চৈতালি রাত
শ্যামল রায়
তটিনীর কানের দুলটা যেন চোখের সামনে দুলছে। অপার্থিব সুন্দর। ঠিক এমনটা আগে কখনও দেখা হয়েছে মনে পড়ে না। ধন্দটা আরোও বেড়ে যায় যখন বেয়াড়া মনটা প্রশ্ন করে বসে- সত্যিকারের মনোহারিণীকে... কার গর্বে কে গরবিনী.. সে কি সোনার উপর মুক্তোর কাজ করা ওই মোহন কানের দুল... নাকি ঘন কুন্তল শয্যায় সুখনিদ্রায় শায়িত ওই পেলব দুটো কান; ট্রেনের জানালার ফাঁক দিয়ে শুক্লা দ্বাদশীর চাঁদ দেখতে দেখতে হঠাৎ সৌভিক মনে মনে বলে উঠলো- ধুত্তর, কি যা তা ভাবছি।
প্রায় নির্জন স্টেশান। একটা দুটো চায়ের দোকান ব্যতীত আর কিছুই তেমন খোলা নেই। অবশ্য থাকার কথাও নয়। রাত প্রায় সাড়ে বারোটা। তার উপর দশটার দিকে বেশ জোরালো এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। আসমান জমিন সবকিছুই অপেক্ষাকৃত স্বচ্ছ এই মুহূর্তে। নক্ষত্রের আলোয় ভেসে যাওয়া এমন শান্ত প্রকৃতির নিঃশব্দ সংগীত প্রাণ ভরে উপভোগ করতে কার না ভালো লাগে। কিন্তু সহসা সেতারের তার ছিড়ে গেল। পিছন থেকে কে একজন ডাক দিয়ে বললো, এই যে.. শুনছেন...
ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকায় সৌভিক।
আপনি কোথায় নামবেন?
উল্টোডাঙ্গা।
লাগেজটা রেখে গেলাম। দশ মিনিটের মধ্যেই আসছি। একটু দেখে রাখবেন প্লীজ।
সৌভিক সম্মতি জানালো।
কাঁধের ব্যাগটা রেখে সহচরী একুশ-বাইশ বছরের মেয়েটির হাত ধরে প্লাটফর্মে নেমে গেলো ছেলেটা। ওদের অন্তর্ধানের পথে একটি জিজ্ঞাসু দৃষ্টি রাখে সৌভিক। নির্মল স্নিগ্ধতার নেশা পার্থিব বিভ্রান্তিকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিল দ্রুত। জানালার সরু পথ গলিয়ে সৌভিকের দৃষ্টি আবারও ভেসে গেল আকাশ গঙ্গায়। সামনের সীটে পা ছড়িয়ে তারার দেশে হারিয়ে গেল গার্লস কলেজের সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত তরুণ অধ্যাপকের সবুজ মন।
ঘড়ির কাঁটায় রাত্রি সাড়ে বারোটা জুঁই ছুঁই। ট্রেনের হুইসেল বাজলো। সামনের সীটের সহযাত্রীদের এখনও খবর নেই। কিছুটা আশ্চর্য সৌভিকের সন্ধানী চোখ দুটো অধিকারীহীন লাগেজের গায়ে গিয়ে বিঁধল। একটা অশুভ ভাবনা তড়িৎ ওর মাথার মধ্যে চক্কর খেয়ে গেল। চক্ষের নিমেষ অন্তর্হিত না হতেই গাঢ় সবুজ পাড়ের হলুদ রঙা শাড়ী পরিহিতা মেয়েটি কোনরকমে ট্রেনে উঠলো। ওর এমন নিঃসঙ্গ প্রত্যাবর্তনে যারপরনাই হতাশ সৌভিক শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন করেই ফেললো। আপনার সাথে যিনি ছিলেন উনি আসেন নি?
না।
ওহ্।
হরিণের চামড়ায় কাজ করা হালকা ধূসর রঙের সাইড ব্যাগটার ভেতর থেকে হ্যান্ডসেট টা বের করে কাকে যেন ফোন করলো নিরাভরণ মেয়েটা। সৌভিক দেখেও দেখল না। চৈত্রের শেষ তবু গরমটা অনুভূত নয় যথাযত। তাছাড়া তখনকার বৃষ্টির পর থেকে রাত্রির আবহাওয়া এখন অনেকটা ইতালীয় মিস্টিসিজম্ এর মতো। অথচ আশ্চর্যজনকভাবে মেয়েটির কপালে, নাকের ডগায় বিন্দু বিন্দু ঘামের অস্তিত্ব আবিষ্কার করে সৌভিক। প্রতিপক্ষের বিধিবদ্ধ সংযমে বন্দী হয়ে নীরবতা দীর্ঘ হতে থাকে। মাঝে মাঝে জানালার ফাঁক গলিয়ে নিরপরাধ ঠাণ্ডা হাওয়া অপরিচিতার কপালের দুই পাশে ইতস্ততঃ ছড়িয়ে থাকা ঘন কালো চুল আর সৌভিকের অতি সৌখিন শরীরটাকে অনিচ্ছাকৃতভাবে মৃদু স্পন্দিত করে যাচ্ছিল। ব্যাগের ভিতর থেকে ট্রাভেলার্স ফ্লাক্স টা বের করে টি পটে চা ঢালতে ঢালতে সহযাত্রীকে উদ্দেশ্য করে সৌভিক বলল,- আপনি চা খাবেন? প্রতিপক্ষের কাছ থেকে সম্মতিসূচক কোন প্রত্যুত্তর না পেয়ে টি পটে চুমুক দিতে দিতে দ্বিধাহীন দ্বিতীয় প্রশ্ন করে সৌভিক, আপনি কি কোন সমস্যায় পড়েছেন?
মুখ তুলে অপরিচিতার জবাব দেওয়ার আগে একজন কনস্টেবলকে সাথে নিয়ে খাঁকি পোশাক পরিহিত একজন পুলিশ কর্তা ওদের কামরায় ঢুকে পড়ে। মাথার টুপিটাকে বার কয়েক অনর্থক অবক্ষেপন করে সৌভিকের দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে পুলিশ ভদ্রলোকটি বললেন- Excuse me... আপনারা কি স্বামী-স্ত্রী?
অপরিচিতার মুখাবয়বে স্পষ্ট ভীতির রেখা প্রত্যক্ষ করে অধিক না ভেবে সৌভিক জবাব দিল-আজ্ঞে হ্যাঁ।
Okay... আপনাদের ব্যাগ দুটো সার্চ করবো।
অনাকাক্তিক্ষত বিড়াম্বনার ভারে কিঞ্চিত বিমর্ষ মেয়েটির মুখের দিকে একটি সহৃদয় দৃষ্টিপাত সেরে কৃত্রিম সৌজন্যে সৌভিক জবাব দিলো- নিশ্চয়ই।
সৌভিকের ব্যাগ থেকে সদ্য কেনা একখানা 'গীতবিতান', চলতি বছরের ওয়েল প্রিন্টেড একখানা ডায়েরী, নিকন কোম্পানির জেড ফিফটি মডেলের একটি ডিএসএলআর ক্যামেরা আর গুটিকয় কলম ছাড়া তেমন কিছু খুঁজে পেলেন না পুলিশকর্তা। ইশারা মতো কনস্টেবলটি পাশের সিটে বসা মেয়েটি ব্যাগটি হাতে তুলে নেয়। ব্যাগের মধ্যে কয়েকটি জামা-কাপড়, একটা কভার ফাইলের মধ্যে বিশ্বভারতীর সংগীত ভবনে তোলা কয়েকটি গ্রুপ ছবি, ইউনিভার্সিটির কিছু ডকুমেন্টস আর ইন্ডিয়ান গভমেন্ট প্রদত্ত একখানা পাসপোর্ট ছাড়া আর বিশেষ কিছু খুঁজে পেল না। অর্ডিনারী সার্চিং শেষ হলে এক টুকরো বিনম্ন হেসে সৌভিকের উদ্দেশ্যে পুলিশ ভদ্রলোকটি বললেন, sorry. একটু ডিস্টার্ব করলাম, কিছু মনে করবেন না। আসলে কাল সন্ধ্যায় পাশের থানার বড়বাবুর মেয়ে প্রেম-ভালোবাসা সংক্রান্ত জটিলতায় ঝগড়া বিবাদে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এখনও অব্দি নিখোঁজ। আমাদের কাছে ইনফরমেশন আছে এই ট্রেনে ওরা কলকাতা যাচ্ছে, তাই আর কি
ও আচ্ছা-- হাসিতে সৌজন্যের জবাব দিলো সৌভিক।
সামনের সিটে তখনও মাথা নত করে বসে মেয়েটি। পুলিশ বেরিয়ে যেতেই অপরিচিতার উদ্দেশ্যে দুই হাত জড়ো করে সৌভিক বলল I'm extremely sorry..
ধীরে ধীরে মুখ তুলে একবার শুধু সৌভিকের দিকে তাকালো মেয়েটি, কোন কথা বললো না।
নিরেট অপরাধবোধে কিংকর্তব্যবিমূঢ় সৌভিক পুনরায় বললো আসলে হঠাৎ কিছু অনুমান করতে না পেরে আপনাকে বিস্তর অসম্মান করে ফেললাম। I'm... ওকে শেষ করতে না দিয়েই স্মিত হাস্যে মেয়েটি বললো No No..It doesn't matter.
শাপমুক্তির উচ্ছ্বাসে মুখ তুলে সৌভিক শুধু বললো- You are so graceful.
মুখে কোন জবাব না দিয়ে সৌভিককে আরও একবার শুধু দেখলো মেয়েটি।
অনেকক্ষণ আর কোন কথা হয়না। রাত্রির নিস্তব্ধতা বিদীর্ণ করে সামনের দিকে ট্রেন ছুটে চলে- সহস্র মানুষের কোলাহলের অন্তরালে যেমন একাকী এগিয়ে চলে মানুষের জীবন। দ্বাদশীর রাতে কোথাও চোখে পড়ে দুর সীমানায় নীরব অভিমানে মুখ তুলে দাঁড়িয়ে থাকা তাল সুপারির বন, কোথাও বা ঘন সবুজে ঘেরা বিস্তীর্ণ ফসলের ক্ষেত। এরই মাঝে আবার কোথাও চোখে ধরা পড়ে নিদারুণ শূন্যতায় বুক চেপে জেগে থাকা অনন্ত ধূধূ মাঠ। সত্যিই এই নৈঃসর্গিকতা জীবনের এই মৌলিক অনুভূতি এতোদিন অনাস্বাদিত ছিল সৌভিকের জীবন অভিজ্ঞতায়। কী ভেবে বাইরের অনাবিল প্রাকৃতিক প্রবাহমানতার তরঙ্গ থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে এনে সামনের সীটে মোবাইল ফোনের কৃত্রিম স্ক্রীনে মগ্ন নিশিথীনির উদ্দেশ্যে বলে, আপনার গন্তব্য?
"দমদম
আপনি ওখানেই থাকেন?
না।
তাহলে?
আজ রাত্রের ফ্লাইটে কোলকাতা থেকে দিল্লি যাবো। দু'দিন জ্যেঠুর কাছে ওখানেই থাকবো..... আপনি উল্টোডাঙাতেই থাকেন?
না। আমি ঘুরতে বেরিয়েছি। ভোর চারটে বিয়াল্লিশের 'দুন' এক্সপ্রেস ধরে কাল এখান থেকে সোজা দেরাদুন।
ওহ্।
If you don't mind.. একটা প্রশ্ন করি?
হু।
কোনো কারনে কি আপনি চিন্তিত?। mean feel worried in mind?
কেন?
আপনাকে কেমন যেন নিষ্প্রভ মনে হচ্ছে।
তাই?
আপনি কি দেশের বাইরে কোথাও.....
হ্যাঁ।
কোথায়?
মাদ্রিদ স্পেনে।
এই জন্য বুঝি মনটা খারাপ?
না... Not at all
তাহলে?
আসলে দিল্লী পর্যন্ত দাদার যাওয়ার কথা ছিলো ও আসতে পারলো না একা তো তাই..
ভয় পাচ্ছেন?
.......
আচ্ছা, উনি এলেন না কেন?
হঠাৎ মা'র অসুস্থতার খবর শুনে ফিরে গেল।
'চিনিলে না আমারে কি, চিনিলে না.. দীপহারা... কথোপকথনের মাঝখানে সৌভিকের ফোনের রিংটোন টা হঠাৎ বেজে উঠল। জাস্ট এ মিনিট বলে ফোনটা রিসিভ করে সৌভিক। দূরভাষের ও প্রান্ত থেকে একটি নারী কন্ঠের অস্পষ্ট আওয়াজ ভেসে আসে। হ্যালো... হ্যালো... ট্রেনের শব্দে বক্তব্যের অস্পষ্টতা দূর করতে ফোনটা লাউডে সেট করে নেয়া সৌভিক। হ্যালো, হ্যাঁ হ্যাঁ এবার শুনতে পাচ্ছি হ্যাঁ বলো..
"আপনি ভালো থাকবেন স্যার... আপনি
সেকি! তুমি এখনও কাঁদছো। হ্যালো, হ্যালো.. হঠাৎ দূরভাষের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলে হ্যাণ্ডসেট টা বন্ধ করতে করতে সামনের দিকে তাকিয়ে কী যেন বলতে চায় সৌভিক। ওকে থামিয়ে দিয়ে মেয়েটি বলে,- আপনি রবীন্দ্র সংগীত ভালোবাসেন?
একদম না।
ওহ আচ্ছা...
এমন প্রশ্নের কারণ?
আপনার ফোনের রিংটোন টা..
ওটা রবীন্দ্র সংগীত?
জানেন না।
নাহ্। আসলে তটিনী, মানে আমার student, ও-ই আমার বছর খানেক আগেকার পুরনো রিংটোনটাকে আজ পাল্টে দিলো।
'গীতবিতান' বইটাও কি ওরই দেওয়া?
আপনার দেখছি গোয়েন্দার চোখ।
আমার প্রশ্নের উত্তর পেলাম না..
হ্যাঁ, বইটা ওরই দেওয়া। আজ ওর বিয়ে হয়ে গেল।
আপনি সেখান থেকে ফিরছেন?
হ্যাঁ।
আজকের রাত্রিটা ওদের বাড়িতে থেকে যেতে পারতেন-ওই যে বললাম চারটে বিয়াল্লিশে দেরাদুন যাত্রা..
একটা প্রশ্ন করি?
নিশ্চয়ই।
বছর খানেক ধরে আপনার ফোনের রিংটোন টা কি ছিল?
একটা হিন্দি সিনেমার গানের সুব কী বলুন তো..
ওই যে "Agar Tum mil Jao jamana chhor denge ham"...
হাসলেন যে?
ঐ সুরটাও তো আপনার Student এর সেট করে দেওয়া ছিলো- তাই না?
আপনি গনক নাকি!
গনক হতে যাবো কেন।
কী করে বুঝলেন?
ছাড়ুন। আচ্ছা, আপনি রবীন্দ্র সংগীত একদমই শোনেন না? না বিশ্বাস করুন আমি 'ওর' মাথা মুন্ডা কিছু খুঁজে পাইনা।
কিছুই না?
কিচ্ছু না. আর আমার ধারণা পৃথিবীর কারুর পক্ষে কোনদিনও ওনার কথার পূর্ণাঙ্গ অর্থ বুঝতে পারা সম্ভব নয়।
একজন বোধহয় বেশ খানিকটা বুঝতে পেরেছিলেন।
কে?
কাদম্বরী দেবী।
জানিনা.. আচ্ছা, আপনি তো একটু আধটু রবীন্দ্রচর্চা করেন, কাদম্বরী দেবী সুইসাইড করলেন কেন বলতে পারেন?
উনি রবীন্দ্রনাথকে অনেকটাই বুঝে ফেলেছিলেন, তাই-
Strange!
বিশ্বাস করতে পারছেন না. তাইতো?
না ঠিক তা নয়
তবে?
ভাবছি এও কি হওয়া সম্ভব?
খুবই সম্ভব।
আচ্ছা ছাড়ুন.. আপনি মাদ্রিদ যাচ্ছেন কেন?
আমার ছোট কাকা থাকেন ওখানে।
বেড়াতে যাচ্ছেন?
না।
Educational কোন embitions আছে বুঝি?
না না।
তবে?
আসলে আমি আমার বাকি জীবনটা ছোট কাকার কাছে থাকবো ভেবেছি।
মানে?
হ্যাঁ।
আপনি আর ফিরবেন না?
ফিরবার প্রয়োজন নেই আর।
বুঝলাম না।
খুবই দুর্বোধ্য মনে হচ্ছে?
ভীষন।
রবীন্দ্র সংগীতের মতো?
হেয়ালী রাখবেন?
আসলে আজ রাত্রে এদেশে আমি আমার সবচেয়ে প্রিয় জিনিসটিকে হারিয়ে ফেলেছি।
মানে
সবটুকু না হয় নাই শুনলেন, কিছুটা অন্তত আমার কাছে থাক।
আপনি অতল রহস্যে ঘেরা এক গভীর সমুদ্র।
আপনি খোলা আকাশের নীচে এক নিষ্ঠুর বৈশাখী হাওয়া।
অকারনে আমাকে মিথ্যে কলঙ্কিত করলেন।
আপনি কলঙ্কিত হওয়ার খুব ভয় পান না?
ট্রেনের গতিটা হঠাৎ শ্লথ হয়ে যাওয়ায় কথোপকথন আর এগোতে পারল না। সৌভিকরা বুঝে নিল গন্তব্য নিকটেই। সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে বহু কষ্টে ট্রেন থেকে নেমে যায় মেয়েটি। সীট ছেড়ে উঠে এসে সহযাত্রীর লাগেজটা এগিয়ে দেয় সৌভিক। নির্জন গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থেকে রহস্যাবৃতাকে নিরীক্ষণ করে কিছুক্ষণ। হঠাৎ কী ভেবে মাথা নিচু করে ঘড়ির সময়টা দেখে নেয় একবার। চারটে বিয়াল্লিশ বাজতে এখনও বেশ খানিকটা বাকী। সহসা নিজের ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে নিয়ে টেন থেকে নেমে পড়ে সৌমিক। দ্রুত পায়ে কয়েক মিনিট হাঁটতেই অপরিচিতার দেখা মেলে। অনভ্যস্ত কার্যে মেয়েটির বিড়াম্বনা বুঝতে বিলম্ব হয় না সৌভিকের। নিকটে পৌঁছে ডাক দিয়ে বলে- শুনুন...
পিছনে ফিরে হক চকিয়ে যায় মেয়েটি। নিঃশব্দ হেসে বলে আপনি এদিকে....
হাতে কিছুটা সময় আছে... ভাবলাম আপনাকে ছেড়ে দিয়ে যাই... প্লীজ ব্যাগটা আমাকে দিন।
না না, আপনার কাঁধে তো..
কোন অসুবিধা হবে না, আমার ব্যাগের মধ্যে তেমন ভারী কিছু নেই- বলতে বলতে হাত বাড়ায় সৌভিক। ক্লান্তির বোঝাটাকে সৌভিকের হাতে তুলে দিতে দিতে এক টুকরো মিষ্টি হেসে মেয়েটি বলে - You are more graceful than a forgiving woman
ওহ! No No..
ওরা এয়ারপোর্টে পৌঁছায়। রাত প্রায় তিনটে। এতো রাত তবু কেন জানি বড্ড ভিড় এয়ারপোর্টে। ভিড় ঠেলে ঠেলে সামনে এগোতে ক্লান্ত হতে হচ্ছে সবাইকে। মেয়েটিকে ঘন ঘন ঘড়ির দিকে তাকাতে দেখে সৌভিক বলে- সময় বোধহয় আর বেশি নেই আমার হাতটা শক্ত করে ধরুন তো।
আপনি বরং ধরুন। আমি কিছু শক্ত করে ধরতে পারি না।
একটি অত্যন্ত নিরীহ দৃষ্টিতে একবার শুধু চোখের দিকে তাকিয়ে অকুণ্ঠিতার হাত ধরে ভিড়ের মধ্যেও তির তির করে এগিয়ে যায় সৌভিক। খানিকক্ষণ বাদে ওরা সেফ জোনের কাছে পৌঁছয়। হাত ছেড়ে দিয়ে কাঁধের ব্যাগটা মেয়েটির হাতে তুলে দিয়ে একটি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে ক্লান্তি মোচন করে নেয় সৌভিক। কৃতজ্ঞতায় রক্তিম হয়ে ওঠা মেয়েটির চোখের দিকে এক পলক তাকিয়ে বলে- এবার তাহলে আসুন।
আপনার নাম্বারটা...
দরকার কী মিছে বিড়াম্বনা বাড়িয়ে। এই অল্প পরিচয়ের আনন্দটুকু না হয় স্মৃতি করে রেখে দেবেন মনের গভীরে।
তাই হবে।
মাদ্রিদে আপনি খুব ভালো থাকবেন.. খুব ভালো।
চেষ্টা করবো.. আপনি একটু আধটু রবীন্দ্র সংগীত শুনতে পারেন.. রবীন্দ্র সংগীত জীবনের কথা বলে।
মনে রাখবো।
...আসি?
আসুন।
দিল্লীগামী যাত্রীদের ভিড়ে ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যায় মেয়েটি। অদূরে দাঁড়িয়ে লাবণ্যলতার শরীরের শেষ চিহ্নটুকু নিরীক্ষণ করে সৌভিক। ভোর হতে আর বেশি বাকি নেই। বসন্ত বিদায়ের কালে শেষ রাত্রির সুশীতল প্রকৃতি যেন স্বপ্নের মতো মায়াবী আর অপরূপ সুন্দর। পকেটের মধ্যে মোবাইল ফোনটা বেজে ওঠে। রিসিভ করতে করতে পিছনে ফিরে গন্তব্যের পথে পা বাড়ায় সৌভিক। কয়েক মূহুর্ত বাদে সশব্দে ইন্ডিয়ান এয়ার ওয়েজের একটি সুদৃশ্য বিমান নক্ষত্রের বক্ষ বিদীর্ণ করে দিল্লীর অভিমুখে যাত্রা শুরু করে। একটি ক্লান্তিহীন নিরাসক্ত দৃষ্টিতে সেটি অবলোকন করতে করতে স্বচ্ছন্দ গতিতে সামনের দিকে এগিয়ে যায় সৌভিক।
==============================
Shyamal Roy
Adress:- Duttapukur,N 24 Pgs,WB
Comments
Post a Comment