মনিকরণিকা
অদিতি চ্যাটার্জি
হাইটেক-ঝলমলে নতুন পোশাকে সাজা বেনারস দেখবো বলে কলকাতা থেকে রওনা দিলাম, আসল উদ্দেশ্য হল ইউটিউব চ্যানেলটার জন্য ভালো ' স্টোরির' সন্ধান ।
ধূলোপায়ে বিশ্বনাথ দর্শন না করে সোজা চলে গেলাম গঙ্গা আরতি দর্শনে । যেভাবেই হোক আমার ক্যামেরাতে ধরতেই হবে গঙ্গা আরতি দেখার উন্মাদনাকে।
মাথায় ঘুরছে প্রাচীন কাশী আর আধুনিক বেনারসের মেলবন্ধনটা যদি ঠিক মতো তুলে ধরতে পারি, তাহলে আমার ছোট ইউটিউব চ্যানেলটা দাঁড়িয়ে যাবে।
" জয় গঙ্গা মাঈয়া কী...জয় ভোলানাথ " , দশাশ্বমেধ ঘাটের একটা দেওয়াল ধরে দাঁড়িয়ে যাই, তবে ক্যামেরাকে সচল রাখি , আবেগ-ভক্তি এবং গঙ্গা আরতি দর্শনে আনন্দ লাভ করা পরিতৃপ্ত মুখের মিছিলকে ক্যামেরাতে বন্দি করার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠলাম।
শুনেছিলাম গঙ্গা আরতি শেষে ললিতাঘাটে একটা লাইট- অ্যান্ড সাউন্ডের শো হয় , সেখানে দেখি ভিড়টা ছানা কাটার মতো, লাইট -অ্যান্ড সাউন্ড শো -টা কিছুটা ক্যামেরায় তুলে নিয়ে সিন্ধিয়া ঘাটে গিয়ে চুপ করে বসলাম, ভাবছি 'স্টোরিটা ইন্টারেস্টিং ' কী করে করা যায় ..
হঠাৎ
" বাবু জী কী বাঙালী? "
বছর সত্তরের বয়স্ক মানুষটার সাদা ধুতি পাঞ্জাবীর গা দিয়ে দুধ-চন্দনের গন্ধ উঠছে, কপালে তিলক কাটা। সৌম্য দর্শন মানুষটিকে ভালো লাগলেও কথা বলতে ভালো লাগছিল না । ঘাড়টা শুধু নাড়ি।
"বিশ্বনাথ দর্শন করলেন? মনিকরণিকা ঘাটে যাবেন না?"
বাধ্য হয়ে বলি, " চিতা দেখলে ভয় করে । "
হাঃ হাঃ হাঃ উফফ কি কান ফাটানো হাসি। সিন্ধিয়া ঘাটের নীরবতাকে টুকরো টুকরো করে দিল নিমেষে।
হাত ধরে টানেন "আসুন আমার সাথে .."
" কী দেখছেন বাবুজী ? "
ঘোরের মধ্যে বলি , " ছয়টা চিতা জ্বলছে মহারাজ, দাউ দাউ করে। কিন্তু আবার এর মধ্যে লস্যিও বিক্রি হচ্ছে, ফটো উঠছে , সাধু মহারাজরা জপেও বসেছেন । "
"হুম জীবন কখনও থেমে থাকে না বাবুজী। " চিতার আকাশ ছোঁয়া আগুনের শিখা থেকে চোখ ফিরিয়ে থাকি , আবার কানে আসলো একটা গম্ভীর গলা কিন্তু ছোট ছেলে ভোলানোর মতো জিগ্যেস করলেন ,
" ভয় করছে চিতার আগুনকে? "
বাচ্চাদের মতো বলি , "হ্যাঁ ।"
"আসুন আমার সাথে ।"
প্রশ্ন করতেও ভুলে যাই, মহারাজের ব্যক্তিত্বের দাপটে।
সিন্ধিয়া ঘাটে এসে আবার বসি। নৌকা গুলোর সাথে জোয়ারের জল খেলা করছে এখন, মাঝি ভাইরা যে যার বাড়িতে । ভোর থেকে আবার ওদের 'ডিউটি' শুরু হয়ে যাবে। গুটিগুটি পায়ে রাত গভীর হয়ে চলে , কাশী ঘুমায় না। আমিও খিদে ঘুম ভুলে মহারাজের সঙ্গে বসে থাকি গঙ্গার ঘাটে । চিন্তাশূণ্য মনে।
" বাবুজী জানেন একবার এক শেঠজির সৌভাগ্য হয়েছিল মনিকরণিকাতে ' ছাই' হওয়ার ।"
চিন্তা শূণ্য মনকে নাড়া দিল সৌম্য দর্শন মানুষটার গম্ভীর কন্ঠ।
কান পাতি , মহারাজ বলে চলেছেন, " হাতে একটা সোনার আংটি, খুব করে পুরোহিত ঘি মাখাচ্ছেন । শেঠের বাড়ির কোনো জেনানা বলে, থাক না মহারাজ বাবার প্রিয় আংটি ছিল ।"
পুরোহিত বলেন " মাঈ কেন বাপকে বন্ধনে বাঁধছিস , ছেড়ে দে, মুক্ত হয়ে যেতে দে। "
"তারপর জানেন বাপুজী সেই পুরোহিত বললো পঁয়তিরিশ শো না পঞ্চান্ন শো ? "
শেঠের বাড়ির লোকেরা বেবাকুফের মতো বলে "মানে ?"
" মানে পঁয়তিরিশ শো তে চন্দন কাঠ একটু কম, বাপের ওপরে যেতে সময় লাগবে। পঞ্চান্ন শো তে বেশি চন্দন কাঠ, তোমাদের বাপ চড় চড় করে ওপরে উঠে যাবে ?"
"ভাবুন বাপুজী যে শেঠজি এই টাকায় চাকর রাখতো , যে টাকার জোরে দুনিয়ায় রাজ করতো , তার মূল্য কিনা পঁয়তিরিশ শো কী পঞ্চান্ন শো !
মহারাজ চুপ করলেন, ভেজা বাতাস, সোঁদা গন্ধ, জলের শব্দের মধ্যে ভাবতে বসি সত্যি তো, সময় এসে গেলে রাজাকেও তাঁর সিংহাসন ফেলে রেখে চলে যেতে হয় , ফকির সেজে ।
তাহলে কিসের ইন্টারেস্টিং স্টোরি , কিসের সোনার আংটি । সবই বন্ধন। কালের সমুদ্রে মুহূর্তের মধ্যে বিলীন হয়ে যাবে।
আবারও কানে আসে গম্ভীর কন্ঠ, " বাপুজী চিতার আগুন কে ভয় করছে ? "
" না " ফিসফিস করে বলি।
----------------------
Aditi Chatterjee
Ranaghat, Nadia
Comments
Post a Comment