ইকো
(E C H O)
রুদ্র ভট্টাচার্য
সময়ের ভাঁজে যা হারায়, তা আসলে অপেক্ষা করে।
"কখনো কখনো ভালোবাসা সময়ের চেয়েও শক্তিশালী। কখনো কখনো ভালোবাসাই সময়।"
রাত তিনটে চোদ্দ।
ঘড়ির কাঁটা এই সংখ্যাটায় পৌঁছে যেন একটু থামে। যেন সময় নিজেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে — এগোবে কি না। বেঙ্গালুরুর ওই lab-এ, যেখানে দিন আর রাতের পার্থক্য শুধু monitor-এর brightness দিয়ে বোঝা যায়, সূর্য বসে আছে। তিনটে screen তার সামনে — প্রতিটায় আলাদা timeline-এর graph, নীল আলোর সুতোয় বোনা ভিন্ন ভিন্ন ভবিষ্যৎ। তার মুখে সেই নীল আলো পড়েছে এমনভাবে যেন সে নিজেই একটা data point — মাংস আর হাড়ে তৈরি, কিন্তু ভেতরে কোথাও একটা সংখ্যা জ্বলছে, টিমটিম করে। সাত দিনের দাড়ি। চোখের নিচে কালি। শার্টের কলার একদিকে উঠে আছে — ঠিক করার কথা তার মনে হয়নি। হয়তো মনে হওয়ার মতো কেউ নেই পাশে।
Lab-এ অন্য কেউ নেই। শুধু সেই ঘড়ির শব্দ — টিক্... টিক্... প্রতিটা শব্দের মাঝে একটু বেশি gap, যেন সময় নিজেই হাঁফাচ্ছে। এই ঘড়িটা সূর্য কখনো বদলায়নি। তাঁরা বলেছিল — "ভাঙা ঘড়িও দিনে দুবার ঠিক সময় দেখায়। বাকি সময় সে অন্য সত্যি বলে।"
ফোনটা বাজছে।
Screen-এর reflection-এ সে দেখতে পায় — কাঁপছে। ছোট একটা কম্পন। কিন্তু সূর্যের হাত ইতিমধ্যে phone-এর দিকে গেছে। যেন শরীর জানত এই call আসবে। যেন শরীর তিন বছর ধরে এই মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করছিল।
Screen-এ caller ID — অজানা নম্বর।
সে ধরে।
"সূর্য।"
একটা নাম। শুধু একটা নাম। কিন্তু এই মুহূর্তে সেই নামের ভেতরে যত পৃথিবী আছে, যত স্মৃতি আছে, যত শনিবার আর ট্রেনের ধোঁয়া আর পুরনো বইয়ের ধুলো আর এলাচের গন্ধ আছে — সব একসাথে তার বুকের ভেতরে ঢুকে পড়ে। তার হাত স্থির হয়ে যায়। Screen-এ graph-গুলো নাচতে থাকে। কিন্তু সূর্য আর দেখছে না। সে শুনছে — ওই কণ্ঠস্বর, যেটা তিন বছর ধরে শুধু ঘুমের মধ্যে শুনত।
"কে?" তার গলা চেনা যাচ্ছে না নিজের কাছেই। যেন কণ্ঠটা মরচে পড়ে গেছে — ব্যবহার না হওয়ার কারণে নয়, অন্য কারণে। কারণ এই কণ্ঠস্বরের সামনে সবসময় তার গলা অন্যরকম হয়ে যেত।
"আমি।" একটু থামা। নিঃশ্বাসের শব্দ। তারপর, শান্তভাবে — "তুমি জানো আমি কে।"
সূর্যের চোখের সামনে graph-এর রেখাগুলো এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। তার মাথার ভেতরে তিন বছরের সমস্ত রাত একসাথে ভেঙে পড়ছে — হাসপাতালের ফোন, পুলিশের রিপোর্ট, শূন্য apartment, বইয়ের তাকে সেই Borges-টা যেটা সে আর খুলতে পারেনি।
"তাঁরা মারা গেছে।" কণ্ঠ শূন্য। একটা statement। কোনো প্রশ্ন না। কারণ প্রশ্ন করলে উত্তরটা বদলে যেতে পারে — সূর্য সেই সুযোগ নিতে ভয় পাচ্ছে। "তিন বছর আগে।"
"জানি।"
দুটো শব্দ। কিন্তু এই দুটো শব্দের মধ্যে অনেক কিছু আছে। যে মানুষ মরে যায় সে জানে না সে মরে গেছে — এটা সূর্যের মাথায় আসে। কিন্তু তারপরই আসে পরের ভাবনাটা, যে ভাবনাটা তিন বছর ধরে lab-এর নীল আলোয় বড় হচ্ছিল।
"তাহলে—"
"মনোযোগ দিয়ে শোনো।" কণ্ঠস্বরটা শান্ত। অদ্ভুত রকম শান্ত — যে শান্তি আসে অনেক দূর থেকে ফিরে এসে, অনেক কিছু দেখে এসে। "তোমার কাছে বেশি সময় নেই। তুমি যে experiment করছ — বন্ধ করো। এখনই। নইলে—"
Line কেটে যায়।
Silence। শুধু সেই ঘড়ির শব্দ। টিক্... টিক্...
সূর্য phone নামিয়ে রাখে। Caller ID-তে নম্বরটা দেখে দীর্ঘক্ষণ। তারপর laptop-এ search করে। Telecom database। সব database।
নম্বরটা exist করে না।
সে window-র দিকে তাকায়। বেঙ্গালুরুর রাত — নিচে traffic light বদলাচ্ছে, কিন্তু রাস্তা ফাঁকা। লাল থেকে সবুজ, সবুজ থেকে লাল — কারো জন্য নয়। শুধু নিজের নিয়মে।
Lab-এর ঘড়িতে ৩:১৪।
সূর্য জানে না — এই সংখ্যাটা আজ রাতে আরও তিনবার ফিরে আসবে।
সাত বছর আগের একটা দুপুর।
কলকাতায় জুনের বৃষ্টি — যে বৃষ্টি হুঁশিয়ারি ছাড়া নামে এবং দুঃখের মতো থামার নাম নেয় না। কলেজ স্ট্রিটের পিচ ভিজে কালো। বইয়ের দোকানের সামনে দাঁড়ানো মানুষরা ছাতা ধরে অপেক্ষা করছে — কেউ বৃষ্টির, কেউ রিকশার, কেউ হয়তো নিজের কারণ খুঁজছে। সূর্যের বয়স সাতাশ, IISc-র তরুণ গবেষক। হাতে রবীন্দ্রনাথের 'বিশ্বপরিচয়' — মহাকাশের কথা লেখা বই, কিন্তু এই মুহূর্তে সে শুধু ভাবছে gravitational wave-এর একটা সমীকরণের কথা যেটা গত তিন রাত মেলাতে পারছে না। মাথার ভেতরে সংখ্যারা ঘুরছে। পেটে খিদে। পায়ে ক্লান্তি।
'শব্দলোক' বইয়ের দোকানে ঢোকে বৃষ্টি থেকে বাঁচতে।
দোকানে ঢুকতেই কিছু একটা বদলায়। বাইরের ধূসর আলো — মেঘের আলো, ভেজা রাস্তার আলো — হঠাৎ সরে যায়। ভেতরে একটা উষ্ণ হলুদ আলো জ্বলছে, পুরনো table lamp-এর আলো, যেটা দেওয়ালের কাঠের তাকে আলতো করে পড়ে। বইয়ের পিঠের সোনালি হরফগুলো চকচক করছে। এলাচের গন্ধ আসছে কোথাও থেকে — মালিকের চা বোধহয় — আর তার সাথে মিশছে পুরনো কাগজের সেই গন্ধ, সেই বিশেষ ধুলো যেটা শুধু পড়া বইয়ে থাকে, অপঠিত বইয়ে নয়। দোকানের কোণে একটা পুরনো দেওয়াল ঘড়ি। টিক্... টিক্... প্রতিটা শব্দের মাঝে একটু বেশি সময়। একটু বেশি gap। সূর্য সেটা লক্ষ করে, তারপর ভুলে যায়।
কালো শাড়ি। চুলে হলুদ ক্লিপ — সেই হলুদ যেটা হলুদ আলোর সাথে মিশে যাচ্ছে, আলাদা করা যাচ্ছে না। হাতে Borges-এর 'Labyrinths'। পাতায় আঙুল রাখা — বাঁ হাতের তর্জনী, পাতার একটু ওপরে, যেন কথার মাঝখানে থামা। এমন মনোযোগ দিয়ে পড়ছে যে মনে হচ্ছে ওই পাতার ভেতর থেকে কেউ তাকে ডাকছে — এবং সে সাড়া দিচ্ছে।
সূর্য ঘড়ির দিকে তাকায়। তিনটে বাজে। পাঁচ মিনিট পর তাকায়। তিনটে দুই। সে ভ্রু কুঁচকায়।
"Borges পড়ছেন?"
মুখ দিয়ে বেরিয়ে যায়। নিজেই অবাক হয়। কারণ সে সাধারণত এই কাজ করে না। সে লোক দেখালে হাসে, কিন্তু অপরিচিতকে কথা বলে না। কিন্তু আজ — কথাটা বেরিয়ে গেছে।
মেয়েটা চোখ তোলে। এই চোখে অবাক নেই। কারণ? সূর্য বুঝতে পারে না। যেন সে জানত কেউ কথা বলবে। যেন সে অপেক্ষায় ছিল — শুধু নিশ্চিত ছিল না ঠিক কখন।
"The Garden of Forking Paths।" কণ্ঠস্বর শান্ত। সমুদ্রের মতো শান্ত — ওপর থেকে দেখলে স্থির, কিন্তু ভেতরে স্রোত। "Borges মনে করতেন সময় একটা সরলরেখা নয়। সময় শাখায় ভাগ হয়। প্রতিটা সিদ্ধান্তে, প্রতিটা মুহূর্তে — একটা নতুন ব্রহ্মাণ্ড জন্ম নেয়। এবং সমস্ত ব্রহ্মাণ্ড একসাথে exist করে।"
"আমি quantum physicist।" সূর্য বলে।
"জানি।"
সূর্য থমকায়। "আমরা আগে কথা বলেছি?"
"না।" একটু থামে। তার ঠোঁটের কোণে কিছু একটা — হাসি না, কিন্তু হাসির মতো কিছু। "এখনও না।"
ওই দুটো শব্দ — "এখনও না" — সূর্যের কানে থেকে যায়। কিন্তু সে তখন বুঝতে পারে না কেন।
"তাঁরা," মেয়েটা বলে, বই থেকে চোখ না সরিয়ে। "তাঁরা মুখার্জি।" পাতায় আঙুল রাখে — আবার সেই ভঙ্গি, যেন কথাটা বলে দিয়ে বইয়ের সাথে সংযোগ রেখে দিল।
"সূর্য।" সে বলে। নিজের পরিচয় দেওয়ার সুযোগ আসার আগেই।
"জানি।"
বাইরে বৃষ্টি থামে। হঠাৎ। যেন সিনেমায় কেউ সাউন্ড কেটে দিয়েছে। রাস্তার শব্দ ফিরে আসে — রিকশার ঘণ্টা, কাকের ডাক, কারো জুতোর শব্দ। ঘড়িতে তখনও তিনটে চার।
সূর্য পরে বুঝবে — এই মুহূর্তটা শুরু না। এটা একটা echo। কোনো আসল মুহূর্তের প্রতিধ্বনি, যে মুহূর্তটা সময়ের অন্য কোনো স্তরে আগেই ঘটে গেছে।
শব্দলোক হয়ে ওঠে তাদের জগৎ।
প্রতি শনিবার সূর্য আসে। বেঙ্গালুরু থেকে তেত্রিশ ঘণ্টার ট্রেন — জানালার ধারে বসে রাতের মাঠ দেখে, সমীকরণের notebook খোলে, কিন্তু সমীকরণ লেখার বদলে ভাবে কী বলবে। শনিবারে শব্দলোকে ঢুকতেই সেই হলুদ আলো, সেই ঘড়ির শব্দ, এলাচের গন্ধ আর পুরনো বইয়ের ধুলো মিলে একটা বিশেষ scent তৈরি হয় — যেটা কোনো পারফিউম বোতলে মেলে না, কোনো বাজারে বিক্রি হয় না। শুধু ওই দোকানে, ওই আলোয়, তাঁরা থাকলে।
তাঁরার একটা অভ্যাস। কথা বলতে বলতে বইয়ের পাতায় আঙুল রাখে। কথা শেষ হলে তোলে। সূর্য আস্তে আস্তে বোঝে — আঙুল পাতায় থাকা মানে সে বিশ্বাস করছে, কথাটা তার কাছে সত্যি। আঙুল সরে যাওয়া মানে কিছু একটা বদলে গেছে ভেতরে — সন্দেহ নয়, হয়তো অন্য কোনো সত্যি।
একটা শীতের রাতে দোকান বন্ধের পর। বাইরে কুয়াশা নেমেছে। তাঁরা বলে, কাউন্টারের পুরনো কাঠে আঙুল চালাতে চালাতে, "আচ্ছা, যদি জানতে যে একটা সম্পর্ক শেষ হবে — তবু কি শুরু করতে?"
সূর্য একটুও ভাবে না। "হ্যাঁ।"
"কেন?" তাঁরা তাকায়।
"কারণ না-শুরু করার যন্ত্রণা শেষের যন্ত্রণার চেয়ে বড়। হারানোর কষ্ট — সেটা অন্তত একটা সত্যির ওপর দাঁড়িয়ে। কিন্তু না-পাওয়ার কষ্ট — সেটা শূন্যের ওপর। শূন্যের ওপর কষ্ট করা — সেটা অনেক বেশি ভারী।"
তাঁরা পাতায় আঙুল রাখে। কিছু বলে না। ঘড়ি টিক্ করে।
সূর্য অনেক পরে বুঝবে — সে আসলে প্রশ্নের উত্তর দেয়নি। সে নিজের সিদ্ধান্ত বলেছিল। এবং তাঁরা সেটা আগে থেকেই জানত — কারণ সে আগেও এই উত্তর দিয়েছে। অন্য কোনো সময়ে। অন্য কোনো timeline-এ।
একটা বর্ষার বিকেলে — বাইরে মেঘ এত ভারী যে দুপুরেও আলো নেই, তাঁরা জিজ্ঞেস করে, মাথা না তুলে, "তুমি কি কখনো ভয় পাও?"
"কিসের?"
"হারিয়ে যাওয়ার।"
হলুদ আলোয় তার মুখ। সে পাতায় আঙুল রাখে।
"না। কারণ echo কখনো হারায় না। প্রতিধ্বনি — সে ভেঙে পড়ে না। সে ফিরে আসে। উৎস যতদিন থাকে, প্রতিধ্বনিও থাকে।"
সূর্য সেদিন এই কথাটা বোঝেনি। কিন্তু মনে রেখেছিল — সেই কণ্ঠস্বর, সেই হলুদ আলো, সেই বইয়ের গন্ধ, সবকিছু মিলিয়ে একটা ছবি মনে রেখেছিল। তিন বছর পর সেই ছবিটা সম্পূর্ণ হবে।
২০২২ সালের একটা শেষ সন্ধে। কমলালেবুর মতো আলো জানলা দিয়ে ঢুকছে। তাঁরা Neruda পড়ছে। সূর্য কিছুক্ষণ চুপ করে দেখে। তারপর বলে, গলা একটু নামিয়ে, যেন ভয় পাচ্ছে এই কথাটা বললে কিছু একটা বদলে যাবে — "তুমি না থাকলে সমীকরণ মেলে না।"
তাঁরা বই থেকে চোখ তোলে। ধীরে। চোখে জল নেই। কিন্তু কিছু একটা আছে — গভীর, পুরনো। যে ভেজা ভাব আসে অনেক দূর থেকে বৃষ্টির মধ্যে হেঁটে ফেরার পর।
পাতায় আঙুল রাখে।
"আমি জানতাম।"
"কিভাবে?"
"কারণ তুমি আগেও বলেছিলে।"
"আগে মানে?" সূর্য হাসে। "কবে?"
"পরে বুঝবে।"
সেই রাতে সূর্য ঘুমাতে পারে না। lab-এ আসে। data খোলে। monitor-এর নীল আলোয় বসে থাকে। একটা graph দেখে দীর্ঘক্ষণ — দুটো timeline-এর curve, দুটো আলাদা সম্ভাবনার রেখা — এবং হঠাৎ লক্ষ করে, একটা জায়গায় তারা একে অপরকে প্রায় স্পর্শ করছে। প্রায়। মিলিমিটারের ব্যবধানে।
একটা সম্ভাবনা মাথায় আসে যেটা এতদিন ভাবেনি। যদি সেই ব্যবধানটা পেরানো যায়? যদি fold দিয়ে কেউ যেতে পারে — এক timeline থেকে আরেক timeline-এ?
২০২৩ সালের মার্চ।
তাঁরা lab-এ আসে। প্রথমবার। সূর্য তাকে সব দেখায় — machine, graph, theory। Temporal fold-এর পুরো ধারণাটা। কীভাবে দুটো সময়ের curve একটা নির্দিষ্ট জায়গায় কাছে আসে। কীভাবে সেই মুহূর্তে একটা passage তৈরি হওয়া theoretically সম্ভব।
"এই fold-এর point কোথায়?" তাঁরা জিজ্ঞেস করে, screen-এর দিকে তাকিয়ে।
সূর্য একটা জায়গায় আঙুল দেয়। Map-এ। "কলেজ স্ট্রিটে। ওই গলিতে। এই দুটো timeline এখানে সবচেয়ে কাছে আসে।"
তাঁরা চুপ করে থাকে।
"এটা কাজ করে?" দীর্ঘক্ষণ পর।
"Theoretically। কিন্তু কেউ try করেনি।"
"কারণ?"
"কারণ fold-এ ঢুকলে নিজের timeline থেকে বিচ্যুত হতে হয়। অন্য timeline-এ পৌঁছানো যায়। কিন্তু সেখানে সে পরিচিত নয় কারো কাছে। Ghost-এর মতো। সব দেখতে পাবে, কথা বলতে পারবে — কিন্তু কেউ চিনবে না তাকে।"
"ফিরে আসা যায়?"
সূর্য একটু থামে। Ventilation fan-এর শব্দ। দূরে কোথাও traffic। "Theoretically হ্যাঁ। কিন্তু fold টা ধরে রাখতে হবে। কেউ এপাশ থেকে hold করলে ওপাশ থেকে ফেরা সম্ভব।"
তাঁরা আর কথা বলে না। পাতায় আঙুল রাখার মতো করে screen-এ আঙুল রাখে — একটু। তারপর তোলে।
সূর্য সেদিন লক্ষ করেনি — তাঁরার চোখে কোনো অবাক নেই। একটুও না। কারণ এই কথাগুলো সে আগে শুনেছে। অন্য কোনো সময়ে, অন্য কোনো context-এ — কিন্তু শুনেছে।
তিন সপ্তাহ পর।
রাত এগারোটা। তাঁরার phone বন্ধ। মিস্ড কল পাঠায় সূর্য — দুটো, তিনটে। চিন্তিত হয় না। সে মাঝে মাঝে phone রাখে, একা থাকতে চায়। তারপর শব্দলোকের মালিক call করেন।
"বাবা, একটা দুর্ঘটনা হয়েছে। কলেজ স্ট্রিটে।"
সূর্য phone রেখে দেয়। তারপর সেভাবেই বসে থাকে — একটু কাত হয়ে, phone হাতে, যেন সংখ্যাগুলো বোঝার চেষ্টা করছে। Lab-এর নীল আলো তার মুখে। ঘড়ির শব্দ।
টিক্... টিক্...
একটু ধীরে।
তিন বছর।
তিন বছর ধরে সূর্য কাজ করে। ঘুমায় না ঠিকমতো। খায় না — সহকর্মীরা এনে দিলে খায়, নইলে মনে থাকে না। শার্ট ইস্ত্রি করার কথা মনে থাকে না, চুল কাটার কথা মনে থাকে না। কিন্তু lab-এ এলে সব মনে থাকে। প্রতিটা equation মনে থাকে। প্রতিটা graph-এর প্রতিটা বাঁক।
Lab-এর নীল আলো তার ত্বকে মিশে গেছে।
সহকর্মীরা বলে — সে ভেঙে পড়েছে। সে জানে — সে তৈরি হচ্ছে।
Temporal fold-এর theory সম্পূর্ণ হয়। পাঁচ বছরের কাজ তিন বছরে শেষ করে। কিন্তু এখন একটাই প্রশ্ন — fold-এ ঢুকলে কোন timeline-এ পৌঁছানো যায়? নিজের past-এ? নিজের ভবিষ্যতে? নাকি এমন কোনো timeline-এ যেটা এখনও তৈরি হয়নি?
উত্তর আসে একটা পুরনো notebook থেকে।
তাঁরার notebook। মৃত্যুর পর তার বাবা এসেছিলেন বেঙ্গালুরুতে — ছোটখাট মানুষ, চোখে জল নেই কিন্তু মুখ খুব শূন্য। বলেছিলেন, "মেয়ে বলেছিল তোমাকে দিতে।" Notebook-টা দিয়ে চলে গিয়েছিলেন।
সূর্য সেই notebook তিন বছর খোলেনি।
আজ রাতে, ওই call-এর পর, notebook বের করে। মলাট খোলে।
প্রথম পাতায় একটা তারিখ — ১৪ই মার্চ, ২০৩২।
সূর্যের হাত কাঁপে।
আজকের তারিখ।
সে পাতা উল্টায়। মাঝের কিছু পাতা ছেঁড়া — যেন কেউ তাড়াহুড়ো করে ছিঁড়েছে, নইলে সরিয়ে রেখেছে। যা আছে তা পড়ে।
"আজ সে বলল — তুমি না থাকলে সমীকরণ মেলে না। আমি জানতাম। তবু কানে লেগে রইল। প্রতিবার লাগে — যতবারই শুনি।"
পরের পাতায় —
"fold-এ যাওয়ার আগে একটাই ভয় — সে আমাকে চিনবে না। কিন্তু আমি তো চিনব। সবসময়। এটাই কি যথেষ্ট?"
সূর্য notebook বন্ধ করে।
কিছুক্ষণ শুধু বসে থাকে। Lab-এ কোনো শব্দ নেই। শুধু সেই ঘড়ি।
টিক্... টিক্…
তারপর সে বোঝে।
তাঁরা মারা যায়নি।
তাঁরা fold-এ গেছে।
সূর্য সেই রাতে সব footage দেখে। ২০২৩ সালের মার্চ — তাঁরা lab-এ আসার দিন। Screen-এ সে pause করে। Zoom করে। তাঁরার মুখ।
চোখে কোনো অবাক নেই। এই lab দেখে, এই machine দেখে, এই theory শুনে — কিছুতেই অবাক নেই।
কারণ সে এই সব আগে দেখেছে। ২০৩৫ সালে। তখন এই machine চলছিল, পুরোদমে, এবং সে দেখেছিল কী হয়।
সূর্য পুলিশের report খোঁজে। ২০২৩-এর মার্চের। পায়। পড়ে।
কলেজ স্ট্রিটে একটা মেয়ে হঠাৎ পড়ে গিয়েছিল রাস্তায়। আশেপাশের মানুষ হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল। জ্ঞান ফিরেছিল। কিন্তু discharge নেওয়ার আগে, hospital-এর মধ্যেই, অদৃশ্য হয়ে যায়।
কোনো body নেই।
কোনো মৃত্যু নেই।
কোনো explanation নেই।
শুধু অন্তর্ধান।
সূর্য রিপোর্ট রাখে। চোখ বন্ধ করে। মাথার ভেতরে সব টুকরো একে একে জায়গায় বসছে — puzzle-এর টুকরো নয়, বরং timeline-এর টুকরো।
তাঁরা ২০২৩-এ fold-এ গেছে। ২০৩৫-এ পৌঁছেছে। সেখানে দেখেছে — এই experiment কী করবে। fold collapse। লক্ষ লক্ষ মানুষ। তারপর ফিরে গেছে আরও পেছনে — ২০১৯-এ। সূর্যের কাছে। তাকে ভালোবাসতে। যাতে সূর্য এই গবেষণা করে, যাতে fold তৈরি হয়, যাতে তাঁরা ২০২৩ থেকে ২০৩৫-এ যেতে পারে।
কিন্তু তাহলে সে এখন সূর্যকে experiment বন্ধ করতে বলছে কেন?
সূর্য ছেঁড়া পাতাগুলো খোঁজে।
Lab-এর পুরনো জিনিসপত্রের মধ্যে, একটা কার্ডবোর্ড বাক্সে, ভাঁজ করা কয়েকটা পাতা। তাঁরার হাতের লেখা।
সে পড়ে।
"২০১৯-এ যাওয়ার আগে আমি জানতাম না ভালোবাসাটা সত্যি হবে। আমার কাছে এটা একটা mission ছিল। সূর্যকে গবেষণায় এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, যাতে সে fold আবিষ্কার করে, যাতে আমি ২০৩৫ থেকে ফিরে আসতে পারি তাকে সতর্ক করতে। Logical। Clean। Closed loop।"
"কিন্তু পথে কিছু একটা হয়ে গেছে।"
"আমি সত্যিই ভালোবেসে ফেলেছি।"
"এটা আমি expect করিনি। আমার calculation-এ এটা ছিল না।"
পরের কয়েক পাতা —
"এখন একটাই সমস্যা। fold collapse হলে সব মুছে যাবে — ২০৩৫ থেকে শুরু করে পেছনের সব timeline। কিন্তু fold না বানালে আমি ২০১৯-এ যেতে পারতাম না। সূর্যের সাথে দেখা হত না। শব্দলোকে সেই বৃষ্টির দুপুর হত না।"
"আমি exist করি কারণ fold exist করে। আর fold exist করে কারণ আমি exist করেছিলাম।"
"একটা perfect paradox। একটা closed loop। এর ভেতরে শুরু নেই, শেষ নেই — শুধু চলমানতা।"
শেষ পাতায় হাতের লেখা একটু বদলে গেছে। ধীর। যেন প্রতিটা শব্দ ভেবে লেখা —
"তাই experiment বন্ধ করতে বলছি না। বলছি — শেষ করো। কিন্তু শেষ মুহূর্তে একটু বদলে দাও calculation। fold collapse হবে না। একটা loop তৈরি হবে — চিরকালের জন্য। আমি চিরকাল ২০১৯-এ থাকব। তুমি চিরকাল আমাকে ভালোবাসবে। সময়ের ভাঁজে। কখনো মেলা, কখনো দূরত্ব — কিন্তু এই loop চলতে থাকবে। কারণ কিছু ভালোবাসা সময়ের চেয়ে বড়।"
এর নিচে আর কিছু নেই।
শুধু একটা হলুদ ক্লিপ। পাতার ফাঁকে রাখা।
Lab-এ পরের দিন সকালে, সূর্যের ছাত্র অভি আসে। সব পড়ে, সব দেখে, সব বোঝার চেষ্টা করে। তারপর বলে, মাথা খানিক নামিয়ে, সরাসরি না তাকিয়ে, "স্যার, সব বুঝলাম। কিন্তু তাঁরাদি কি জানেন এই loop মানে কী? তিনি চিরকাল ২০১৯-এ থাকবেন। নিজের সময়ে ফিরতে পারবেন না। পরিবারের কাছে না, নিজের বাড়িতে না। সবসময় অন্য একটা সময়ে।"
সূর্য জানলার দিকে তাকিয়ে থাকে। বাইরে বৃষ্টি নামছে — হালকা, তির্যক। Lab-এর নীল আলোয় তার মুখ স্থির। চোখে জল নেই। কিন্তু কোথাও থেকে ভেসে আসছে — এলাচের গন্ধ, পুরনো বইয়ের ধুলো। এই lab-এ এই গন্ধ আসার কথা নয়। তবু আসছে।
"জানেন।"
"তাহলে?"
"তাহলে notebook-এর শেষ লাইনটা পড়িসনি।" সূর্য ঘুরে তাকায়। "পড়।"
অভি notebook খোলে। সবচেয়ে শেষে, একদম ছোট হাতে, কালিতে লেখা —
"কিছু মানুষ সময়ের বাইরে থাকে। আমি সেই মানুষ। সূর্যের কাছে আমি সবসময় ছিলাম — থাকব। এটাই আমার timeline।"
অভি মাথা তোলে। একটু থাকে। তারপর বলে, "স্যার, তাহলে গত বছর ২০২৬-এ শব্দলোকে গিয়েছিলেন কেন? জানতেন সে আপনাকে চিনবে না — সেই সময়ে সে তখনও loop-এ ঢোকেনি।"
সূর্য একটু হাসে। তিন বছরে প্রথমবার। এই হাসিটা তার মুখের জন্য একটু অচেনা — যেন একটা পেশি দীর্ঘদিন ব্যবহার না করে থেকে, এখন একটু ব্যথা করে কাজ করছে।
"কারণ তাঁকে দেখতে চেয়েছিলাম। একবার। শুধু একবার।"
"জেনেও যে সে চিনবে না?"
"সে যখন বলল — মুখটা চেনা লাগছে — বুঝলাম।" সূর্য আবার জানলার দিকে তাকায়। বৃষ্টি একটু বেড়েছে। "চেনে। শরীর ভোলে, কিন্তু ভেতরে কোথাও মনে রাখে। সময়ের ভাঁজে যা হারায়, তা আসলে মরে না। অপেক্ষা করে।"
Lab-এর ঘড়ি।
টিক্... টিক্…
একটু ধীরে।
২০২৬ সাল। শব্দলোক।
বিকেলের তেরচা রোদ বাইরে নারঙি করে দিচ্ছে পুরনো বাড়ির দেওয়াল। সূর্য দাঁড়িয়ে আছে দরজার সামনে। আসার কারণ সে জানে না ঠিকমতো। হয়তো পা এমনিই এনেছে। হয়তো শুধু একবার দেখতে।
দোকানে ঢুকতেই — সেই হলুদ। সেই একই হলুদ। সাত বছর পরেও বদলায়নি।
টিক্... টিক্...
ঘড়ির শব্দ। একটু বেশি gap।
কাউন্টারে একটা বই রাখা। তার নামে — সূর্য — লেখা একটা চিরকুটে।
Borges — 'Labyrinths'।
সে বই খোলে। একটা পাতায় নখের দাগ — এখানে কেউ পাতায় আঙুল রেখেছিল দীর্ঘক্ষণ। এই ভঙ্গি সে চেনে।
পাতায় ছাপা লেখা — "Time forks perpetually toward innumerable futures."
পাতার কোণে তাঁরার হাতে লেখা, নীল কালিতে, ছোট হরফে —
"আমি প্রতিটা ভবিষ্যতে অপেক্ষা করছি।"
সূর্য বইটা বুকে চেপে ধরে। কড়া না, ধীরে — যেভাবে কিছু ভাঙার ভয় থাকে।
বাইরে বৃষ্টি শুরু হয়। হঠাৎ। কলকাতার বৃষ্টি — হুঁশিয়ারি ছাড়া। এলাচের গন্ধ ভাসে বাতাসে। পুরনো বইয়ের ধুলো হলুদ আলোয় নাচে।
ঘড়ি চলছে। টিক্... টিক্... একটু বেশি gap। সবসময়ের মতো।
এবং ২০১৯-এর একটা বৃষ্টির দুপুরে —
হলুদ আলোর শব্দলোকে, কলেজ স্ট্রিটে, বৃষ্টি সবেমাত্র থামার মুখে — একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে বইয়ের তাকের সামনে। কালো শাড়ি। চুলে হলুদ ক্লিপ। হাতে Borges-এর 'Labyrinths'। পাতায় আঙুল রাখা।
এলাচের গন্ধ ভাসছে। ঘড়ি বাজছে।
দরজা খোলে।
একটা ছেলে ঢোকে।
সে মাথা তোলে।
এই চোখে অবাক নেই।
কারণ সে জানে — এই মুহূর্তটা শুরু না।
এটা একটা echo।
এবং echo কখনো থামে না। উৎস যতদিন থাকে।
ইকো মানে প্রতিধ্বনি — কিন্তু প্রতিটা প্রতিধ্বনির একটা উৎস আছে। তাঁরা সেই উৎস। সূর্য সেই শ্রোতা। আর এই গল্প — সেই শব্দ যেটা দুটো timeline-এর মাঝখানে চিরকাল বেজে চলে।
..............................
রুদ্র ভট্টাচার্য
Vivekanand Pally, Taki Road, Barasat, North 24 pgs, West Bengal.
Comments
Post a Comment