অধ্যাপক প্রবাল দাশগুপ্তকে স্মরণে
✍️ শিবাশিস মুখার্জি
ভাষাবিজ্ঞানের জগৎ আজ নিঃসন্দেহে আরও দরিদ্র হয়ে পড়ল। অধ্যাপক প্রবাল দাশগুপ্তের প্রয়াণ কেবল একজন খ্যাতনামা ভাষাবিদের মৃত্যু নয়; এটি এমন এক শিক্ষকের বিদায়, যিনি ভাষা, সমাজ ও মানবিক যোগাযোগকে নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছিলেন। তাঁর চলে যাওয়ায় আমরা হারালাম এমন একজন মানুষকে, যিনি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ছাত্রদের শুধু ভাষাবিজ্ঞান নয়, চিন্তা করতে, প্রশ্ন করতে এবং মানবিক হতে শিখিয়েছেন।
কলকাতায় জন্ম নেওয়া প্রবাল দাশগুপ্ত ভাষাকে শুধুমাত্র ব্যাকরণ ও বাক্যগঠনের বিষয় হিসেবে দেখেননি। তাঁর কাছে ভাষা ছিল সমাজ, সংস্কৃতি, পরিচয়, ইতিহাস ও ক্ষমতার জটিল আন্তঃসম্পর্কের এক জীবন্ত প্রতিফলন। বাংলা ভাষাবিজ্ঞান, সমাজভাষাবিজ্ঞান, ভাষানীতি ও ভাষাদর্শন নিয়ে তাঁর গবেষণা নতুন চিন্তার দুয়ার খুলে দিয়েছিল অসংখ্য ছাত্র, গবেষক ও ভাষাপ্রেমীর সামনে।
তাঁর প্রয়াণ আমার কাছে কেবল একাডেমিক ক্ষতি নয়, গভীর ব্যক্তিগত বেদনাও। ডেকান কলেজ, পুনেতে অধ্যাপনা করার সময় আমি তাঁর ছাত্র হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করি। সেই সময় প্রায়ই তাঁর কোয়ার্টারে যাওয়ার সুযোগ হতো। ভাষাবিজ্ঞান, সাহিত্য, ভাষা, সমাজ কিংবা জীবন— নানা বিষয় নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা চলত। সেই আড্ডাগুলি কখনও শুধুমাত্র পাঠ্যসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; সেগুলি ছিল জ্ঞান, কৌতূহল ও মানবিকতার এক অনন্য পাঠশালা। তাঁর কাছ থেকে আমি শুধু বিদ্যাই পাইনি, পেয়েছি স্নেহ, উৎসাহ এবং একজন শিক্ষক কীভাবে ছাত্রের জীবনে আলোর দিশা দেখাতে পারেন, তার এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
পরবর্তীকালে তিনি হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। কিন্তু স্থান বদলালেও আমাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়নি। আন্তর্জাতিক খ্যাতি ও ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি তাঁর ছাত্রদের কথা ভুলে যাননি। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষকতার গণ্ডি পেরিয়ে তিনি আমাদের চিন্তায়, গবেষণায় এবং জীবনবোধে প্রভাব বিস্তার করে গেছেন।
এরপর তিনি ভারতীয় পরিসংখ্যান প্রতিষ্ঠান (ISI), কলকাতায় অধ্যাপনা করেন। সেই সময় আমাদের সম্পর্কের এক নতুন মাত্রা যোগ হয়, কারণ ভাষা বিভাগের কাজের সূত্রে আমারও তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার সুযোগ হয়। একজন সহকর্মী হিসেবে তাঁকে কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা আমাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। শিক্ষক হিসেবে যে নিষ্ঠা, বিনয় ও বৌদ্ধিক সততা আমি দেখেছিলাম, কর্মক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন ঠিক তেমনই।
প্রবাল দাশগুপ্ত আন্তর্জাতিক পরিসরেও সুপরিচিত ছিলেন, বিশেষত এস্পেরান্তো আন্দোলনে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য। ভাষার মাধ্যমে বিশ্বজনীন সংলাপ ও সাংস্কৃতিক সহাবস্থানের যে স্বপ্ন তিনি দেখতেন, এস্পেরান্তো চর্চায় তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল তারই বহিঃপ্রকাশ।
তাঁকে অসাধারণ করে তুলেছিল শুধু তাঁর পাণ্ডিত্য নয়, তাঁর মানবিকতা। তিনি শুনতে জানতেন, প্রশ্ন করতে শিখিয়েছেন, মতভেদকে সম্মান করতে শিখিয়েছেন। তাঁর ছাত্রদের স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে উৎসাহিত করতেন। তাঁর উদারতা, আন্তরিকতা ও জ্ঞানপিপাসা আজও আমাদের অনুপ্রাণিত করে।
একজন শিক্ষকের প্রকৃত পরিচয় শুধু তাঁর লেখা বই বা গবেষণাপত্রে নয়, বরং তিনি কত মানুষের জীবন স্পর্শ করে যেতে পেরেছেন তার মধ্যেই নিহিত। অধ্যাপক প্রবাল দাশগুপ্ত তাঁর অগণিত ছাত্র, সহকর্মী ও শুভানুধ্যায়ীদের হৃদয়ে এমনই এক অমলিন ছাপ রেখে গেছেন।
তাঁর ছাত্র হিসেবে আমাদের অসংখ্য আলাপচারিতা, তাঁর স্নেহময় উপস্থিতি এবং তাঁর পরামর্শ আমি আজীবন বহন করে চলব। তাঁর অনুপস্থিতি গভীর বেদনার, কিন্তু তাঁর চিন্তা, শিক্ষা ও আদর্শ আগামী প্রজন্মের ভাষাবিদদের পথ দেখিয়ে যাবে।
প্রবালদা, আপনি আমার কাছে শুধু একজন শিক্ষক ছিলেন না; ছিলেন পথপ্রদর্শক, অভিভাবকসুলভ এক মানুষ। আপনার দরজা যেমন ছাত্রদের জন্য সবসময় খোলা ছিল, তেমনি খোলা ছিল আপনার মনও। আজ আপনি নেই, কিন্তু আপনার শেখানো পাঠ, আপনার স্নেহ এবং আপনার প্রতি আমার শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা চিরকাল অমলিন থাকবে। শিক্ষকরা কখনও সত্যিই চলে যান না; তাঁরা বেঁচে থাকেন তাঁদের ছাত্রদের চিন্তায়, কাজে এবং স্মৃতিতে।
ভালো থাকবেন প্রবালদা। আপনার ছাত্র হিসেবে এটাই আমার সবচেয়ে বড় পরিচয়গুলির একটি হয়ে থাকবে। আপনার অভাব গভীরভাবে অনুভব করব। কিন্তু আপনি রয়ে যাবেন আমাদের ভাষায়, আমাদের চিন্তায়, আমাদের হৃদয়ে।
....................................
(শিবাশিস মুখার্জি, ফ্যাকাল্টি, কলকাতা ও সংস্কৃত বিশ্ববিদ্যালয়)
Comments
Post a Comment