্যতের শুভ পরিণাম।
চোখের কোণে জমে থাকা উদ্বেগ পেরিয়ে অবিরাম,
আশীর্বাদের আলো ছড়ায় মায়ের মমতা অবিরাম।
ঝড়ের দিনে সাহস জোগায়, দুঃখে দেয় নতুন বল,
ব্যর্থতার অন্ধকারে দেখায় আশার উজ্জ্বল পথচল।
নিঃস্বার্থ সেই প্রার্থনাতে মুছে যায় কত বিফল ছল,
মায়ের দোয়া ছায়ার মতো আগলে রাখে প্রতিক্ষণ চল।
আজও যখন পথের শেষে ক্লান্ত হয়ে থামি আমি,
মনে পড়ে সেই দুটি হাত, মমতা যার অবিরাম।
পৃথিবীতে যত সম্পদ আছে, যত অর্জন, যত দামি,
মায়ের প্রার্থনার চেয়ে বড় কিছু দেখিনি আমি।
প্রতীক্ষার প্রদীপ
বিকেল শেষে সন্ধ্যা নামে, পথের ধারে ঝিমায় আলো,
দরজার পাশে বসে থাকে একজোড়া চোখ নিরালো।
ফেরার পথে সন্তানেরই পদধ্বনি শুনবে ভালো,
অপেক্ষাতে মায়ের মন যে নদীর মতো চঞ্চল আলো।
দিন ফুরিয়ে রাত বাড়ে আর নেমে আসে নিস্তব্ধ ক্ষণ।
তবু মায়ের কান খুঁজে ফেরে পরিচিত সেই পদচিহ্ন।
হাজার কাজে ব্যস্ত থাকুক সন্তানের জীবনযাপন,
মায়ের কাছে সে-ই থাকে সবচেয়ে আপন, সবচেয়ে আপন।
দূর শহরের ব্যস্ত রাস্তায় হারিয়ে যায় দিনের বেলা,
মায়ের মনে জমে থাকে কত অজানা ভাবনার মেলা।
ফোনের ওপার ছোট্ট কণ্ঠও এনে দেয় সুখের ভেলা,
একটি কথায় মুছে যায় যে অপেক্ষার দীর্ঘ জ্বালা।
জানালার ধারে জ্বলে থাকে আশার ক্ষুদ্র এক প্রদীপ,
ফিরে আসার স্বপ্ন বুকে আগলে রাখে অনুক্ষণ নীরব দীপ।
সন্তান যত দূরেই যাক, থাক না যত জীবনদ্বীপ,
মায়ের হৃদয় পথ চেয়ে যায়—প্রতীক্ষাতেই তার সঞ্চিত দীপ।
নিঃশব্দ আশীর্বাদ
কত কথার ভিড়ে মিশে থাকে না-বলা কিছু নিঃশ্বাস,
মায়ের চোখে লুকিয়ে থাকে সন্তানের সুখের আভাস।
নিজের দুঃখ আড়াল করে মুখে রাখে বিশ্বাস,
নিঃশব্দ সেই আশীর্বাদে ভরে ওঠে জীবন-উচ্ছ্বাস।
হোঁচট খেয়ে পথ চলাতে যখন নামে হতাশার ঢেউ,
চারপাশ ভরা মানুষের মাঝে আপন বলে থাকে না কেউ।
তখন যেন অদৃশ্য হয়ে পাশে দাঁড়ায় মায়ের ঢেউ,
তারই দোয়ায় সাহস ফেরে, মুছে যায় ভয়ের ঢেউ।
সফলতার উজ্জ্বল দিনে যেমন থাকে মায়ের হাসি,
ব্যর্থতার অন্ধকারেও কমে না তার মুখের হাসি।
সব হারিয়ে শূন্য হলেও থাকে না কোনো উদাসি,
সন্তানেরই মঙ্গল ভেবে ছড়ায় নীরব আশ্বাস।
সবকিছুরই ঊর্ধ্বে থাকে মায়ের নীরব আশীর্বাদ।
কোনো দাবি, কোনো শর্ত, কোনো হিসাব নেই অবসাদ,
মায়ের হৃদয় খুলে দেয় শুধু ভালোবাসার প্রসাদ।
পৃথিবীজুড়ে যত আশ্রয়, যত সম্পর্ক, যত সম্পদ।
জননীর মুখচ্ছবি
সময়ের স্রোত বয়ে যায়, বদলে যায় কত পরিচয়,
শৈশব পেরিয়ে জীবনের পথে আসে নতুন বিস্ময়।
তবু মনের গভীর কোণে অমলিন থাকে এক আশ্রয়,
মায়ের মুখের সেই আলো আজও হৃদয়ে জাগায় প্রত্যয়।
কত ভোরে ঘুম ভেঙেছে তারই স্নেহের প্রভাতে।
মায়ের মতো আপন মানুষ মেলে কি আর পৃথিবীতে?
কত রাতে জেগে থেকেছে সন্তানেরই সুখের নিমিত্ত।
নিজের কথা ভুলে গিয়ে আগলে রেখেছে অনবরত।
মুখের ভাঁজে লেখা থাকে ত্যাগের অগণিত ইতিহাস,
চোখের কোণে জমে থাকে না-বলা কত দীর্ঘশ্বাস।
তবু হাসিমুখে ঢেকে রাখে জীবনের সব উচ্ছ্বাস,
সন্তানেরই আনন্দে খুঁজে পায় বেঁচে থাকার বিশ্বাস।
আজ যা কিছু অর্জন আমার, যা কিছু স্বপ্নের আলো,
তারই পেছনে মিশে আছে মায়ের স্নেহের আলো।
শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা আর স্নেহে মাথা নত করি চিরকাল,
জননীর মুখচ্ছবিতেই খুঁজে পাই জীবনের সম্বল।
...................................
মইনুদ্দিন সরদার
খোড়গাছি, বসিরহাট - বাদুড়িয়া, উত্তর ২৪ পরগনা, পশ্চিমবঙ্গ
Comments
Post a Comment