শুভ দীপাবলী ও পাপান
গোপা সোম
আজ শুভ দীপাবলী। গতকাল ভূত চতুর্দশী গেছে, ভিন দেশের ভিন প্রথা আছে, এই চতুর্দশীতে। পাপানদের এদিন চৌদ্দশাক খাওয়ার রীতি আছে, ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছে পাপান। পাপানের মনে আছে, আগে ভূত চতুর্দশীর দিনে, ওর বাবার সাথে বাজার গিয়ে, শাক কিনতো, একটা একটা করে,গুনে গুনে। আজকাল বাজারে আর আলাদা করে করে শাক খুঁজে খুঁজে কিনতে হয় না। ছোট ছোট ঝুড়ি করে, রেডিমেড চৌদ্দশাক বিক্রী হয়। দিনের বেলায় চৌদ্দশাক খেয়ে, পাপান আর তিতলি সন্ধ্যায় ওদের বাড়ীর কাছেই এক পুজো প্যান্ডেলে, বেড়াতে বেরিয়েছিল। ওইদিনই পাপানদের বাড়ী, আশে পাশের ছোট বড় প্রায় সব বাড়ী ঘর গুলি সব রঙিন রঙিন টুনি বাল্ব দিয়ে সাজানো হয়ে গেছিল। আগে দীপাবলীর দিনই আলো দিয়ে সাজানো হত, এখন যত দিন যাচ্ছে, কেমন একটু অন্যরকম হয়ে যাচ্ছে সবকিছু। যেদিকেই ওরা তাকাচ্ছে, সব জায়গায় আলো ঝলমল করছে, কত রঙ বেরঙের আলো, লাল, হলদে, নীল, সাদা, বেগুনী সবুজ, বিভিন্ন রঙের খেলা আর কি! পাপানের মনে হচ্ছিল, সারা বছরই তো এমন সাজানো থাকতে পারত, কী সুন্দর লাগতো! কাল কাছের ঠাকুর দেখে ওরা তাড়াতাড়িই ঘরে চলে আসে।
আজ আবার সকাল থেকেই চারদিকে গান বাজনা শোনা যাচ্ছে। আজ তো শ্যামা পুজো। পাপানের আজ আর পড়াশোনা ভালো লাগে না, সেও রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে। রাস্তা-ঘাট বেশ জম-জমাট। পাপান ওর বাবার থেকে আজ কিছু টাকা পেয়েছে, ওর আর তিতলির জন্য আতসবাজি কেনার জন্য। পাপান ভাবলো, পায়ে পায়ে বাজার গিয়ে সেখান থেকে বাজি কিনে আনবে। রাস্তায় আজ প্রচুর ভ্যান দেখতে পায় পাপান। ভ্যানে করে কত জনে কত জিনিস নিয়ে যাচ্ছে, কখনো বস্তা বস্তা জিনিস, কখনো বা শতরঞ্জি গাদা খানেক, কখনো আবার কেউ রান্নার বড় বড় বাসন নিয়ে যাচ্ছে, মোটের ওপর অন্যদিনের তুলনায়, আজ রাস্তা বেশী জনবহুল, বোঝা যাচ্ছে। কত প্রতিমা নিয়ে আসছে, কেউ ভ্যানে, কেউ বড় গাড়ী করে, মুখ বেঁধে, পাছে কারোর রাস্তা থেকেই ঠাকুরের মুখ দর্শন হয়ে যায়, এই ভয়ে। কেউ আবার ভ্যানে করে হেলে, দুলে ঠাকুর কে নিয়ে অলি গলি দিয়ে এঁকে বেঁকে, কোথায় চলে যাচ্ছে, কোথায় গন্তব্যস্থল, কে জানে! কেউ চারচাকা নিয়ে ছোট, বড় গাড়ী নিয়ে ঘুরতেও বেরিয়ে পড়েছে। কেউ বাইকে, কেউ সাইকেলে যাচ্ছে, আসছে, আবার কেউ পায়ে হেঁটেই কামাল করে দিচ্ছে। কেউ পুজোর ফুল, বেলপাতা যোগাড় করছে, আজ কাল যদিও সব বাজারেই কিনতে পাওয়া যায়, বাজারেও আজ খুব ভীড়। শাক সবজির দোকান, ফল মিষ্টির দোকানে দোকানে ভীড় উপচে পড়ছে। ব্যবসায়ীরা জিনিসপত্র আজ চড়া দামে বিকোচ্ছে। জায়গায় জায়গায় কত অস্থায়ী দোকান বসেছে, আতসবাজি, ফুলঝুড়ি, সাপ বাজি, চড়কি বাজি, রঙ মশাল, তুবড়ি, রঙ দেশলাই, পটকা সব বিকোচ্ছে। শব্দবাজি নিষিদ্ধ হলেও, ভালোই বিক্রী হচ্ছে, লুকিয়ে চুরিয়ে। লোক জনও সব আজকাল কেমন বেপরোয়া, বিধি নিষেধ যাই থাক না কেন, দুম দাম বাজি ফাটায় যেখানে,সেখানে, কানে তালা লেগে যায় পাপানের। পাপানের বাবা বারবার বলে দিয়েছেন, কোনো শব্দবাজি নয়, শুধুই আলোর বাজি কিনতে। প্রত্যেক বাজির দোকানেই ভীড়, পাপানের ভালো লাগছে না, এতক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে, বাজি কিনতে হবে, তাই পাপান বাজার ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আসে। বাজারের বাইরেও বাজির প্রচুর দোকান বসিয়েছে।
কিছুদূর এগিয়ে পাপান দেখে, একটা বিরাট বড় ডাস্টবিনের কাছে তিন জন ছোট ছোট ছেলে, রুক্ষ মাথায়, গায়ে ছেঁড়া জামা, নোংরা ঘেঁটে বেড়াচ্ছে, আর কি খুঁজে বেড়াচ্ছে। পাপান মনে মনে ভাবে, আজ এত আনন্দের দিন, সবাই যেখানে ঘর সাজাতে, বাজি কিনতে এত ব্যস্ত, আর এই ছোট ছোট ছেলেগুলি রুক্ষ মাথা, গায়ে ছেঁড়া জামা পরে, এই ডাস্টবিনের নোংরা ঘাঁটছে! পাপান জোরে চীৎকার করে ওঠে, এই তোরা এখানে কি করছিস আজ পুজোর দিন? ওরা তিন জনেই বলে, আমাদের আর পুজো কোথায়? পুজো আমাদের নাকি? ওদের মধ্যে যে একটু বড়, সে বলে, ওদের রোজকার খাওয়াই অনিশ্চিত, কোনোদিন পূর্ণ খাবার জোটে তো, কোনো দিন আধা পেটে থাকতে হয়। ও একই ছেলে ওর বাবা-মায়ের। ওর বাবা অনেক ছোট থাকতেই মারা গেছে, ওর মা ছাড়া ওদের ঘরে কেউ নেই। ওর মা এতদিন ভিক্ষে করে দুটি খাবার এনে দিত, তাই খেয়ে সে দিন কাটাতো, আজ ওর মায়ের জ্বর হয়েছে, ভিক্ষে করতে বেরোয়নি, তাই তো ও বেরিয়েছিল, কিছু যদি কেউ ভিক্ষে দেয়, কই না, একজনের থেকেও ভিক্ষে পায় নি। সবাই আজ খুব ব্যস্ত। কেউ পুজো প্যান্ডেলে ঠাকুর আনতে, কেউ বাড়ীতে বসে বাজি পটকা রোদে দিতে, কেউ টুনি বাল্ব দিয়ে নিজেদের বাড়ী সাজাতে, কেউ আবার বাইরে বেরিয়ে গেছে দূর দেশে, ঘরে তালা দিয়ে। বাজারে গেছিল, ভিক্ষে চাইতে সবজিওলা, একজনও একটা আনাজও দিল না। এখন হবে না, মুখের ওপর বলে দিলো। মুদির দোকানে এক মুঠি চাল চেয়েও পায়নি, এক মুঠি চাল পেলে ওদের ভাত আজকের মত হয়ে যেত। কি করবে, রাস্তায় ওদের দুই ভাইয়ের চেনা মুখ দেখে, ওদের সাথেই এই ডাস্টবিনেই চলে এসেছে সেও। ওরা দুই ভাইও কাল রাতের থেকে না খাওয়া। ওরা এই ডাস্টবিনের উদ্দেশ্যেই এসেছে, যদি কিছু খাবার মেলে। অনেক বড়লোক তো অনেক জিনিস খায় না, ফেলে দেয়, তাই যদি কিছু যোগাড় করতে পারে। অন্যদের উচ্ছিষ্ট খাবার পেলেও নিয়ে যাবে, এই আশায়। ওরা দুজন দুইভাই, একই ঘরে থাকে। ওদের আবার বাবা-মা কেউই নেই। দিদির কাছেই মানুষ। ঐ এক দিদিই আছে ওদের মাথার ওপর, আর কেউ নেই। ওর দিদি পরের বাড়ী বাসন মেজে যে টূকু পায়, তাই দিয়ে তিন ভাই বোনের সংসার চালায়। তিনটে বাড়ীতে কাজ করে, সেই সকালে বেরিয়ে যায়, ঘরে এসে রান্না করে, তিন ভাই বোনের, খাওয়া দাওয়া সেরে আবার বিকেলে বেরোয়। গতকাল বিকেলে সে যে বেরিয়েছে, আর ঘরে ফেরে নি। সন্ধ্যেবেলায় ওরা খুব কান্নাকাটি করছিল, পাড়ায় দু একজন এদিক সেদিক দেখেও কোনো সন্ধান করতে পারে নি। রাত বেড়েই চললো, ওদের দিদি আর ফেরে নি। ওরা এখন বড় একা। কাল থেকে ওরা দুই ভাই না খেয়ে আছে, শুধু জল খেয়ে আছে। দিদির জন্য ওদের মনটা ভালো নেই। ওদের মুখে এ কথা শুনে, পাপানের মনটা খুব খারাপ লাগল, তাই বলে বসল, তোদের ঘর কোথায়? একজন বলল, ওই তো ক্যানেলের পারে, যে টালির ছাদের ঘরগুলো দেখা যাচ্ছে, সেগুলিই আমাদের ঘর।
পাপানের বাবা আজ সকালে পাপানকে পাঁচশত টাকা দিয়েছিলেন, শব্দ বাজি নয়, আলোর বাজি কেনার জন্যে, পাপান সেই টাকা দিয়ে বাজি না কিনে, ফের বাজারে গিয়ে, বিস্কিট, মুড়ি, চানাচুর, হোটেল থেকে চার প্লেট গরম ভাত, মাছ সব কিনে নিয়ে ওই তিনজনকে নিয়ে হাঁটা দিল, ওদের বস্তির দিকে। প্রথমে বড় ছেলেটির ঘর গিয়ে, ওর মায়ের সাথে দেখা করে খাবার দিল, পরে দুই ভায়ের ঘরে গেল খাবার দিতে। বলল খেয়ে নিতে আর ওর দিদির নাম জানতে চাইল, একটা ফোটো চাইল। প্রথমে ওরা ফোটো দিতে পারে না। তার পর মনে পড়ল, ওর দিদি একদিন একটা ফোটো এনেছিল, মণিবের বাড়ীতে তোলা। সেই ফোটো খুঁজে বার করে দিল পাপানের হাতে। পাপান নিজেই গট গট করে কাছেই একটা পুলিশ স্টেশনে গিয়ে এফ আই আর করে দিল। পুলিশ অফিসার কে গিয়ে খুব অনুনয় করে সব ঘটনা বলল। পুলিশ অফিসার পাপানের পিঠে হাত রেখে আশ্বস্ত করলেন, বললেন, “এই বয়সে তোমার এত সামাজিক দায়িত্ববোধ, তুমি এত বড় একটা কাজ করলে আর আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করব না? আমাদের তো এটাই কাজ। আমরা আমাদের জান দিয়ে দেব, ওদের দিদিকে খুঁজে বের করার”। পাপান বাড়ী ফিরে আসার সময় মনে মনে ভাবতে ভাবতে আসছিল, ভালো কাজই সে আজ করল, বাড়ী ফিরে সে তার বাবা-মাকে সব কথা বলল। সব কথা শুনে পাপানের বাবা-মা বললেন, শুভ দীপাবলী সার্থক হয়েছে।
Comments
Post a Comment