পূজারিনী
শিউলী ব্যানার্জী ( মুখার্জী )
সন্ধ্যা নামছে ধীরে ....
পূজারিনীর হাতে প্রদীপ ঠাকুর ঘরে পিলসুজের উপর প্রদীপ টি ধীরে ধীরে জ্বালিয়ে ধূপ খানা দুটো জ্বালিয়ে দেয়। শঙ্খে ফু দিয়ে লালা পাড় সাদা শাড়ি টি পরে পূজারিনী ঠাকুর ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। আজ পূজারিনীকে দেখে অনুজের যেনো আরো বেশি ভালো লাগছিলো। অনুজ পূজারিনীকে আগে এভাবে দেখেনি , আসলে পূজারিনীকে কখনো এভাবে দেখার চেষ্টা ও করেনি। বিগত দশ বছর ধরে রাত দিন শুধু কাজ আর কাজ চব্বিশ ঘন্টা সে তার কম্পানির কাজে পাগল। কখনো নিজের স্ত্রীর জন্য তার সময় নেই। হ্যাঁ ঘরে পূজারিনীর অভাব কিছু নেই। সব স্বাচ্ছন্দ্য সে পূজারিনীকে দিয়েছে কিন্তু সময় দিতে পারে নি। পূজারিনী নিজের মতো নিজের জীবন গুছিয়ে নিয়েছে অনুজের জন্য তার কোনো অনুযোগ অভিযোগ নেই কারন বাবা মা আত্মীয় স্বজনহীন অনাথ পূজারিনীকে সে বিয়ে করেছে সমাজে একটা সম্মানের জায়গা দিয়েছে এটা অনুজের কাছ থেকে পূজারিনীর বিশেষ পাওয়া। তবে পূজারিনী অনুজের জন্য তার স্ত্রীর কর্তব্য কর্মে অবহেলা কখনো করেনি। যতই অনুজ ব্যস্ত থাক না কেন অনুজের সব দিকটি খেয়াল রাখে পূজারিনী।তবে আজ বেশ কিছুদিন ধরে অনুজের শরীর ভালো রকম অসুস্থ । পূজারিনী রাত দিন জেগে অনুজের দেখ ভাল করতে থাকে প্রয়োজন মতো তার সব ওষুধ খাবার খাওয়াতে থাকে সময় সময় ডাক্তারের সাথে পরামর্শ ও নেয় সে। তবে আজ দশদিন পর অনুজ একটু সুস্থ। আজ সন্ধ্যাটা অনুজের কাছে এক অন্যরকম সময় আর ভালোলাগা বয়ে এনেছে তার জীবনে। পূজারিনী যখন প্রদীপের আলোটি ধীরে ধীরে অনুজের মাথা কপালে ঠেকিয়ে বুকের কাছে সেই আলোর তাপ হাতে করে দিলো অনুজ পূজারিনীকে এক নতুন রূপে দেখলো এর আগে কখনো এভাবে সে পূজারিনীকে দেখেই নি সে । তার কাছে বিয়েটা ছিলো সমাজ সেবার একটা প্রোজেক্টের মতো। কখনো পূজারিনীকে নিজের কাছে টানে নি সে। যদিও পূজারিনীর কোন কিছুর সাংসারিক ত্রুটি রাখেনি সে। কিন্তু আজ সন্ধ্যায় লাল পাড় সাদা শাড়ি কপালে লাল টিপ মাথায় সিঁথি ভর্তি সিঁদুর ফর্সা পান পাতার মতো মুখের উপর প্রদীপের আলো পড়ছে .... কি অপূর্ব লাগছে পূজারিনীকে। অনুজ অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে পূজারিনীর চোখের দিকে। তার দৃষ্টি স্থির। এমন সময় পূজারিনীর হাত দুটো অনুজ ধীরে ধীরে ধরে পাশে বসিয়ে জিজ্ঞেস করে ..... পূজারিনী আমি কি তোমাকে সুখী করতে পেরেছি ! এত গুলো বছরে তোমাকে তো চেয়ে দেখার অবকাশ টুকু হয়নি। পূজারিনীর মুখে মৃদু হাসি সে উত্তরে বলে আমার মতো অনাথ কে তুমি আশ্রম থেকে এনে তোমার দেবালয়ে জায়গা দিয়েছো। প্রতিদিন তোমার ঘরের মন্দিরে পূজো করার অধিকার দিয়েছো
আমার কিছুর ত্রুটি রাখনি আর তোমার ভালোবাসা সে তো একটা ভরসা বিশ্বাস যা তোমার মুখে প্রকাশ না হলেও পেয়েছি, তাই তোমার সময়ের অপেক্ষা করেছি ।
অনুজ তার স্ত্রী পূজারিনীর কথায় বিস্মিত হয় সে ভেবেছিল পূজারিনীর তার প্রতি হয়তো অভিযোগের শেষ থাকবে না। কিন্তু পূজারিনীর অন্তরের সরলতা তার বিচার ভাবনা অনুজের ভাবনা কে বদলে দেয়। অনুজের চোখে জল সে পূজারিনীকে বুকের কাছে টেনে নেয় ..... সন্ধ্যার বাতাসে ঘরের জানালা দিয়ে ভেসে আসে ...
মধু মালতির গন্ধ আর সানাই এর সুর... সাক্ষী থাকে দীর্ঘ দশ বছরের অনুজ আর পূজারিনীর বিবাহিত জীবনের ভালোবাসার আর কাছে আসার মূহূর্তের....।।
----------------------------------
শিউলী ব্যানার্জী (মুখার্জী)
গ্রাম+ পোস্ট: নিত্যানন্দপুর
থানা :গঙ্গাজলঘাটী
জেলা : বাঁকুড়া
পিন : 722142
Comments
Post a Comment