Skip to main content

গল্প ।। সন্দেহ ।। লিপিকর

Nabapravat

সন্দেহ

লিপিকর

 
এক বছর! আজ থেকে ঠিক একবছর আগে উনি অবসর নিয়েছিলেন। এখানকার হেড-পোস্টাফিসে সিনিয়র-ডিভিশ্যন কেরাণীর চাকরিতে তখনও আমার এগারো মাসের মেয়াদ বাকি। তারপরে যে ক’মাস আমি ব্যাগ কাঁধে বেরোতুম, উনি নিজেকে ডুবিয়ে রাখতেন স্কুল-লাইব্রেরির বইয়ের ক্যাটালগটি পুরোপুরি কম্পিউটারাইজড করার কাজে। কাজটা ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর জন্যেই হোক, বা অফিসটাইমের ট্র্যাফিক জ্যাম কর্তার চিরকালের না-পসন্দ বলেই হোক, উনি এসময় থেকে সকালবেলা মাঝেমাঝে টুকটাক রান্না করা শুরু করলেন। কলেজিয়েট স্কুল, তার কলেজের স্টাফ-ক্যান্টিনে প্রবেশাধিকার তাঁর তখনও ছিল, কিন্তু ওখানকার খাবার কোনওদিনই কি তাঁর মুখে রুচেছে! আমি নেয়ে-খেয়ে অফিস যাব বলে ছুটোছুটি করছি, সেই ব্যস্ত সময়ে উনি এসে, “কুসুম, তুমি রিটায়ার করলে আমরা সমুদ্রের ধারে যে যে জায়গায় বেড়াতে যাব, সেই লিস্টে আরো তিনটে নাম রাখলুম।” বললে কে না বিরক্ত হয় বলুন তো! সত্যি বলতে কী, সুখস্বপ্ন একটু একটু আমিও বুনতে শুরু করি নি, এমনতো নয়! এর চেয়ে, এখন মনে হয়, যদি উনি গতানুগতিকভাবে “আজ কী রান্না হচ্ছে!” মার্কা প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি করে চলতেন, তাহলে হয়তো আমার এখনকার এই একা, বন্ধ্যা, বদ্ধ জীবনটা একটু কম ভারাক্রান্ত হতো।


একাকিত্ব। এটাই তো আমাদের চারদশকের বিবাহিত জীবনের সবচেয়ে বড় লেইট্‌মোটিফ্‌। ওঁকে বিয়ে করার জন্যে যখন বাড়ি থেকে পালিয়েছি তখন আমার বয়স সাড়ে আঠেরো। জানতুম শুধু একটা মানুষকে আর দুটো তথ্য - একঃ আমার আঠেরো বছর বয়স পূর্ণ হয়ে গেলে আইনতঃ আমি যাকে খুশী বিয়ে করতে পারি। আর আমাদের ছোটবেলার সেই গঞ্জ-শহরে আইনে যেহেতু লোকের বিশেষ বিশ্বাস ছিল না, ওখানে থাকলে আমাদের দুজনেরই মারা পড়ার আশঙ্কা ছিল। বিপদ যে হয় নি, তার সম্ভবতঃ একমাত্র কারণ ছিলেন আমার স্বর্গগতা শাশুড়ি-মা। আগুনে পুড়ে আত্মহত্যা করার আগে আমার স্বামীর পিতামহকে উদ্দেশ্য করে যে চিঠি লিখে গিয়েছিলেন তাঁর পুত্রবধূ, তাতে বংশের প্রথম লিখি-পঢ়ি বহু’র আবেগপ্রবণ অনুরোধ ছিল যাতে আমাদের দুজনের কোন ক্ষতি না হয়। এছাড়াও তাঁর স্ত্রীধনের সবচেয়ে মোটা চুড়িটি তিনি আশীর্বাদস্বরূপ আমার জন্যে রেখে যান। আমার স্বামীর পরিবার সেই মৃত্যুপথযাত্রিণীর শেষ ইচ্ছের অমর্য্যাদা করেছিল, এমনটা বলব না। অশৌচের মধ্যেই সেই চুড়ির জোড় তৈরী করিয়ে, চুড়ি দু’গাছা আমার বরের হাতে সঁপে তাঁর পিতামহ জানিয়ে দেন, ভবিষ্যতে পরিবারের কোনও দায় বা অধিকার - কোনটাই যেন আমরা দাবী না করি। আমার বিবাহিত জীবনের প্রথম পঁয়ত্রিশ বছরে আমি আমার শ্বশুরবাড়ির কোন আত্মীয়কে দেখি নি, নিজের বাপ-মা বা অন্য আত্মীয়বন্ধুদের তো আর কখনোই নয়। যদিও উনি বরাবর, বারবার বলে এসেছেন যে আমাকে ভালোবাসতে গিয়ে যা কিছু ওঁকে বিসর্জন দিতে হয়েছে, তা নিয়ে ওঁর কোনও খেদ বা অনুতাপ নেই, আমাদের দু’জনের দাম্পত্যজীবনে কিন্তু আমার সেই কখনো দেখা-না-হওয়া মহিলার এক দৃঢ় প্রভাব থেকেই গিয়েছে। কোনদিন এবিষয়ে একটি কথাও ব্যয় না করে আমরা দুজনেই যেন জানতুম সেই নিষ্ঠ বধূর মৃত্যুর সমস্ত দায় আমাদের প্রেমের, আমার অবিমৃশ্য ভালবাসার, একমাত্র দায়িত্বজ্ঞানহীন আমার, শুধুই বেজাতে জন্মানো আমার। সেজন্যেই অবচেতনে সেই মৃত্যু আমাদের মাঝে দাঁড়িয়ে নতুন প্রাণের জন্মে বাধা দিয়েছিল।


এতগুলো বছরের আমাদের সহ-বাস, অনস্বীকার্যভাবেই, একঘেয়ে ছিল। তবুও এখন আমাকে যে সন্দেহ কুরেকুরে খাচ্ছে, সে তুলনায় গত জীবনটা শান্তির ছিল। ভিতুর ডিম একটা! পলায়নপর, মেরুদন্ডহীন, পোড়া চ্যালাকাঠের ছাওয়াল! এই যে অন্ধকার ভাবনাটা আমার মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে গেল, এটা থেকে আমি কী করে মুক্তি পাবো? এটা থেকে কি আমি আদৌ মুক্তি পাবো? এখন আমার ঐ একঘেয়ে জীবনটাতেই ফিরে যেতে ইচ্ছে করছে, যেখানে সকালে চোখ খুললেই সেই মানুষটাকে দেখতে পাওয়া যেত, যাকে সারাজীবন নির্ভর করে এসেছি। যাকে এই কদিনের দুঃস্বপ্নের কথা বললেই তিনি সস্মিতমুখে বলবেন, “কুসুম, ঐজন্যে বলি, সূর্য ডোবার পরে মাছ-মাংস খেও না।”


আমার যখন চাকরী থেকে অবসরের আর সপ্তাহচারেক বাকি, তখন আমার পোস্টাফিসের বড়বাবু আমাকে বললেন, “কুসুম, আমরা আপনার রিটায়ারমেন্টের কাগজপত্র তৈরী করেছি। কিন্তু আমার একটা অনুরোধ ছিল, আপনি যে আপনার আর্নড লিভগুলো নিয়ে নেবেন ভেবেছিলেন, সেটা করা যাবে না। রুক্মিণীর প্রেগন্যান্সিতে কিছু জটিলতা দেখা দিয়েছে, ডাক্তার ওঁকে পুরো বেডরেস্টে থাকতে বলেছে। আর কিষেণবাবুও সামনের কদিন থাকবেন না, সামনেই ওঁর ছোট মেয়ের বিয়ে,জানেনই তো … তাছাড়া আমি ফিন্যান্স-কে আপ্রুভ্যাল দিয়ে দিয়েছি আপনার সমস্ত ছুটি বিক্রি করে টাকা জমা করে দিতে … এখন নতুন হিসেব কষাও ঝামেলা, আর আপনিই বা টাকাকটা ছাড়বেন কেন? বুঝতেই পারছেন ক্যাল্কুলেশ্যন গোড়া থেকে করতে হলে টাকা হাতে পেতে অনেকদিন লেগেই যাবে।”


আগ বাড়িয়ে আমার হয়ে এই সিদ্ধান্ত নেওয়াটা আমার পছন্দ হয় নি, কিন্তু আমি খুব একটা আপত্তি করি নি। আমার এই চারসপ্তাহে কিছু করার পরিকল্পনা ছিলও না। তাছাড়া এই অফিসে অনেকদিন কাজ করেছি তো, জানি, পরিবার থেকে খেদিয়ে দেওয়া বাঁজা মেয়েদের ব্যক্তিগত ইচ্ছে-অনিচ্ছের চেয়ে তাদের সহকর্মীদের (বা, সহকর্মীদে্র সন্তান-সন্ততিদের) জীবনের জন্ম-পরীক্ষা-বিবাহ-আনন্দানুষ্ঠান ছুটি মঞ্জুর করার ক্ষেত্রে বেশি গুরুত্ব পায়। আর বলে ক্ষতি বিনে লাভ নেই, “ইন্সেন্সিটিভ” শোনার ব্যাপারে আজকাল আমি সেন্সিটিভ হয়ে গিয়েছি।


আমার কাজের শেষদিন, ৩০শে নভেম্বর, ছিল বুধবার। ২০ তারিখে, আমার চাকরীজীবনের শেষ উইকেন্ডের আগের রোববারে, ভোরবেলা উনি আমাকে ঘুম থেকে ডেকে তুললেন। “কুসুম, আমার পেটে অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে, আমি অ্যান্টাসিড, গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ সব খেয়ে ফেলেছি … কিন্তু কিছুতেই কমছে না, কিছু একটু করো, যাতে আমি একটু আরাম পাই!”


শারীরিক ব্যথা সহ্য করার ব্যাপারে আমার স্বামীর ক্ষমতার সঙ্গে আমার ভালোই পরিচয় আছে। একবার আমাদের এখানে একটা রাজনৈতিক বিক্ষোভের সময়ে কয়েকজন গুন্ডা কলেজ লাইব্রেরিতে আগুন লাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। অন্যান্য কর্মচারীরা বিপদ দেখে ‘চাচা, আপন প্রাণ বাঁচা’ নীতিগ্রহণ করেছিল, উনি কপালে ডান্ডার বাড়ি খেয়েও সেই বদমাইশদের একজনকে ধরে লাইব্রেরীর দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিয়েছিলেন, ফলে গুন্ডারা আর পুলিশ আসার আগে আগুন লাগিয়ে উঠতে পারে নি। তাঁকে উদ্ধার করতে দু’ঘন্টার ওপরে সময় লেগেছিল। এই দুটিঘন্টা তিনি কপাল থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরে পড়া রক্ত নিয়েও নাহোক দশ বছরের ছোট, পেশাদার একজন দুষ্কৃতিকে লাইব্রেরিতে আটকে রেখেছিলেন, শুধু বই বাঁচাতে। এখন তিনি ‘অবসরপ্রাপ্ত’ বৃদ্ধ বটে, কিন্তু কষ্টটা প্রচন্ড না হলে আমাকে সেই অভিশপ্ত ভোরে ওভাবে ঘুম থেকে ওঠাতেন না, সে বিষয়ে আজও আমি নিশ্চিত।


আমাদের মফঃস্বল শহরে ভোরে ডাক্তার-বদ্যি পাওয়া যায় না। সেদিন রোববার। আমাদের যিনি পারিবারিক চিকিৎসক তিনি দু’সপ্তাহ আগে বেড়াতে গিয়েছেন, মঙ্গলবারের আগে ফিরবেন না। আমি প্রথমে ওঁকে কিছু ঘরোয়া দাওয়াই দিলুম, কিন্তু তাতে ওঁর কোন উপশমই হল না। আমার দন্তশূলের জন্যে একটা পেনকিলার আনানো হয়েছিল, সেটা খেয়ে উনি চোখ বন্ধ করে আচ্ছন্নের মত শুয়ে রইলেন সাময়িকভাবে। ওঁকে শহরের আরেকজন ডাক্তার, যাঁর কাছে আমরা আগেও গিয়েছি অবরেসবরে, তাঁর চেম্বারে নিয়ে গেলুম। যথারীতি নোটিশ ঝোলানো আছে, ‘রবিবার বন্ধ।’, এদিকে উনি তখন যন্ত্রণায় প্রায় অজ্ঞান। অটোরিক্সা করে আরো দুজন ডাক্তারের চেম্বারে গিয়েও কাউকে পাওয়া গেল না, তখন উনি অর্ধনিমীলিত চোখে আমাকে বললেন, “কুসুম, চলো, আমরা সদর হাসপাতালের এমার্জেন্সীতে যাই।”


সেই প্রথমবার সাময়িক নিরাময়ের ব্যাকুলতা কাটিয়ে দীর্ঘকালীন স্বাস্থ্য-দুশ্চিন্তা আমার মনে এল। যে লোকটাকে আমাদের বিয়াল্লিশ বছর আটমাসের যৌথজীবনে নিজের জন্যে ডাক্তার, ইঞ্জেকশ্যন, হাসপাতাল - সবরকম আধুনিক চিকিৎসাকে দূরে রাখতে দেখেছি (আমার জন্যে অবশ্য তাঁর আধুনিক চিকিৎসা ও চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে কখনো আপত্তি হতে দেখি নি), সেই মানুষটা কিনা পেটব্যথার জন্যে হাসপাতালের এমার্জেন্সীতে যেতে চাইছে। এ তো কোন সাধারণ অসুখ নয়!


হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা শুরু করতে ঘন্টা দুই লাগলো। ওখানেও কর্মী অপ্রতুল। আরো একঘন্টা পরে মেট্রন এসে ওঁকে ঘুমপাড়ানি ইঞ্জেকশ্যন দিলেন, তখন অসহ্য ব্যথায় তিনিও ধুঁকছেন, তাঁর কষ্ট দেখতে না পেরে আমিও কাঁদছি।


সেদিন দুপুরে আমাদের দুজনের খাওয়া জোটে নি। আমি তো আগে কখনো এরকম মেডিক্যাল এমার্জেন্সী’র সম্মুখীন হইনি। জুনিয়র একজন হাউসস্টাফ রাউন্ডে আসবেন শুনে তাঁর জন্যে হত্যে দিচ্ছিলুম। সেই ডাক্তার ডাক পেয়ে এসে যখন ওষুধ আর অনেক টেস্ট লিখে দিলেন তখন চারটে বেজে গিয়েছে। সেরাতে ওঁকে হাসপাতালে ভর্তি রাখতে আমাকে একবার বাড়ি এসে নিজের আর ওঁর আই-কার্ড নিয়ে গিয়ে সব সইসাবুদ করতে আরো ঘন্টাখানেক লাগলো। তারপরে সকালের মেট্রন নিজে বাড়ি যাওয়ার সময়ে আমাকে বললেন আমার এখানে আজ আর কিছু করণীয় নেই, এলাকাটা খারাপ, আমি যেন বাড়ি গিয়ে রাতে বিশ্রাম নিয়ে কাল আবার আসি।


সেরাতে নিজেকে খুব একাএকা, অসহায় লাগছিল। এই একাকিত্বটা চল্লিশবছর ওঁর পাশে শুয়ে যে একাকিত্ব অনুভব করেছি, তার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।


এক হিসেবে, আমাদের চার দশকের বাঁচাটা তো একরকমের মরে থাকাই। আমরা এসে দুজনের নতুন সংসার পেতেছিলুম এক ছোট্ট শহরে, যেখানে একজন মানুষও আমাদের আগে চিনতো না। উনি এই কলেজিয়েট স্কুলে লাইব্রেরিয়ানের চাকরি পেয়েছিলেন বলেই আমরা দু’বাড়িতে নিজেদের বিয়ের সিদ্ধান্ত জানাতে পেরেছিলুম। এখানে এসেই উনি আমাকে প্রাইভেটে ঠেলেঠুলে গ্র্যাজুয়েট বানিয়ে তুললেন, আর তারপরেই পোস্টাফিসের কেরাণির চাকরীটাও আমার কোনও উমেদারি ছাড়াই জুটে গেল। উনি আমাকে সাহিত্য ভালোবাসানোর চেষ্টায় মেতে উঠলেন। আমরা নিতান্তই সাংসারিক প্রয়োজন ছাড়া কটাই বা বাড়তি কথা বলতুম? যেদিন উনি আমার শাশুড়ির অশৌচগৃহ থেকে একজোড়া সোনার বালা হাতে ফিরে এলেন পূর্বাশ্রমের সবকিছু খুইয়ে, আগের চেনা প্রেমিক মানুষটি কেমন যেন অন্যরকম হয়ে গেলেন। নিজের সাধ্যমত যত্নে আমাকে রাখতে কোনোদিন তাঁর ত্রুটী হয় নি। কিন্তু সংসারে, আমি সহজেই টের পেতুম, তাঁর টান নেই। আমরা সহ-বাস করেছি দশকের পর দশক, সহবাসও দাম্পত্যজীবনের প্রাকৃতিক টানে করেছি নাহোক কয়েকশো বার, কিন্তু সহধর্মী বা সহধর্মিণী হয়ে উঠতে কি আমরা উদ্বুদ্ধ হয়েছি, উন্মুখ থেকেছি? এক অদৃশ্য দূরত্ব আমাদের মধ্যে থেকেই গিয়েছে। যে দেড়-কামরার ভাঙা বাড়িটিতে আমরা প্রথম সংসার পেতেছিলুম, সেই বাড়িটিই আমরা পরে সস্তায় কিনে নিই। অথচ, বাড়িটা যে তাঁর কলেজ বা আমার পোস্টাফিস, কারও কাজের জায়গা থেকেই হাঁটাপথের দূরত্ব ছিল - এমন না। আমাদের তখন যা আর্থিক সঙ্গতি, আমরা আরেকটু বড় বাড়ি আরেকটু সম্ভ্রান্ত পাড়ায় কিনতেই পারতুম, কিন্তু আমাদের কারোরই কোনও উৎসাহ ছিল না ব্যাপারটায়।


বিয়ের কিছু বছর পরেও যখন আমরা নিঃসন্তান, তখন আমি ওঁকে ডাক্তার দেখানোর কথা বলেছিলুম। যে ডাক্তারের কাছে আমরা প্রথমবার গিয়েছিলুম তিনি পরীক্ষা করে আমাদের দুজনকেই পাশ করিয়ে দিয়েছিলেন। তারপরেও যখন কিছু হল না, তখন অন্য কোনও ডাক্তার দেখানোর কথা যতবার বলতুম, উনি শুনে প্রতিবারই হুঁ-হাঁ করতেন, কিন্তু তারপরেই আলোচনাটা কেমন পিছলে বা মিইয়ে যেত, ফলপ্রসূ কোনকিছু আর করা হত না। শেষে আমি এই সিদ্ধান্তে আসি, তাঁর মায়ের আত্মহত্যার জন্যে পরোক্ষভাবে হলেও দায়ী মহিলার গর্ভে উনি নিজের বংশের বীজ বপন করতে অনিচ্ছুক। নিজের শারীরিক ক্ষুধা আমার মাধ্যমে তৃপ্ত করতে চাওয়ার ব্যগ্রতা কখনোই আমি তাঁর মধ্যে লক্ষ্য করি নি, অথচ আমার ডাকে সাড়া দিতে তিনি ক্বচিৎ অরাজি হতেন। আমি যে পরিবেশে বড় হয়েছি, সেখানে অন্য জাতের নারী বা পুরুষকে প্রেম নিবেদন করার উদাহরণ সামনে ছিল, কিন্তু স্বামীর সঙ্গে এক বিছানায় শুয়ে, তাঁকে কিভাবে বলতে হয় যে মূল ব্যাপারটায় তিনি উদ্যোগ নিলে, সম্ভোগে আদিম হলে আমার ভালো লাগবে, সেই সোজাসাপ্টা হওয়ার মত নির্লজ্জ প্রগলভতাটা আমার শিক্ষায় ছিল না। তা’বলে কি আমাদের মধ্যে কিছুই হত না? হত তো, আমরা দুজনেই কিভাবে যেন টের পেতুম আজ ‘হওয়ার’ দিন আছে, দুজনেই ঘেঁষে আসতুম, সচেতন উদ্যম ছাড়াই অন্ধকারে আমাদের অভিসাররথ নিজেনিজেই যাত্রাপথ তৈরী করে নিত।


আমার জন্যে ওঁর একটা সর্বব্যাপ্ত আর সহজাত স্নেহ, প্রতিক্ষণে টের পেতুম মানুষটা আমাকে মুড়ে রাখতে চায়, দিতে চায় সার্বিক নিরাপত্তা। আমার ছোটখাটো অসুবিধে নিয়ে তাঁর মাথাব্যথা (অথচ বড় জিনিসগুলোর খেয়াল নেই!) আর এই নরম রক্ষাকর্তার ভূমিকাতেই তিনি আমার মনে চরম ভয় জাগাতেন। একপৃথিবী আত্মীয়-বন্ধু, সমাজ-সংসার, ছোটবেলা ছেড়ে এসেছি যে একটিমাত্র মানুষের কাছে থাকার জন্যে, তাঁকে হারানোর, আঘাত করার, দূরে সরানোর ভয় আমাকে সবসময়ে তাড়িয়ে বেড়াত। এই নিরাপত্তাহীনতার ভয়ের নিরাপত্তাহীনতা আমার ভেতরে জন্ম দিয়েছিল এক বিষাদের, আরো তীব্র, তীক্ষ্ণ করে তুলেছিল আমার একাকিত্বকে। আমি সবসময়ে সচেষ্ট থাকতুম, সম্পর্কের নতুন কোনও মাত্রা আবিষ্কার বা উপভোগ করতে না পারি, এমনকিছু আমার করা চলবে না যাতে এই মানুষটা কষ্ট পেতে পারে। বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাটুকুকেও রুখতে আঁকড়ে ধরার মত অনেককিছুকেই দূরে সরিয়ে রেখেছিলুম!


জানেন, প্রতিবছর আমরা নিয়ম করে দু’বার বেড়াতে যেতুম। সমুদ্রসৈকতের হৈচৈতে, বা নদীকূলবর্তী ভ্রমণকেন্দ্রে, মাঝেসাঝে কোনও পাহাড়ে আমরা কাটিয়ে আসতুম কটা দিন। দেশের প্রায় প্রত্যেকটি রাজ্যেই আমরা গিয়েছি, মন্দির-স্থাপত্য-দুর্গ-মহানগরী-যাদুঘর আমরা কোটি-কোটি বৈশিষ্ট্যহীন ভ্রামণিকের মতই দেখেছি, সামনাসামনি দেখার উচ্ছ্বাস স্মৃতিতে কিছু দাগ রেখেছে বটে, কিন্তু আমাদের সম্পর্ককে নিবিড় করে তোলে নি। বড় সাধ ছিল কোনো নির্জন বনবাংলোতে কটা দিন কাটাবো, যেখানে তখন আমরা ছাড়া কেউ নেই, আদিম হব দুজনে, বিয়ের আগে ভেবেছিলুম যেসব হরকৎ-কসরৎ, প্রকৃতির সান্নিধ্যে সেগুলো নিয়ে মেতে কয়েকটা দিন এমনভাবে কাটিয়ে আসবো যে ফিরে এসেও আমাদের সম্পর্কে থাকবে কিছু বিদ্যুৎঝলক, যা আমাদের প্রতিদিনের জীবনকে দেবে আরেকটু নিবিড়তা। এখন দেখি, অ্যালবামে ধরা পড়া শুধু ঢেউ-স্রোত-গাছপালা-মিনার-সৌধ-প্রত্ননিদর্শন, আমি মানুষটা অদৃশ্য। লাইব্রেরিয়ান মহোদয় প্রত্যেকবার এই ছবিগুলোর মধ্যে থেকেই কেন একটা-দুটো ছবি আলাদা করে অন্য একটা আলবামে সাজিয়ে রাখতেন, আজো বুঝি নি।


বেড়াতে যাওয়ার মাঝের সপ্তাহগুলো আমরা সকালে উঠতুম, দুজনে মিলে জলখাবার তৈরী করতুম আর খেতুম একসঙ্গে, তারপর যে যার অফিসের জন্যে বেরিয়ে পড়তুম। ক্বচিৎ তাঁর আমার আগে ছুটি হ’লে তিনি আমার আপিসের সামনে অপেক্ষা করতেন, দু’হাতে দুটো ভেলপুরির ঠোঙা নিয়ে। ব্যস, ঐটুকুই। তারপরে বাড়ি ফিরে সেই রান্না করা, খাওয়াদাওয়া’র মাঝে টুকটাক কথাবার্তা, খাওয়া শেষ হলেই দু’জনে দুটো বই নিয়ে নিঃশব্দে নিজেদের পড়ার জগতে ঢুকে পড়া। ঠিক এগারটায় ওঁর ঘড়িতে রাতের অ্যালার্ম বাজতো, উনি সেটা বন্ধ করে মুখেচোখে জল দিয়ে বিছানায় শুতে আসতেন। আমার অবশ্য পড়া অত সময় মেনে শেষ হত না। ভালো না লাগলে আমি সাড়ে নটাতেও আলো নিভিয়ে শুয়ে একলা ছটফট করেছি, আবার পাঠ্যবইটির প্রসাদগুণে রাত দেড়টা অব্দি আলো জ্বালিয়েও গোগ্রাসে ছাইপাঁশ গিলেছি। ওঁর তাতে ঘুমের কোনও ব্যাঘাত হত না। যেদিন ফেরোমোন বা টেলিপ্যাথি কিছু একটা থেকে জানতুম, আজ রাতে কিছু ‘হওয়ার’ আছে, সেদিন একসঙ্গে পড়া সাঙ্গ হতো, দুজনে জন্মদিনের পোষাকে একে অপরকে আঁকড়ে ধরতুম, দুজনেরই দীর্ঘশ্বাসে বিষাদ মিশে থাকত অনেকটা করে, কেন কে জানে! জৈবিক যা কিছু হতো, তা দৈবিক না হলেও আধা বেহুঁশে, মাঝরাতে, ঘুমের ঘোরে, স্বপ্নের শুরুতে এমনভাবে মিশে যেত, যে কোনটা ঘটেছিল, আর কোনটা ভেবেছি, স্পষ্ট ফারাক মনে পড়ত না পরদিন সকালে।


খারাপ খবরটা পেলুম ওঁকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়ার দু’দিন পরে। পাকস্থলীর ক্যান্সার, তৃতীয় স্টেজ।


“কুসুম” উনি বাড়ি এসে ভাবলেশহীন গলায় বললেন, “ডাক্তাররা বলছে বটে কেমোথেরাপি করালে আমি এখনো এক বছর বাঁচবো, কিন্তু আমার মন বলছে, একবার ওদের পাল্লায় পড়লে আমার মেয়াদ আর তিন মাসের বেশি নয়। আমি হিমালয়ের একটা আয়ুর্বেদ চিকিৎসাকেন্দ্রের খোঁজ পেয়েছি, ওখান থেকে একবার ঘুরে আসি, তুমি আমাকে পনেরোটা দিন সময় দাও, তাতে আমি হান্ড্রেড পার্সেন্ট রোগমুক্ত হয়ে ফিরে না এলে এসব তো রইলোই।”


আমি তখনো দুঃসংবাদের অভিঘাতে অস্থির, তাছাড়া কোনদিন তো এইসব রোগ, রোগী, চিকিৎসা, হাসপাতাল নিয়ে সেরকম বিপদে পড়তে হয় নি, তাই খুব শক্তভাবে সেই উদ্ভট পরিকল্পনাটাকে উড়িয়ে দিতে পারলুম না তক্ষুণি। আর যাদুকররা যেমন টুপি থেকে খরগোস বের করে, অনেকটা অবিকল সেই ভঙ্গিমায় তিনি নিজের ফতুয়ার পকেট থেকে একটা ট্রেনের টিকিট আমার সামনে মেলে ধরলেন, আর তাঁর গলায় একটা আকুতি ফুটে উঠল, “তুমি যদি একবারও না বলো কুসুম, তাহলে আমার আমার এই যাওয়া সফল হবে না! … তুমি কোন চিন্তা কোরো না, তুমি চাকরি থেকে রিটায়ার করতে করতে আমি ক্যান্সারকে বিসর্জন দিয়ে তোমার কাছেই ফিরে আসবো।”


জামাকাপড় গুছোতে তাঁর আধঘন্টার বেশি সময় লাগল না, সন্ধ্যেবেলা আমরা স্টেশ্যনের কাছে একটা বড় ধাবাতে নৈশভোজ সারলুম, আমরা দুজনে প্রথা ভেঙে রাতের বেলাও মাংস খেলুম। এখানে ওঁর শেষরজনীতে আমার হাতের রান্না আর ওঁর খাওয়া হলো না। এতগুলো বছরের নিত্যিনিশির রান্নায় আমার তরফ থেকে যে দিনগত পাপক্ষয়ের অযত্ন চুইয়ে ঢুকে পড়েছিল, তা শোধরানো আর হল না আমার। তারপর তিনি ট্রেনে উঠে আমাকে চিরকালের জন্যে ফেলে রেখে চলে গেলেন। এবার আমি একলা হলুম আরেকভাবে, অনেক বেশি আক্ষরিক অর্থে, চিরতরে। এখন খুব ইচ্ছে করে জানেন, ওঁর জন্যে যত্ন করে ওঁর প্রিয় পদগুলো আবার রান্না করি। ওঁর শেষ খবর যবে থেকে পেয়েছি, তবে থেকে আর আলাদা করে রাতের রান্না করি না। সারাদিনে একবার চাল-ডাল একসঙ্গে ফুটিয়ে নিই, তাতে অন্যমনস্কভাবে একেকদিন একেকরকম মশলা চিমটিখানেক ফেলে দিই ফুটন্ত হাড়িতে, সেটাই কয়েক হাতা করে খাই এক বা দু’বার, বেশির ভাগটাই ফেলে দিই পরের দিন। এটা করে আমার সন্ধ্যেগুলো আরো ফাঁকা, বিবর্ণ হতে পেরেছে। আরো একলা হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে আমার নিঃসঙ্গতাকে। এই বেঁচে থাকা, যেখানে আমার বিচ্ছেদব্যথার সঙ্গে প্রতি মুহুর্তের সহচর এক অকথ্য সন্দেহ, আমার জীবনকে সত্যিই দুর্বিষহ করে তুলেছে।


আমার স্বামী এই অকালসফরে যাওয়ার পরে প্রথম কদিন আমি নিজেকে চূড়ান্ত ব্যস্ত রেখেছিলুম। অফিসে অ্যাসিস্ট্যান্ট মাস্টার নীরবসাহেবকে কাজ বোঝাচ্ছি, নিজের আর কিষেণের কাজ সামলাচ্ছি, আর ফাঁকেফাঁকে মারণরোগ নিয়ে পড়াশুনো করছি। খোঁজ নিচ্ছি চিকিৎসা-পদ্ধতি আর চিকিৎসকদের নিয়ে। তখনই মনে কু ডাকছিল যে পনেরোদিন দেরী করাটার চড়া দাম দিতে হবে। এদিকে উনি কল করতে বারণ করেছেন, শুধু মেসেজিং ভরসা। ওঁকে বকাবকি করে চলে আসতেও বলতে পারছি না, পুরোপুরি নিঃসংশয়ে। দু-একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট ফোনেই জোগাড় করার উপক্রম দেখছিলুম, কিন্তু যেই তারা শোনে যে রোগী আমার সঙ্গে নেই, আর কবে হিমালয় থেকে নামবে তাও নিশ্চিত নয়, অমনি তারা কথাবার্তা থামিয়ে দেয়। এদিকে আমি এইসব আলোচনা করছি যথাসাধ্য সঙ্গোপণে, আত্মীয় তো আমাদের কেউই ছিলো না কোনদিন, পরিচিত বা প্রতিবেশীদের যাদের সঙ্গে এতদিনেও সখ্য নিতান্তই আলগা-আলগা, তাঁদের মেকী সহানুভূতি, যা আমরা সারাজীবন দূরে-দূরেই রাখতে পছন্দ করেছি, সেসবের যতদূর সম্ভব ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে। তখনও কি জানতুম আমার চল্লিশ বছরের বরটি এইরকম কাপুরুষ! আমি তো আসলে ভুলেই গিয়েছিলুম আত্মহত্যার পাপ ওর রক্তে, মা’র কাছ থেকে পাওয়া স্বভাব আর যাবে কোথায়! মাঝখান থেকে শুধু আমার জন্যই এক সন্দেহের বীজ রেখে গেল বাকী জীবনের জন্য।


আমার ফোন করা বারণ ছিল বটে, কিন্তু ওঁর তো এসব কোন বারণ-বাধা-বিধিনিষেধ কোনকালে ছিল না! শেষ দুদিন উনি খুব ঘনঘন ফোন করছিলেন, মেসেজ পাঠাচ্ছিলেন, কোথাও যেন একটা স্বভাববিরুদ্ধ উচ্ছলতা ফুটে উঠছিল ওঁর মধ্যে। আমি চিকিৎসা-ডাক্তার নিয়ে যতবারই আলোচনা করতে চাইলুম, উনি সব মন দিয়ে শুনলেন, প্রশ্ন করলেন, তারপরে বললেন, “প্ল্যানটা ঠিকই করেছ কুসুম, তবে আমি গিয়ে তারপরে টাকা-পয়সা পেমেন্ট করবো।” আমিও, তা হোক না যতই পোস্টাফিসের কেরাণী, তো ত্রিশ বছরের ওপরে চাকরী করেছি, আমি কি এই খরচটা দিতে পারি না! কিন্তু উনি কিছুতেই রাজি হলেন না, সেই এক কথা, “না কুসুম, পুরো বিশ্বাস না থাকলে এই আধ্যাত্মিক পথে আরোগ্য হয় না। আমি ফেরার আগে তুমি কোনো ডাক্তার বা হাসপাতালকে পয়সা দিও না।” আমি কি তখনও একবারও বুঝেছি ওঁর আসল মতলবটা কী? এর মধ্যে তিনি স্মার্টফোনে ওঁর সেই আশ্রমের পাশের পাহাড়, নদী - এসবের ছবি পাঠাতে শুরু করলেন। সেগুলোর কোনটাতেই ঘরবাড়ি, হাসপাতাল, যোগী, চিকিৎসক কেউ নেই, কিছু নেই, শুধুই সুন্দর, সমাহিত, শান্ত প্রকৃতি। আমি বেশ কয়েকবার জানতে চাইলুম, চিকিৎসা বা নিরাময়ের কতদূর কী হলো, দেখলুম উনি প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাচ্ছেন।


এরপরে ওঁর কাছে ওঁর সেই বোনঝি তরলা’র কথা শুনলুম, যে নাকি ওঁর আশ্রম থেকে মাত্র আধঘন্টার দূরত্বেই থাকে। সন্ধ্যেবেলা একটা ছবি পাঠালেন, সেখানে এই কদিনে প্রথমবার ওঁর মুখ দেখতে পেলুম আর দেখলুম সেই মেয়েটির মুখ, যে মুখ এ জীবনে না দেখলেই বোধ করি বেশি ভালো ছিল!


মেসেজ করে জানতে চাইলুম, “এই কি তরলা?”


উনি জবাবে শুধু একটা হাসি-হাসি স্মাইলি পাঠালেন। দুজনের মুখের কী আশ্চর্য মিল! হঠাৎ আমার এই মারণ রোগাক্রান্ত মানুষটাকে খুব ভালবাসতে ইচ্ছে করল, ভালবাসি জানাতে ইচ্ছে করল। মনে হল, কেন উনি আমার কাছে নেই! আমি নির্লজ্জের মত ওঁকে মেসেজ করলুম, “আই লাভ ইয়ু!” সে মেসেজে পাঠ করার দুটি নীল টিক ফুটে উঠল। তারপর, সব চুপ … পরের দু’দিন কোনও মেসেজ, কল, অন্য ফোন থেকে ওঁকে ফোন বা যোগাযোগ করার চেষ্টা - সব বিফলে গেল।


পুলিশের পক্ষ থেকে তৃতীয়দিন ফোনটা এসেছিল সন্ধ্যে ৬টা ৪৭ মিনিটে। কেজো গলায় আমার পরিচিতি নিশ্চিত করার পরে নিরাবেগ কণ্ঠে আমার স্বামীর পাহাড়ী নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করার খবর জানিয়ে শব মর্গ থেকে সংগ্রহ করার নিয়মকানুন জানিয়ে তারা ফোনটি কেটে দেয়। আমাকে অবশ্য তাঁর নিষ্প্রাণ দেহটি হিমালয় থেকে আবাহন করে আমাদের শহরে আনতে হয় নি। তরলা, ওর মামাতো ভাই সুমিত, সুমিতের বাবা-মা সেই কাপুরুষটার পোস্টমর্টেম করা দেহাবশেষ নিয়ে আমার কাছে হাজির হয়েছিলেন। “আই লাভ ইয়ু” বলার পাওনা-দেনা তো এভাবেই মেটায় চল্লিশ বছরের থাকা ও না-থাকা সম্পর্ক!


অশৌচের সময়টা তরলা আমার এই দেড়কামরার ঘরে রইলো। সুমিতরা সামলালো সমস্ত আয়োজন। আমি বারবার ওদের মুখ দেখছিলুম, আর ভাবছিলুম, ওঁর মুখের সঙ্গে ওদের দুজনেরই কী প্রচন্ড সাদৃশ্য রয়েছে। বিশেষ করে তরলা’র মুখ তো কেটে বসান যেন। আচ্ছা, এতটাই মুখের মিল কি কাকা বা মামাদের সঙ্গে কারুর হয়?


উনি গবেষণার জন্য দেহদান করে গিয়েছিলেন, কিন্তু পুলিশের ছুরিকাঁচি সে সম্ভাবনাকে রদ করেছিল। তবে নিজের অদ্ভুত শেষ ইচ্ছেটুকু উনি একজন লাইব্রেরিয়ানের দক্ষতায় এমনভাবে লিপিবদ্ধ করে গিয়েছিলেন, সেগুলোকে এড়ানোর পন্থা কারো জানা ছিল না। জীবনের শেষ ঝাঁপ দেওয়ার সময়েও তাঁর শরীরে শক্ত করে আটকানো ছিল একটা প্লাস্টিকের চেনবন্ধ বটুয়া, যাতে ছিল ওঁর ভোটার আই-কার্ডের প্রতিলিপি, আত্মহত্যা করার কারণ (সেই রবিবারের এক মাস আগে থেকে তিনি জানতেন এই রোগ তাঁর শরীরে বাসা বেঁধেছে ও কতটা বিস্তার লাভ করেছে, অথচ পাশে শুয়েও আমি কোনদিন তা টেরও পাই নি।), আমার এবং সুমিতের যোগাযোগের নম্বর ও কীভাবে ওঁর শেষ ইচ্ছালিপিখানি খুঁজে পাওয়া যাবে । ঐ একই পাউচে ছিল তাঁর স্মার্ট ফোনটাও। এবং কী আশ্চর্য! যে আছাড়ে একটা মানুষের প্রাণ চলে গেল, সেই পতন এবং দীর্ঘক্ষণ জলের মধ্যে থেকেও সেটাও প্রায় অক্ষতই ছিল। চার্জে বসানো থাকা অবস্থায় ছুঁলে সেটা এখন একটু শক দেয় বটে, কিন্তু যে শক জীবন আমাকে দিয়েছে, সে তুলনায় এ আর কী! এখনও সেখানে আমাদের দুজনের সব বার্তালাপ পড়া যায় ইচ্ছে করলেই।


ওঁর শেষ ইচ্ছালিপি যখন আমাদের বাড়ির দেরাজ থেকে বের করে পড়া হচ্ছে, তখন আমার অস্বস্তি আরো বাড়লো। উনি প্রত্যাশা করেছেন তরলা তাঁর অন্ত্যেষ্টিতে যোগ দেবে, সেটা অবশ্য দুই কাজিনে না জেনেই করেছিল। এই চিঠিতেই আমার জন্যে রাখা ছিল ওঁর শেষ উপরোধ! সেটা পড়ার পরে, বিশ্বাস করুন, আমার যেটুকু জিজীবিষা বাকী ছিল, চলে গিয়েছে। উনি বলেছেন, যদি ওঁর শেষকৃত্যে তরলা আসে, তাহলে আমি, যদি ইচ্ছে করি, তাহলে সেই সোনার বালাদুটো তরলাকে দিতে পারি। আমি কেন সেই আদেশ অমান্য করতে যাবো। ও জিনিশ তো চার দশকে দু’বার পরেছি, একবার ওঁর চাকরীজীবনের রৌপ্যজয়ন্তীপূর্তির সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানে, আর একবার সেই সাহসিকতার জন্যে পুরষ্কার দেওয়ার বেলায়। হুহ! সাহসিকতা! তখন কে জানত, লোকটা একটা ভিতুর ডিম, ঠিক ওর মায়েরই মত! শ্রাদ্ধের দিন ওঁদের দিকের আত্মীয়স্বজন, ওঁর প্রাক্তন সহকর্মী, আমার (বর্তমান, না প্রাক্তন, এখনও জানি না, আমার অবসরের কাগজপত্র, সইসাবুদ এখনও সব ঝুলে আছে) সহকর্মীদের সামনে আমি সেটা তরলার জন্যে তুলে দিয়েছি সুমিতের মা’র হাতে। তরলা কেঁদে আকূল হচ্ছিল, আর ওর কান্নায় ভিজে যাওয়া, ভেঙে চুরমার হতে থাকা মুখে আমি স্পষ্ট হয়ে উঠতে দেখছিলুম আমার স্বার্থপর পতিটিকে, এই দীর্ঘ চার দশকে যে কর্কটরোগ, সমস্ত কান্না ছাড়াও আমার থেকে না জানি আর কীকী লুকিয়ে রেখেছে! তাঁকে আমি কোনদিন কাঁদতে দেখি নি তো! পুরুষমানুষ! সাহসী পুরুষমানুষ!


তরলা ওর ফোনে দেখিয়েছে, ওঁদের দুজনের একসঙ্গে তোলা একটা ছবি। মৃত্যুর তিনদিন আগে তোলা। যে পাহাড় থেকে ঐ কাপুরুষটা ঝাঁপ দিয়েছিল, তার কাছের একটা সরাইয়ে দুজনে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। উনি আমাকে যে ছবিটা পাঠিয়েছিলেন, সেটার সেই একই পোষাক সে এখানেও পরে আছে। পেছনে একই নদীর দুর্দ্ধর্ষ পশ্চাদপট। তরলা’র কথা অনুযায়ী, উনি ওকে ডেকেছিলেন এই বলে যে ‘তোর কলেজের কাছাকাছি আসছি, অমুকদিন সন্ধ্যেবেলা তুই ফাঁকা থাকলে এসে দেখা করিস, কফি খাওয়া যাবে, আর তুই চাইলে আমাদের একসঙ্গে কয়েকটা ছবিও তোলা থাকবে!’ অবিশ্বাস করি নি সে কথা, কিন্তু বড় ধাক্কা লেগেছে, যখন জেনেছি এর আগে ওঁদের দুজনের আরো একবার দেখা হয়েছিল বছরখানেক আগে, নাকি নেহাৎই ঘটনাচক্রে, যখন নিজেদের কলেজের হয়ে তরলা এসেছিল ওঁদের কলেজে একটি সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে।


জানি, মৃত্যু অনেক কিছু মুছিয়ে দেয়, অনেক প্রশ্ন যা ছিল জ্বলন্ত জীবৎকালে, তাকে করে দেয় গুরুত্বহীন, পছন্দের না হলেও অশান্ত, বিক্ষুব্ধ , সন্দিগ্ধ হৃদয়ে ও সম্পর্কের ওপর অনেক সময়েই চাপিয়ে দেয় এক চরম অন্ত, যার বিরুদ্ধে আর কোন আবেদন-নিবেদনেই আর কোন কাজ হওয়ার নয়। কিন্তু যখন মৃত্যু থেকেই জন্ম নেয় সন্দেহ, তখন জীবিত মানুষগুলোর দুর্বিষহ জ্বালা অপনোদনের আর কোনই উপায় থাকে না। ঐ ভিতুটা ঐ কাজটা কেন করেছিল, তার যুক্তিগ্রাহ্য কোন কারণ খুঁজে না পেলেও আমি নিজেকে এই বলে সান্ত্বনা দিই যে যার মা বিংশ শতাব্দীতেও সতীর মৃত্যুবরণে গৌরব পান, তার রক্তেই আছে কাপুরুষতার বীজ, সে না পালিয়ে যাবে কোথায়! কিন্তু তরলা?


এত মুখের মিল, আমার যদি একটা মেয়ে আজ থাকত! তরলাকে দেখার পর থেকেই আমার মনে কুটকুট করা শুরু করেছে। ধরে নিই, যদি ধরে নিই, মাতাপিতৃহীন তরলা নিছকই ওঁর ভাগ্নি নয়, তরলা ওঁর …


এই অনুমানটা বোধহয় ওঁর গত একবছরের অনেক বিদঘুটে আচরণকে চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করে ফেলতে পারে, তাই না! এ এক অদ্ভুত চিন্তা, যা আমি বুঝে ফেলেছি বাকী জীবন আমাকে তাড়া করে বেড়াবে, কুরে কুরে খাবে! সবচেয়ে বড় কথা, এই ভাবনাটা আমি কারো সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারবো না, কারো কাছে চাইতে পারবো না সহানুভূতি বা যৌক্তিক বিশ্লেষণ বা প্রতিকার, কারণ যে একটামাত্র মানুষকে অবলম্বন করে, যাকে সর্বতোভাবে বিশ্বাস করে সমস্ত সামাজিক সম্পর্ককে উপেক্ষা করে গেছি গত চারদশক, সেই লোকটাই আমাকে এই সন্দেহের মধ্যে ডুবিয়েছে। ভিতু! কাপুরুষ! সতীর বাচ্চা!


একা হওয়ার রকমফের আছে। সমস্ত পরিবার, আত্মীয়বন্ধু-চ্যুত হয়ে জীবননির্বাহ করার অভিজ্ঞতা তো আমার কমদিনের নয়। সামান্য সময়ের জন্য হলেও উনি যখন অসুস্থ কিন্তু জীবিত ছিলেন, তখনও অনুভব করেছি এক ভিন্ন ধরণের একাকিত্ব ও অসহায়তা। কিন্তু এই সন্দেহদীর্ণ যাপন অসহনীয়।


মিথ্যে বলবো না, তরলা আর ওর পিসি-কাকিরা আমার নিয়মিত খোঁজ রাখে। রোজকার স্বাচ্ছন্দ্যের খোঁজখবর নেয়, বারবার অনুরোধ করে একবার, অন্ততঃ একবার, ওদের সেই পারিবারিক ভিটেতে গিয়ে দাঁড়িয়ে ওদের ক্ষমা চাইবার সুযোগ করে দিতে। এমনকী তরলা এও বলেছিল, যদি আমি ফিরতে চাই আমার বেড়ে ওঠার সেই গঞ্জশহরটিতে, কাটাতে চাই বাকী দিনগুলো, আমার জন্যে ছোট একটা একতলা বাড়িও নাকি দেখে রেখেছে ওরা, আমার স্বাধীনভাবে থাকবার জন্যে। ভেবেছিলুম জানতে চাইবো ওদের কীসের গরজ আমাকে নিয়ে? কিন্তু সে প্রশ্ন করার আগেই তরলা উপযাচক হয়ে উত্তর দিয়েছে, “তোমার সম্পত্তির লোভে এমনটা করছি মনে হলে আমাকে বিদেয় করে দিয়ো! কিন্তু ঐ একটা সন্ধ্যের আলাপে মামা আমাকে নতুন একরকম শান্তি দিয়ে গিয়েছে মাইমা!”


“শান্তি”? “নতুন শান্তি”? “একরকম নতুন শান্তি”? শব্দেরা মাঝে মাঝে কী অসম্ভব ধারালো হয়, তাই না? এত ভালো মেয়েটা! অথচ তাকে ভালো বাসতেও পারছি না মন খুলে এই দুঃসময়ে!


ইচ্ছে করে, সময়ের কাঁটা উল্টোদিকে ঘুরিয়ে দেখি আমার মন থেকে এই কাঁটাটা উপড়ে ফেলতে পারি কিনা! সেই ধুসর, উষর, একঘেয়ে, ক্লান্তিকর প্রাত্যহিকতাকে কোনওমতে একবার, আরেকটিবার ফিরিয়ে আনা যায় যদি, যেখানে প্রতিমুহূর্তে আমাকে অবাস্তবপ্রায় সন্দেহে জর্জরিত হতে হতো না। কখনো নিজেকে শাসন করার চেষ্টা করি এই বলে যে এগুলো সবই অমূলক দুর্ভাবনা, আর তখন এক অপরাধবোধ আমাকে গ্রাস করে। কে জানে, যদি লোভে পড়ে ঐ “আই লাভ ইয়ু”টুকু না লিখতুম, হয়তো আজ জীবনটা এমন হতো না। আমাদের চল্লিশ বছরের ভালোবাসা, না-বাসার দিনগুলো তো এভাবেই কেটে গেলো, এর আগে শেষবার মুখ ফুটে প্রকাশ করেছিলুম সেই একদিনই মাত্র, যেদিন তিনি আমাকে বিয়ে করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তারপরেই আবার মনে হয়, কে জানে চল্লিশ বছর যে জীবন কাটিয়েছি, তা হয়তো ধোঁকার টাটিই ছিল! পুরুষমানুষ, দিনের শেষে তো পুরুষমানুষই।


আমার জীবনের বাকি দিনগুলো নিয়ে আমার আর কোন আগ্রহ নেই। নিজের অতীত জীবনেই যেখানে এরকম এক অসঙ্গতি, ভয়, নিরাপত্তাহীনতা, সবকিছুই প্রপঞ্চময়, সেখানে আমার বয়সে এসে ভবিষ্যৎ নিয়ে কীইবা ভাবি, বলুন! শুধু জানি, আমার বর্তমানটুকু থেকে আমি ছিটকে বেরোতে চাই, ছিঁড়ে ফেলতে চাই এই দৈনন্দিনকে। কী ভাববো, তা-ই আজকাল আমার মাথায় খেলে না।


ভগবান! আমাকে ঐ ভিতুটার সাহসটুকু দাও! হে ভগবান, আমাকে ঐ কাপুরুষটার কাছে পৌছনোর সম্বলটুকু দাও!

Comments

বিধিবদ্ধ স্বীকার্য :

লেখার বক্তব্যের দায়িত্ব লেখকের, পত্রিকার নয়। আমরা বহু মতের প্রকাশক মাত্র।

সাম্প্রতিক বাছাই

লেখা-আহ্বান-বিজ্ঞপ্তি : মুদ্রিত নবপ্রভাত বইমেলা ২০২৫

   মুদ্রিত  নবপ্রভাত  বইমেলা ২০২৫ সংখ্যার জন্য  লেখা-আহ্বান-বিজ্ঞপ্তি মুদ্রিত  নবপ্রভাত  বইমেলা ২০২৫ সংখ্যার জন্য  প্রবন্ধ-নিবন্ধ, মুক্তগদ্য, রম্যরচনা, ছোটগল্প, অণুগল্প, কবিতা ও ছড়া পাঠান।  যে-কোন বিষয়েই লেখা যাবে।  শব্দ বা লাইন সংখ্যার কড়াকড়ি বাঁধন  নেই। তবে ছোট লেখা পাঠানো ভালো,  তাতে অনেককেই সুযোগ দেওয়া যায়।  যেমন, কবিতা/ছড়া ১২-১৬ লাইনের মধ্যে, অণুগল্প/মুক্তগদ্য কমবেশি ৩০০/৩৫০শব্দে, গল্প/রম্যরচনা ৮০০-৯০০ শব্দে, প্রবন্ধ/নিবন্ধ ১৫০০-১৬০০ শব্দে। তবে এ বাঁধন 'অবশ্যমান্য' নয়।  সম্পূর্ণ অপ্রকাশিত লেখা পাঠাতে হবে। মনোনয়নের সুবিধার্থে একাধিক লেখা পাঠানো ভালো। তবে একই মেলেই দেবেন। একজন ব্যক্তি একান্ত প্রয়োজন ছাড়া একাধিক মেল করবেন না।  লেখা  মেলবডিতে টাইপ বা পেস্ট করে পাঠাবেন। word ফাইলে পাঠানো যেতে পারে। লেখার সঙ্গে দেবেন  নিজের নাম, ঠিকানা এবং ফোন ও whatsapp নম্বর। (ছবি দেওয়ার দরকার নেই।) ১) মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখবেন 'মুদ্রিত নবপ্রভাত বইমেলা সংখ্যা ২০২৬-এর জন্য'।  ২) বানানের দিকে বিশেষ নজর দেবেন। ৩) য...

প্রচ্ছদ ও সূচিপত্র ।। মাসিক নবপ্রভাত ওয়েবম্যাগ ।। ১০২তম সংখ্যা ।। ভাদ্র ১৪৩২ আগস্ট ২০২৬

সূ ~ চি ~প~ত্র ==================== প্রবন্ধ-নিবন্ধ-ফিচার-স্মৃতিকথা  আকাশের রহস্য থেকে বৈজ্ঞানিক বোধ: জ্যোতিষ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের সন্ধিক্ষণে ।। উৎপল সরকার সুকান্ত ভট্টাচার্য : কবিতার ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা এক তরুণ বিপ্লবী ।। তানভীর আহমেদ হৃদয় নারী জাগরণের দিশারী বেগম রোকেয়া ।। আবু রাইহান জীবনানন্দ দাশ: বাংলার নিসর্গে যে কবি রেখে গেছেন বিষণ্ণ আলোর দাগ ।। শিকদার বাসির   স্থানীয়  কিছু কথ্যশব্দ, উচ্চারণ, বাগ্‌ধারা ইত্যাদি ।। অরবিন্দ পুরকাইত আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও গোলামির ভয়ংকর ফাঁদ…।। আবদুল্লা আল আদীব সূত্র থেকে বৃহৎ ইতিহাস কার্লো গিনজবার্গ, মাইক্রোহিস্ট্রি জানার নতুন পদ্ধতি ।। শিবাশিস মুখার্জি ফ্রুক্টোজ এবং ক্যানসার বিস্তার ।। অনিন্দ্য পাল বিবেকের অভিষেকে মানবধর্মের নন্দনভূমি ।। মেশকাতুন নাহার জনাই আর মালদহের মনোহরা ।। সোনালী সরকার অতিরিক্ত সাবান মাখা কি স্বাস্থ্যকর ।। গৌতম সমাজদার ফুচকা থেরাপি ।। অরিন্দম পাল স্মৃতিকথা ।। হারানো ছাতা ।। সেখ নাজিরুল ইসলাম বিভিন্ন পত্রিকার লেখা-আহ্বান বিষয়ক ভাবনা ।। মাখনলাল প্রধান পুঁটুর স্মৃতিচারণা ।। মৌমিতা চ্যাটার্জী  দুরন্ত ও দুর্দান্ত শৈ...

উন্মুক্ত পাগলামি ।। আশরাফুল মণ্ডল

উন্মুক্ত পাগলামি আশরাফুল মণ্ডল আহা, অপরূপ নিজস্বতার দাহ! কুঁকড়ে যায় আবহমান, সজনে পাতার বোঁটায়! ভাপওঠা ভাতের কাছে মাছি সত্তায় কী নিপুণ! তবুও ঘোর লাগা বসন্তের ডাক, হাঁকে! খেদিয়ে দেয় পা দোলানো প্রস্তাব, ওই ধুনুরি চোখ! রাংতায় মোড়া ডাকের সাজ, দে দোল দোল! হুইসেল বাজিয়ে কে রুখে দ্যায় সেই নাকছাবির রুদালি কাঁপন! খালবিল ছেঁচে পাঁচসিকের  মানত কুড়িয়ে আনে, বাংলা বাজার। ঠ্যাং নাচানো সুরে চোখ মারছে, দ্যাখো ভ্যানতারা! মুখ খোলা মানেই পাঁজরের স্রোত ভাবা যেন উগরানো টালমাটাল! ঢিল মারা প্রশ্নের রোয়াকে বক্রচোখে যেন মেধাবী কবিতা! মুছে দিও তবে লাজুক গুপ্ত রোগ, দিনরাত্রি! ভালো থেকো তোমরা বাছাধন, রং মাস সে আর কতদিন... ================    ASRAFUL MANDAL Chandidas Avenue, B-zone, Durgapur, Paschim Bardhaman, Pin - 713205,  

কবিতাঃ চন্দন ঘোষ

এক টুকরো রুটি বস্তির রাস্তায় একটা বৃদ্ধ মানুষ সারাদিন বসে আছে। উত্তরে দেখে দক্ষিনে দেখে বহুদূর কেউ একটুকরো রুটি দিয়েযায় পাছে। চক্ষু কোটোরা গত শরীর মাস হীন, হাড় মাত্র। হয়তো স্বাধিনতা আন্দোলনের বিপ্লবী! হয়তো কলেজের আদর্শ ছাত্র। হয়তো ব্রিটিশ গোরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল  তার ছোট্টো ঝুঁপরির উপর। সে বাধা দিয়েছিল প্রতীবাদী হাতে। হয়তো পঙ্গু হয়েছিল সেই রাতে। আমি এক প্রশ্ন তুলেছিলাম, কেমনে হইল এ অবস্থা? বাক সরেনা মুখে সরকার কেন করেনা কোনো ব্যাবস্থা?? শরীর বস্ত্রহীন এই রাতে। নিম্নাঙ্গে একটা নোংগরা ধুতি। কী জানি কত দিন খায়নি? কত দিন দেখেনি এক টুকরো রুটি! রাজধানী শহরের আকাশটা দেখছে। দেখছে নেতা মন্ত্রী গন। হাইরে কেউতো তারে উঠিয়ে তোলেনি। দেখেনি কোনো কোমল মন। আজ ভারতবর্ষ উন্নতশীল রাষ্ট্র!   কথাটা অতীব মিথ্যা মাটি। এমন কতযে মানুষ ক্ষুদার্থ, দেখেনা এক টুকরো রুটি। নতুন মন্ত্রী, নতুন রাষ্ট্রপতি সবাই আসে সবার হয় আবর্তন। হাইরে পিছিয়ে পড়া মানুষ গুলো! তাদের হয়না কোনো পরিবর্তন। আজ 71 বছর আজাদ হয়েও  বোধহয় যে...

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও গোলামির ভয়ংকর ফাঁদ…।। আবদুল্লাহ আল আদীব

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও গোলামির ভয়ংকর ফাঁদ … আবদুল্লাহ আল আদীব     ক্ষমতা ও শোষণের ঐতিহাসিক বিবর্তন : প্রস্তরযুগ থেকে জ্ঞাননিয়ন্ত্রণের যুগ … মানবসভ্যতার ইতিহাসকে যদি একটিমাত্র প্রশ্ন দিয়ে পড়া যায় , তবে সেই প্রশ্নটি হতে পারে — ক্ষমতা কার হাতে এবং সেই ক্ষমতা কীভাবে ব্যবহৃত হয়েছে ? কৃষির আবির্ভাবের আগে মানুষের জীবন ছিল মূলত শিকার , সংগ্রহ ও পারস্পরিক সহযোগিতানির্ভর । কৃষির বিকাশের সঙ্গে জমি , উদ্বৃত্ত উৎপাদন ও সম্পত্তির ধারণা তৈরি হলো । সেখান থেকেই ধীরে ধীরে জন্ম নিল সামাজিক শ্রেণিবিভাগ , করব্যবস্থা , শ্রমের বিভাজন এবং রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব । ক্ষমতা আর কেবল শারীরিক শক্তির বিষয় রইল না ; তা হয়ে উঠল সম্পদ ও মানুষের ওপর নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা । প্রাচীন মিশর , সুমের , ব্যাবিলন , পারস্য , গ্রিস ও রোম — বিভিন্ন সভ্যতা তাদের নিজস্ব রাষ্ট্র ও সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিল । সাম্রাজ্যের বিস্তারের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুদ্ধ , দখল , কর ও শ্রমের নিয়ন্ত্রণ । বিজিত জনগোষ্ঠীর ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ...

ছোটগল্প ।। নীলিমার আত্মজাগরণ ।। পরেশ চন্দ্র মাহাত

নীলিমার আত্মজাগরণ পরেশ চন্দ্র মাহাত নীলিমা মাহাত, বয়স পঁচিশ প্লাস —তার বাবা মায়ের পঞ্চম তথা শেষ সন্তান। দুই দাদা —বড়দাদা শঙ্কর ও ছোটদাদা বিজয়। বড় দাদা শঙ্কর আর দুই দিদি তাদের কিন্তু বিয়ে হয়ে গেছে। একমাত্র নীলিমা আপাতত স্বামীর কোমল হাতের স্পর্শ ও সহানুভূতি থেকে বঞ্চিত এবং আদৌ কবে অথবা সেই সৌভাগ্য আসবে সেটা ঈশ্বরের নিকটই একমাত্র জ্ঞাত। সেই সঙ্গে দুবছরের সিনিয়র ছোটদাদা বিজয়েরও নীলিমার মতো অবস্থা। তারও জীবনসঙ্গিনী জুটেনি। মোট সাতজন সদস্য নিয়ে গঠিত সংসার নীলিমাদের পরিবার। মধ্যবিত্ত পরিবার —মধ্যবিত্ত পরিবার না বলে যদি নিম্নবিত্ত বলা হয় তবুও কোনো অত্যুক্তি করা হয় না। বাবার প্রত্যেকদিনের আয়ের উপর ভিত্তি করেই চলে সংসার। এই কঠোর এবং কঠিন পরিস্থিতিতেও নীলিমার মা শ্রীমতী মেনকা‚ সংসার সামলে তার ছেলেমেয়েদের পড়াশুনার প্রতি যথেষ্ট তৎপর ও সহানুভূতিশীল। তাদের পড়াশুনায় কোনো খামতি রাখেননি। যথা সময়ে তাদেরকে বিদ্যালয়ের মুখ দেখিয়েছে – টিউশনের বন্দোবস্ত করেছে। তাদের জীবন যাতে সুখকর হয় সেটাই প্রতিদিন ভগবানের কাছে প্রার্থনা করেছে। পাঁচ-পাঁচটি ছেলেমেয়ের মধ্যে সবাইকে উচ্চশিক্ষিত করে তোলা একপ...

পাশের বাড়ি ।। অরণ্যানী

পাশের বাড়ি অরণ্যানী পাশের বাড়িটি আজ নির্জন ও নিস্তব্ধ। শিশুর কলকাকলি আর ভেসে আসে না। কর্মব্যস্ত মায়ের কন্ঠস্বর শোনা যায় না। কিছু বৎসর পূর্বেও মা ও শিশুদের কলতান ও দস্যিপনায় ঘুম ভেঙে যেত সকালে। এখন বেলা পর্যন্ত ঘুমিয়ে থাকলেও কারুর কন্ঠস্বরে ঘুম ভাঙে না। উপরে বয়স্ক স্বামী স্ত্রীর গলার আওয়াজ বিশেষ পাওয়া যায় না। নীচের তলায় ছেলে বৌমা থাকত। যারা আজ কোথায় ভাড়া আছে কেউ জানে না।        আমার নীচের ঘরের শান্ত শীতল নির্জন পরিবেশ তখন মাঝে মধ্যেই অশান্ত হয়ে উঠত পাশের বাড়ির গোলমালে। অল্পবয়সী স্বামী স্ত্রী। তিনটি বাচ্চা। বড় মেয়েটিই তবু একটু বড়। কিশোরী বলা চলে। অল্পবয়সী বউটিকে সদা-সর্বদা হাসিখুশি ভাবে মানুষের সঙ্গে কথা বলতে শুনতাম। কখনোবা বেশ দক্ষতার সঙ্গে ছোট দুটি সন্তানকে সামলাতে দেখতাম। পাশাপাশি বাড়ি। দুই বাড়ির জানলা খুললে সবই দেখা যেত।          একদিন বউটির সঙ্গে আলাপ করলাম। তারপর থেকে মাঝে মধ্যে কথাবার্তা হতো। বউটির মুখেই শুনি, তাদের প্রেমের বিয়ে। আঠারো বছর বয়সে বিয়ে করে সিজার করে তিনটি সন্তান...

তিনটি কবিতা ।। নবনীতা রক্ষিত

 তিনটি কবিতা ।। নবনীতা রক্ষিত নবপ্রভাতের   আহ্বান রাতের   শেষে   ফুটল   ভোর , সোনার   রঙে   রাঙে   ঘোর।   শিশির ভেজা   ঘাসের   বুকে , সূর্য   হাসে   মিষ্টি   মুখে। পাখিরা   গায়   নতুন   গান , জেগে   ওঠে   সারা   প্রাণ। নদীর   জলে   রোদের   নাচ , মেঘের   গায়ে   আলোর   আঁচ। ফুলের   ডালে   মধুর   গন্ধ , মনটা   ভরে   আনন্দ। হাওয়া   বয়ে   আনে   সুখ , মুছে   দেয়   সব   দুঃখ। নতুন   দিনের   নতুন   ডাকে , স্বপ্ন   জাগে   হৃদয়   ফাঁকে। চলার   পথে   আশা   সাথি , সাহস   থাকে   প্রতি   রাতে। পরিশ্রমে   ফুটুক   ফুল , ভেঙে   যাক   সব   ভুল। ভোরের   আলো   বলে   তাই , জীবন   জয়   করবই।   বৃষ্টির   সুরে   বাংলা কালো   মেঘে   ঢাকে   আকাশ , বৃষ্টি   নামে   উচ্ছ্বাস। কদম...

কবিতা ।। মেঘের দেশে ভিজুক মন... ।। কাবেরী মিত্র

মেঘের দেশে ভিজুক মন... কাবেরী মিত্র  অন্ধকারে একলা ঘরে বসে আছি স্মৃতির জানলা খুলে, সোনালি সেই দিনগুলোকে ফিরে পেতে,  ও বৃষ্টি, আমি তোমায় চাই ছুঁতে। ও মেঘ, ও মেঘ, সেদিন যে কথা দিলে জানলার ওই শার্সি ছুঁয়ে আমায় তুমি নিয়ে যাবে — তোমার প্রিয় সঙ্গী করে। দেখব আমি বৃষ্টিগুলো কেমন করে ঝমঝমিয়ে — পড়ে বকুল ফুলের মাথার পরে, রামধনুরা কেমন করে আবির খেলে নীল আকাশকে রঙিন করে। কেমন করে বৃষ্টিফোঁটার তালে তালে পানকৌড়ি ডুবসাঁতারে খেলা করে গভীর জলের বুকের মাঝে, কেমন করে মেঘেরা লুকোচুরি খেলে ওই পাহাড়টাকে সাক্ষী রেখে। নিয়ে যাও মেঘ—ভিজুক আমার মন, আর কত রাখব ধরে কান্নাগুলো হৃদয় ভরে! আবার একবার ফিরতে চাই সেই মাতাল করা দিনগুলোতে। ...

সদা অন্যমনস্ক গোলকবাবু ।। দীপক পাল

সদা অন্যমনস্ক গোলকবাবু  দীপক পাল  গোলক বাবু প্রতিদিন সকাল ছটার সময় ঘুম থেকে ওঠেন একেবারে ঘড়ি ধরে ছটায় নয়, কোন কোন দিন সোয়া ছটা ও বেজে যায়। তারপর চোখ মুখ ধুয়ে নিজের জন্য চায়ের জল বসান। গিন্নী জয়া ওঠে দেরি করে। রাতে শুতেও যায় সে দেরি করে। কারণ কোনএকটা কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকে সে। তাই শুতেও তার দেরী উঠতেও দেরী। রান্নার লোক ও ঘর দোর পরিষ্কার করার লোক আছে। তারা ওরকিছু ফাই ফরমাসও খেটে দেয়। গোলক বাবু ওসব কিছুর ধার ধারেন না। তিনি কারো কাছে কিছু চান না। চা টা তিনি বেশ ভালইকরেন। বিকেলেও তিনি প্রায়সই করে থাকেন। গিন্নী তার করা চা ভালই খান। চায়ের কাপ আর বিস্কুটের কৌটো নিয়ে তিনি দক্ষিনের বারান্দায় এসে দাঁড়িয়ে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপে একটা স্নেহের চুমুক দিলেন। ইজি চেয়ারটা পাতাই ছিল। তিনি অতি সাবধানে চায়ের কাপটা মাটিতে রেখে কৌটো খুলে দুটো বিস্কুট বার করে কৌটো নামিয়ে চায়ের কাপটা তুলে নিলেন হাতে। গায়ে অবশ্য শাল জড়াতে তিনি ভোলেননি। যদিও নভেম্বর মাসের এখনও কটা দিন বাকি আছে। তাই একমাত্র রাত নটার পর এবং সকালের দিকটা বেশ ঠান্ডাঠান্ডা লাগে। গোলক বাবু এক গভর্নমেন্ট আন্ডারটেকিং অফিসে ...

জনপ্রিয় লেখা

সাহিত্যের মাটিতে এক বীজ : "ত্রয়ী কাব্য" -- সুনন্দ মন্ডল

সাহিত্যের মাটিতে এক বীজ -- "ত্রয়ী কাব্য" ------------------------------------------------------------------------------ সুনন্দ মন্ডল নবীনচন্দ্র সেন সাহিত্যে তথা বাংলা কবিতার জগতে এক অবিস্মরণীয় নাম। তিনি চট্টগ্রাম জেলার নওয়াপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ১৮৪৭ সালে তাঁর জন্ম এবং মত্যু ১৯০৯ সালে। বঙ্কিমচন্দ্র তাঁকে 'বাংলার বায়রন' বলেছেন। ‎জীবৎকালীন যুগে আত্মপ্রত্যয়ের মধ্যে জাতীয় চরিত্র আত্মস্থ করে নতুন সংস্কারে প্রয়াসী হয়ে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেছেন।মধুসূদন-হেমচন্দ্র-নবীনচন্দ্র--এই তিন কবি বাংলা কাব্যধারায় প্রাণ সঞ্চার করেছিলেন। বিশেষত মহাকাব্য লেখার দুঃসাহস দেখিয়েছিলেন। এদিক থেকে মধুসূদন দত্ত একজন সফল মহাকাব্যিক। তাঁর 'মেঘনাদ বধ' কাব্যের মত গভীর ও ব্যঞ্জনাময় না হলেও নবীনচন্দ্র সেনের 'ত্রয়ী' কাব্য বিশেষ মর্যাদা দাবি করতেই পারে। তাছাড়া 'ত্রয়ী' কাব্যে ধর্মীয় ভাবধারার আবেগ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ‎ ‎নবীনচন্দ্র সেন বহু কাব্য লিখেছেন। যেমন- 'অবকাশরঞ্জিনী','পলাশীর যুদ্ধ', 'ক্লিওপেট্রা', 'রঙ্গমতী', 'খ্রীষ্ট', ...

প্রবন্ধ ।। লুপ্ত ও লুপ্তপ্রায় গ্রামীণ জীবিকা ।। শ্রীজিৎ জানা

লুপ্ত ও লুপ্তপ্রায় গ্রামীণ জীবিকা শ্রীজিৎ জানা "সময় চলিয়া যায় নদীর স্রোতের প্রায়"। স্রোতের ধারা তার দু'প্রান্তে রেখে যায় ভাঙাগড়ার চিহ্ন। কালের দৃশ্যপটেও পরিবর্তনের ছবি অনিবার্যভাবেই চোখে পড়ে। সমাজ সময়ের ছাঁচে নিজেকে গড়ে নেয় প্রতিনিয়ত।  সেখানে মনে নেওয়ায় বাধা থাকলেও,মেনে নেওয়ার গাজোয়ারি চলে না। ফলত কাল বদলের গাণিতিক হিসেবে জীবন ও জীবিকার যে রদবদল,তাকেই বোধকরি সংগ্রাম বলা যায়। জীবন সংগ্রাম অথবা টিকে থাকার সংগ্রাম।  মানুষের জীবনযাপনের ক্ষেত্রে আজকে যা অত্যাবশ্যকীয় কাল তার বিকল্প রূপ পেতে পারে অথবা তা অনাবশ্যক হওয়াও স্বাভাবিক। সেক্ষেত্রে উক্ত বিষয়টির পরিষেবা দানকারী মানুষদের প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হওয়া অস্বাভাবিক নয়। এক কালে গাঁয়ে কত ধরনের পেশার মানুষদের চোখে পোড়তো। কোন পেশা ছিল সম্বৎসরের,আবার কোন পেশা এককালীন।  সব পেশার লোকেরাই কত নিষ্ঠা ভরে গাঁয়ে  তাদের পরিষেবা দিত। বিনিময়ে সামান্য আয় হত তাদের। আর সেই আয়টুকুই ছিল  তাদের সংসার নির্বাহের একমাত্র উপায়। কালে কালান্তরে সেই সব পেশা,সেই সব সমাজবন্ধুরা হারিয়ে গ্যাছে। শুধুমাত্র তারা বেঁচে আছে অগ্রজের গল্পকথায়,আর বিভিন...

গ্রন্থ আলোচনা: শর্মিষ্ঠা দেবনাথ

প্রতিবাদ যখন অগ্নিবাণী বাংলাদেশে নারীমুক্তি ও নারী আন্দোলনের পুরোধা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ১৯৯তম জন্মদিনের শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদিত হল " আসিফা এবং.." কাব্য সংকলনটির মধ্যদিয়ে।সংকলনটির বিশেষত্ব হল,এটি উৎসর্গ করা হয়েছে নারীর সম্মান রক্ষার আন্দোলনের যোগ্যতম ব্যক্তি শহীদ শিক্ষক বরুন বিশ্বাসকে। সংকলক প্রকাশক সন্দীপ সাহু নিজে এবং বিশিষ্ট কবি সাহিত্যিকদের দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছেন এমন কিছু কবিতা, যা শুধুমাত্র শব্দ ও ছন্দের অনুবন্ধ নয়, এক একটি অগ্নিবাণী।আসলে জীবনকে দেখার স্বাতন্ত্র‍্যে কবিরা সব সময়ই অগ্রগণ্য এবং অনন্য।যুগ ও জীবন দ্বন্দ্বের কণ্ঠস্বরকে আশ্রয় করে,একদিকে মনের প্রবল দাহ ও অন্যদিকে  নির্যাতিতা শিশুকন্যা ও নারীর প্রতি মনের গভীর আকুলতা থেকে প্রকাশ পেয়েছে "আসিফা এবং" এর  কবিতাগুলি।এক অন্ধকার সময়ের মুখোমুখি আমরা,সেই অন্ধকার আমাদের নিয়ে এসেছে সামাজিক অবক্ষয়ের শেষধাপে যেখানে নৈতিকতা,পাপবোধ,গ্লানিকে সরিয়ে রেখে, সমাজের বানানো নিয়মকে তোয়াক্কা না করে,অনায়াস দক্ষতায় ও ক্ষিপ্রতায় নিজেরই ধর্মচেতনাকে জলাঞ্জলি দিয়ে কিছু মানুষ তার পশুত্বের পরিচয় দিয়েছে ধর্ষণ ও ন...

লেখা-আহ্বান-বিজ্ঞপ্তি : মুদ্রিত নবপ্রভাত বইমেলা ২০২৫

   মুদ্রিত  নবপ্রভাত  বইমেলা ২০২৫ সংখ্যার জন্য  লেখা-আহ্বান-বিজ্ঞপ্তি মুদ্রিত  নবপ্রভাত  বইমেলা ২০২৫ সংখ্যার জন্য  প্রবন্ধ-নিবন্ধ, মুক্তগদ্য, রম্যরচনা, ছোটগল্প, অণুগল্প, কবিতা ও ছড়া পাঠান।  যে-কোন বিষয়েই লেখা যাবে।  শব্দ বা লাইন সংখ্যার কড়াকড়ি বাঁধন  নেই। তবে ছোট লেখা পাঠানো ভালো,  তাতে অনেককেই সুযোগ দেওয়া যায়।  যেমন, কবিতা/ছড়া ১২-১৬ লাইনের মধ্যে, অণুগল্প/মুক্তগদ্য কমবেশি ৩০০/৩৫০শব্দে, গল্প/রম্যরচনা ৮০০-৯০০ শব্দে, প্রবন্ধ/নিবন্ধ ১৫০০-১৬০০ শব্দে। তবে এ বাঁধন 'অবশ্যমান্য' নয়।  সম্পূর্ণ অপ্রকাশিত লেখা পাঠাতে হবে। মনোনয়নের সুবিধার্থে একাধিক লেখা পাঠানো ভালো। তবে একই মেলেই দেবেন। একজন ব্যক্তি একান্ত প্রয়োজন ছাড়া একাধিক মেল করবেন না।  লেখা  মেলবডিতে টাইপ বা পেস্ট করে পাঠাবেন। word ফাইলে পাঠানো যেতে পারে। লেখার সঙ্গে দেবেন  নিজের নাম, ঠিকানা এবং ফোন ও whatsapp নম্বর। (ছবি দেওয়ার দরকার নেই।) ১) মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখবেন 'মুদ্রিত নবপ্রভাত বইমেলা সংখ্যা ২০২৬-এর জন্য'।  ২) বানানের দিকে বিশেষ নজর দেবেন। ৩) য...

শ্যামাপদ মালাকারের কবিতা

চোখ """"""" নদী, অরণ্য, রাতের ফালি চাঁদ- সবেই তো আমার...স্বর্ণপিঁড়িটাও!। সেদিন, শুকতারাটার গা' মাপতে গিয়ে মনে হল, --ওরা আমার চেয়েও সুখী? দেখিনা একবার গাইতি-শাবল চালিয়ে... চালালাম। জল-মাটি ভেজা একটা 'চোখ' কুড়িয়ে ফিরলাম! সেই চোখদিয়ে দেখি-- শেষ বিকেলের নিরন্ন আঁচে ঝলসানো বুকে নীড়ে ফিরছে ধূলিমাখা কত কাল পা, কি শান্তি - কি তৃষ্ণা! পাতাক্ষোয়া কোদালেরর মাথায় ঝরেপড়া ললাটের ঘামে, কারা যেন জীবন শাণ দেয়! রুক্ষঠোঁটের আবরণে এক সময় নেমে আসে শিশিরস্নাত কালনিশি-- মাঝের ব্যবধান মুছে দেয় প্রতিশ্রুতির ভীড়- - পূর্বজনমের নিদর্শনচুম্বন শেষে হেরে যায় কার মমতাজ-- ম্লান হয়ে যায় কত পিঁড়ি! ... ম্লান হয়ে যায় কত পিঁড়ি! ... ম্লা...

ভৌতিক গল্প ।। পাঁচ ভূতের প্রতিশোধ ।। মিঠুন মুখার্জী

পাঁচ ভূতের প্রতিশোধ মিঠুন মুখার্জী  বহু বছর আগের এক ঘটনা। বর্ধমানের শক্তিগড়ের কাছেই সেই গ্ৰামটি। তখন জনসংখ্যা খুবই কম ছিল ।দুটি বাড়ির মধ্যে একশো গজ দূরত্ব। একজনের ঘরের খবর অন্যজন জানতে পারতেন না। গ্ৰামে কারেন্ট ছিল না। সন্ধ্যার পর সারা গ্ৰামের ঘরে ঘরে টেমি ও হ্যারিকেন জ্বলত। কারো বাড়িতে কোনো অনুষ্ঠান হলে হ্যাচাকলাইট জ্বালানো হতো। একটু সচ্ছল পরিবারে জেনারেটর ভাড়া নিতেন। কেউ মরে গেলে নদীর পাড়ে পুড়াতে যেত। সঙ্গে যাওয়ার জন্য খুব বেশি লোক পাওয়া যেত না। ঐ গ্ৰাম থেকে বাজারের দূরত্ব তিন কিলোমিটার হবে। বাজারে সন্ধ্যার পর জেনারেটরের লাইন ভাড়া নিয়ে সকলে লাইট জ্বালাত ও ফ্যান চালাত। বাজারে যাওয়ার সময় একটা বিরাট মাঠ পার হতে হত। যে মাঠের পুরোটা একজায়গায় দাঁড়িয়ে দেখা যেত না। গ্ৰামের মানুষেরা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করত, সন্ধ্যার পর এই মাঠে ভূতেদের আখরা বসে। তারা অনেকেই রাত্রি বেলা ওই মাঠে ভূতেদের দাঁড়িয়ে কখনো বসে জটলা পাকাতে দেখেছে। এই মাঠের উত্তর দিকে একটি বিশাল তেঁতুল গাছ ছিল। এই গাছ থেকেই ভূতেরা মাঠে নেমে আসত নিজেদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করার জন্য। তাদের আলোচনার বিষয়...

লেখা-আহ্বান-বিজ্ঞপ্তি : মুদ্রিত নবপ্রভাত বইমেলা ২০২৬

  লেখা-আহ্বান-বিজ্ঞপ্তি মুদ্রিত  নবপ্রভাত  বইমেলা ২০২৬ সংখ্যার জন্য  প্রবন্ধ-নিবন্ধ, মুক্তগদ্য, রম্যরচনা, ছোটগল্প, অণুগল্প, কবিতা ও ছড়া পাঠান।  যে-কোন বিষয়েই লেখা যাবে।  শব্দ বা লাইন সংখ্যার কড়াকড়ি বাঁধন  নেই। তবে ছোট লেখা পাঠালে  অনেককেই সুযোগ দেওয়া যায়।  যেমন, কবিতা/ছড়া ১২-১৬ লাইনের মধ্যে, অণুগল্প/মুক্তগদ্য কমবেশি ৩০০/৩৫০শব্দে, গল্প/রম্যরচনা ৮০০-৯০০ শব্দে, প্রবন্ধ/নিবন্ধ ১৫০০-১৬০০ শব্দে হলে ভালো। তবে এ বাঁধন 'অবশ্যমান্য' নয়।  সম্পূর্ণ অপ্রকাশিত লেখা পাঠাতে হবে। মনোনয়নের সুবিধার্থে একাধিক লেখা পাঠানো ভালো। তবে একই মেলেই দেবেন। একজন ব্যক্তি একান্ত প্রয়োজন ছাড়া একাধিক মেল করবেন না।  লেখা  মেলবডিতে টাইপ বা পেস্ট করে পাঠাবেন। word ফাইলে পাঠানো যেতে পারে। লেখার সঙ্গে দেবেন  নিজের নাম, ঠিকানা এবং ফোন ও whatsapp নম্বর। (ছবি দেওয়ার দরকার নেই।) ১) মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখবেন 'মুদ্রিত নবপ্রভাত বইমেলা সংখ্যা ২০২৬-এর জন্য'।  ২) বানানের দিকে বিশেষ নজর দেবেন। ৩) যতিচিহ্নের আগে স্পেস না দিয়ে পরে দেবেন। ৪) বিশেষ কোন চিহ্ন (যেমন @ # ...

কোচবিহারের রাস উৎসব ও রাসমেলা: এক ঐতিহ্যবাহী অধ্যায় ।। পার্থ সারথি চক্রবর্তী

  কোচবিহারের রাস উৎসব ও রাসমেলা : এক ঐতিহ্যবাহী অধ্যায়  পার্থ সারথি চক্রবর্তী  কথায় বলে বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ। রাজার শহর কোচবিহারের ক্ষেত্রে সংখ্যাটা আরো অনেক বেশি। দুর্গাপূজা আর দীপাবলির মতো দু'দুটো বিরাট মাপের উৎসবের রেশ কাটতে না কাটতেই, এ শহর ভাসে রাস উৎসবের উন্মাদনায়। মদনমোহন ঠাকুর কোচবিহারের প্রাণের ঠাকুর। তাঁকে নিয়ে সবার আবেগ আর শ্রদ্ধা ও ভালবাসা এখানে বাঁধনছাড়া। এক অপূর্ব মিলনোৎসবের চেহারা নেওয়া এই উৎসব ঐতিহ্যবাহী ও ঐতিহাসিক। জন, মত, সম্প্রদায়ের উর্ধে এই উৎসবের গ্রহণযোগ্যতা। সময়ের কষ্টি পাথরে পরীক্ষিত! এক প্রাণের উৎসব, যা বহুদিন ধরেই গোটা উত্তরবঙ্গের সর্ববৃহৎ উৎসবে পর্যবসিত।কোচবিহারের এই রাস উৎসবকে কেন্দ্র করে যে মেলা হয় তাও সময়ের হাত ধরে অনেক বদলে গেছে। এসেছে আধুনিকতার ছোঁয়া! শৈশবে বাবার হাত ধরে যে মেলা দেখেছি তা চরিত্র ও আকৃতি দু'দিক থেকেই বদলে গেছে। গত পঁচিশ বছর ধরে খুব কাছে থেকে এই উৎসব ও মেলা দেখা, অনুভব করার সুযোগ হয়েছে। যা দিনদিন অভিজ্ঞতা ও প্রাপ্তির ঝুলিকে সমৃদ্ধ করে গেছে প্রতি ক্ষেত্রেই।  খুব সংক্ষেপে এই উৎসবের ইতিহাস না জানাটা কিন্তু অবিচারই ...

মুদ্রিত নবপ্রভাত বইমেলা 2024 সংখ্যার জন্য লেখা-আহ্বান-বিজ্ঞপ্তি

লেখা-আহ্বান-বিজ্ঞপ্তি (লেখক ও সম্পাদকীয় দপ্তরের কথোপকথন আকারে) --কী পত্রিকা? --নবপ্রভাত। --মুদ্রিত না অনলাইন? --মুদ্রিত। --কোন সংখ্যা হবে এটা? --বইমেলা 2024। --কোন কোন ধরনের লেখা থাকবে? --প্রবন্ধ-নিবন্ধ, ছোটগল্প, অণুগল্প, কবিতা ও ছড়া। --বিশেষ কোন বিষয় আছে? --না। যে-কোন বিষয়েই লেখা যাবে। --শব্দ বা লাইন সংখ্যার কোন বাঁধন আছে? --না। নেই। তবে ছোট লেখা পাঠানো ভালো (যেমন, কবিতা 12-14 লাইনের মধ্যে, অণুগল্প কমবেশি 200/250শব্দে)। তাতে অনেককেই সুযোগ দেওয়া যায়। --ক'টি লেখা পাঠাতে হবে? --মনোনয়নের সুবিধার্থে একাধিক লেখা পাঠানো ভালো। --ফেসবুক বা অন্য কোন প্লাটফর্মে প্রকাশিত লেখা কি পাঠানো যাবে? --না। সম্পূর্ণ অপ্রকাশিত লেখা পাঠাতে হবে। --পত্রিকা কোন সময়ে প্রকাশিত হবে? --জানুয়ারি 2024-এর দ্বিতীয় সপ্তাহে। --লেখা পাঠানোর শেষতারিখ কত? -- 17 ডিসেম্বর 2023। --কীভাবে পাঠাতে হবে? --মেলবডিতে টাইপ বা পেস্ট করে পাঠাবেন। word ফাইলে পাঠানো যেতে পারে। --লেখার সঙ্গে কী কী দিতে হবে? --নিজের নাম, ঠিকানা এবং ফোন ও whatsapp নম্বর। (ছবি দেওয়ার দরকার নেই।) --বিশেষ সতর্কতা কিছু ? --১)মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখবেন '...

উৎসবের সৌন্দর্য: সেকালে ও একালে।। সৌরভ পুরকাইত

  উৎসবের সৌন্দর্য:  সেকালে ও একালে   সৌরভ পুরকাইত বাংলার উৎসব বাংলার প্রাণ। প্রতিদিনের জীবনযাপনের মধ্যে যখন মন ক্লান্ত হয়ে পড়ে তখন তাকে বেঁচে থাকার রসদ যোগায় এই উৎসব। কথায় বলে 'বারো মাসে তেরো পার্বণ'।মন আনন্দই চায়।তাই তাকে সজীবতা দিতে,পরিবারের,সমাজের ভালো-মন্দের কথা মাথায় রেখে মানুষ নিজেই সৃষ্টি করে নিয়েছে নানাবিধ উৎসবগুলিকে। একেবারে প্রাচীন কাল থেকে আজ পর্যন্ত মানুষ কখনোই উৎসব বিমুখ ছিল না।উৎসবই তাকে ঘর থেকে বাইরে টেনে এনেছে,চিনতে শিখিয়েছে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার আনন্দকে। উৎসব আসলে প্রাণের সাথে প্রাণের যোগ, হৃদয়ের সাথে হৃদয়ের যোগ।রবীন্দ্রনাথ বলেছেন 'সত্য যেখানেই সুন্দর হয়ে প্রকাশ পায় সেইখানেই উৎসব'।হৃদয়ের সেই সুকোমল বৃত্তির জাগরণ যেন ফুটে ওঠা ফুলেরই মতো সত্য ও সুন্দর।এই জাগরণই উৎসব। তাই নানা কিছুর মধ্য দিয়ে,নানা উপলক্ষ্যে এই উৎসব প্রকাশ পায়। প্রাচীনকালে মানুষের হাতে না ছিল পসার, না ছিল পসরা।ছিল মনের আন্তরিকতা,মানুষকে কাছে টেনে নেবার ক্ষমতা।সেটাই ছিল উৎসবের সৌন্দর্য। তাই সেদিনের উৎসবে ক্ষুদ্র,তুচ্ছ উপকরণও প্রাণের উচ্ছ্বাসে মহৎ হয়ে উঠত।সেকালের উৎসবে লোক দেখানো ব্যাপার কিছু ...

বছরের বাছাই

ভৌতিক গল্প ।। পাঁচ ভূতের প্রতিশোধ ।। মিঠুন মুখার্জী

পাঁচ ভূতের প্রতিশোধ মিঠুন মুখার্জী  বহু বছর আগের এক ঘটনা। বর্ধমানের শক্তিগড়ের কাছেই সেই গ্ৰামটি। তখন জনসংখ্যা খুবই কম ছিল ।দুটি বাড়ির মধ্যে একশো গজ দূরত্ব। একজনের ঘরের খবর অন্যজন জানতে পারতেন না। গ্ৰামে কারেন্ট ছিল না। সন্ধ্যার পর সারা গ্ৰামের ঘরে ঘরে টেমি ও হ্যারিকেন জ্বলত। কারো বাড়িতে কোনো অনুষ্ঠান হলে হ্যাচাকলাইট জ্বালানো হতো। একটু সচ্ছল পরিবারে জেনারেটর ভাড়া নিতেন। কেউ মরে গেলে নদীর পাড়ে পুড়াতে যেত। সঙ্গে যাওয়ার জন্য খুব বেশি লোক পাওয়া যেত না। ঐ গ্ৰাম থেকে বাজারের দূরত্ব তিন কিলোমিটার হবে। বাজারে সন্ধ্যার পর জেনারেটরের লাইন ভাড়া নিয়ে সকলে লাইট জ্বালাত ও ফ্যান চালাত। বাজারে যাওয়ার সময় একটা বিরাট মাঠ পার হতে হত। যে মাঠের পুরোটা একজায়গায় দাঁড়িয়ে দেখা যেত না। গ্ৰামের মানুষেরা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করত, সন্ধ্যার পর এই মাঠে ভূতেদের আখরা বসে। তারা অনেকেই রাত্রি বেলা ওই মাঠে ভূতেদের দাঁড়িয়ে কখনো বসে জটলা পাকাতে দেখেছে। এই মাঠের উত্তর দিকে একটি বিশাল তেঁতুল গাছ ছিল। এই গাছ থেকেই ভূতেরা মাঠে নেমে আসত নিজেদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করার জন্য। তাদের আলোচনার বিষয়...

লেখা-আহ্বান-বিজ্ঞপ্তি : মুদ্রিত নবপ্রভাত বইমেলা ২০২৬

  লেখা-আহ্বান-বিজ্ঞপ্তি মুদ্রিত  নবপ্রভাত  বইমেলা ২০২৬ সংখ্যার জন্য  প্রবন্ধ-নিবন্ধ, মুক্তগদ্য, রম্যরচনা, ছোটগল্প, অণুগল্প, কবিতা ও ছড়া পাঠান।  যে-কোন বিষয়েই লেখা যাবে।  শব্দ বা লাইন সংখ্যার কড়াকড়ি বাঁধন  নেই। তবে ছোট লেখা পাঠালে  অনেককেই সুযোগ দেওয়া যায়।  যেমন, কবিতা/ছড়া ১২-১৬ লাইনের মধ্যে, অণুগল্প/মুক্তগদ্য কমবেশি ৩০০/৩৫০শব্দে, গল্প/রম্যরচনা ৮০০-৯০০ শব্দে, প্রবন্ধ/নিবন্ধ ১৫০০-১৬০০ শব্দে হলে ভালো। তবে এ বাঁধন 'অবশ্যমান্য' নয়।  সম্পূর্ণ অপ্রকাশিত লেখা পাঠাতে হবে। মনোনয়নের সুবিধার্থে একাধিক লেখা পাঠানো ভালো। তবে একই মেলেই দেবেন। একজন ব্যক্তি একান্ত প্রয়োজন ছাড়া একাধিক মেল করবেন না।  লেখা  মেলবডিতে টাইপ বা পেস্ট করে পাঠাবেন। word ফাইলে পাঠানো যেতে পারে। লেখার সঙ্গে দেবেন  নিজের নাম, ঠিকানা এবং ফোন ও whatsapp নম্বর। (ছবি দেওয়ার দরকার নেই।) ১) মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখবেন 'মুদ্রিত নবপ্রভাত বইমেলা সংখ্যা ২০২৬-এর জন্য'।  ২) বানানের দিকে বিশেষ নজর দেবেন। ৩) যতিচিহ্নের আগে স্পেস না দিয়ে পরে দেবেন। ৪) বিশেষ কোন চিহ্ন (যেমন @ # ...

মুদ্রিত নবপ্রভাত বইমেলা ২০২৬ সংখ্যার চূড়ান্ত সূচিপত্র

  মুদ্রিত নবপ্রভাত বইমেলা ২০২৬ সংখ্যার চূড়ান্ত সূচিপত্র প্রকাশিত হল।     যত লেখা রাখা গেল, তার দ্বিগুণ রাখা গেল না। বাদ যাওয়া সব লেখার 'মান' খারাপ এমন নয়। কয়েকটি প্রবন্ধ এবং বেশ কিছু (১৫-১৭টা) ভালোলাগা গল্প শেষ পর্যন্ত রাখা যায়নি। আমাদের সামর্থ্যহীনতার কারণে।     তবুও শেষ পর্যন্ত দশ ফর্মার পত্রিকা হয়েছে। গত দুবছরের মতো A4 সাইজের পত্রিকা।    যাঁদের লেখা রাখা গেল না, তাঁরা লেখাগুলি অন্য জায়গায় পাঠাতে পারেন। অথবা, সম্মতি দিলে আমরা লেখাগুলি আমাদের অনলাইন নবপ্রভাতের জানুয়ারি ২০২৬ সংখ্যায় প্রকাশ করতে পারি।    পত্রিকাটি আগামী ৯-১৩ জানুয়ারি ২০২৬ পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি আয়োজিত কলকাতা লিটল ম্যাগাজিন মেলায় (রবীন্দ্র সদন - নন্দন চত্বরে) পাওয়া যাবে।     সকলকে ধন্যবাদ। শুভেচ্ছা।

কবিতাঃ চন্দন ঘোষ

এক টুকরো রুটি বস্তির রাস্তায় একটা বৃদ্ধ মানুষ সারাদিন বসে আছে। উত্তরে দেখে দক্ষিনে দেখে বহুদূর কেউ একটুকরো রুটি দিয়েযায় পাছে। চক্ষু কোটোরা গত শরীর মাস হীন, হাড় মাত্র। হয়তো স্বাধিনতা আন্দোলনের বিপ্লবী! হয়তো কলেজের আদর্শ ছাত্র। হয়তো ব্রিটিশ গোরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল  তার ছোট্টো ঝুঁপরির উপর। সে বাধা দিয়েছিল প্রতীবাদী হাতে। হয়তো পঙ্গু হয়েছিল সেই রাতে। আমি এক প্রশ্ন তুলেছিলাম, কেমনে হইল এ অবস্থা? বাক সরেনা মুখে সরকার কেন করেনা কোনো ব্যাবস্থা?? শরীর বস্ত্রহীন এই রাতে। নিম্নাঙ্গে একটা নোংগরা ধুতি। কী জানি কত দিন খায়নি? কত দিন দেখেনি এক টুকরো রুটি! রাজধানী শহরের আকাশটা দেখছে। দেখছে নেতা মন্ত্রী গন। হাইরে কেউতো তারে উঠিয়ে তোলেনি। দেখেনি কোনো কোমল মন। আজ ভারতবর্ষ উন্নতশীল রাষ্ট্র!   কথাটা অতীব মিথ্যা মাটি। এমন কতযে মানুষ ক্ষুদার্থ, দেখেনা এক টুকরো রুটি। নতুন মন্ত্রী, নতুন রাষ্ট্রপতি সবাই আসে সবার হয় আবর্তন। হাইরে পিছিয়ে পড়া মানুষ গুলো! তাদের হয়না কোনো পরিবর্তন। আজ 71 বছর আজাদ হয়েও  বোধহয় যে...

ছোটগল্প ।। নীলিমার আত্মজাগরণ ।। পরেশ চন্দ্র মাহাত

নীলিমার আত্মজাগরণ পরেশ চন্দ্র মাহাত নীলিমা মাহাত, বয়স পঁচিশ প্লাস —তার বাবা মায়ের পঞ্চম তথা শেষ সন্তান। দুই দাদা —বড়দাদা শঙ্কর ও ছোটদাদা বিজয়। বড় দাদা শঙ্কর আর দুই দিদি তাদের কিন্তু বিয়ে হয়ে গেছে। একমাত্র নীলিমা আপাতত স্বামীর কোমল হাতের স্পর্শ ও সহানুভূতি থেকে বঞ্চিত এবং আদৌ কবে অথবা সেই সৌভাগ্য আসবে সেটা ঈশ্বরের নিকটই একমাত্র জ্ঞাত। সেই সঙ্গে দুবছরের সিনিয়র ছোটদাদা বিজয়েরও নীলিমার মতো অবস্থা। তারও জীবনসঙ্গিনী জুটেনি। মোট সাতজন সদস্য নিয়ে গঠিত সংসার নীলিমাদের পরিবার। মধ্যবিত্ত পরিবার —মধ্যবিত্ত পরিবার না বলে যদি নিম্নবিত্ত বলা হয় তবুও কোনো অত্যুক্তি করা হয় না। বাবার প্রত্যেকদিনের আয়ের উপর ভিত্তি করেই চলে সংসার। এই কঠোর এবং কঠিন পরিস্থিতিতেও নীলিমার মা শ্রীমতী মেনকা‚ সংসার সামলে তার ছেলেমেয়েদের পড়াশুনার প্রতি যথেষ্ট তৎপর ও সহানুভূতিশীল। তাদের পড়াশুনায় কোনো খামতি রাখেননি। যথা সময়ে তাদেরকে বিদ্যালয়ের মুখ দেখিয়েছে – টিউশনের বন্দোবস্ত করেছে। তাদের জীবন যাতে সুখকর হয় সেটাই প্রতিদিন ভগবানের কাছে প্রার্থনা করেছে। পাঁচ-পাঁচটি ছেলেমেয়ের মধ্যে সবাইকে উচ্চশিক্ষিত করে তোলা একপ...

গল্প ।। জাতিস্মর ।। আশীষ কুমার বিশ্বাস

    জাতিস্মর   আশীষ  কুমার   বিশ্বাস    গল্পের শুরুটা প্রায় ষাট বছর আগের কথা । যার নাম গৌতম, ডাক নাম ছিল বাবু ।  তার বছর তখন ছয়-সাত হবে । আমরা বা আমি তখন একটু বড় । এক সাথেই চলতো খেলা । গোল্লা ছুট, দাঁড়িয়া বান্দা, চোর-পুলিশ । যে মাঝে মাঝে খেলা থেকে বিরত থাকতো ; সে-ই জাতিস্মর । মাঠের পাশেই ছিল একটা খেঁজুর গাছ । তাতে হাত রেখে দূরের এক গ্রামের দিকে এক মনে তাঁকিয়ে থাকতো "বাবু" । গ্রামটির নাম "বিনয় পল্লী " । মাঝে বড়ো মাঠ । হাঁটা শুরু করলে তিরিশ - চল্লিশ মিনিট লাগবে । মাঝে জলে ভরপুর দেখে কখনো যাওয়া হয়নি । বাবু কে যখন বলতাম, ওপারে কি দেখছিস? ও বলতো, ওখানে আমার ছোট মা থাকে, দিদি থাকে, আমার ভুলু কুকুর থাকে । এ কথা আমাদের বিশ্বাস হতো না । আবার খেলায় ফিরে যেতাম, খেলতাম ।  কিন্তু ও বসে বসে , ওপারের গাছ পালা , বাড়ি ঘর দেখতো । কাছে গেলে বলতো , ওই যে সবুজ ,কচি কলাপাতা রঙের দালান বাড়ি, ওটাই আমাদের বাড়ি !  এই ভাবে মাস ছয়, বছর গড়াতে লাগলো । মনে প্রশ্ন জাগতে লাগলো, এ টা কি মন গড়া , বা বানিয়ে বানিয়ে বলছে? সত্যি প্রকাশ হোল এক দিন ।  সে বাড়িতে কিছু ...

উন্মুক্ত পাগলামি ।। আশরাফুল মণ্ডল

উন্মুক্ত পাগলামি আশরাফুল মণ্ডল আহা, অপরূপ নিজস্বতার দাহ! কুঁকড়ে যায় আবহমান, সজনে পাতার বোঁটায়! ভাপওঠা ভাতের কাছে মাছি সত্তায় কী নিপুণ! তবুও ঘোর লাগা বসন্তের ডাক, হাঁকে! খেদিয়ে দেয় পা দোলানো প্রস্তাব, ওই ধুনুরি চোখ! রাংতায় মোড়া ডাকের সাজ, দে দোল দোল! হুইসেল বাজিয়ে কে রুখে দ্যায় সেই নাকছাবির রুদালি কাঁপন! খালবিল ছেঁচে পাঁচসিকের  মানত কুড়িয়ে আনে, বাংলা বাজার। ঠ্যাং নাচানো সুরে চোখ মারছে, দ্যাখো ভ্যানতারা! মুখ খোলা মানেই পাঁজরের স্রোত ভাবা যেন উগরানো টালমাটাল! ঢিল মারা প্রশ্নের রোয়াকে বক্রচোখে যেন মেধাবী কবিতা! মুছে দিও তবে লাজুক গুপ্ত রোগ, দিনরাত্রি! ভালো থেকো তোমরা বাছাধন, রং মাস সে আর কতদিন... ================    ASRAFUL MANDAL Chandidas Avenue, B-zone, Durgapur, Paschim Bardhaman, Pin - 713205,  

প্রচ্ছদ ও সূচিপত্র ।। ১০০তম সংখ্যা ।। আষাঢ় ১৪৩৩ জুন ২০২৬

নবপ্রভাত ১০০তম সংখ্যা ।। আষাঢ় ১৪৩৩ জুন ২০২৬ এই সংখ্যায় প্রকাশিত লেখাগুলোর মধ্যে প্রতি বিভাগের একজন করে নির্বাচিত লেখককে নবপ্রভাতের পক্ষ থেকে সম্মান জানানোর কথা আছে। সেই নামগুলো আগামী সংখ্যার সূচিপত্রের সঙ্গে প্রকাশিত হবে। (পাঠক হিসাবে আপনিও জানাতে পারেন আপনার ভালোলাগার কথা।) ---নিরাশাহরণ নস্কর, সম্পাদক, নবপ্রভাত। সূচিপত্র  প্রবন্ধ-নিবন্ধ-ফিচার  প্রবন্ধ  ।। ভয় ।। শ্রীশুভ্র প্রবন্ধ ।। প্রবীণ জনগণ ।। শ্যামল হুদাতী একাকীত্বের ছাদ থেকে পতন : অনিক দত্ত ও মানুষের নিঃশ... প্রবন্ধ ।। ধাঙড় ।। মোঃ চাঁন মিয়া ফকির প্রবন্ধ ।। অন্ধকারের উৎস হতে উৎসারিত আলো ।। কুহেলী... প্রবন্ধ ।। নারীর সম্মান ও অধিকার — অলীক কল্পনা, না... আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন ভাষা বিজ্ঞানী অধ্যাপক প... প্রবন্ধ ।। কবি কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার ।। সুমন বিপ্লব     ফিচার ।। চা দিবস ।। অশোক বন্দ্যোপাধ্যায়   ফিচার ।। বর্তমান প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্...   রম্যনাটিকা ।। পাত্র দেখা ।। সুশীল বন্দ্যোপাধ্যায়   ভ্রমণকাহিনি মাজান্দারান: কাস্পিয়ান সাগরের তীর... ঝরণার গান শুনতে ।। ...

কবিতা ।। মনোজকুমার রায়

জল সিঁড়ি চেক বইয়ের পাতা ফুরিয়ে যেতে থাকে -- ঝরে পড়ে বৃদ্ধ গাছটির পত্রমুকুল কাঁচা গন্ধ বেয়ে চলে সময়ের স্রোতে  সারা ভোর জেগে থাকি ঘুমের টলে তাড়া দেয় একগ্রাস অবিশ্বাসী বায়ু দিন ফুরনো লাল সূর্যের টানে নেমে আসে পাড় ছোঁয়া জল সিঁড়ি ================= মনোজকুমার রায় দঃ ঝাড় আলতা ডাউকিমারী, ধূপগুড়ি জলপাইগুড়ি -৭৩৫২১০ মো ৭৭৯৭৯৩৭৫৬৬

প্রচ্ছদ ও সূচিপত্র ।। ৯৭তম সংখ্যা ।। চৈত্র ১৪৩২ মার্চ ২০২৬ ।। নারী বিষয়ক সংখ্যা

 সম্পাদকীয় দপ্তর থেকে :  শুধুমাত্র 'নারী' বিষয়ক লেখাই এই সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে। অন্যান্য বিষয়ের ভালো লাগা কিছু লেখা আগামী সংখ্যার জন্য রইল। সকলকে ধন্যবাদ। ~নিরাশাহরণ নস্কর, সম্পাদক, নবপ্রভাত। সূচিপত্র নারীমর্যাদা ও অধিকার ।। হিমাদ্রি শেখর দাস নারীমুক্তির কালিতে লেখা ইতিহাসের কটি পাতা ।। ডাঃ অরুণ চট্টোপাধ্যায় সাহসী এবং লড়াকু নারীরা ।। উৎপল সরকার পল গগ্যাঁর চিত্রে নারী ।। ড. সবুজ সরকার সুন্দরবনের নারীদের গল্প "নোনাজলের নীরবতা" ।। কাবেরী মাতৃত্ব অন্তকোষীয় স্থপতি ।। মেশকাতুন নাহার অপ্রয়োজনীয় ।। শ্যামাপ্রসাদ সরকার নারী: উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় অপরিহার্য শক্তি ।। চঞ্চল পাণ্ডে নিরুদ্দেশ ।। স্বাতী রায় চৌধুরী ইলা ঘোষ : বাংলার প্রথম মহিলা ইঞ্জিনিয়ার ।। সঙ্ঘমিত্রা দাস অক্ষরের আলো ।। জয় মণ্ডল প্রতিশোধ ।। কাবেরী মিত্র বর্তমান প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক নারী দিবসের গুরুত্ব ।। পাভেল আমান যে পথ হারিয়েছে দূরে ।। জয়িতা চট্টোপাধ্যায় সেই লাল ফ্রকটা ।। সৈকত প্রসাদ রায় অন্য এক নারীর গল্প ।। অদিতি চ্যাটার্জি শৃঙ্গার ।। চন্দ্রকান্ত চক্রবর্তী একালের অর্জুন ।। জয়শ্রী সরকার এক সাহসিনী সিন্ধু ক...

মাসের বাছাই

প্রচ্ছদ ও সূচিপত্র ।। মাসিক নবপ্রভাত ওয়েবম্যাগ ।। ১০২তম সংখ্যা ।। ভাদ্র ১৪৩২ আগস্ট ২০২৬

সূ ~ চি ~প~ত্র ==================== প্রবন্ধ-নিবন্ধ-ফিচার-স্মৃতিকথা  আকাশের রহস্য থেকে বৈজ্ঞানিক বোধ: জ্যোতিষ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের সন্ধিক্ষণে ।। উৎপল সরকার সুকান্ত ভট্টাচার্য : কবিতার ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা এক তরুণ বিপ্লবী ।। তানভীর আহমেদ হৃদয় নারী জাগরণের দিশারী বেগম রোকেয়া ।। আবু রাইহান জীবনানন্দ দাশ: বাংলার নিসর্গে যে কবি রেখে গেছেন বিষণ্ণ আলোর দাগ ।। শিকদার বাসির   স্থানীয়  কিছু কথ্যশব্দ, উচ্চারণ, বাগ্‌ধারা ইত্যাদি ।। অরবিন্দ পুরকাইত আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও গোলামির ভয়ংকর ফাঁদ…।। আবদুল্লা আল আদীব সূত্র থেকে বৃহৎ ইতিহাস কার্লো গিনজবার্গ, মাইক্রোহিস্ট্রি জানার নতুন পদ্ধতি ।। শিবাশিস মুখার্জি ফ্রুক্টোজ এবং ক্যানসার বিস্তার ।। অনিন্দ্য পাল বিবেকের অভিষেকে মানবধর্মের নন্দনভূমি ।। মেশকাতুন নাহার জনাই আর মালদহের মনোহরা ।। সোনালী সরকার অতিরিক্ত সাবান মাখা কি স্বাস্থ্যকর ।। গৌতম সমাজদার ফুচকা থেরাপি ।। অরিন্দম পাল স্মৃতিকথা ।। হারানো ছাতা ।। সেখ নাজিরুল ইসলাম বিভিন্ন পত্রিকার লেখা-আহ্বান বিষয়ক ভাবনা ।। মাখনলাল প্রধান পুঁটুর স্মৃতিচারণা ।। মৌমিতা চ্যাটার্জী  দুরন্ত ও দুর্দান্ত শৈ...

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও গোলামির ভয়ংকর ফাঁদ…।। আবদুল্লাহ আল আদীব

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও গোলামির ভয়ংকর ফাঁদ … আবদুল্লাহ আল আদীব     ক্ষমতা ও শোষণের ঐতিহাসিক বিবর্তন : প্রস্তরযুগ থেকে জ্ঞাননিয়ন্ত্রণের যুগ … মানবসভ্যতার ইতিহাসকে যদি একটিমাত্র প্রশ্ন দিয়ে পড়া যায় , তবে সেই প্রশ্নটি হতে পারে — ক্ষমতা কার হাতে এবং সেই ক্ষমতা কীভাবে ব্যবহৃত হয়েছে ? কৃষির আবির্ভাবের আগে মানুষের জীবন ছিল মূলত শিকার , সংগ্রহ ও পারস্পরিক সহযোগিতানির্ভর । কৃষির বিকাশের সঙ্গে জমি , উদ্বৃত্ত উৎপাদন ও সম্পত্তির ধারণা তৈরি হলো । সেখান থেকেই ধীরে ধীরে জন্ম নিল সামাজিক শ্রেণিবিভাগ , করব্যবস্থা , শ্রমের বিভাজন এবং রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব । ক্ষমতা আর কেবল শারীরিক শক্তির বিষয় রইল না ; তা হয়ে উঠল সম্পদ ও মানুষের ওপর নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা । প্রাচীন মিশর , সুমের , ব্যাবিলন , পারস্য , গ্রিস ও রোম — বিভিন্ন সভ্যতা তাদের নিজস্ব রাষ্ট্র ও সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিল । সাম্রাজ্যের বিস্তারের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুদ্ধ , দখল , কর ও শ্রমের নিয়ন্ত্রণ । বিজিত জনগোষ্ঠীর ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ...

জীবনানন্দ দাশ: বাংলার নিসর্গে যে কবি রেখে গেছেন বিষণ্ন আলোর দাগ ।। শিকদার বাসির

জীবনানন্দ দাশ: বাংলার নিসর্গে যে কবি রেখে গেছেন বিষণ্ন আলোর দাগ  শিকদার বাসির বাংলা কবিতার আকাশে কিছু নক্ষত্র আছে, যারা আলো ছড়ায় না—আলো হয়ে থাকে। তাদের দীপ্তি চোখ ধাঁধায় না; বরং ধীরে ধীরে এসে বসে মনের গভীরে। জীবনানন্দ দাশ তেমনই এক কবি। তিনি উচ্চকণ্ঠে বাংলা কবিতার দরজায় কড়া নাড়েননি; নিভৃত অন্ধকারের ভেতর দিয়ে হেঁটে এসে কবিতাকে দিয়েছেন এক নতুন চোখ, এক নতুন শ্রুতি, এক নতুন বিষণ্ন সৌন্দর্য। তাঁকে পড়লে মনে হয়, আমরা যেন কোনো অচেনা অথচ বহুদিনের পরিচিত বাংলার ভেতর প্রবেশ করেছি—যেখানে কুয়াশায় ভেজা ধানক্ষেত, শালিকের ডানা, শিশিরে নুয়ে পড়া ঘাস, নদীর ধূসর জল, সন্ধ্যার পাখি আর দূর কোনো গ্রাম থেকে ভেসে আসা নিঃসঙ্গতার সুর একাকার হয়ে আছে। সেই বাংলার নাম জীবনানন্দের কবিতায় কখনো বনলতা সেন, কখনো ধানসিঁড়ি, কখনো রূপসী বাংলা। ১৮৯৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বরিশালে জন্মেছিলেন জীবনানন্দ দাশ। পিতা সত্যানন্দ দাশ ছিলেন শিক্ষক ও ব্রাহ্মসমাজের সঙ্গে যুক্ত; মা কুসুমকুমারী দাশ ছিলেন কবি। মায়ের কাছ থেকেই যেন কবিতার প্রথম আলো তাঁর জীবনে প্রবেশ করেছিল। বরিশালের প্রকৃতি, নদী, পাখি, গাছপালা এবং নিসর্গের সঙ্গে তাঁর যে গভীর ...

এ যুগের নারী ।। সঞ্জয় বৈরাগ্য

  এ যুগের নারী সঞ্জয় বৈরাগ্য নই আর মোরা সত্তাবিহীন, সে যুগের মতো নই পরাধীন নই তো আমরা অবলা, কূপমন্ডকী সুযোগ, সুবিধা, শুধুই সুখভোগী। আমরা, এ যুগের নারী। মোরা ভয় করি নাকো ঝড়-তুফানে লক্ষ্য মোদের সদা জয় পানে। দিতে পারি মোরা দিক-দিগন্তে পাড়ি যুগ-যুগান্তের নৌকা ধরি। আমরা, এ যুগের নারী। আমরা ঘোচাবো ভাবনা মা, বাবা'র 'কন্যাদায়' --- এ কথাটি তাদের ভুলিয়ে দেবো, হয়ে যে অনন্যা আমরা যে যত সাহসী কন্যা। আমরা, এ যুগের নারী। পুরুষের থেকে কম নই মোরা আমরাই ভুবনে সৃষ্টির আধার।  পার হতে পাড়ি কাটিয়ে শত ভয়, সাগরের ঐ অতল জলরাশি; আমরা, এ যুগের নারী।   =============== সঞ্জয় বৈরাগ্য কৃষ্ণনগর, নদীয়া।

গল্প ।। আত্মরক্ষার অধিকার ।। রণেশ রায়

আত্মরক্ষার অধিকার রণেশ রায় উনার নাম সুমন বোস। বয়স পঞ্চান্ন ছাপ্পান্ন হবে।  চব্বিশপরগনার আমতলায় নিজের পৈতৃক বাড়িতে স্ত্রী সুজাতা কন্যা কল্যাণীকে নিয়ে থাকেন। একটা বেসরকারি সংস্থায় চাকুরী করেন। অবস্থা খুব ভালো না হলেও খারাপ নয়। দিব্বি চলে যায়। ভ্রমণ রসিক মানুষ। ছুটি পেলেই পরিবার নিয়ে কোথাও না কোথাও বেড়াতে যাওয়া। স্ত্রী ঘর সামলান মেয়েকে নিয়ে। মেয়ে  দেখতে শুনতে তেমন না হলেও তার দৃপ্ত হাসিমুখ নজর কাড়ে। সে প্রথম বর্ষের কলেজ ছাত্রী নিকটবর্তী কলেজে বিষ্ণুপুর এলাকায়। পড়াশুনায় মোটামুটি। একটু বারমুখী ।  বাবার সঙ্গে খুব খাতির। ওর মায়ের অভিযোগ বাবার কাছে মেয়ে প্রশ্রয় পায় তাই পরশুনায় তেমন মন নেই। তবে মায়ের সাহায্যে যে সে তৎপর  সে বিষয়ে মায়েরও সন্দেহ নেই।  মেয়ে একটু  বহির্মুখী বলে মায়ের চিন্তা। বাবা মেয়ের এই ব্যাপারে নির্লিপ্ত। আর সেটাই মেয়েকে একটু বেয়ারা করে তুলেছে বলে মায়ের ধারণা। সব নিয়ে ভালো মন্দে সুমনবাবুদের সংসার। সুমনবাবু মেয়ের বহির্মুখী কাজে উৎসাহ দেন সন্দেহ নেই। সেটা যেন তাঁর গর্ব আর সেটাই স্ত্রী সুজাতার রাগের কারণ। মেয়ে কল্যাণী পাড়ায় ছেলেদের সঙ্গে ফুটবল খেলায় উৎস...

কবিতা ।। আটক ।। তাপসী লাহা

আটক তাপসী লাহা  সময়টি নিঃসন্দেহে অতি তরল, তরঙ্গময় ঘোরের বারান্দায় পাখি দাঁড় করিয়ে রাখা চমৎকার লৌহশানিত খাঁচা  বিড়ালিনীর শেষ রাতে চুপিসারে এঁটো করা দুগ্ধ পাত্রটি,  ঠনক্ শব্দে কেঁপে ওঠে নিত্যগৃহী, ঘুম গহ্বর থেকে অতর্কিতে ফিরে আসা নিঃসার ধ্বংসছ্যাক শোভাহীন শুকনো ফুলের তোড়া তবু তো মায়া! স্নেহ বিপন্ন বস্তুসুলভ গাছ...... আহারে মেছো প্রাণ ------ মাংস দাঁতটির কি হবে ভাবতে ভাবতে সমুদ্রে তলিয়ে যাচ্ছে ধুলোদের ঘরকন্না। ============ Tapashi Laha  Birnagar  733134 Raiganj  Uttar Dinajpur 

ছোটগল্প ।। নীলিমার আত্মজাগরণ ।। পরেশ চন্দ্র মাহাত

নীলিমার আত্মজাগরণ পরেশ চন্দ্র মাহাত নীলিমা মাহাত, বয়স পঁচিশ প্লাস —তার বাবা মায়ের পঞ্চম তথা শেষ সন্তান। দুই দাদা —বড়দাদা শঙ্কর ও ছোটদাদা বিজয়। বড় দাদা শঙ্কর আর দুই দিদি তাদের কিন্তু বিয়ে হয়ে গেছে। একমাত্র নীলিমা আপাতত স্বামীর কোমল হাতের স্পর্শ ও সহানুভূতি থেকে বঞ্চিত এবং আদৌ কবে অথবা সেই সৌভাগ্য আসবে সেটা ঈশ্বরের নিকটই একমাত্র জ্ঞাত। সেই সঙ্গে দুবছরের সিনিয়র ছোটদাদা বিজয়েরও নীলিমার মতো অবস্থা। তারও জীবনসঙ্গিনী জুটেনি। মোট সাতজন সদস্য নিয়ে গঠিত সংসার নীলিমাদের পরিবার। মধ্যবিত্ত পরিবার —মধ্যবিত্ত পরিবার না বলে যদি নিম্নবিত্ত বলা হয় তবুও কোনো অত্যুক্তি করা হয় না। বাবার প্রত্যেকদিনের আয়ের উপর ভিত্তি করেই চলে সংসার। এই কঠোর এবং কঠিন পরিস্থিতিতেও নীলিমার মা শ্রীমতী মেনকা‚ সংসার সামলে তার ছেলেমেয়েদের পড়াশুনার প্রতি যথেষ্ট তৎপর ও সহানুভূতিশীল। তাদের পড়াশুনায় কোনো খামতি রাখেননি। যথা সময়ে তাদেরকে বিদ্যালয়ের মুখ দেখিয়েছে – টিউশনের বন্দোবস্ত করেছে। তাদের জীবন যাতে সুখকর হয় সেটাই প্রতিদিন ভগবানের কাছে প্রার্থনা করেছে। পাঁচ-পাঁচটি ছেলেমেয়ের মধ্যে সবাইকে উচ্চশিক্ষিত করে তোলা একপ...

লেখা-আহ্বান-বিজ্ঞপ্তি : মুদ্রিত নবপ্রভাত বইমেলা ২০২৫

   মুদ্রিত  নবপ্রভাত  বইমেলা ২০২৫ সংখ্যার জন্য  লেখা-আহ্বান-বিজ্ঞপ্তি মুদ্রিত  নবপ্রভাত  বইমেলা ২০২৫ সংখ্যার জন্য  প্রবন্ধ-নিবন্ধ, মুক্তগদ্য, রম্যরচনা, ছোটগল্প, অণুগল্প, কবিতা ও ছড়া পাঠান।  যে-কোন বিষয়েই লেখা যাবে।  শব্দ বা লাইন সংখ্যার কড়াকড়ি বাঁধন  নেই। তবে ছোট লেখা পাঠানো ভালো,  তাতে অনেককেই সুযোগ দেওয়া যায়।  যেমন, কবিতা/ছড়া ১২-১৬ লাইনের মধ্যে, অণুগল্প/মুক্তগদ্য কমবেশি ৩০০/৩৫০শব্দে, গল্প/রম্যরচনা ৮০০-৯০০ শব্দে, প্রবন্ধ/নিবন্ধ ১৫০০-১৬০০ শব্দে। তবে এ বাঁধন 'অবশ্যমান্য' নয়।  সম্পূর্ণ অপ্রকাশিত লেখা পাঠাতে হবে। মনোনয়নের সুবিধার্থে একাধিক লেখা পাঠানো ভালো। তবে একই মেলেই দেবেন। একজন ব্যক্তি একান্ত প্রয়োজন ছাড়া একাধিক মেল করবেন না।  লেখা  মেলবডিতে টাইপ বা পেস্ট করে পাঠাবেন। word ফাইলে পাঠানো যেতে পারে। লেখার সঙ্গে দেবেন  নিজের নাম, ঠিকানা এবং ফোন ও whatsapp নম্বর। (ছবি দেওয়ার দরকার নেই।) ১) মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখবেন 'মুদ্রিত নবপ্রভাত বইমেলা সংখ্যা ২০২৬-এর জন্য'।  ২) বানানের দিকে বিশেষ নজর দেবেন। ৩) য...

কবিতাঃ চন্দন ঘোষ

এক টুকরো রুটি বস্তির রাস্তায় একটা বৃদ্ধ মানুষ সারাদিন বসে আছে। উত্তরে দেখে দক্ষিনে দেখে বহুদূর কেউ একটুকরো রুটি দিয়েযায় পাছে। চক্ষু কোটোরা গত শরীর মাস হীন, হাড় মাত্র। হয়তো স্বাধিনতা আন্দোলনের বিপ্লবী! হয়তো কলেজের আদর্শ ছাত্র। হয়তো ব্রিটিশ গোরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল  তার ছোট্টো ঝুঁপরির উপর। সে বাধা দিয়েছিল প্রতীবাদী হাতে। হয়তো পঙ্গু হয়েছিল সেই রাতে। আমি এক প্রশ্ন তুলেছিলাম, কেমনে হইল এ অবস্থা? বাক সরেনা মুখে সরকার কেন করেনা কোনো ব্যাবস্থা?? শরীর বস্ত্রহীন এই রাতে। নিম্নাঙ্গে একটা নোংগরা ধুতি। কী জানি কত দিন খায়নি? কত দিন দেখেনি এক টুকরো রুটি! রাজধানী শহরের আকাশটা দেখছে। দেখছে নেতা মন্ত্রী গন। হাইরে কেউতো তারে উঠিয়ে তোলেনি। দেখেনি কোনো কোমল মন। আজ ভারতবর্ষ উন্নতশীল রাষ্ট্র!   কথাটা অতীব মিথ্যা মাটি। এমন কতযে মানুষ ক্ষুদার্থ, দেখেনা এক টুকরো রুটি। নতুন মন্ত্রী, নতুন রাষ্ট্রপতি সবাই আসে সবার হয় আবর্তন। হাইরে পিছিয়ে পড়া মানুষ গুলো! তাদের হয়না কোনো পরিবর্তন। আজ 71 বছর আজাদ হয়েও  বোধহয় যে...

কবিতা ।। রক্ত গোলাপ ।। অমিত কুমার রায়

রক্ত গোলাপ  অমিত কুমার রায় এস অতুলপ্রসাদী গান গাই  'আ - মরি বাংলা ভাষা,  এসো, প্রতুলের গাওয়া গান গাই  'আমি বাংলার গান গাই  আমি বাংলায় গান গাই....." যারা মাতৃভাষায় কলঙ্ক লেপে উল্লাসে উঠেছে ক্ষেপে উপেক্ষা বাতাসে ভাসিয়ে দাও প্রতিবাদ ঝড় তীব্রতর হোক  তাদের বুকের ভেতর অশ্রদ্ধা উঠুক কেঁপে। এসো বাংলার ঘরে বাংলা স্বরে  বাংলা ভাষার ডিঙ্গা ভাষাই।  এসো বাংলার পথে বাংলার সত্য  ব্রতে লালনের গান গাই  লালনের গান গাই। এসো ফাগুনের কবি বৈশাখী রবি  আগুন শহীদ পাখি  এসো আগুনের ফুল ফাগুনের ফুল  আকাশের তারা আখি। ভাসে ভাষা ফুল মানবতাব গুল  রক্ত গোলাপে রাখী রক্ত গোলাপে ঢাকি।   ================== --- অমিত কুমার রায় হাওড়া  পশ্চিমবঙ্গ  ভারত