ধাঙড়
মোঃ চাঁন মিয়া ফকির
বাংলাদেশে অনেকগুলো জাতিগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে| সাধারণভাবে বাংলাদেশী বলতে আমরা বুঝি দক্ষিণ এশিয়ার বাংলাদেশ ভূখণ্ডে বসবাসকারী বা অধিবাসী জনগণ| বাংলাদেশের সংবিধানের ৬ ধারার ২ উপধারায় বলা হয়েছে যে, বাংলাদেশের জনগণ জাতি হিসাবে বাঙালি এবং নাগরিকগণ বাংলাদেশী বলিয়া পরিচিত হইবেন| বাংলাদেশীদের মধ্যে রয়েছে বাঙালি এবং কিছু উপজাতি, নৃ-গোষ্ঠী সম্প্রদায়, বিভিন্ন সময়ের শাসক শ্রেণি কর্তৃক আনিত ও বাঙালি কর্তৃক আনিত শ্রমজীবি, পেশাজীবী সম্প্রদায়|
ধাঙড় (মেথর/ঝাড়ুদার/হরিজন) একটি পেশাজীবী সম্প্রদায়| তারা শহর, বন্দর, গঞ্জ ও জনবহুল (রেলস্টেশন/বাসস্টেশন) এলাকায় বিভিন্ন ধরনের ময়লা, আবর্জনা পরিষ্কার করার কাজে পেশাদার শ্রমজীবি হিসেবে কাজ করে| স্থানীয় হাট বাজারে এদেরকে ভূঁইমারি বা ঝাড়ুদার বলা হয়| সমাজে ধাঙড় বা মেথরদের অবস্থান ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, ˆবশ্য এবং শূদ্রের বাইরে পঞ্চম হিসেবে তারা অস্পৃশ্য| এদের পর্যায়ে আরো আছে চামার, কামার, কুমার, জেলে, ব্যাধ, জোলা, ডোম যাযাবর ইত্যাদি সমাজে এদের স্থান অস্পৃশ্য অন্তজ| ধাঙড়রা হাতে ধরেছে; ছোঁয়েছে বা ব্যবহার করেছে এমন কোন জিনিস অন্য সকল বর্ণের হিন্দুদের কাছে নিষিদ্ধ| এরা সনাতন হিন্দু ধর্মের লোক হলেও অন্য সকল বর্ণের হিন্দুদের সাথে মন্দিরে উপসনায় অংশ নিতে পারে না| ভারতীয় উপমহাদেশে মানবতাবাদী রাজনীতিবিদ মহাত্মা গান্ধী মেথর বা ধাঙড় সহ সকল অন্তজ শ্রেণির লোকদের হরিজন (হরির জন / ঈশ্বরের সন্তান) হিসেবে আখ্য দেন| যারা সেবা দান করে তারা উত্তম যারা সেবা নেয় তারা ঋণি| এই দিকটি বিবেচনায় করলে দেখা যায় যে ধাঙরদের অবস্থান উত্তম| আমরা ধর্মীয় বাণী ও প্রবাদ প্রবচনেও শুনি-
'জীবে দয়া করে যেইজন সেইজন সেবিছে ঈশ্বর'
'মুছি হলেও সুচি হবে যদি কৃষ্ণ ভজে' ইত্যাদি|
পেশাজীবি হিসেবে এই ধাঙড়দের ঢাকায় আগমন ঘটে ১৬২৪-২৬ খ্রিস্টাব্দে| ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দে ঢাকা কমিটি গঠন ও ১৮৬৪ খ্রিস্টাব্দে ঢাকা পৌরসভা গঠনের পর ধাঙড়রা পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার কাজে বেতনভোগী শ্রমিক হিসেবে কাজ করে| ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গভঙ্গের ফলে ঢাকা পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশের রাজধানী হয়| ইহার ফলে ঢাকা পৌরসভার দায়িত্ব আরও বেড়ে যায় আর তা সামাল দিতে পৌর কর্তৃপক্ষ ভারতের কানপুর, মাদ্রাজ, নাগপুর থেকে ধাঙড় (নারী-পুরুষ) আনার ব্যবস্থা করে| পরবর্তী পর্যায়ে বাংলাদেশের অন্যান্য শহর বন্দরেও মেথর নিয়োগ করা হয| তাদের বসবাসের জায়গাও নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয় যেমন ঢাকার টিকাটুলি, আগা সাদেক রোড, ময়মনসিহে হরিজন পল্লী, মেথরপট্টি ইত্যাদি| ১৯৪০ পরবর্তী কয়েক দশকে দেশ ভাগ, যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ ইত্যাদি কারণে যে চরম অর্থসংকট সামাজিক সংকট সৃষ্টি হয়| এর ফল¯^রূপ দেশীয় লোকজনও ধাঙড় বৃত্তি গ্রহণ করে| ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দের দুর্ভিক্ষ সময় আরও বহু সংখ্যক দেশীয় লোক এই ধাঙড় পেশায় নিয়োজিত হয়|
ধাঙরদের ভাষা ও সংস্কৃতি| সাধারণত আমরা যে শব্দ / সংকেতের মাধ্যমে একে অপরকে বুঝে থাকি এবং বুঝিয়ে থাকি সেটাকেই ভাষা বলি| পৃথিবীতে বর্তমানে প্রায় ৭১১১টি ভাষায় মানুষজন কথা বলে| আমাদের বাংলাদেশে বিভিন্ন অঞ্চলে অবস্থানরত আগত বিভিন্ন সম্প্রদায়, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে নিজ¯^ ভাষা ও সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত আছে| এথ&&নোলগ এর ২১তম সংস্করণ (২০১৮) অনুসারে বাংলাদেশে ৪১টি ভাষা প্রচলিত আছে| ভাষাগুলো হলো- গারো / মান্দি (Garo / mandi) হাজং (Hajang) কোচ (koch) লালেং/পাত্রা (Laleng / Patra), মারমা (marma) কোকবরক (kokborok), খুমি (khumi) খিয়াং (khiyang), লুসাই (lusai) তংচঙ্গা (tanchangya) ম্রো (Mro) রাখাইন (rakhain) পাংখুয়া (Pankhuya) বাউম (Bawom) রেংমিটচা (Rengmitcha) চক (Chak) মণিপুরীমেইথেই (Maripuri Meithei) লিঙ্গম (Lingam) সাদরি (Sadri) মাদ্রাজি (Madraji) থর (Thar) উর্দু (Urdu) ওড়িয়া (Odia) অহমিয়া (Ahomia) মণিপুরী বিষ্ণুপ্রিয়া (Monipuri Bishnupriya) কানপুরী (Kanprui) চাকমা (Chakma) নেপালি (Nepali) এবং কন্দো (Kondu), সাঁওতালি (Santati) মাহলে (Mahle) কোরা (kol), কোয়া বা কোদা (koda), মুন্দারি (mundari), খারিয়া (kharia), সাউরা (saura), খাসি (khasi), কুরুখ (Kurukh) মাল্টো (malto), তেলেগু (Teluge)| বাংলাদেশে আগত ধাঙড়দের মধ্যে মাদ্রাজি, কানপুরি ও নাগাপুরিই প্রধান, এদের জীবনাচার ও সামাজিক ব্যবস্থার মধ্যে কিছু কিছু পার্থক্য রয়েছে| মাদ্রাজ থেকে আগত ধাঙড়দের মুখের ভাষা তেলেগু আর নাগপুর ও কানপুর থেকে আগতদের মুখের ভাষা হিন্দি বা হিদি উর্দু মিশ্রিত|
ময়মনসিংহ হরিজন পল্লীতে তাদের ভাষা সংস্কৃতি দেখা উপলব্ধি ও ভাববিনিময় করতে গিয়েছিলাম| তাদের সাথে কথা বলে উপলব্ধি করলাম তাদের অতীতের অর্থাৎ পূর্ব পুরুষদের যে ¯^াতস্ত্র ছিল এটা এখন আর নেই| তাদের মধ্যে বাঙালি সংস্কৃতি প্রবেশ করেছে| বাংলাদেশের রাষ্ট্র ভাষা বাংলা, সকল কাজকর্ম অফিস আদালতে বাংলা ব্যবহৃত হয়| ফলে তারা বাংলা শিখেছে ভালোভাবেই তাদের কথা-বার্তা, চলন-বলন, আবেগ প্রকাশে নাচ গান সবকিছুতেই বাঙালি স্টাইল| শুধুমাত্র বিয়ে সাদী, ধর্মীয় অনুষ্ঠান ইত্যাদির ক্ষেত্রে প্রবীন মহিলা ও কিছু কিছু ইয়ং মহিলা হিন্দি উর্দু মিত্রিত ভাষায় গীত, কীর্তন, নাছ গান করে থাকে|
বিনোদ হেলা ও বিমল হেলার সাথে কথা বলার সময় তাদের একটি কথোপকথন শুনি| এটা তাদের আঞ্চলিক হিন্দি ভাষায়:-
১ম জন : কাব আয়হে? কতক্ষণ হলো এসেছে?
২য় জন: আবি আইলি, এইমাত্র এসেছি|
১ম জন: ভাত খায়হে? ভাত খাইছেন?
২য় জন: খায়হে - খাইছি|
১ম জন: খায় দেয়কে খায়হে? রাম রাম| কি দিয়ে খেয়েছে? সেলাম|
পোষাক আশাকে এদের বিশেষত্ব হলো প্রায় পুরুষই ধূতি, পাগড়ী, হাতাকাটা আচকান পড়ে| তবে আজকাল এরা বাহিরে বের হলে প্যান্ট শার্ট পড়ে, গৃহ বা বাড়ীতে অবস্থানকালে লুঙ্গি, গামছা ও অনেককেই উদোম গায়ে দেখা যায়| মেয়েরা শাড়ি ও ব্লাউজ পরিধান করে, অলঙ্কার হিসেবে দুল, বিছা, চুড়ি, হাঁসুলি, নাকফুল, হার, কড়া ইত্যাদি পড়ে| পুরুষেরা বীরত্বের প্রতীক হিসেবে বিভিন্ন শক্তিশালী শিকারী জন্তুর (বাঘ, সিংহ, ভাল্লুক, ষাঁড়) উল্কি এঁকে থাকে| মেয়েরা কোমলতার প্রতীক হিসেবে শরীরে ফুলের উল্কি এঁকে থাকে|
ধাঙর সম্পাদায়ের আচার-বিচার অর্থাৎ প্রশাসনিক কার্যক্রমের জন্য রয়েছে পঞ্চায়েত ব্যবস্থা| পঞ্চায়েত প্রধানকে তারা চৌধরী (তাদের ভাষায় চৌধরী মানেই সভাপতি) বলে| ময়মনসিংহ হরিজন পল্লীর পঞ্চায়েত প্রধান বিনোদ হেলা চৌধরীকে মন্দিরে বসে দরবার করতে দেখলাম| জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম সাধারণত তারা মন্দিরে বসেই বিচার-দরবারের কাজ করে থাকে|
ধর্মীয় ও সামাজিক কারণে ধাঙড়রা শত শত বছর ধরে শোষণ, নিপীড়ন ও ˆবষম্যের শিকার হয়ে আসছে| তাদের উন্নতি ও কল্যাণের জন্য ১৯৩২ খ্রি. মহাত্মা গান্ধীর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সর্বভারতীয় অস্পৃশ্যতা বিরোধী লীগ যা হরিজন সেবক সংঘ নামে পরিচিতি|
১৯৩৬ খ্রি. বি.আর আ¤ে^দকারের উদ্যোগে গঠিত হয় একটি শ্রমিক সংগঠন| একই খ্রীস্টাব্দে ঢাকায় গঠিত হয় ঢাকা জেলা ধাঙড় ইউনিয়ন| ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় হরিজন সেবক সমিতি| এটি বর্তমানে বাংলাদেশে হরিজন সেবক সমিতি নামে পরিচিত| ধাঙড় অস্পৃশ্য এবং সম্প্রদায়ের কল্যাণে সারাদেশে কাজ করছে বাংলাদেশ বাশফোর হরিজন কল্যাণ পরিষদ|
বিনোদ হেলা, রাসেল হরিজন, তুলা হেলা, মুন্না হেলা, বিমল হেলা, বাদল সরকার প্রভৃতি হরিজনদের সাথে আমি যখন কথা বলছিলাম তখন পঞ্চায়েত প্রধান বিনোদ হেলা চৌধরী আক্ষেপ করে বলেছিল:- “আমরাও মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছিলাম| তবে আমাদেরকে দিয়ে পাকসেনারা এবং বাঙালিরা অনেক সময় মরা মানুষের লাশ টানাইছে| মুক্তিযুদ্ধের পরে আজ দেশ ¯^াধীন| মুক্তিযুদ্ধের সুফল আমরা পাই নাই| মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের সম্মান থেকে আমরা বঞ্চিত| আমরাতো নিচু জাত| আমাদের কাজের কোন মর্যাদা নেই| সবসময় অবহেলার পাত্র হয়ে থাকি| ¯^াধীন দেশের নাগরিক হিসেবে দেশের বিভিন্ন স্থানে আমাদের বসবাস করার সুযোগ নেই| আমাদের একটি নির্দিষ্ট গণ্ডীর মধ্যে বাস করতে হয়|”
ধর্মীয়, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক সেভাবে আমরা চিন্তা করি না কেন বর্তমান আধুনিক রাষ্ট্রসমূহ পুলিশি রাষ্ট্র নহে কল্যান রাষ্ট্র| কল্যান রাষ্ট্রে বসবাসরত সকল নাগরিকের কল্যানে রাষ্ট্র কাজ করে| গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশে প্রজাতন্ত্রের মালিক জনগণ| ধাঙররাতো দেশে বসবাসকারী জনগণের অংশ তাই তাদের অধিকার সংরক্ষণ প্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্রের তৃতীয় উপাদান সরকারের দায়িত্ব| রাষ্ট্রে বসবাসকারী সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের সকলেরই মানবতার ¯^ার্থে পরস্পর পরস্পরের সহযোগী হবো, এটা কল্যাণ রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে আমার বিশ্বাস|
--------------------------
মোঃ চাঁন মিয়া ফকির
ফকির বাড়ি, ঢোলাদিয়া, ময়মনসিংহ, বাংলাদেশ

Comments
Post a Comment