বন্দীর জবানবন্দী
চন্দন চক্রবর্তী
কে? সুবল ঠাকুরপো? প্রবীরদা বাজারে গেছেন। তোমার অনেকদিন দেখা সাক্ষাৎ নেই যে, কী ব্যাপার?
এতগুলো কথার উত্তর কী দেব! থমকে গেলাম। প্রবীরদার এখানে আসছি অনেকদিন। বৌদিকেও দেখছি। কিন্তু আলাপ করার ইচ্ছাটা প্রবল হলেও, নিজে থেকে একটা কথাও এতদিন মুখে ফোটে নি। বৌদিও বলেন নি।
প্রবীরদার সঙ্গে প্রথম আলাপ কিন্তু আমাদের বাড়িতে। সেই যেবার সন্ধ্যাবেলা বাড়িতে সাপ ঢুকেছিল। প্রবীরদাকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিলাম।
আমার তখন কুড়ি চলছে। সেই সময় মেয়েদের সম্পর্কে কৌতূহল তুঙ্গে। অথচ লজ্জা এসে সরাসরি দেখার ইচ্ছাটা এমন চেপে ধরে, মুখে কথা সরে না, চোখ ও আপনা আপনি নত হয়ে যায়!
সেদিন যখন সরাসরি প্রশ্নগুলো শুনলাম, কিছু বলতেই হয়। তবু লজ্জা চেপে ধরায় তোতলামি করে কটা কথা কোনো রকমে বেরিয়ে এলো।
ও প্রবীরদা নেই?
বৌদি বোধ হয় আমার অবস্থাটা বুঝতে পেরেছেন। মেয়েরা এমনিতেই ছেলেদের থেকে বেশি সচেতন। তার ওপর ওর বয়স তিরিশের আশপাশ, কাজেই অভিজ্ঞতাও বেশি। আমার উত্তর উপেক্ষা করেই বললেন,
চা খাবে ঠাকুরপো?
না হ্যা কিছু বলতে পারলাম না। লজ্জা এসে ঘিরে ধরল। ভদ্রমহিলা নিঃসন্তান। নাম রমলা। স্বাস্থ্য ভালো বললে কম বলা হয়। শরীর যেটুকু উন্মুক্ত, চকচক করছে। কপালে বিরাট লাল সিঁদুরের টিপ। যেন উদ্ধত গোখরোর ফনা হিস হিস করছে! গাল দুটোয় রক্তিম আভা।
এ বাড়িতে শুধু সাপ আর সাপ। প্রবীরদার বয়স আন্দাজ পয়ত্রিশ। ওর কাজই হল সাপ ধরে বাক্সে, চৌবাচ্চায় রাখা। সেই কারণেই মনে হয় রমলা বৌদিকে বোঝাতে সাপের কথাটা মাথায় এসে গেল!
আমার বাড়ির কাছেই প্রবীরদার বাড়ি। বিয়ে করেছেন অনেকদিন। কিন্তু বাচ্চা কাচ্চা নেই। কেমন মনে হত লোকটা বিয়ে না করলেই পারতেন। যখনই ওর ওখানে গেছি, সাপের সঙ্গেই ওকে সময় কাটাতে দেখেছি। ঘরে বউ আছে তার দিকে দৃষ্টি দেওয়ার যেন ইচ্ছাই ছিল না!
প্রবীরদার ওখানে যখন যেতাম, হাতে করে দু পাঁচটা ডিম কিনে সঙ্গে নিতাম। কিংবা ওর হাতে টাকা গুঁজে দিতাম। নইলে অতগুলো প্রাণীর যা খরচ, চালানো কঠিন।
কী এত ভাবছ? ! নাও, কাপটা ধর।
এই আলাপের পর থেকেই আমাদের সম্পর্ক অনেকটা সহজ হয়ে গেল। এরপর থেকে ওদের ওখানে গেলে কিছু সময় বৌদিকে দিতে হত।
দিন দিন প্রবীরদার দিক থেকে কোনো বাঁধা না আসায় আমি বৌদির একজন ভালো শ্রোতা হয়ে উঠতে লাগলাম। ঘন ঘন যাওয়া শুরু হল। বিকেল হলেই কেন জানি না যাওয়ার ইচ্ছাটা প্রবল হতে লাগলো। যখনই যেতাম বৌদি আমাকে ঘরে বসিয়ে কাজ সারতেন আর এটা ওটা বলে যেতেন। কিন্তু হাসি ছাড়া ওকে কোনোদিন কোনো অনুযোগ করতে শুনিনি।
একদিন বিকেলের দিকে গিয়েছিলাম। বৌদির কোনো সাড়া না পেয়ে ওদের ঘরে উঁকি দিলাম। বৌদির মুখটা ভার! আমার উপস্থিতি টের পেয়েই মনে হয় চোখের জল মুছে ফেললেন। আমার বুকেও কেমন কষ্ট বোধ হল! এটাও বোধহয় বয়সের কারণে। মনে হল ওর চোখের জল আমি মুছিয়ে দি। মনে হল মানুষটার কষ্টটা যদি কোনোভাবে কমিয়ে দিতে পারতাম। বললাম,
কী হয়েছে বৌদি?
কিছু না ঠাকুরপো। তুমি ছেলেমানুষ সেসব বুঝবে না। তোমার দাদাটা গোখরো পোষে ঠিকই কিন্তু নিজে একটা হেলে সাপ। না আছে বিষ, না আছে ফোঁস। তাই সারা জীবন ওর গোখরোগুলো বন্দী থেকে ছটফট করে।
সেই হেঁয়ালির অর্থ কী, বুঝলাম না! সেই প্রথম দিনটা ঠিক জমল না। আমি তো অস্বস্তিতে পড়ে গেলাম। মুখ দিয়ে কথা সরছে না। চুপ করে আছি দেখে বৌদি আবার শুরু করল,
তোমার দাদা বিয়ে করেছিল কেন বলতে পারো? এতগুলো বছর কেটে গেল, না পেলাম স্বামীর সোহাগ, না পারলাম মা হতে। রাত নেই দিন নেই যে যখন ডাকবে চলে যাবে। বাড়িতে বউটা যে একলা পড়ে থাকে সেই ব্যাপারে তার হুঁশ আছে? অথচ সাপগুলোর বেলা খেয়াল তো ঠিক থাকে!
বাইরে আসতেই প্রবীরদা আমাকে একটু দূরে টেনে নিয়ে গেল। বলল, তুই আর আমার বাড়িতে আসবি না।
আকাশ থেকে পড়লাম।
বললাম, আমার অপরাধ?
বলল, তুই অনেক ছোট, তাই বুঝিসনি। তোর ঘন ঘন আসাটা পাড়ার লোকে চর্চা করছে। আমি জানি তুই ছেলে ভালো। কিন্তু সমাজকে তো মানতে হয়।
আমার ভেতরে ভেতরে ভীষণ রাগ হল। যাওয়া বন্ধ করে দিলাম।
এর পরে প্রবীরদারের বাড়ির পাশ দিয়ে যখন গেছি, বৌদিকে কোনোদিন দেখতাম বারান্দায় বসে উদাস নয়নে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন। কোনোদিন উঠোন ঝাড় দিতে গিয়ে যেন হাঁফিয়ে পড়ছেন। চেহারার সেই উজ্জ্বলতা আর নেই।
কয়েকদিন পরে লোকমুখে খবরটা ছড়ালো। প্রবীরদার সর্বনাশ হয়ে গেছে। শুনেই মন খারাপ হয়ে গেল। প্রবীরদার ওপরে ভীষণ রাগ হচ্ছিল। ওদের বাড়ি ছুটলাম।
উঠোনে লোকের ভিড়। বৌদিকে চাদরে ঢেকে শোয়ান দেখে চমকে উঠলাম! কপালের লাল সিঁদুরটা টকটক করছে। বৌদির হাসি ভরা মুখটা চোখে ভেসে উঠলো। আমার কান্না এসে গেল!
প্রবীরদাকে পেলাম গোখরোর চৌবাচ্চার ধারে। আমাকে দেখে হাউ হাউ করে কেঁদে উঠল। তোর বৌদি সুইসাইড করেছে রে। ওর সাথে অনেক অন্যায় করে ফেলেছি। রমলা যে আমার উপর রাগ করে এটা করবে সময়মতো কেন বুঝলাম না!
কী বলব, ওকে জাপটে ধরলাম। সান্ত্বনা দিতে লাগলাম, একটু ধাতস্ত হতে বললাম।
প্রবীরদা এবার গতকাল রাতে যা ঘটেছে, সব কেঁদে কেঁদে বলতে লাগলো।
সবগুলোকে ছেড়ে দেব বুঝলি। আর বন্দী করে রাখব না। কাল রাতে একটা গোখরো ধরে এনেছিলাম। আমারই ভুল হয়েছে। ওটাকে বারান্দায় রেখেছিলাম। তোর বৌদি আমাকে শিক্ষা দিতে ওর ছোবল খেয়ে ঘটনাটা ঘটিয়েছে। একটু সময় পেলাম না বাঁচাবার । শুধু যাবার আগে কথা কটা লিখে গেছে। একটা কাগজ প্রবীরদা সামনে তুলে ধরল।
লাইন কটা পড়ে চমকে উঠলাম। লেখা আছে, বিষ দিয়ে ব্যর্থ জীবনের জ্বালা মিটিয়ে গেলাম তাতে যদি তোমার হুঁশ ফেরে! খালি খেতে পরতে দিলেই হয় না। পারলে ওদের মুক্তি দিও। ওদের অবস্থাও তো আমারই মত!
কাগজটা হাত থেকে নামিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইলাম। হঠাৎ বৌদির সেই কথাগুলো কানে ভাসছে, গোখরোগুলো বন্দী থেকে ছটফট করে, ঠিক আমার মতো।
বুঝলাম, বন্দী শুধু চৌবাচ্চার গোখরোগুলো ছিল না, একটা মানুষও এতকাল বন্দী হয়ে ছিল। আজ সে স্বইচ্ছায় মুক্তি পেয়েছে।
==================
চন্দন চক্রবর্তী, গ্রাম: প্রীতিনগর। পোস্ট অফিস : প্রীতিনগর, থানা : রানাঘাট, জেলা : নদীয়া, পিন নাম্বার : ৭৪১২৪৭,
Comments
Post a Comment