অন্তর্লীন
সুমিতা চৌধুরী
আজ সকাল থেকেই টিপ টিপ বৃষ্টি। ঘুম থেকে উঠেই মন খারাপ হয়ে যায় প্রিয়ার। রোববারের বাজার হাটের দফারফা! একটা দিনই তো একটু নিশ্বাস নেবার ফুরসত মেলে!
ব্রাশ করে কফির কাপ নিয়ে যখন ব্যালকনিতে এলো, তখন বৃষ্টির জোর আরো বেড়েছে। এখানে এই মুশকিল, বৃষ্টি শুরু হলে আর থামতে চায় না! তবু আজ তাকে বেরোতেই হবে, ঘরে একটাও সব্জি নেই। মোবাইল এর রিংটোনে চিন্তার জাল ছিঁড়ে যায়। ও প্রান্তে মা।
" কেমন লাগছে রে নতুন চাকরি?" মা'র গলায় কিছুটা উদ্বেগ।
" ভালই লাগছে, তবে খুব খাটনি। শনি, রবিও নিস্তার নেই। এই তো, আজই বেলায় একটা মিটিং আছে।তুমি কেমন আছো, মা?"
" ভালই। তুই খাওয়া দাওয়া করছিস তো ঠিকমত?
জানিস তো পিয়া, বাড়িটার খুব খারাপ অবস্থা। কাল রাতে বড় একটা চাঙর খসে পড়েছে সিলিং থেকে। ভাগ্যিস, শুয়ে পড়েছিলাম তখন! কি করা যায় বল্ তো?" মায়ের গলার উৎকণ্ঠা ফোনেও চাপা থাকে না।
" মা, তুমি আমার কাছে চলে এসো। বাড়িটা কে বাসযোগ্য করতে গেলে তো অনেক কাজ করাতে হবে। এক্ষুনি এত টাকা তো আমার কাছে নেই,মা! তুমি চিন্তা কোরো না। শরীরের যত্ন নিও, মা!"
" তুই আজ এত কি ভাবছিস, বল তো? শরীর ঠিক আছে তো?" কফি খেতে খেতে জিজ্ঞেস করে অঞ্জু।
" না রে, শরীর ঠিক আছে। আসলে ক' দিন ধরে অফিসের কাজের খুব চাপ যাচ্ছে, তো!" কিছুটা এড়িয়ে যায় প্রিয়া।
" আজ আমার সাথে ডিনার করবি, চল্!"
" না রে, অঞ্জু, রাগ করিস না। কালকের অফিসের একটা রিপোর্ট বানাতে হবে। একদিন আমি নিজেই চলে যাব তোর বাড়ি ডিনার খেতে, দেখিস!"
আসলে নতুন চাকরি নিয়ে মুম্বই শহরে আসার দু বছর পরেও তার সেরকম কোনো বন্ধু নেই এখানে, একমাত্র অঞ্জু ছাড়া। ছোট্ট আধা মফস্বল শহর থেকে এই এত বড় শহরে এসে প্রথম প্রথম তার ফেলে আসা দিনগুলোর জন্য মন কাঁদত। এই সদা ব্যস্ত শহরের গতি ময় জীবনের সাথে তাল মেলানোই কষ্টের ছিল। এখানের মানুষজনের ঠুনকো অহংকার আর ঠাঁটবাট দেখে সে সঙ্কুচিত হয়ে থাকতো সবসময়। বারবার তার শান্ত গৃহকোণের ছায়াঘেরা আলিঙ্গনের কথা মনে পড়ত।অথচ, এই ঝাঁ চকচকে জীবন ই তো চেয়েছিল সে! আজন্ম বেড়ে ওঠা তার প্রিয় শহর থেকে সে নিজেই তো পালাবার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিল। মায়ের মতো জীবনে
আটকা পড়ে থাকতে চায় নি। তাই মায়ের আকুতির তোয়াক্কা না করেই, একরকম জেদ করে সে ওই ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে নিশ্বাস নিতে চেয়েছিল। আজ তাহলে মন এত উচাটন হচ্ছে কেন?
এম ডি মি: কল্যাণপুরের ঘরে যখন প্রিয়ার ডাক পড়লো, তখন সন্ধ্যে সাড়ে ছ'টা। যদিও এই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরের মধ্যে বসে আকাশ দেখা যায় না, তবুও আকাশে নিশ্চয়ই এখনও যথেষ্ট আলো আছে, প্রিয়া মনে মনে আন্দাজ করলো। এম.ডি সাহেব খুব শৌখিন, উনার চেম্বারে ঢুকলেই তা বোঝা যায়।
" বসুন ম্যাডাম!" সাহেব একটু জল খেয়ে গলা পরিষ্কার করে নেন। " আপনি তো জানেন, কোম্পানির অবস্থা খুব ভাল না। লাস্ট ইয়ারে আমরা আমাদের টার্গেট ফুলফিল করতে পারিনি।এবার আমাদের সামনে যে প্রজেক্ট আছে, তার মধ্যে দিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর একটা চেষ্টা চলছে। আপনার ওপর এই প্রজেক্টের ভার দিচ্ছি। সেই আস্থা আছে আমার আপনার ওপর। আপনি টিম তৈরি করে নিন, কিন্তু প্রজেক্ট টা একটু তাড়াতাড়ি শেষ করতে হবে। বুঝতেই তো পারছেন, হাতে সময় কম। আজ থেকেই লেগে পড়ুন।" চোস্ত ইংলিশে গড় গড় করে কথাগুলো বলে মোবাইলে সময় দেখে নিলেন এম.ডি.।
প্রিয়ার সামনে তার মায়ের মুখ মুখ ভেসে ওঠে।মা সকালেও ফোন করেছিল। তাদের ওখানে প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছে। বাড়ির যা অবস্থা, বৃষ্টিতে আরো কোনো বড় বিপর্যয় হতে পারে। প্রতি মুহূর্তে মা ভয় পাচ্ছে।
" মা, তুমি চিন্তা কোরো না। আমি দুদিনের ছুটির ব্যবস্থা করে যাচ্ছি। দেখি, কি করা যায়!" মা কে আশ্বস্ত করেছিল প্রিয়া। আর তার মধ্যেই এই দায়িত্ব।
" স্যার,"খুব ধীরে বলে প্রিয়া। " এই মুহুর্তে আমার দু দিনের জন্য বাড়ি যাবার খুব দরকার। মা একলা থাকেন ওখানে।"
মি. কল্যাণপুর কিছুক্ষন পেপার ওয়েট নিয়ে নাড়াচাড়া করেন। তারপর বেশ কেটেকেটে বলেন,
" দেখুন ম্যাডাম, সুযোগ সবসময় আসে না। কিন্তু এলে, তার ঠিকঠাক ব্যবহার করতেও জানতে হয়।আমি যা বলার বলেছি। হাতে সময় খুব কম। এবার বাকিটা আপনার বিবেচনা।" কথা শেষ করে ফোনে ব্যস্ত হয়ে পড়েন তিনি।
আজ জুহু বীচে খুব ভিড়। সরকারি ছুটির দিন বলেই বোধহয়। বাচ্চারা বসে বসে বালির পাহাড় বানাচ্ছে। কেউ কেউ বালির ওপর ডিগবাজি খাচ্ছে।দূরে বাবা, মা নিজেদের মধ্যে কথায় ব্যস্ত। কি সুন্দর নিটোল পারিবারিক ছবি! প্রিয়া কোনোদিন এর স্বাদ ই পেলো না। বাবার মৃত্যুর পর মা কেমন যেন নিজেকে গুটিয়ে নিলেন। তাদের জীবনে কোনো আনন্দ ছিল না। রোজ একরকম জীবন। আচ্ছা, মা তার কথাও একবার ভাবলো না? সে তো তখন ছোটো, তার কত ঘুরতে, বেড়াতে ইচ্ছে করতো।
একটানা কিসের শব্দে চমক ভাঙে। ব্যাগের মধ্যেই
ফোন টা বাজছে।
" কিরে কতবার ফোন করছি! কোথায় ছিলি বলতো? আমি এদিকে চিন্তায় মরছি!"
" মা শোনো, আমি একদম কাজে আটকে গেছি গো। আমি রন্টু কে বলে দিচ্ছি। ও তোমাকে টিকিট করে দেবে। তুমি একলা আসতে পারবে না? আমি মুম্বই স্টেশনে থাকবো "
" শোন্ না", মা'র গলা কিরকম অন্যরকম লাগে।"অনেক ভেবে দেখলাম। বাড়ি ছেড়ে যাওয়া খুব মুশকিল রে। কতরকম বাঁধনে যে বেঁধে আছি!তুই রাগ করিস না ,মা! তুই তোর সময় মত আসিস। হাতে যদি টাকা আসে, তবে রন্টু কে পাঠিয়ে দিস।ও বাড়ি সারাবার কাজগুলো সব করিয়ে দেবে বলেছে।"
মা অনেক কথা বলে যায়। প্রিয়ার কানে কিছু ঢোকে না। এখন বীচ অনেক ফাঁকা। আরব সাগরের ঠান্ডা হাওয়ার ঝাপ্টা চোখে মুখে এসে লাগে। মা'র ওপর প্রচণ্ড রাগটা ধীরে ধীরে প্রশমিত হয়ে আসে। সে যেভাবে শেকড় ছেড়ে চলে আসতে পেরেছে, মা 'র পক্ষে সেই টান অগ্রাহ্য করা কি সম্ভব? সেও তো কত দিন হল এখানে এসেছে, তবু ঘুরে ঘুরে কেন ফেলে আসা মাটির কথা ভেবে মন বিষণ্ণ হয়? যে অন্য জীবনের স্বাদ নিতে সমস্ত পিছুটান ফেলে এই জীবনে এসেছে, তা এত বিস্বাদ লাগে কেন আজকাল? কিন্তু ফিরব বললেই ফেরা যায় না বোধহয়!
ভোরের ঠান্ডা হাওয়ায় যেন মায়ের হাতের ছোঁয়া! বাইরে এখনও বেশ অন্ধকার। কাল রাতেই সব গুছিয়ে রেখেছে। সকাল সাড়ে দশ টায় কলকাতার ফ্লাইট। বাড়ির মালিকের সাথেও কথা হয়ে গেছে।
ফ্ল্যাটের চাবি নিচের বাড়িতে দিয়ে দিলেই হবে। এখন শুধু রেসিগ্নেশন্ লেটার টা মেইল করার অপেক্ষা! চোখে, মুখে জল দিয়ে তার প্রিয় জানালার কাছে এসে দাঁড়ায় প্রিয়া। তার ভেতরের এই টানাপোড়েন বোধহয় কোনোদিন যাবে না! যে আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্যকে পেছনে ফেলে সে তার আজন্ম লালিত মাটির কাছে ফিরে যাচ্ছে, সেই জীবনের ভালো, মন্দ সে জানে না। তবু, এই মুহুর্তে ফেলে আসা মূল্যবোধকেই বড্ড আঁকড়ে ধরে বাঁচতে ইচ্ছে করছে যে!
=========================
সুমিতা চৌধুরী
নিউ টাউন, কলকাতা--৭০০১৫৬

Comments
Post a Comment