দুটি কবিতা ।। মেশকাতুন নাহার
মেঘসংলগ্ন অনুপস্থিতি
আজ আকাশের গায়ে জমেছে নীলাভ বিষণ্নতার পরাগ,
দিগন্তজোড়া মেঘেরা যেন তোমার অভিমানের অনুবাদ হয়ে
নিভৃত শহরের উপর ঝুঁকে আছে।
বৃষ্টি নেমেছে—
কিন্তু এ কেবল জলধারা নয়,
এ যেন তোমাকে না-পাওয়ার দীর্ঘ প্রতিলিপি।
জানালার কাঁচে টুপটাপ শব্দেরা
অদ্ভুত কোনো গোপন সংকেতে লিখে যায় তোমার নাম,
আর আমি নৈঃশব্দ্যের ভেতর বসে
ভেজা বাতাসে তোমার অনুপস্থিতির গন্ধ খুঁজি।
আজ চায়ের ধোঁয়াও কেমন নির্বাসিত লাগে,
ঠোঁটে ছোঁয়ালেই মনে হয়—
তোমার অধরের উষ্ণতা ছাড়া পৃথিবীর সব উষ্ণতাই অসম্পূর্ণ।
এই মেঘলা বিকেল
আমার হৃদয়ে এক প্রলম্বিত শ্রাবণ খুলে দিয়েছে।
স্মৃতিরা ভিজে শাড়ির আঁচলের মতো
বারবার জড়িয়ে ধরছে আমাকে,
আর তোমার কণ্ঠের প্রতিধ্বনি
বজ্রের শব্দ ছাপিয়ে কানে বাজছে—
ধীর, গভীর, অব্যক্ত প্রেমের মতো।
আমি জানি,
আজ তুমি হয়তো অন্য কোনো জানালার পাশে দাঁড়িয়ে
একই বৃষ্টি দেখছো,
কিন্তু জানো কি?
একই আকাশের নিচে থেকেও
মানুষ কখনও কখনও
কত অসীম দূরত্বে হারিয়ে যায়।
রাত আরও ঘন হলে
মেঘেরা যখন শহরের উপর নতজানু হবে,
আমি তখনও তোমাকেই ভাবব,
যেন তুমি কোনো দুর্লভ নক্ষত্র,
যাকে ছোঁয়া যায় না,
তবু যার আলোয় সমগ্র অন্তর ভিজে থাকে।
আজকের এই বর্ষণমুখর অন্ধকারে
ভালোবাসা বড় বেশি অলৌকিক লাগে—
ঠিক তোমার মতো;
অস্পর্শ থেকেও
সমস্ত সত্তাকে ভিজিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
ভস্মস্তূপের উপাখ্যান
নতুন করে আর কী জ্বলিবে? প্রদীপ্তি বহু আগে ক্ষয়,
ছাইয়ের নিচে নিদ্রামগ্ন অগ্নিবীজের নীরব আশ্রয়।
ধ্রুবতারার স্বপ্নগুলো কুয়াশাভেজা প্রহর শেষে,
হারিয়ে গেছে মহাশূন্যের অনামিকা অন্ধকার দেশে।
জীবন শুধু সরল নদী নয়, ঘূর্ণাবর্তের গূঢ় পাঠ,
প্রতিটি ঢেউ লুকিয়ে রাখে অনিবার্য ভাঙনের ঠাট।
পতনগুলো পরাজয় নয়, বীজের গোপন ভূগর্ভবাস,
অন্ধকারই মহীরুহের প্রথম প্রার্থনা, প্রথম শ্বাস।
দুঃখ আসে ঋষির বেশে নৈঃশব্দ্যের শাস্ত্র হাতে,
কষ্ট নামে ভাস্কর হয়ে পাষাণ গড়ে আপন মতে।
ঝড়ের বুকে ভাঙা তরী সাগরচেনার দীক্ষা লয়,
বজ্রাহত বৃক্ষ একদিন আকাশস্পর্শী মহিমাময়।
অশ্রুবিন্দু শুকিয়ে গেলে প্রস্তর জাগে অন্তরালে,
নীরবতা মহাকাব্য হয় অনুক্ত বাণীর জ্যোৎস্নাজালে।
নদী জানে সাগর পেতে ক্ষয়ের কত আয়োজন,
মেঘও জানে ঝরে পড়াই পূর্ণতারই সাধন।
মৃত্তিকার গভীর অন্ধকারে চাপা থাকে যে বীজতলা,
সেখান থেকেই জন্ম নেয় এক মহাকালের বনশালা।
প্রদীপ নেভে, শিখা হারায়, স্মৃতি ঢাকে ধূলির স্তর,
তবু ভস্মে গোপন থাকে সূর্য হওয়ার সম্ভাবনার ঘর।
সময় শেষে হিসাবখাতায় লেখা থাকে গোপন গাথা,
কত ভাঙনের অন্তরালে জেগে ওঠে নব বারতা।
অমরত্ব সুখে নয় কভু, নয় অলস উল্লাসধ্বনিকা,
অমর তারা, যারা জাগে ভস্মস্তূপের মহাকাব্যিকা।
.................................
মেশকাতুন নাহার,
প্রভাষক সমাজকর্ম
কচুয়া সরকারি ডিগ্রি কলেজ,
চাঁদপুর।
Comments
Post a Comment