নীরব পরিণতি
তুফান নস্কর
নীলচে আকাশ ধীরে ধীরে ঘন কালো মেঘে ঢেকে গেল মৃদু শীতল ঝোড়ো বাতাস অবাধে বয়ে চলল, ধীরে ধীরে বাতাসের প্রকোপ বাড়তে লাগলো আর বৃষ্টির তীক্ষ্ণ ফোটার শীতল স্পর্শে উষ্ণ ধরিত্রী শান্ত হলো। ঝোড়ো বাতাসের দাপটে গগনচুম্বী বৃক্ষ হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ল কোনোরকম বাধা বিঘ্ন ছাড়াই ঝড়-বৃষ্টির তান্ডব যখন থামল তখন বেশ রাত হয়েছে। শর্মিষ্ঠা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল সাড়ে দশটা বাজে মোমবাতির আলোর শেষ কিরণ নিভে যাওয়ার আগের মুহূর্তে আরো একটা মোমবাতি জ্বালিয়ে দিল অনুরিতা। কালো ঘুমোট অন্ধকারের মাঝে সময়ও যেন থমকে গিয়েছে অজানা আতঙ্কে, বৃষ্টিতে ভেজা শীতল বাতাস খোলা জানালা দিয়ে ঘরের মধ্যে প্রবেশ করছে তাই মোমবাতির শিখাটা হেলে দুলে কোনরকমে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে এই প্রতিকূল পরিস্থিতি মাঝে। অপ্রত্যাশিত প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে দুই বোন এই অসময় খুব একা হয়ে পড়েছে মনের মধ্যে কেমন একটা অসস্থি কাজ করছে ওদের মধ্যে এখন ওরা কি করবে ঠিক বুঝতে পারছে না বাবা-মায়ের অপেক্ষায় আর কত সময় পার করতে হবে, কে জানে! এমন সময় প্রবল বাতাসের বেগে ভেজানো সদর দরজাটা সজোরে খুলে গেল তারপর.....
ছিটে ফোটা বৃষ্টির ছোঁয়ায় যখন ওদের জ্ঞান ফিরলো তখন ভোরের আলো সবে ফুটতে শুরু করেছে সারা শরীরে অসহ্য যন্ত্রণা তাই ওরা ঠিক করে হেঁটে যেতে পারছে না। দুজনে হাত ধরাধরি করে কোনরকমে কিছুটা সামনে এগিয়ে গিয়ে নিজেদের শরীরে ভারসাম্য রাখতে না পেরে আবার মাটিতে আছড়ে পড়ল এরপর ওদের আর কিছু মনে নেই। ফাঁকা রাস্তার পাশে বেশ কয়েকটা পুলিশ গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে আর ঠিক তারই পিছনে দাঁড়িয়ে আছে একটা অ্যাম্বুলেন্স। জমির আলের পাশে পড়ে থাকা রক্তাক্ত দুটো মানব শরীরে তখনও প্রাণের চিহ্ন বিদ্যমান তাই একটুও দেরি না করে দুজনকে তাড়াতাড়ি হসপিটালে নিয়ে গিয়ে এমার্জেন্সি ওয়ার্ডে ভর্তি করানো হল ডাক্তার তৎক্ষণাৎ চিকিৎসার সাথে সাথে ওদের দুজনকে I.C.U ওয়ার্ডে ট্রান্সফার করলো এবং থানার বড়বাবুকে ডেকে বললেন ৭২ ঘন্টা না কাটলে কিছুই বলা যাচ্ছে না ওদের কন্ডিশন খুব ক্রিটিকাল।
ঝড়-বৃষ্টি থেমে গেলেও নীলাভ আকাশ এখনো ঘন কালো মেঘের অন্দরে চাপা পড়ে আছে যা বেশ সংকটময় পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। সন্ধা প্রদীপ দেখানোর পরে মন্দিরের অভিজ্ঞ পুরোহিত বুঝতে পারলেন যে অশুভ সংকটময় সময়ের পরিসমাপ্তি এই অমাবস্যার রাতেই লুকিয়ে আছে কিন্তু কিভাবে? তা কিছুতেই বুঝতে পারছেন না। গ্রামের কুলো দেবীকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে বৃদ্ধ পুরোহিত বাড়ির দিকে রওনা হলেন এবং ধীরে ধীরে অন্ধকারের মাঝে মিলিয়ে গেলেন।
সূর্যোদয় প্রথম কিরণে ঝলমল করে উঠেছে বৃষ্টিতে ভেজা চারিদিকের পারিপার্শ্বিক পরিবেশ, প্রায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া প্রাচীনতম মন্দিরের নোনা ধরা দেওয়ালে তাজা রক্ত মাখা নারীর হাতের ছাপ স্পষ্টভাবে বিদ্যমান। এই মন্দিরের অন্দরে এখনো সমহিমায় বিরাজমান মাতা ছিন্নমস্তা প্রতিদিন কেউ না কেউ ঠিক নিয়ম করেই সূর্যোদয়ের পূর্বে মায়ের পূজো দিয়ে যায় আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি সযত্নে মাকে অর্পিত করা হয়েছে রক্তে মাখানো ফুলের সাথে রক্তমাখা নরমুণ্ডু; সেই জমির আলের পাশে পড়ে থাকা দুটো পুরুষের মৃতদেহের অবশিষ্টাংশ মায়ের দিকে তাকিয়ে এক নীরব প্রশ্নচিহ্ন রেখে গেল- আজ এই পরিণতির জন্য দায়ী কারা!
=================
কলমে- তুফান নস্কর
ঠিকানা- গ্রাম + পোস্ট- বেলপুকুর, থানা- কুলপি, জেলা- দক্ষিন ২৪ পরগনা, পিন নম্বর- ৭৪৩৩৪৮
Comments
Post a Comment