বর্তমান প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য দিবসের গুরুত্ব ও তাৎপর্য
মানুষ, প্রাণী ও প্রকৃতি মিলিয়েই আমাদের পৃথিবী। এ পৃথিবীকে মানুষের বাসযোগ্য করে তুলতে তাদের প্রত্যেকের অবদান অপরিসীম। কিন্তু আত্মসাথ্য চরিতার্থ করতে গিয়ে লোভ-লালসা সম্পদের আকাঙ্ক্ষায় মানুষ যেন প্রকৃতির বিরুদ্ধে তার পরাক্রম প্রতিপত্তি জারি রেখে নিজের বিপন্নতার ঘনঘটা সৃষ্টি করছে।মানুষ এটিকে নির্দয়ভাবে ও নির্বিচারে ব্যবহার করছে, ফলে বিশ্ব ব্যবস্থাই আজ হুমকির মুখে। জীব-বৈচিত্র্য বিশ্ব পরিবেশের এক অনন্য উপকারী সত্ত্বা। বাস্তুতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে জীব-বৈচিত্র্য বিশেষ ভূমিকা পালন করে।আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য দিবস আজ। প্রতিবছরের মতো এবারও ২২ মে ভারতসহ বিশ্বব্যাপী যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে দিবসটি পালিত হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, প্রাকৃতিক সম্পদের অপব্যবহার ও বন্য প্রাণীর সংকটাপন্ন অবস্থা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোই দিবসটির লক্ষ্য।দিন দিন পৃথিবীতে কমে আসছে বনভূমির আকার।জনসংখ্যার বসবাসের স্থান তৈরি, জ্বালানির চাহিদা পূরণে উজাড় হচ্ছে বন, সেইসঙ্গে ধ্বংস হচ্ছে জীববৈচিত্র্য। মানুষের নানাবিধ চাহিদা মেটাতে তৈরি হচ্ছে শিল্প খাত। এতে গ্রাস হচ্ছে কৃষি জমি। জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতেই এই আন্তর্জাতিক দিবস।এই দিনটির মূল উদ্দেশ্য হলো পৃথিবীর নানা রকম জীবের – যেমন প্রাণী, উদ্ভিদ, অণুজীব এবং বাস্তুতন্ত্র – সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা। জীববৈচিত্র্য হলো জীবনের মূল ভিত্তি। এটি আমাদের খাদ্য, ওষুধ, বিশুদ্ধ পানি এবং জলবায়ু নিয়ন্ত্রণের মতো গুরুত্বপূর্ণ উপাদান সরবরাহ করে – যা মানব জীবনের জন্য অপরিহার্য।
এবারে জীব বৈচিত্র্য দিবসের নেপথ্যের ইতিহাস আলোচনা করা যাক। বিশ্ব জীববৈচিত্র্য দিবসের সূচনা হয় ১৯৯২ সালে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ১৯৯৩ সালের ২৯ ডিসেম্বর বিশ্ব জীববৈচিত্র্য দিবস হিসেবে পালন করা হলেও ২০০১ সাল থেকে এটি প্রতিবছর ২২ মে পালন করা হচ্ছে। জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে বিশ্ববাসীকে সচেতন করতেই জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি ২২ মে দিনটি বিশ্ব জীববৈচিত্র্য দিবস হিসেবে পালন করে আসছে। বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে ধারণা ও সচেতনতা বৃদ্ধি এবং এ বিষয়ে করণীয় নির্ধারণে দিবসটি গুরুত্বপূর্ণ।বিভিন্ন দেশের পরিবেশবাদীদের দাবি, বন উজাড় হওয়ায় জীববৈচিত্র্য ধ্বংসসহ পরিবেশের ভারসাম্যহীনতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।জাতিসংঘের তথ্য মতে, প্রকৃতি ধ্বংসের বর্তমান এই ধারা চলতে থাকলে আগামী ১০ বছরের মধ্যে বিশ্বব্যাপী প্রায় ১০ লাখ প্রজাতি বিলুপ্ত হতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন যেভাবে হচ্ছে, তা যদি চলতে থাকে, তাহলে ২০৭০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী প্রাণী ও উদ্ভিদের প্রতি তিনটির মধ্যে একটি প্রজাতি বিলুপ্ত হতে পারে। দেখা গেছে, গত ৫০ বছরে গড়ে ৬০ শতাংশের বেশি বন্যপ্রাণী হ্রাস পেয়েছে। আর সে হিসাবে গত ১০ মিলিয়ন বছরের তুলনায় বর্তমানে প্রজাতি বিলুপ্তির গড় হার ১০-১০০ গুণ বেশি।আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য দিবস ২০২৬, যার মূলমন্ত্র “বৈশ্বিক প্রভাবের জন্য স্থানীয়ভাবে পদক্ষেপ”, জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি রোধ ও তা পুনরুদ্ধারের জন্য আমাদের সকলের পদক্ষেপ গ্রহণের একটি আহ্বান। জীববৈচিত্র্য সুরক্ষার জন্য নিজ গৃহে পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন, যার ইতিবাচক প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে।আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে পৃথিবীর প্রতিটি জীব একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত। জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা কেবল পরিবেশগত দায়িত্ব নয়, এটি মানব জীবনের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই আমাদের সকলের সম্মিলিত দায়িত্ব হলো প্রকৃতিকে রক্ষা করা এবং আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ ও টেকসই পৃথিবী গড়ে তোলা।জীববৈচিত্র্যের অবক্ষয় একটি বৈশ্বিক। এটি কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা কোনো ভৌগোলিক সীমারেখার মধ্যে আবদ্ধ নয়। প্রকৃতি, পরিবেশ ও জলবায়ুর সঙ্গে জীব বৈচিত্র্যের সম্পর্ক বিদ্যমান। পৃথিবীকে সুন্দর, পরিছন্ন ও জীব বৈচিত্র্য রক্ষা করতে উন্নত, উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশকে জলবায়ুর বিরূপ প্রতিক্রিয়া হতে বাঁচতে হলে একযোগে কাজ করতে হবে। আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য দিবসে আমরা প্রত্যেকেই পরিবেশের সচেতনতার পাশাপাশি জীববৈচিত্র সম্পর্কে আরো বেশি সচেতন দায়িত্বশীল হয়ে ওঠি। ভুলে গেলে চলবে না শুধুমাত্র গাল ভরা কথা আলোচনার মধ্যে দিয়েই দিবস পালিত হয় না যদি না আমরা আমাদের জীবন ধারণের জন্য পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের গুরুত্ব উপলব্ধি করি। এই পৃথিবীতে মানুষের যতটা অধিকার ঠিক ততটাই জীবদের। আসুন আমরা সবাই হাতে হাত রেখে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য দিবসের শপথ গ্রহণ করি পরিবেশকে সতেজ দূষণমুক্ত করে বৃক্ষ রোপনের মধ্য দিয়ে জীববৈচিত্র্যের বাস্তুতন্ত্রকে স্বাভাবিক করে তুলি। এটাই হোক আমাদের বছরব্যাপী এই দিবস পালনের অঙ্গীকার।
রচনা -পাভেল আমান -হরিহরপাড়া -মুর্শিদাবাদ
Comments
Post a Comment