মুক্তি
বাপন মান্না
কিষানগঞ্জ হাই স্কুলের একজন স্বনামধন্য শিক্ষক হলেন পবিত্র বাবু। পবিত্র বাবু খুব অল্প দিন হচ্ছে এই স্কুলে এসেছেন। এই অল্প দিনের মধ্যেই সমস্ত ছাত্র-ছাত্রীর কাছে তিনি খুবই প্রিয় হয়ে উঠেছেন। তিনি খুবই সহজ-সরল প্রকৃতির ছিলেন। চাঁদের মধ্যে যে কলঙ্ক থাকে, তা বুঝি তিনি জানতেন না। তাই তিনি তার সহশিক্ষকদের ছল-চাতুরী ধরতে পারতেন না। এমনকি যেসব ছাত্র-ছাত্রী তার সাথে খারাপ ব্যবহার করতো, সেই সব ছাত্র-ছাত্রীকে বেশি করেই ভালোবাসতেন। কারণ তিনি ভাবতেন — ভালোবাসা দিয়ে পৃথিবীকে বদলে ফেলা যায়।
একদিন একাদশ শ্রেণীতে ক্লাস করানোর জন্য ঢুকতেই তিনি দেখতে পেলেন — একটা ছাত্র একটা ছাত্রীর কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে; আর গল্প করছে। ক্লাসে স্যার ঢুকেছে দেখেও তারা স্বাভাবিক অবস্থায় বসল না। তাই বাধ্য হয়ে পবিত্র বাবু কারো নাম না করে বললেন, "আমি তোমাদের ক্লাসে এসেছি তোমাদেরকে পড়ানোর জন্য। তোমরা আমার অনেক স্নেহের ছাত্র-ছাত্রী। তাই তোমাদের উচিৎ — ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক মিষ্টি-মধুর করে রাখা। তাই যারা ক্লাসের মধ্যে অসভ্যতামি শুরু করেছো, তারা শুধরে যাও।" এই কথা বলতেই সেই ছাত্রটি অর্থাৎ রনি উঠে দাঁড়িয়ে বলে, "স্যার, আপনি আমাদের স্বাধীনতার বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে পারেন না। আপনার কোন অধিকার নেই এইসব কথা বলার।" ক্লাসের সমস্ত ছাত্র-ছাত্রীরা মনে মনে রনির এমন অসভ্য ব্যবহারে ছিঃ ছিঃ করতে থাকে। ভরা ক্লাসের মধ্যে রনির এমন দুর্ব্যবহারে পবিত্র বাবু খুব লজ্জা বোধ করেন। এমনকি মনে খুব কষ্ট পান। তবুও তিনি নম্রভাবে বলেন, "তোমাদের স্বাধীনতায় আমি হস্তক্ষেপ করি নি। তোমরা তোমাদের মতোই স্বাধীনভাবে চলো — তাতে আমার কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু ক্লাসের মধ্যে এসব অসভ্যতামি কোরো না।" রনি আর কিছু না বলে চুপ হয়ে রইল।
তারও কিছুদিন পরে পবিত্র বাবু একদিন একাদশ শ্রেণীতে পড়া ধরতে থাকেন। পড়া ধরাকালীন পবিত্র বাবু পড়া ধরেন সুনীতিকে। সুনীতি হল রনির প্রেমিকা। সুনীতি পড়া না পারায় পবিত্র বাবু বলেন, "তোমাদের বাবা-মা অনেক কষ্ট করে তোমাদেরকে পড়াচ্ছেন। তোমরা স্কুলে এসে একটু পড়াশোনা কোরো। বসো।" সুনীতি পবিত্র বাবুর কথায় খুব অপমানিত বোধ করে। তাই সে স্যারকে জব্দ করার জন্য ছক কষতে থাকে।
পরের দিন যখন পবিত্র বাবু একাদশ শ্রেণীতে ক্লাস নিতে আসছিলেন, সেই সময় বারান্দায় কোনো ছাত্র-ছাত্রী ছিল না। ঠিক তখনই সুনীতি কোথা থেকে এসে নিজের জামা ছিঁড়ে চিৎকার করতে থাকে — বাঁচাও! বাঁচাও! আমাকে ছাড়ুন! এই চিৎকার শুনে সমস্ত ছাত্র-ছাত্রীরা এবং শিক্ষক-শিক্ষিকারা ছুটে আসে। সুনীতির ছেঁড়া জামা কাপড় দেখে ও চিৎকার শুনে সবাই ঘটনাটি বুঝতে পারে। তবুও হেড মাস্টার জানতে চায় — কি হয়েছে? সুনীতি কাঁদতে কাঁদতে বলে, "স্যার, আমার শ্লীলতাহানির চেষ্টা করেছিল।" পবিত্র বাবু জানান, "আমি কিছুই করিনি। আমি ওর গা স্পর্শও করিনি। ও মিথ্যা বলছে।" তবুও কেউ পবিত্র বাবুর কথা বিশ্বাস করল না। কিছুক্ষণের মধ্যেই সুনীতির বাবা খবর পেয়ে ছুটে আসে। স্কুলের সমস্ত ছাত্র-ছাত্রীরা ক্লাস থেকে বেরিয়ে আসে। স্কুলের মধ্যে বিশাল শোরগোল শুরু হয়েছে। সুনীতির বাবা থানায় ফোন করে পবিত্র বাবুর বিরুদ্ধে অভিযোগ জানায়। খবর পেয়ে কিছু পুলিশ তৎক্ষণাৎ স্কুলে এসে হাজির হয়। পুলিশ পবিত্র বাবুকে জিজ্ঞাসাবাদ করে থানায় নিয়ে যায়। পুলিশ পবিত্র বাবুকে অ্যারেস্ট করে থানায় নিয়ে যাওয়ার সময় স্থানীয় লোকজনের অনেকে বলতে থাকে — ওর জুতোর বাড়ি মারা উচিৎ! ও শিক্ষক! এই সংবাদ চারিদিকে আগুনের ফুলকির মতো ছড়িয়ে পড়ে। ভালো কোনো ঘটনা ঘটলে, সেটা লোকজন জানতে সময় লাগে। কিন্তু খারাপ কিছু ঘটলে আকাশ বাতাসেও ঢি-ঢি পড়ে যায়, তাতে বেশি সময় লাগে না। চারপাশের সমস্ত গ্রামের লোকজনেররা বলাবলি করতে থাকে — শিক্ষক হয়ে এমন কাজ করতে পারল! এদেরকে শিক্ষক বলতে ঘেন্না হয়! ওই স্কুলেরই কিছু ঈর্ষাপরায়ণ শিক্ষক-শিক্ষিকা বলতে থাকে — পবিত্র বাবুর সাথে যা হয়েছে, ঠিক হয়েছে। ওর জেলে থাকা উচিৎ। আশেপাশের স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকারা বলে, "পবিত্র বাবুকে আমরা ভালো মানুষ বলে জানতাম! তলে তলে এমন! ছিঃ ছিঃ!"
এদিকে যেসব ছাত্র-ছাত্রী পবিত্র বাবুকে খুব ভালোবাসত, সম্মান-শ্রদ্ধা করত, তাদের সংখ্যাটা নেহাত কম নয়। তারা সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে আলোচনা করতে থাকে। তাদের মধ্যে কেউ বলে ওঠে, "এটা হতেই পারে না। স্যার, এমন করতেই পারে না।" আবার কেউ বলে, "স্বয়ং ভগবান এসেও যদি আমাকে বলে, তাও আমি বিশ্বাস করব না। আমাদের স্যার ভোরের আকাশের মতো স্বচ্ছ, গঙ্গার জলের মতো পবিত্র। তিনি একাজ করতেই পারেন না।" এমন সময় বাবাই ছুটে এসে জানায় — পাশের ঘরে রনি আর সুনীতি তাদের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করছিল। তারা নাকি পরিকল্পনা করেই পবিত্র স্যারকে মিথ্যে অপবাদ দিয়েছে। বাবাই আরও বলে, "এখনো ওরা ওই ঘরে আছে। চাপ দিয়ে বললে হয়তো সত্যি কথা এখনো বের হতে পারে।" এই কথা শেষ হতে না হতেই হুড়মুড় করে সবাই পাশের ঘরে গিয়ে তাদের ঘিরে ধরে। তাদের দুজনকে মারধর করে ছাত্র-ছাত্রীরা এবং চাপ দিয়ে সত্য কথা বের করে। সেই স্বীকারোক্তি ছাত্র-ছাত্রীরা তাদের ফোনে রেকর্ড করে রাখে। তারপর দল বেঁধে ছাত্র-ছাত্রীরা হেড মাস্টার মশাইয়ের সাথে থানায় যায়। বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়। সেখানে গিয়ে দেখে পবিত্র বাবু লক-আপের মধ্যে বসে আছে। সন্ধ্যা হয়ে যাওয়ায় লাইট জ্বলছে। হেড মাস্টার মশাই থানার বড়ো বাবুকে রনি ও সুনীতির কুকীর্তি ফাঁস করে দিয়ে বলে, "সুনীতি ও রনি চক্রান্ত করে এই অপবাদ দিয়েছে। আমাদের কাছে ওদের স্বীকারোক্তি আছে।" থানার বড়ো বাবু সব কথা শুনে পবিত্র বাবুকে ছেড়ে দেন। ছাত্র-ছাত্রীরা অশ্রুসিক্ত হয়ে তাদের প্রিয় স্যারকে জড়িয়ে ধরে। আনন্দ করতে করতে সবাই বাড়ি ফিরে আসে। পবিত্র বাবুও তার নিজের বাড়িতে চলে যান।
বাড়ি ফিরতে পবিত্র বাবুর দেরি হওয়ায় বাড়ির লোকেরা তাকে প্রশ্ন করে। পবিত্র বাবু ইতস্তত করে বলেন, "এমনিই দেরি হয়ে গেল।" বাড়ির লোককে সন্তুষ্ট করতে পারলেও নিজের অন্তরকে, নিজের বিবেককে কিছুতেই তিনি সান্ত্বনা দিতে পারছেন না। বারবার তার বিবেকের দংশনে তিনি জর্জরিত হয়ে পড়ছেন। তিনি রাতে ডিনার করেন নি। রাতে ঘুমাতেও পারছেন না। তিনি বারবার ভাবছেন — "আমার দোষ কি ছিল? যার জন্য আমাকে এতটা অপমানিত হতে হল? ছাত্র-ছাত্রী পড়া না পারলে তাকে বকাঝকা করা বা বুঝিয়ে বলা বা ভালো পরামর্শ দেওয়া — এটাই কি আমার দোষ? নাকি ক্লাসের মধ্যে স্যারের সামনে ছাত্র-ছাত্রী অশালীনভাবে বসে থাকলে, তাকে শাসন করাটা দোষের? কোন্ অপরাধে আমি আজ এত বড়ো মিথ্যে অপবাদের স্বীকার হলাম? সবাই তো আর সত্যি ঘটনা জানবে না। আগামীকাল স্কুলে গিয়ে যাদের সঙ্গে আমার দেখা হবে, তাদের দিকে কিভাবে আমি চোখ তুলে তাকাব? আমার তখন মনে হবে না — ওরা সবাই আমার দিকে তাচ্ছিল্য ভরে তাকাচ্ছে, উপহাস করছে আমাকে ওদের ওই চোখগুলো?" এইসব কথা ভাবতে ভাবতে পবিত্র বাবু ঘুমিয়ে পড়েন।
রাত শেষ হল। কিন্তু পবিত্র বাবুর ঘুম শেষ হল না। রাতে এক কৌটো ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছেন চিরতরে। কারণ তিনি তার চারপাশের যে চোখগুলো থেকে সম্মান, শ্রদ্ধা, ভক্তি পেয়েছেন, সেই চোখগুলোতে ঘৃণা, অবজ্ঞা দেখতে তিনি খুব ভয় পেয়েছিলেন। তাই তিনি মুক্তি নিলেন।
----------------------------------
Comments
Post a Comment