নারীর সম্মান ও অধিকার — অলীক কল্পনা, না কি অসমাপ্ত সংগ্রাম
শঙ্খদীপ জানা
সভ্যতার ইতিহাস খুলে দেখলে আমরা এক আশ্চর্য বৈপরীত্যের সামনে এসে দাঁড়াই। যে নারী জন্ম দেয়, লালন করে, ভালোবাসার ভাষা শেখায়, সেই নারীই যুগে যুগে সবচেয়ে বেশি অবহেলিত, লাঞ্ছিত ও বঞ্চিত। একদিকে আমরা দেবীর আরাধনা করি, অন্যদিকে বাস্তবের নারীকে প্রতিদিন অপমান, হিংসা ও বৈষম্যের আগুনে পুড়তে দেখি। তাই প্রশ্ন জাগে—নারীর সম্মান ও অধিকার কি সত্যিই বাস্তব, না কি তা কেবল সভ্যতার মুখে ঝোলানো এক অলীক কল্পনা?
আজকের পৃথিবী আধুনিকতার দাবিতে গর্বিত। প্রযুক্তি চাঁদ ছুঁয়েছে, মানুষ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে প্রবেশ করেছে, কিন্তু সমাজের মানসিকতা কি সত্যিই বদলেছে? সংবাদপত্রের প্রতিটি পাতা, টেলিভিশনের প্রতিটি খবর, কিংবা সমাজমাধ্যমের প্রতিটি আলোচনায় নারী নির্যাতনের নতুন নতুন চিত্র উঠে আসে। কোথাও ধর্ষিতা হয়ে ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় দিন গুনছে এক কিশোরী, কোথাও পণের দাবিতে প্রাণ হারাচ্ছে এক নববধূ, কোথাও কর্মক্ষেত্রে অপমান সহ্য করছে এক শিক্ষিতা নারী। এই বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে “নারীর সম্মান” শব্দবন্ধটি অনেক সময় কেবল কবিতার অলংকার বলেই মনে হয়।
সমাজ নারীকে দুই চোখে দেখে। এক চোখে পূজা, অন্য চোখে অবজ্ঞা। দুর্গাপূজার চারদিন নারীকে দেবী বলা হয়, অথচ বাকি দিনগুলোতে সেই নারীকে ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যে বন্দি রাখার চেষ্টা চলে। এই দ্বিচারিতা কেবল পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার নয়, বরং একটি দীর্ঘ সামাজিক সংস্কারের ফল, যেখানে নারীকে স্বাধীন মানুষ হিসেবে নয়, বরং কারও কন্যা, কারও স্ত্রী, কারও মা হিসেবেই বিচার করা হয়। তার নিজের পরিচয় যেন সবসময়ই অন্য কারও ছায়ার নিচে চাপা পড়ে যায়।
আজও বহু পরিবারে মেয়ের জন্মকে আনন্দ নয়, বোঝা হিসেবে দেখা হয়। পুত্রসন্তানের আশায় প্রার্থনা চলে, অথচ কন্যাসন্তান জন্মালে মুখ ভার হয়ে যায়। একটি মেয়ে ছোটবেলা থেকেই শুনতে শেখে—“এভাবে হাসবে না”, “ওভাবে হাঁটবে না”, “রাতে বেরোবে না”, “এত জোরে কথা বলো না।” অর্থাৎ সমাজ তার স্বাধীনতাকে প্রথম থেকেই শাসনের বেড়াজালে বেঁধে দেয়। একটি ছেলে যেখানে নিজের ইচ্ছেমতো জীবন গড়ার অধিকার পায়, সেখানে একটি মেয়েকে প্রতিনিয়ত নিজের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে হয়।
নারীর প্রতি এই বৈষম্য শুধু গ্রামবাংলা বা অশিক্ষিত সমাজে সীমাবদ্ধ নয়; তথাকথিত শিক্ষিত সমাজেও এর গভীর শিকড় রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি হাতে নিয়েও বহু নারী কর্মক্ষেত্রে সমান সম্মান পান না। একই কাজ করেও বেতনের বৈষম্য দেখা যায়। কর্মদক্ষতার বদলে তাদের পোশাক, চেহারা কিংবা ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে বিচার করা হয়। যেন একজন নারীকে তার মেধা দিয়ে নয়, বরং বাহ্যিকতা দিয়ে মূল্যায়ন করার অভ্যাস এখনও সমাজ ছাড়তে পারেনি।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, নারীর নিরাপত্তা আজও প্রশ্নের মুখে। একজন নারী যখন ঘর থেকে বের হন, তখন তাঁর মনে ভয় কাজ করে—রাস্তা নিরাপদ তো? গণপরিবহনে কেউ অসভ্য আচরণ করবে না তো? রাত হয়ে গেলে সমাজের আঙুল তাঁর দিকেই উঠবে না তো? এই ভয়ই প্রমাণ করে, নারীর স্বাধীনতা এখনও পূর্ণ নয়। স্বাধীনতা তখনই সত্যিকারের স্বাধীনতা হয়, যখন তা ভয়হীন হয়।
তবে কি নারীর অধিকার শুধুই কাগজে লেখা কিছু আইন? সংবিধান নারী-পুরুষ সমতার কথা বলেছে, আইন নারীকে সুরক্ষা দিয়েছে, কিন্তু বাস্তবে সেই অধিকার কতটা কার্যকর? আদালতে বিচার পেতে বছরের পর বছর কেটে যায়। নির্যাতিত নারীকে সমাজই উল্টো প্রশ্ন করে—“সে রাতে বাইরে কেন ছিল?”, “ওর পোশাক কেমন ছিল?” অর্থাৎ অপরাধীর বদলে ভুক্তভোগীকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর প্রবণতা আজও প্রবল। এই মানসিকতা বদল না হলে আইন একা সমাজকে বদলাতে পারে না।
কিন্তু এর মাঝেও আশার আলো নিভে যায়নি। আজকের নারী আর আগের মতো নীরব নন। তিনি প্রতিবাদ করতে শিখেছেন। তিনি জানেন, সম্মান ভিক্ষা নয়; সম্মান তাঁর অধিকার। তাই তিনি কলম হাতে নিচ্ছেন, আদালতে দাঁড়াচ্ছেন, আন্দোলনের মিছিলে হাঁটছেন, বিজ্ঞান গবেষণাগার থেকে যুদ্ধক্ষেত্র—সব জায়গায় নিজের সামর্থ্যের পরিচয় দিচ্ছেন। ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে নারী নিজের সংগ্রামের আগুনে পথ তৈরি করেছেন।
একসময় মেয়েদের শিক্ষার অধিকার ছিল না। আজ সেই নারীরাই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, মহাকাশ বিজ্ঞানী, সাংবাদিক, প্রশাসক, সেনা অফিসার। একসময় সমাজ বলত, “নারীর কাজ ঘর সামলানো।” আজ সেই নারী সংসারও সামলাচ্ছেন, আবার রাষ্ট্রের দায়িত্বও কাঁধে তুলে নিচ্ছেন। অর্থাৎ নারীকে অবদমিত রাখার প্রতিটি প্রাচীর ধীরে ধীরে ভাঙছে। যদিও সেই ভাঙনের শব্দ এখনও সর্বত্র সমান জোরালো নয়।
সমস্যার মূল আসলে মানসিকতায়। আমরা এখনও ছেলে ও মেয়েকে আলাদা চোখে বড় করি। একটি ছেলেকে শেখানো হয় শক্ত হতে, আর একটি মেয়েকে শেখানো হয় সহ্য করতে। অথচ সহ্য করাই নারীর ধর্ম নয়। মানুষ হিসেবে তাঁরও রাগ আছে, স্বপ্ন আছে, স্বাধীনতা আছে। নারীকে “সম্মান” করার অর্থ তাকে করুণা করা নয়; বরং তাকে সমান মানুষ হিসেবে স্বীকার করা।
সমাজে এমন এক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, যেখানে নারীকে বিচার করা হয় তাঁর চরিত্র দিয়ে, কিন্তু পুরুষকে বিচার করা হয় তাঁর সাফল্য দিয়ে। একজন নারী যদি নিজের মত প্রকাশ করেন, তাঁকে “বেশি আধুনিক” বলা হয়; আর একজন পুরুষ একই কাজ করলে তাকে “আত্মবিশ্বাসী” বলা হয়। এই দ্বৈত মানদণ্ডই নারীর প্রতি বৈষম্যের সবচেয়ে বড় উদাহরণ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে নারীরা নতুন ধরনের হিংসার শিকার হচ্ছেন। ট্রোল, কুরুচিকর মন্তব্য, ব্যক্তিগত আক্রমণ—সবকিছু যেন এখন স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। একজন নারী নিজের মতামত প্রকাশ করলেই তাঁর চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। ফলে ডিজিটাল যুগেও নারীর স্বাধীনতা সম্পূর্ণ নিরাপদ নয়।
তবে নারীর সম্মান ও অধিকারকে যদি অলীক কল্পনা বলে মেনে নেওয়া হয়, তবে তা হবে মানবসভ্যতার সবচেয়ে বড় পরাজয়। কারণ নারীকে অসম্মান করা মানে মানবতাকেই অসম্মান করা। একটি সমাজ তখনই প্রকৃত সভ্য হয়ে ওঠে, যখন সেখানে নারী নিরাপদ, স্বাধীন ও সম্মানিত থাকেন। শুধু আইন নয়, প্রয়োজন সামাজিক চেতনার পরিবর্তন। প্রয়োজন পরিবার থেকে শিক্ষা দেওয়া—মেয়ে দুর্বল নয়, ছেলে শ্রেষ্ঠ নয়; উভয়েই সমান মানুষ।
রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, “নারীকে আপন ভাগ্য জয় করিবার কেন নাহি দিবে অধিকার?” এই প্রশ্ন আজও সমান প্রাসঙ্গিক। নারীর অধিকার কাউকে দয়া করে দেওয়া অনুগ্রহ নয়; এটি তাঁর জন্মগত প্রাপ্য। যে সমাজ নারীকে দমিয়ে রাখে, সেই সমাজ কখনও পূর্ণ বিকাশ লাভ করতে পারে না। কারণ একটি ডানায় ভর করে কোনো পাখি উড়তে পারে না।
আজ প্রয়োজন এমন এক সমাজ, যেখানে একটি মেয়ে রাতে নির্ভয়ে বাড়ি ফিরতে পারবে; যেখানে তাঁর পোশাক নয়, তাঁর ব্যক্তিত্ব মূল্য পাবে; যেখানে বিবাহ তাঁর জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হবে না; যেখানে তিনি নিজের স্বপ্ন নিজের মতো করে বাঁচতে পারবেন। নারীর সম্মান তখনই বাস্তব হবে, যখন তাঁকে মানুষ হিসেবে দেখা হবে—কেবল নারী হিসেবে নয়।
অতএব, নারীর সম্মান ও অধিকার এখনও সম্পূর্ণ বাস্তব হয়ে ওঠেনি—এ কথা সত্য। বহু ক্ষেত্রেই তা এখনও অসমাপ্ত সংগ্রাম, অনেক সময় অলীক কল্পনার মতোই অধরা। কিন্তু সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার দায়িত্ব আমাদের সবার। কারণ নারী শুধু একটি লিঙ্গ নয়; নারী মানে সৃষ্টি, সহনশীলতা, ভালোবাসা ও শক্তির আরেক নাম। তাঁকে অসম্মান করে কোনো সভ্যতা টিকে থাকতে পারে না।
যেদিন সমাজ সত্যিই নারীকে সমান মর্যাদায় গ্রহণ করবে, সেদিন “নারীর অধিকার” নিয়ে আলাদা করে কথা বলার প্রয়োজনই থাকবে না। সেদিন নারীকে তাঁর অধিকার প্রমাণ করতে হবে না; সমাজ নিজেই তা স্বীকার করবে। আর সেই দিনই হয়তো আমরা বলতে পারব—নারীর সম্মান আর অলীক কল্পনা নয়, তা এক জীবন্ত বাস্তবতা।
শঙ্খদীপ জানা
গ্রাম + পোস্ট - তনুয়া, থানা - মোহনপুর, জেলা - পশ্চিম মেদিনীপুর
Comments
Post a Comment