সন্দেহ
লিপিকর
এক বছর! আজ থেকে ঠিক একবছর আগে উনি অবসর নিয়েছিলেন। এখানকার হেড-পোস্টাফিসে সিনিয়র-ডিভিশ্যন কেরাণীর চাকরিতে তখনও আমার এগারো মাসের মেয়াদ বাকি। তারপরে যে ক’মাস আমি ব্যাগ কাঁধে বেরোতুম, উনি নিজেকে ডুবিয়ে রাখতেন স্কুল-লাইব্রেরির বইয়ের ক্যাটালগটি পুরোপুরি কম্পিউটারাইজড করার কাজে। কাজটা ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর জন্যেই হোক, বা অফিসটাইমের ট্র্যাফিক জ্যাম কর্তার চিরকালের না-পসন্দ বলেই হোক, উনি এসময় থেকে সকালবেলা মাঝেমাঝে টুকটাক রান্না করা শুরু করলেন। কলেজিয়েট স্কুল, তার কলেজের স্টাফ-ক্যান্টিনে প্রবেশাধিকার তাঁর তখনও ছিল, কিন্তু ওখানকার খাবার কোনওদিনই কি তাঁর মুখে রুচেছে! আমি নেয়ে-খেয়ে অফিস যাব বলে ছুটোছুটি করছি, সেই ব্যস্ত সময়ে উনি এসে, “কুসুম, তুমি রিটায়ার করলে আমরা সমুদ্রের ধারে যে যে জায়গায় বেড়াতে যাব, সেই লিস্টে আরো তিনটে নাম রাখলুম।” বললে কে না বিরক্ত হয় বলুন তো! সত্যি বলতে কী, সুখস্বপ্ন একটু একটু আমিও বুনতে শুরু করি নি, এমনতো নয়! এর চেয়ে, এখন মনে হয়, যদি উনি গতানুগতিকভাবে “আজ কী রান্না হচ্ছে!” মার্কা প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি করে চলতেন, তাহলে হয়তো আমার এখনকার এই একা, বন্ধ্যা, বদ্ধ জীবনটা একটু কম ভারাক্রান্ত হতো।
একাকিত্ব। এটাই তো আমাদের চারদশকের বিবাহিত জীবনের সবচেয়ে বড় লেইট্মোটিফ্। ওঁকে বিয়ে করার জন্যে যখন বাড়ি থেকে পালিয়েছি তখন আমার বয়স সাড়ে আঠেরো। জানতুম শুধু একটা মানুষকে আর দুটো তথ্য - একঃ আমার আঠেরো বছর বয়স পূর্ণ হয়ে গেলে আইনতঃ আমি যাকে খুশী বিয়ে করতে পারি। আর আমাদের ছোটবেলার সেই গঞ্জ-শহরে আইনে যেহেতু লোকের বিশেষ বিশ্বাস ছিল না, ওখানে থাকলে আমাদের দুজনেরই মারা পড়ার আশঙ্কা ছিল। বিপদ যে হয় নি, তার সম্ভবতঃ একমাত্র কারণ ছিলেন আমার স্বর্গগতা শাশুড়ি-মা। আগুনে পুড়ে আত্মহত্যা করার আগে আমার স্বামীর পিতামহকে উদ্দেশ্য করে যে চিঠি লিখে গিয়েছিলেন তাঁর পুত্রবধূ, তাতে বংশের প্রথম লিখি-পঢ়ি বহু’র আবেগপ্রবণ অনুরোধ ছিল যাতে আমাদের দুজনের কোন ক্ষতি না হয়। এছাড়াও তাঁর স্ত্রীধনের সবচেয়ে মোটা চুড়িটি তিনি আশীর্বাদস্বরূপ আমার জন্যে রেখে যান। আমার স্বামীর পরিবার সেই মৃত্যুপথযাত্রিণীর শেষ ইচ্ছের অমর্য্যাদা করেছিল, এমনটা বলব না। অশৌচের মধ্যেই সেই চুড়ির জোড় তৈরী করিয়ে, চুড়ি দু’গাছা আমার বরের হাতে সঁপে তাঁর পিতামহ জানিয়ে দেন, ভবিষ্যতে পরিবারের কোনও দায় বা অধিকার - কোনটাই যেন আমরা দাবী না করি। আমার বিবাহিত জীবনের প্রথম পঁয়ত্রিশ বছরে আমি আমার শ্বশুরবাড়ির কোন আত্মীয়কে দেখি নি, নিজের বাপ-মা বা অন্য আত্মীয়বন্ধুদের তো আর কখনোই নয়। যদিও উনি বরাবর, বারবার বলে এসেছেন যে আমাকে ভালোবাসতে গিয়ে যা কিছু ওঁকে বিসর্জন দিতে হয়েছে, তা নিয়ে ওঁর কোনও খেদ বা অনুতাপ নেই, আমাদের দু’জনের দাম্পত্যজীবনে কিন্তু আমার সেই কখনো দেখা-না-হওয়া মহিলার এক দৃঢ় প্রভাব থেকেই গিয়েছে। কোনদিন এবিষয়ে একটি কথাও ব্যয় না করে আমরা দুজনেই যেন জানতুম সেই নিষ্ঠ বধূর মৃত্যুর সমস্ত দায় আমাদের প্রেমের, আমার অবিমৃশ্য ভালবাসার, একমাত্র দায়িত্বজ্ঞানহীন আমার, শুধুই বেজাতে জন্মানো আমার। সেজন্যেই অবচেতনে সেই মৃত্যু আমাদের মাঝে দাঁড়িয়ে নতুন প্রাণের জন্মে বাধা দিয়েছিল।
এতগুলো বছরের আমাদের সহ-বাস, অনস্বীকার্যভাবেই, একঘেয়ে ছিল। তবুও এখন আমাকে যে সন্দেহ কুরেকুরে খাচ্ছে, সে তুলনায় গত জীবনটা শান্তির ছিল। ভিতুর ডিম একটা! পলায়নপর, মেরুদন্ডহীন, পোড়া চ্যালাকাঠের ছাওয়াল! এই যে অন্ধকার ভাবনাটা আমার মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে গেল, এটা থেকে আমি কী করে মুক্তি পাবো? এটা থেকে কি আমি আদৌ মুক্তি পাবো? এখন আমার ঐ একঘেয়ে জীবনটাতেই ফিরে যেতে ইচ্ছে করছে, যেখানে সকালে চোখ খুললেই সেই মানুষটাকে দেখতে পাওয়া যেত, যাকে সারাজীবন নির্ভর করে এসেছি। যাকে এই কদিনের দুঃস্বপ্নের কথা বললেই তিনি সস্মিতমুখে বলবেন, “কুসুম, ঐজন্যে বলি, সূর্য ডোবার পরে মাছ-মাংস খেও না।”
আমার যখন চাকরী থেকে অবসরের আর সপ্তাহচারেক বাকি, তখন আমার পোস্টাফিসের বড়বাবু আমাকে বললেন, “কুসুম, আমরা আপনার রিটায়ারমেন্টের কাগজপত্র তৈরী করেছি। কিন্তু আমার একটা অনুরোধ ছিল, আপনি যে আপনার আর্নড লিভগুলো নিয়ে নেবেন ভেবেছিলেন, সেটা করা যাবে না। রুক্মিণীর প্রেগন্যান্সিতে কিছু জটিলতা দেখা দিয়েছে, ডাক্তার ওঁকে পুরো বেডরেস্টে থাকতে বলেছে। আর কিষেণবাবুও সামনের কদিন থাকবেন না, সামনেই ওঁর ছোট মেয়ের বিয়ে,জানেনই তো … তাছাড়া আমি ফিন্যান্স-কে আপ্রুভ্যাল দিয়ে দিয়েছি আপনার সমস্ত ছুটি বিক্রি করে টাকা জমা করে দিতে … এখন নতুন হিসেব কষাও ঝামেলা, আর আপনিই বা টাকাকটা ছাড়বেন কেন? বুঝতেই পারছেন ক্যাল্কুলেশ্যন গোড়া থেকে করতে হলে টাকা হাতে পেতে অনেকদিন লেগেই যাবে।”
আগ বাড়িয়ে আমার হয়ে এই সিদ্ধান্ত নেওয়াটা আমার পছন্দ হয় নি, কিন্তু আমি খুব একটা আপত্তি করি নি। আমার এই চারসপ্তাহে কিছু করার পরিকল্পনা ছিলও না। তাছাড়া এই অফিসে অনেকদিন কাজ করেছি তো, জানি, পরিবার থেকে খেদিয়ে দেওয়া বাঁজা মেয়েদের ব্যক্তিগত ইচ্ছে-অনিচ্ছের চেয়ে তাদের সহকর্মীদের (বা, সহকর্মীদে্র সন্তান-সন্ততিদের) জীবনের জন্ম-পরীক্ষা-বিবাহ-আনন্দানুষ্ঠান ছুটি মঞ্জুর করার ক্ষেত্রে বেশি গুরুত্ব পায়। আর বলে ক্ষতি বিনে লাভ নেই, “ইন্সেন্সিটিভ” শোনার ব্যাপারে আজকাল আমি সেন্সিটিভ হয়ে গিয়েছি।
আমার কাজের শেষদিন, ৩০শে নভেম্বর, ছিল বুধবার। ২০ তারিখে, আমার চাকরীজীবনের শেষ উইকেন্ডের আগের রোববারে, ভোরবেলা উনি আমাকে ঘুম থেকে ডেকে তুললেন। “কুসুম, আমার পেটে অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে, আমি অ্যান্টাসিড, গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ সব খেয়ে ফেলেছি … কিন্তু কিছুতেই কমছে না, কিছু একটু করো, যাতে আমি একটু আরাম পাই!”
শারীরিক ব্যথা সহ্য করার ব্যাপারে আমার স্বামীর ক্ষমতার সঙ্গে আমার ভালোই পরিচয় আছে। একবার আমাদের এখানে একটা রাজনৈতিক বিক্ষোভের সময়ে কয়েকজন গুন্ডা কলেজ লাইব্রেরিতে আগুন লাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। অন্যান্য কর্মচারীরা বিপদ দেখে ‘চাচা, আপন প্রাণ বাঁচা’ নীতিগ্রহণ করেছিল, উনি কপালে ডান্ডার বাড়ি খেয়েও সেই বদমাইশদের একজনকে ধরে লাইব্রেরীর দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিয়েছিলেন, ফলে গুন্ডারা আর পুলিশ আসার আগে আগুন লাগিয়ে উঠতে পারে নি। তাঁকে উদ্ধার করতে দু’ঘন্টার ওপরে সময় লেগেছিল। এই দুটিঘন্টা তিনি কপাল থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরে পড়া রক্ত নিয়েও নাহোক দশ বছরের ছোট, পেশাদার একজন দুষ্কৃতিকে লাইব্রেরিতে আটকে রেখেছিলেন, শুধু বই বাঁচাতে। এখন তিনি ‘অবসরপ্রাপ্ত’ বৃদ্ধ বটে, কিন্তু কষ্টটা প্রচন্ড না হলে আমাকে সেই অভিশপ্ত ভোরে ওভাবে ঘুম থেকে ওঠাতেন না, সে বিষয়ে আজও আমি নিশ্চিত।
আমাদের মফঃস্বল শহরে ভোরে ডাক্তার-বদ্যি পাওয়া যায় না। সেদিন রোববার। আমাদের যিনি পারিবারিক চিকিৎসক তিনি দু’সপ্তাহ আগে বেড়াতে গিয়েছেন, মঙ্গলবারের আগে ফিরবেন না। আমি প্রথমে ওঁকে কিছু ঘরোয়া দাওয়াই দিলুম, কিন্তু তাতে ওঁর কোন উপশমই হল না। আমার দন্তশূলের জন্যে একটা পেনকিলার আনানো হয়েছিল, সেটা খেয়ে উনি চোখ বন্ধ করে আচ্ছন্নের মত শুয়ে রইলেন সাময়িকভাবে। ওঁকে শহরের আরেকজন ডাক্তার, যাঁর কাছে আমরা আগেও গিয়েছি অবরেসবরে, তাঁর চেম্বারে নিয়ে গেলুম। যথারীতি নোটিশ ঝোলানো আছে, ‘রবিবার বন্ধ।’, এদিকে উনি তখন যন্ত্রণায় প্রায় অজ্ঞান। অটোরিক্সা করে আরো দুজন ডাক্তারের চেম্বারে গিয়েও কাউকে পাওয়া গেল না, তখন উনি অর্ধনিমীলিত চোখে আমাকে বললেন, “কুসুম, চলো, আমরা সদর হাসপাতালের এমার্জেন্সীতে যাই।”
সেই প্রথমবার সাময়িক নিরাময়ের ব্যাকুলতা কাটিয়ে দীর্ঘকালীন স্বাস্থ্য-দুশ্চিন্তা আমার মনে এল। যে লোকটাকে আমাদের বিয়াল্লিশ বছর আটমাসের যৌথজীবনে নিজের জন্যে ডাক্তার, ইঞ্জেকশ্যন, হাসপাতাল - সবরকম আধুনিক চিকিৎসাকে দূরে রাখতে দেখেছি (আমার জন্যে অবশ্য তাঁর আধুনিক চিকিৎসা ও চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে কখনো আপত্তি হতে দেখি নি), সেই মানুষটা কিনা পেটব্যথার জন্যে হাসপাতালের এমার্জেন্সীতে যেতে চাইছে। এ তো কোন সাধারণ অসুখ নয়!
হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা শুরু করতে ঘন্টা দুই লাগলো। ওখানেও কর্মী অপ্রতুল। আরো একঘন্টা পরে মেট্রন এসে ওঁকে ঘুমপাড়ানি ইঞ্জেকশ্যন দিলেন, তখন অসহ্য ব্যথায় তিনিও ধুঁকছেন, তাঁর কষ্ট দেখতে না পেরে আমিও কাঁদছি।
সেদিন দুপুরে আমাদের দুজনের খাওয়া জোটে নি। আমি তো আগে কখনো এরকম মেডিক্যাল এমার্জেন্সী’র সম্মুখীন হইনি। জুনিয়র একজন হাউসস্টাফ রাউন্ডে আসবেন শুনে তাঁর জন্যে হত্যে দিচ্ছিলুম। সেই ডাক্তার ডাক পেয়ে এসে যখন ওষুধ আর অনেক টেস্ট লিখে দিলেন তখন চারটে বেজে গিয়েছে। সেরাতে ওঁকে হাসপাতালে ভর্তি রাখতে আমাকে একবার বাড়ি এসে নিজের আর ওঁর আই-কার্ড নিয়ে গিয়ে সব সইসাবুদ করতে আরো ঘন্টাখানেক লাগলো। তারপরে সকালের মেট্রন নিজে বাড়ি যাওয়ার সময়ে আমাকে বললেন আমার এখানে আজ আর কিছু করণীয় নেই, এলাকাটা খারাপ, আমি যেন বাড়ি গিয়ে রাতে বিশ্রাম নিয়ে কাল আবার আসি।
সেরাতে নিজেকে খুব একাএকা, অসহায় লাগছিল। এই একাকিত্বটা চল্লিশবছর ওঁর পাশে শুয়ে যে একাকিত্ব অনুভব করেছি, তার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
এক হিসেবে, আমাদের চার দশকের বাঁচাটা তো একরকমের মরে থাকাই। আমরা এসে দুজনের নতুন সংসার পেতেছিলুম এক ছোট্ট শহরে, যেখানে একজন মানুষও আমাদের আগে চিনতো না। উনি এই কলেজিয়েট স্কুলে লাইব্রেরিয়ানের চাকরি পেয়েছিলেন বলেই আমরা দু’বাড়িতে নিজেদের বিয়ের সিদ্ধান্ত জানাতে পেরেছিলুম। এখানে এসেই উনি আমাকে প্রাইভেটে ঠেলেঠুলে গ্র্যাজুয়েট বানিয়ে তুললেন, আর তারপরেই পোস্টাফিসের কেরাণির চাকরীটাও আমার কোনও উমেদারি ছাড়াই জুটে গেল। উনি আমাকে সাহিত্য ভালোবাসানোর চেষ্টায় মেতে উঠলেন। আমরা নিতান্তই সাংসারিক প্রয়োজন ছাড়া কটাই বা বাড়তি কথা বলতুম? যেদিন উনি আমার শাশুড়ির অশৌচগৃহ থেকে একজোড়া সোনার বালা হাতে ফিরে এলেন পূর্বাশ্রমের সবকিছু খুইয়ে, আগের চেনা প্রেমিক মানুষটি কেমন যেন অন্যরকম হয়ে গেলেন। নিজের সাধ্যমত যত্নে আমাকে রাখতে কোনোদিন তাঁর ত্রুটী হয় নি। কিন্তু সংসারে, আমি সহজেই টের পেতুম, তাঁর টান নেই। আমরা সহ-বাস করেছি দশকের পর দশক, সহবাসও দাম্পত্যজীবনের প্রাকৃতিক টানে করেছি নাহোক কয়েকশো বার, কিন্তু সহধর্মী বা সহধর্মিণী হয়ে উঠতে কি আমরা উদ্বুদ্ধ হয়েছি, উন্মুখ থেকেছি? এক অদৃশ্য দূরত্ব আমাদের মধ্যে থেকেই গিয়েছে। যে দেড়-কামরার ভাঙা বাড়িটিতে আমরা প্রথম সংসার পেতেছিলুম, সেই বাড়িটিই আমরা পরে সস্তায় কিনে নিই। অথচ, বাড়িটা যে তাঁর কলেজ বা আমার পোস্টাফিস, কারও কাজের জায়গা থেকেই হাঁটাপথের দূরত্ব ছিল - এমন না। আমাদের তখন যা আর্থিক সঙ্গতি, আমরা আরেকটু বড় বাড়ি আরেকটু সম্ভ্রান্ত পাড়ায় কিনতেই পারতুম, কিন্তু আমাদের কারোরই কোনও উৎসাহ ছিল না ব্যাপারটায়।
বিয়ের কিছু বছর পরেও যখন আমরা নিঃসন্তান, তখন আমি ওঁকে ডাক্তার দেখানোর কথা বলেছিলুম। যে ডাক্তারের কাছে আমরা প্রথমবার গিয়েছিলুম তিনি পরীক্ষা করে আমাদের দুজনকেই পাশ করিয়ে দিয়েছিলেন। তারপরেও যখন কিছু হল না, তখন অন্য কোনও ডাক্তার দেখানোর কথা যতবার বলতুম, উনি শুনে প্রতিবারই হুঁ-হাঁ করতেন, কিন্তু তারপরেই আলোচনাটা কেমন পিছলে বা মিইয়ে যেত, ফলপ্রসূ কোনকিছু আর করা হত না। শেষে আমি এই সিদ্ধান্তে আসি, তাঁর মায়ের আত্মহত্যার জন্যে পরোক্ষভাবে হলেও দায়ী মহিলার গর্ভে উনি নিজের বংশের বীজ বপন করতে অনিচ্ছুক। নিজের শারীরিক ক্ষুধা আমার মাধ্যমে তৃপ্ত করতে চাওয়ার ব্যগ্রতা কখনোই আমি তাঁর মধ্যে লক্ষ্য করি নি, অথচ আমার ডাকে সাড়া দিতে তিনি ক্বচিৎ অরাজি হতেন। আমি যে পরিবেশে বড় হয়েছি, সেখানে অন্য জাতের নারী বা পুরুষকে প্রেম নিবেদন করার উদাহরণ সামনে ছিল, কিন্তু স্বামীর সঙ্গে এক বিছানায় শুয়ে, তাঁকে কিভাবে বলতে হয় যে মূল ব্যাপারটায় তিনি উদ্যোগ নিলে, সম্ভোগে আদিম হলে আমার ভালো লাগবে, সেই সোজাসাপ্টা হওয়ার মত নির্লজ্জ প্রগলভতাটা আমার শিক্ষায় ছিল না। তা’বলে কি আমাদের মধ্যে কিছুই হত না? হত তো, আমরা দুজনেই কিভাবে যেন টের পেতুম আজ ‘হওয়ার’ দিন আছে, দুজনেই ঘেঁষে আসতুম, সচেতন উদ্যম ছাড়াই অন্ধকারে আমাদের অভিসাররথ নিজেনিজেই যাত্রাপথ তৈরী করে নিত।
আমার জন্যে ওঁর একটা সর্বব্যাপ্ত আর সহজাত স্নেহ, প্রতিক্ষণে টের পেতুম মানুষটা আমাকে মুড়ে রাখতে চায়, দিতে চায় সার্বিক নিরাপত্তা। আমার ছোটখাটো অসুবিধে নিয়ে তাঁর মাথাব্যথা (অথচ বড় জিনিসগুলোর খেয়াল নেই!) আর এই নরম রক্ষাকর্তার ভূমিকাতেই তিনি আমার মনে চরম ভয় জাগাতেন। একপৃথিবী আত্মীয়-বন্ধু, সমাজ-সংসার, ছোটবেলা ছেড়ে এসেছি যে একটিমাত্র মানুষের কাছে থাকার জন্যে, তাঁকে হারানোর, আঘাত করার, দূরে সরানোর ভয় আমাকে সবসময়ে তাড়িয়ে বেড়াত। এই নিরাপত্তাহীনতার ভয়ের নিরাপত্তাহীনতা আমার ভেতরে জন্ম দিয়েছিল এক বিষাদের, আরো তীব্র, তীক্ষ্ণ করে তুলেছিল আমার একাকিত্বকে। আমি সবসময়ে সচেষ্ট থাকতুম, সম্পর্কের নতুন কোনও মাত্রা আবিষ্কার বা উপভোগ করতে না পারি, এমনকিছু আমার করা চলবে না যাতে এই মানুষটা কষ্ট পেতে পারে। বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাটুকুকেও রুখতে আঁকড়ে ধরার মত অনেককিছুকেই দূরে সরিয়ে রেখেছিলুম!
জানেন, প্রতিবছর আমরা নিয়ম করে দু’বার বেড়াতে যেতুম। সমুদ্রসৈকতের হৈচৈতে, বা নদীকূলবর্তী ভ্রমণকেন্দ্রে, মাঝেসাঝে কোনও পাহাড়ে আমরা কাটিয়ে আসতুম কটা দিন। দেশের প্রায় প্রত্যেকটি রাজ্যেই আমরা গিয়েছি, মন্দির-স্থাপত্য-দুর্গ-মহানগরী-যাদুঘর আমরা কোটি-কোটি বৈশিষ্ট্যহীন ভ্রামণিকের মতই দেখেছি, সামনাসামনি দেখার উচ্ছ্বাস স্মৃতিতে কিছু দাগ রেখেছে বটে, কিন্তু আমাদের সম্পর্ককে নিবিড় করে তোলে নি। বড় সাধ ছিল কোনো নির্জন বনবাংলোতে কটা দিন কাটাবো, যেখানে তখন আমরা ছাড়া কেউ নেই, আদিম হব দুজনে, বিয়ের আগে ভেবেছিলুম যেসব হরকৎ-কসরৎ, প্রকৃতির সান্নিধ্যে সেগুলো নিয়ে মেতে কয়েকটা দিন এমনভাবে কাটিয়ে আসবো যে ফিরে এসেও আমাদের সম্পর্কে থাকবে কিছু বিদ্যুৎঝলক, যা আমাদের প্রতিদিনের জীবনকে দেবে আরেকটু নিবিড়তা। এখন দেখি, অ্যালবামে ধরা পড়া শুধু ঢেউ-স্রোত-গাছপালা-মিনার-সৌধ-প্রত্ননিদর্শন, আমি মানুষটা অদৃশ্য। লাইব্রেরিয়ান মহোদয় প্রত্যেকবার এই ছবিগুলোর মধ্যে থেকেই কেন একটা-দুটো ছবি আলাদা করে অন্য একটা আলবামে সাজিয়ে রাখতেন, আজো বুঝি নি।
বেড়াতে যাওয়ার মাঝের সপ্তাহগুলো আমরা সকালে উঠতুম, দুজনে মিলে জলখাবার তৈরী করতুম আর খেতুম একসঙ্গে, তারপর যে যার অফিসের জন্যে বেরিয়ে পড়তুম। ক্বচিৎ তাঁর আমার আগে ছুটি হ’লে তিনি আমার আপিসের সামনে অপেক্ষা করতেন, দু’হাতে দুটো ভেলপুরির ঠোঙা নিয়ে। ব্যস, ঐটুকুই। তারপরে বাড়ি ফিরে সেই রান্না করা, খাওয়াদাওয়া’র মাঝে টুকটাক কথাবার্তা, খাওয়া শেষ হলেই দু’জনে দুটো বই নিয়ে নিঃশব্দে নিজেদের পড়ার জগতে ঢুকে পড়া। ঠিক এগারটায় ওঁর ঘড়িতে রাতের অ্যালার্ম বাজতো, উনি সেটা বন্ধ করে মুখেচোখে জল দিয়ে বিছানায় শুতে আসতেন। আমার অবশ্য পড়া অত সময় মেনে শেষ হত না। ভালো না লাগলে আমি সাড়ে নটাতেও আলো নিভিয়ে শুয়ে একলা ছটফট করেছি, আবার পাঠ্যবইটির প্রসাদগুণে রাত দেড়টা অব্দি আলো জ্বালিয়েও গোগ্রাসে ছাইপাঁশ গিলেছি। ওঁর তাতে ঘুমের কোনও ব্যাঘাত হত না। যেদিন ফেরোমোন বা টেলিপ্যাথি কিছু একটা থেকে জানতুম, আজ রাতে কিছু ‘হওয়ার’ আছে, সেদিন একসঙ্গে পড়া সাঙ্গ হতো, দুজনে জন্মদিনের পোষাকে একে অপরকে আঁকড়ে ধরতুম, দুজনেরই দীর্ঘশ্বাসে বিষাদ মিশে থাকত অনেকটা করে, কেন কে জানে! জৈবিক যা কিছু হতো, তা দৈবিক না হলেও আধা বেহুঁশে, মাঝরাতে, ঘুমের ঘোরে, স্বপ্নের শুরুতে এমনভাবে মিশে যেত, যে কোনটা ঘটেছিল, আর কোনটা ভেবেছি, স্পষ্ট ফারাক মনে পড়ত না পরদিন সকালে।
খারাপ খবরটা পেলুম ওঁকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়ার দু’দিন পরে। পাকস্থলীর ক্যান্সার, তৃতীয় স্টেজ।
“কুসুম” উনি বাড়ি এসে ভাবলেশহীন গলায় বললেন, “ডাক্তাররা বলছে বটে কেমোথেরাপি করালে আমি এখনো এক বছর বাঁচবো, কিন্তু আমার মন বলছে, একবার ওদের পাল্লায় পড়লে আমার মেয়াদ আর তিন মাসের বেশি নয়। আমি হিমালয়ের একটা আয়ুর্বেদ চিকিৎসাকেন্দ্রের খোঁজ পেয়েছি, ওখান থেকে একবার ঘুরে আসি, তুমি আমাকে পনেরোটা দিন সময় দাও, তাতে আমি হান্ড্রেড পার্সেন্ট রোগমুক্ত হয়ে ফিরে না এলে এসব তো রইলোই।”
আমি তখনো দুঃসংবাদের অভিঘাতে অস্থির, তাছাড়া কোনদিন তো এইসব রোগ, রোগী, চিকিৎসা, হাসপাতাল নিয়ে সেরকম বিপদে পড়তে হয় নি, তাই খুব শক্তভাবে সেই উদ্ভট পরিকল্পনাটাকে উড়িয়ে দিতে পারলুম না তক্ষুণি। আর যাদুকররা যেমন টুপি থেকে খরগোস বের করে, অনেকটা অবিকল সেই ভঙ্গিমায় তিনি নিজের ফতুয়ার পকেট থেকে একটা ট্রেনের টিকিট আমার সামনে মেলে ধরলেন, আর তাঁর গলায় একটা আকুতি ফুটে উঠল, “তুমি যদি একবারও না বলো কুসুম, তাহলে আমার আমার এই যাওয়া সফল হবে না! … তুমি কোন চিন্তা কোরো না, তুমি চাকরি থেকে রিটায়ার করতে করতে আমি ক্যান্সারকে বিসর্জন দিয়ে তোমার কাছেই ফিরে আসবো।”
জামাকাপড় গুছোতে তাঁর আধঘন্টার বেশি সময় লাগল না, সন্ধ্যেবেলা আমরা স্টেশ্যনের কাছে একটা বড় ধাবাতে নৈশভোজ সারলুম, আমরা দুজনে প্রথা ভেঙে রাতের বেলাও মাংস খেলুম। এখানে ওঁর শেষরজনীতে আমার হাতের রান্না আর ওঁর খাওয়া হলো না। এতগুলো বছরের নিত্যিনিশির রান্নায় আমার তরফ থেকে যে দিনগত পাপক্ষয়ের অযত্ন চুইয়ে ঢুকে পড়েছিল, তা শোধরানো আর হল না আমার। তারপর তিনি ট্রেনে উঠে আমাকে চিরকালের জন্যে ফেলে রেখে চলে গেলেন। এবার আমি একলা হলুম আরেকভাবে, অনেক বেশি আক্ষরিক অর্থে, চিরতরে। এখন খুব ইচ্ছে করে জানেন, ওঁর জন্যে যত্ন করে ওঁর প্রিয় পদগুলো আবার রান্না করি। ওঁর শেষ খবর যবে থেকে পেয়েছি, তবে থেকে আর আলাদা করে রাতের রান্না করি না। সারাদিনে একবার চাল-ডাল একসঙ্গে ফুটিয়ে নিই, তাতে অন্যমনস্কভাবে একেকদিন একেকরকম মশলা চিমটিখানেক ফেলে দিই ফুটন্ত হাড়িতে, সেটাই কয়েক হাতা করে খাই এক বা দু’বার, বেশির ভাগটাই ফেলে দিই পরের দিন। এটা করে আমার সন্ধ্যেগুলো আরো ফাঁকা, বিবর্ণ হতে পেরেছে। আরো একলা হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে আমার নিঃসঙ্গতাকে। এই বেঁচে থাকা, যেখানে আমার বিচ্ছেদব্যথার সঙ্গে প্রতি মুহুর্তের সহচর এক অকথ্য সন্দেহ, আমার জীবনকে সত্যিই দুর্বিষহ করে তুলেছে।
আমার স্বামী এই অকালসফরে যাওয়ার পরে প্রথম কদিন আমি নিজেকে চূড়ান্ত ব্যস্ত রেখেছিলুম। অফিসে অ্যাসিস্ট্যান্ট মাস্টার নীরবসাহেবকে কাজ বোঝাচ্ছি, নিজের আর কিষেণের কাজ সামলাচ্ছি, আর ফাঁকেফাঁকে মারণরোগ নিয়ে পড়াশুনো করছি। খোঁজ নিচ্ছি চিকিৎসা-পদ্ধতি আর চিকিৎসকদের নিয়ে। তখনই মনে কু ডাকছিল যে পনেরোদিন দেরী করাটার চড়া দাম দিতে হবে। এদিকে উনি কল করতে বারণ করেছেন, শুধু মেসেজিং ভরসা। ওঁকে বকাবকি করে চলে আসতেও বলতে পারছি না, পুরোপুরি নিঃসংশয়ে। দু-একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট ফোনেই জোগাড় করার উপক্রম দেখছিলুম, কিন্তু যেই তারা শোনে যে রোগী আমার সঙ্গে নেই, আর কবে হিমালয় থেকে নামবে তাও নিশ্চিত নয়, অমনি তারা কথাবার্তা থামিয়ে দেয়। এদিকে আমি এইসব আলোচনা করছি যথাসাধ্য সঙ্গোপণে, আত্মীয় তো আমাদের কেউই ছিলো না কোনদিন, পরিচিত বা প্রতিবেশীদের যাদের সঙ্গে এতদিনেও সখ্য নিতান্তই আলগা-আলগা, তাঁদের মেকী সহানুভূতি, যা আমরা সারাজীবন দূরে-দূরেই রাখতে পছন্দ করেছি, সেসবের যতদূর সম্ভব ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে। তখনও কি জানতুম আমার চল্লিশ বছরের বরটি এইরকম কাপুরুষ! আমি তো আসলে ভুলেই গিয়েছিলুম আত্মহত্যার পাপ ওর রক্তে, মা’র কাছ থেকে পাওয়া স্বভাব আর যাবে কোথায়! মাঝখান থেকে শুধু আমার জন্যই এক সন্দেহের বীজ রেখে গেল বাকী জীবনের জন্য।
আমার ফোন করা বারণ ছিল বটে, কিন্তু ওঁর তো এসব কোন বারণ-বাধা-বিধিনিষেধ কোনকালে ছিল না! শেষ দুদিন উনি খুব ঘনঘন ফোন করছিলেন, মেসেজ পাঠাচ্ছিলেন, কোথাও যেন একটা স্বভাববিরুদ্ধ উচ্ছলতা ফুটে উঠছিল ওঁর মধ্যে। আমি চিকিৎসা-ডাক্তার নিয়ে যতবারই আলোচনা করতে চাইলুম, উনি সব মন দিয়ে শুনলেন, প্রশ্ন করলেন, তারপরে বললেন, “প্ল্যানটা ঠিকই করেছ কুসুম, তবে আমি গিয়ে তারপরে টাকা-পয়সা পেমেন্ট করবো।” আমিও, তা হোক না যতই পোস্টাফিসের কেরাণী, তো ত্রিশ বছরের ওপরে চাকরী করেছি, আমি কি এই খরচটা দিতে পারি না! কিন্তু উনি কিছুতেই রাজি হলেন না, সেই এক কথা, “না কুসুম, পুরো বিশ্বাস না থাকলে এই আধ্যাত্মিক পথে আরোগ্য হয় না। আমি ফেরার আগে তুমি কোনো ডাক্তার বা হাসপাতালকে পয়সা দিও না।” আমি কি তখনও একবারও বুঝেছি ওঁর আসল মতলবটা কী? এর মধ্যে তিনি স্মার্টফোনে ওঁর সেই আশ্রমের পাশের পাহাড়, নদী - এসবের ছবি পাঠাতে শুরু করলেন। সেগুলোর কোনটাতেই ঘরবাড়ি, হাসপাতাল, যোগী, চিকিৎসক কেউ নেই, কিছু নেই, শুধুই সুন্দর, সমাহিত, শান্ত প্রকৃতি। আমি বেশ কয়েকবার জানতে চাইলুম, চিকিৎসা বা নিরাময়ের কতদূর কী হলো, দেখলুম উনি প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাচ্ছেন।
এরপরে ওঁর কাছে ওঁর সেই বোনঝি তরলা’র কথা শুনলুম, যে নাকি ওঁর আশ্রম থেকে মাত্র আধঘন্টার দূরত্বেই থাকে। সন্ধ্যেবেলা একটা ছবি পাঠালেন, সেখানে এই কদিনে প্রথমবার ওঁর মুখ দেখতে পেলুম আর দেখলুম সেই মেয়েটির মুখ, যে মুখ এ জীবনে না দেখলেই বোধ করি বেশি ভালো ছিল!
মেসেজ করে জানতে চাইলুম, “এই কি তরলা?”
উনি জবাবে শুধু একটা হাসি-হাসি স্মাইলি পাঠালেন। দুজনের মুখের কী আশ্চর্য মিল! হঠাৎ আমার এই মারণ রোগাক্রান্ত মানুষটাকে খুব ভালবাসতে ইচ্ছে করল, ভালবাসি জানাতে ইচ্ছে করল। মনে হল, কেন উনি আমার কাছে নেই! আমি নির্লজ্জের মত ওঁকে মেসেজ করলুম, “আই লাভ ইয়ু!” সে মেসেজে পাঠ করার দুটি নীল টিক ফুটে উঠল। তারপর, সব চুপ … পরের দু’দিন কোনও মেসেজ, কল, অন্য ফোন থেকে ওঁকে ফোন বা যোগাযোগ করার চেষ্টা - সব বিফলে গেল।
পুলিশের পক্ষ থেকে তৃতীয়দিন ফোনটা এসেছিল সন্ধ্যে ৬টা ৪৭ মিনিটে। কেজো গলায় আমার পরিচিতি নিশ্চিত করার পরে নিরাবেগ কণ্ঠে আমার স্বামীর পাহাড়ী নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করার খবর জানিয়ে শব মর্গ থেকে সংগ্রহ করার নিয়মকানুন জানিয়ে তারা ফোনটি কেটে দেয়। আমাকে অবশ্য তাঁর নিষ্প্রাণ দেহটি হিমালয় থেকে আবাহন করে আমাদের শহরে আনতে হয় নি। তরলা, ওর মামাতো ভাই সুমিত, সুমিতের বাবা-মা সেই কাপুরুষটার পোস্টমর্টেম করা দেহাবশেষ নিয়ে আমার কাছে হাজির হয়েছিলেন। “আই লাভ ইয়ু” বলার পাওনা-দেনা তো এভাবেই মেটায় চল্লিশ বছরের থাকা ও না-থাকা সম্পর্ক!
অশৌচের সময়টা তরলা আমার এই দেড়কামরার ঘরে রইলো। সুমিতরা সামলালো সমস্ত আয়োজন। আমি বারবার ওদের মুখ দেখছিলুম, আর ভাবছিলুম, ওঁর মুখের সঙ্গে ওদের দুজনেরই কী প্রচন্ড সাদৃশ্য রয়েছে। বিশেষ করে তরলা’র মুখ তো কেটে বসান যেন। আচ্ছা, এতটাই মুখের মিল কি কাকা বা মামাদের সঙ্গে কারুর হয়?
উনি গবেষণার জন্য দেহদান করে গিয়েছিলেন, কিন্তু পুলিশের ছুরিকাঁচি সে সম্ভাবনাকে রদ করেছিল। তবে নিজের অদ্ভুত শেষ ইচ্ছেটুকু উনি একজন লাইব্রেরিয়ানের দক্ষতায় এমনভাবে লিপিবদ্ধ করে গিয়েছিলেন, সেগুলোকে এড়ানোর পন্থা কারো জানা ছিল না। জীবনের শেষ ঝাঁপ দেওয়ার সময়েও তাঁর শরীরে শক্ত করে আটকানো ছিল একটা প্লাস্টিকের চেনবন্ধ বটুয়া, যাতে ছিল ওঁর ভোটার আই-কার্ডের প্রতিলিপি, আত্মহত্যা করার কারণ (সেই রবিবারের এক মাস আগে থেকে তিনি জানতেন এই রোগ তাঁর শরীরে বাসা বেঁধেছে ও কতটা বিস্তার লাভ করেছে, অথচ পাশে শুয়েও আমি কোনদিন তা টেরও পাই নি।), আমার এবং সুমিতের যোগাযোগের নম্বর ও কীভাবে ওঁর শেষ ইচ্ছালিপিখানি খুঁজে পাওয়া যাবে । ঐ একই পাউচে ছিল তাঁর স্মার্ট ফোনটাও। এবং কী আশ্চর্য! যে আছাড়ে একটা মানুষের প্রাণ চলে গেল, সেই পতন এবং দীর্ঘক্ষণ জলের মধ্যে থেকেও সেটাও প্রায় অক্ষতই ছিল। চার্জে বসানো থাকা অবস্থায় ছুঁলে সেটা এখন একটু শক দেয় বটে, কিন্তু যে শক জীবন আমাকে দিয়েছে, সে তুলনায় এ আর কী! এখনও সেখানে আমাদের দুজনের সব বার্তালাপ পড়া যায় ইচ্ছে করলেই।
ওঁর শেষ ইচ্ছালিপি যখন আমাদের বাড়ির দেরাজ থেকে বের করে পড়া হচ্ছে, তখন আমার অস্বস্তি আরো বাড়লো। উনি প্রত্যাশা করেছেন তরলা তাঁর অন্ত্যেষ্টিতে যোগ দেবে, সেটা অবশ্য দুই কাজিনে না জেনেই করেছিল। এই চিঠিতেই আমার জন্যে রাখা ছিল ওঁর শেষ উপরোধ! সেটা পড়ার পরে, বিশ্বাস করুন, আমার যেটুকু জিজীবিষা বাকী ছিল, চলে গিয়েছে। উনি বলেছেন, যদি ওঁর শেষকৃত্যে তরলা আসে, তাহলে আমি, যদি ইচ্ছে করি, তাহলে সেই সোনার বালাদুটো তরলাকে দিতে পারি। আমি কেন সেই আদেশ অমান্য করতে যাবো। ও জিনিশ তো চার দশকে দু’বার পরেছি, একবার ওঁর চাকরীজীবনের রৌপ্যজয়ন্তীপূর্তির সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানে, আর একবার সেই সাহসিকতার জন্যে পুরষ্কার দেওয়ার বেলায়। হুহ! সাহসিকতা! তখন কে জানত, লোকটা একটা ভিতুর ডিম, ঠিক ওর মায়েরই মত! শ্রাদ্ধের দিন ওঁদের দিকের আত্মীয়স্বজন, ওঁর প্রাক্তন সহকর্মী, আমার (বর্তমান, না প্রাক্তন, এখনও জানি না, আমার অবসরের কাগজপত্র, সইসাবুদ এখনও সব ঝুলে আছে) সহকর্মীদের সামনে আমি সেটা তরলার জন্যে তুলে দিয়েছি সুমিতের মা’র হাতে। তরলা কেঁদে আকূল হচ্ছিল, আর ওর কান্নায় ভিজে যাওয়া, ভেঙে চুরমার হতে থাকা মুখে আমি স্পষ্ট হয়ে উঠতে দেখছিলুম আমার স্বার্থপর পতিটিকে, এই দীর্ঘ চার দশকে যে কর্কটরোগ, সমস্ত কান্না ছাড়াও আমার থেকে না জানি আর কীকী লুকিয়ে রেখেছে! তাঁকে আমি কোনদিন কাঁদতে দেখি নি তো! পুরুষমানুষ! সাহসী পুরুষমানুষ!
তরলা ওর ফোনে দেখিয়েছে, ওঁদের দুজনের একসঙ্গে তোলা একটা ছবি। মৃত্যুর তিনদিন আগে তোলা। যে পাহাড় থেকে ঐ কাপুরুষটা ঝাঁপ দিয়েছিল, তার কাছের একটা সরাইয়ে দুজনে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। উনি আমাকে যে ছবিটা পাঠিয়েছিলেন, সেটার সেই একই পোষাক সে এখানেও পরে আছে। পেছনে একই নদীর দুর্দ্ধর্ষ পশ্চাদপট। তরলা’র কথা অনুযায়ী, উনি ওকে ডেকেছিলেন এই বলে যে ‘তোর কলেজের কাছাকাছি আসছি, অমুকদিন সন্ধ্যেবেলা তুই ফাঁকা থাকলে এসে দেখা করিস, কফি খাওয়া যাবে, আর তুই চাইলে আমাদের একসঙ্গে কয়েকটা ছবিও তোলা থাকবে!’ অবিশ্বাস করি নি সে কথা, কিন্তু বড় ধাক্কা লেগেছে, যখন জেনেছি এর আগে ওঁদের দুজনের আরো একবার দেখা হয়েছিল বছরখানেক আগে, নাকি নেহাৎই ঘটনাচক্রে, যখন নিজেদের কলেজের হয়ে তরলা এসেছিল ওঁদের কলেজে একটি সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে।
জানি, মৃত্যু অনেক কিছু মুছিয়ে দেয়, অনেক প্রশ্ন যা ছিল জ্বলন্ত জীবৎকালে, তাকে করে দেয় গুরুত্বহীন, পছন্দের না হলেও অশান্ত, বিক্ষুব্ধ , সন্দিগ্ধ হৃদয়ে ও সম্পর্কের ওপর অনেক সময়েই চাপিয়ে দেয় এক চরম অন্ত, যার বিরুদ্ধে আর কোন আবেদন-নিবেদনেই আর কোন কাজ হওয়ার নয়। কিন্তু যখন মৃত্যু থেকেই জন্ম নেয় সন্দেহ, তখন জীবিত মানুষগুলোর দুর্বিষহ জ্বালা অপনোদনের আর কোনই উপায় থাকে না। ঐ ভিতুটা ঐ কাজটা কেন করেছিল, তার যুক্তিগ্রাহ্য কোন কারণ খুঁজে না পেলেও আমি নিজেকে এই বলে সান্ত্বনা দিই যে যার মা বিংশ শতাব্দীতেও সতীর মৃত্যুবরণে গৌরব পান, তার রক্তেই আছে কাপুরুষতার বীজ, সে না পালিয়ে যাবে কোথায়! কিন্তু তরলা?
এত মুখের মিল, আমার যদি একটা মেয়ে আজ থাকত! তরলাকে দেখার পর থেকেই আমার মনে কুটকুট করা শুরু করেছে। ধরে নিই, যদি ধরে নিই, মাতাপিতৃহীন তরলা নিছকই ওঁর ভাগ্নি নয়, তরলা ওঁর …
এই অনুমানটা বোধহয় ওঁর গত একবছরের অনেক বিদঘুটে আচরণকে চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করে ফেলতে পারে, তাই না! এ এক অদ্ভুত চিন্তা, যা আমি বুঝে ফেলেছি বাকী জীবন আমাকে তাড়া করে বেড়াবে, কুরে কুরে খাবে! সবচেয়ে বড় কথা, এই ভাবনাটা আমি কারো সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারবো না, কারো কাছে চাইতে পারবো না সহানুভূতি বা যৌক্তিক বিশ্লেষণ বা প্রতিকার, কারণ যে একটামাত্র মানুষকে অবলম্বন করে, যাকে সর্বতোভাবে বিশ্বাস করে সমস্ত সামাজিক সম্পর্ককে উপেক্ষা করে গেছি গত চারদশক, সেই লোকটাই আমাকে এই সন্দেহের মধ্যে ডুবিয়েছে। ভিতু! কাপুরুষ! সতীর বাচ্চা!
একা হওয়ার রকমফের আছে। সমস্ত পরিবার, আত্মীয়বন্ধু-চ্যুত হয়ে জীবননির্বাহ করার অভিজ্ঞতা তো আমার কমদিনের নয়। সামান্য সময়ের জন্য হলেও উনি যখন অসুস্থ কিন্তু জীবিত ছিলেন, তখনও অনুভব করেছি এক ভিন্ন ধরণের একাকিত্ব ও অসহায়তা। কিন্তু এই সন্দেহদীর্ণ যাপন অসহনীয়।
মিথ্যে বলবো না, তরলা আর ওর পিসি-কাকিরা আমার নিয়মিত খোঁজ রাখে। রোজকার স্বাচ্ছন্দ্যের খোঁজখবর নেয়, বারবার অনুরোধ করে একবার, অন্ততঃ একবার, ওদের সেই পারিবারিক ভিটেতে গিয়ে দাঁড়িয়ে ওদের ক্ষমা চাইবার সুযোগ করে দিতে। এমনকী তরলা এও বলেছিল, যদি আমি ফিরতে চাই আমার বেড়ে ওঠার সেই গঞ্জশহরটিতে, কাটাতে চাই বাকী দিনগুলো, আমার জন্যে ছোট একটা একতলা বাড়িও নাকি দেখে রেখেছে ওরা, আমার স্বাধীনভাবে থাকবার জন্যে। ভেবেছিলুম জানতে চাইবো ওদের কীসের গরজ আমাকে নিয়ে? কিন্তু সে প্রশ্ন করার আগেই তরলা উপযাচক হয়ে উত্তর দিয়েছে, “তোমার সম্পত্তির লোভে এমনটা করছি মনে হলে আমাকে বিদেয় করে দিয়ো! কিন্তু ঐ একটা সন্ধ্যের আলাপে মামা আমাকে নতুন একরকম শান্তি দিয়ে গিয়েছে মাইমা!”
“শান্তি”? “নতুন শান্তি”? “একরকম নতুন শান্তি”? শব্দেরা মাঝে মাঝে কী অসম্ভব ধারালো হয়, তাই না? এত ভালো মেয়েটা! অথচ তাকে ভালো বাসতেও পারছি না মন খুলে এই দুঃসময়ে!
ইচ্ছে করে, সময়ের কাঁটা উল্টোদিকে ঘুরিয়ে দেখি আমার মন থেকে এই কাঁটাটা উপড়ে ফেলতে পারি কিনা! সেই ধুসর, উষর, একঘেয়ে, ক্লান্তিকর প্রাত্যহিকতাকে কোনওমতে একবার, আরেকটিবার ফিরিয়ে আনা যায় যদি, যেখানে প্রতিমুহূর্তে আমাকে অবাস্তবপ্রায় সন্দেহে জর্জরিত হতে হতো না। কখনো নিজেকে শাসন করার চেষ্টা করি এই বলে যে এগুলো সবই অমূলক দুর্ভাবনা, আর তখন এক অপরাধবোধ আমাকে গ্রাস করে। কে জানে, যদি লোভে পড়ে ঐ “আই লাভ ইয়ু”টুকু না লিখতুম, হয়তো আজ জীবনটা এমন হতো না। আমাদের চল্লিশ বছরের ভালোবাসা, না-বাসার দিনগুলো তো এভাবেই কেটে গেলো, এর আগে শেষবার মুখ ফুটে প্রকাশ করেছিলুম সেই একদিনই মাত্র, যেদিন তিনি আমাকে বিয়ে করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তারপরেই আবার মনে হয়, কে জানে চল্লিশ বছর যে জীবন কাটিয়েছি, তা হয়তো ধোঁকার টাটিই ছিল! পুরুষমানুষ, দিনের শেষে তো পুরুষমানুষই।
আমার জীবনের বাকি দিনগুলো নিয়ে আমার আর কোন আগ্রহ নেই। নিজের অতীত জীবনেই যেখানে এরকম এক অসঙ্গতি, ভয়, নিরাপত্তাহীনতা, সবকিছুই প্রপঞ্চময়, সেখানে আমার বয়সে এসে ভবিষ্যৎ নিয়ে কীইবা ভাবি, বলুন! শুধু জানি, আমার বর্তমানটুকু থেকে আমি ছিটকে বেরোতে চাই, ছিঁড়ে ফেলতে চাই এই দৈনন্দিনকে। কী ভাববো, তা-ই আজকাল আমার মাথায় খেলে না।
ভগবান! আমাকে ঐ ভিতুটার সাহসটুকু দাও! হে ভগবান, আমাকে ঐ কাপুরুষটার কাছে পৌছনোর সম্বলটুকু দাও!
একাকিত্ব। এটাই তো আমাদের চারদশকের বিবাহিত জীবনের সবচেয়ে বড় লেইট্মোটিফ্। ওঁকে বিয়ে করার জন্যে যখন বাড়ি থেকে পালিয়েছি তখন আমার বয়স সাড়ে আঠেরো। জানতুম শুধু একটা মানুষকে আর দুটো তথ্য - একঃ আমার আঠেরো বছর বয়স পূর্ণ হয়ে গেলে আইনতঃ আমি যাকে খুশী বিয়ে করতে পারি। আর আমাদের ছোটবেলার সেই গঞ্জ-শহরে আইনে যেহেতু লোকের বিশেষ বিশ্বাস ছিল না, ওখানে থাকলে আমাদের দুজনেরই মারা পড়ার আশঙ্কা ছিল। বিপদ যে হয় নি, তার সম্ভবতঃ একমাত্র কারণ ছিলেন আমার স্বর্গগতা শাশুড়ি-মা। আগুনে পুড়ে আত্মহত্যা করার আগে আমার স্বামীর পিতামহকে উদ্দেশ্য করে যে চিঠি লিখে গিয়েছিলেন তাঁর পুত্রবধূ, তাতে বংশের প্রথম লিখি-পঢ়ি বহু’র আবেগপ্রবণ অনুরোধ ছিল যাতে আমাদের দুজনের কোন ক্ষতি না হয়। এছাড়াও তাঁর স্ত্রীধনের সবচেয়ে মোটা চুড়িটি তিনি আশীর্বাদস্বরূপ আমার জন্যে রেখে যান। আমার স্বামীর পরিবার সেই মৃত্যুপথযাত্রিণীর শেষ ইচ্ছের অমর্য্যাদা করেছিল, এমনটা বলব না। অশৌচের মধ্যেই সেই চুড়ির জোড় তৈরী করিয়ে, চুড়ি দু’গাছা আমার বরের হাতে সঁপে তাঁর পিতামহ জানিয়ে দেন, ভবিষ্যতে পরিবারের কোনও দায় বা অধিকার - কোনটাই যেন আমরা দাবী না করি। আমার বিবাহিত জীবনের প্রথম পঁয়ত্রিশ বছরে আমি আমার শ্বশুরবাড়ির কোন আত্মীয়কে দেখি নি, নিজের বাপ-মা বা অন্য আত্মীয়বন্ধুদের তো আর কখনোই নয়। যদিও উনি বরাবর, বারবার বলে এসেছেন যে আমাকে ভালোবাসতে গিয়ে যা কিছু ওঁকে বিসর্জন দিতে হয়েছে, তা নিয়ে ওঁর কোনও খেদ বা অনুতাপ নেই, আমাদের দু’জনের দাম্পত্যজীবনে কিন্তু আমার সেই কখনো দেখা-না-হওয়া মহিলার এক দৃঢ় প্রভাব থেকেই গিয়েছে। কোনদিন এবিষয়ে একটি কথাও ব্যয় না করে আমরা দুজনেই যেন জানতুম সেই নিষ্ঠ বধূর মৃত্যুর সমস্ত দায় আমাদের প্রেমের, আমার অবিমৃশ্য ভালবাসার, একমাত্র দায়িত্বজ্ঞানহীন আমার, শুধুই বেজাতে জন্মানো আমার। সেজন্যেই অবচেতনে সেই মৃত্যু আমাদের মাঝে দাঁড়িয়ে নতুন প্রাণের জন্মে বাধা দিয়েছিল।
এতগুলো বছরের আমাদের সহ-বাস, অনস্বীকার্যভাবেই, একঘেয়ে ছিল। তবুও এখন আমাকে যে সন্দেহ কুরেকুরে খাচ্ছে, সে তুলনায় গত জীবনটা শান্তির ছিল। ভিতুর ডিম একটা! পলায়নপর, মেরুদন্ডহীন, পোড়া চ্যালাকাঠের ছাওয়াল! এই যে অন্ধকার ভাবনাটা আমার মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে গেল, এটা থেকে আমি কী করে মুক্তি পাবো? এটা থেকে কি আমি আদৌ মুক্তি পাবো? এখন আমার ঐ একঘেয়ে জীবনটাতেই ফিরে যেতে ইচ্ছে করছে, যেখানে সকালে চোখ খুললেই সেই মানুষটাকে দেখতে পাওয়া যেত, যাকে সারাজীবন নির্ভর করে এসেছি। যাকে এই কদিনের দুঃস্বপ্নের কথা বললেই তিনি সস্মিতমুখে বলবেন, “কুসুম, ঐজন্যে বলি, সূর্য ডোবার পরে মাছ-মাংস খেও না।”
আমার যখন চাকরী থেকে অবসরের আর সপ্তাহচারেক বাকি, তখন আমার পোস্টাফিসের বড়বাবু আমাকে বললেন, “কুসুম, আমরা আপনার রিটায়ারমেন্টের কাগজপত্র তৈরী করেছি। কিন্তু আমার একটা অনুরোধ ছিল, আপনি যে আপনার আর্নড লিভগুলো নিয়ে নেবেন ভেবেছিলেন, সেটা করা যাবে না। রুক্মিণীর প্রেগন্যান্সিতে কিছু জটিলতা দেখা দিয়েছে, ডাক্তার ওঁকে পুরো বেডরেস্টে থাকতে বলেছে। আর কিষেণবাবুও সামনের কদিন থাকবেন না, সামনেই ওঁর ছোট মেয়ের বিয়ে,জানেনই তো … তাছাড়া আমি ফিন্যান্স-কে আপ্রুভ্যাল দিয়ে দিয়েছি আপনার সমস্ত ছুটি বিক্রি করে টাকা জমা করে দিতে … এখন নতুন হিসেব কষাও ঝামেলা, আর আপনিই বা টাকাকটা ছাড়বেন কেন? বুঝতেই পারছেন ক্যাল্কুলেশ্যন গোড়া থেকে করতে হলে টাকা হাতে পেতে অনেকদিন লেগেই যাবে।”
আগ বাড়িয়ে আমার হয়ে এই সিদ্ধান্ত নেওয়াটা আমার পছন্দ হয় নি, কিন্তু আমি খুব একটা আপত্তি করি নি। আমার এই চারসপ্তাহে কিছু করার পরিকল্পনা ছিলও না। তাছাড়া এই অফিসে অনেকদিন কাজ করেছি তো, জানি, পরিবার থেকে খেদিয়ে দেওয়া বাঁজা মেয়েদের ব্যক্তিগত ইচ্ছে-অনিচ্ছের চেয়ে তাদের সহকর্মীদের (বা, সহকর্মীদে্র সন্তান-সন্ততিদের) জীবনের জন্ম-পরীক্ষা-বিবাহ-আনন্দানুষ্ঠান ছুটি মঞ্জুর করার ক্ষেত্রে বেশি গুরুত্ব পায়। আর বলে ক্ষতি বিনে লাভ নেই, “ইন্সেন্সিটিভ” শোনার ব্যাপারে আজকাল আমি সেন্সিটিভ হয়ে গিয়েছি।
আমার কাজের শেষদিন, ৩০শে নভেম্বর, ছিল বুধবার। ২০ তারিখে, আমার চাকরীজীবনের শেষ উইকেন্ডের আগের রোববারে, ভোরবেলা উনি আমাকে ঘুম থেকে ডেকে তুললেন। “কুসুম, আমার পেটে অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে, আমি অ্যান্টাসিড, গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ সব খেয়ে ফেলেছি … কিন্তু কিছুতেই কমছে না, কিছু একটু করো, যাতে আমি একটু আরাম পাই!”
শারীরিক ব্যথা সহ্য করার ব্যাপারে আমার স্বামীর ক্ষমতার সঙ্গে আমার ভালোই পরিচয় আছে। একবার আমাদের এখানে একটা রাজনৈতিক বিক্ষোভের সময়ে কয়েকজন গুন্ডা কলেজ লাইব্রেরিতে আগুন লাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। অন্যান্য কর্মচারীরা বিপদ দেখে ‘চাচা, আপন প্রাণ বাঁচা’ নীতিগ্রহণ করেছিল, উনি কপালে ডান্ডার বাড়ি খেয়েও সেই বদমাইশদের একজনকে ধরে লাইব্রেরীর দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিয়েছিলেন, ফলে গুন্ডারা আর পুলিশ আসার আগে আগুন লাগিয়ে উঠতে পারে নি। তাঁকে উদ্ধার করতে দু’ঘন্টার ওপরে সময় লেগেছিল। এই দুটিঘন্টা তিনি কপাল থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরে পড়া রক্ত নিয়েও নাহোক দশ বছরের ছোট, পেশাদার একজন দুষ্কৃতিকে লাইব্রেরিতে আটকে রেখেছিলেন, শুধু বই বাঁচাতে। এখন তিনি ‘অবসরপ্রাপ্ত’ বৃদ্ধ বটে, কিন্তু কষ্টটা প্রচন্ড না হলে আমাকে সেই অভিশপ্ত ভোরে ওভাবে ঘুম থেকে ওঠাতেন না, সে বিষয়ে আজও আমি নিশ্চিত।
আমাদের মফঃস্বল শহরে ভোরে ডাক্তার-বদ্যি পাওয়া যায় না। সেদিন রোববার। আমাদের যিনি পারিবারিক চিকিৎসক তিনি দু’সপ্তাহ আগে বেড়াতে গিয়েছেন, মঙ্গলবারের আগে ফিরবেন না। আমি প্রথমে ওঁকে কিছু ঘরোয়া দাওয়াই দিলুম, কিন্তু তাতে ওঁর কোন উপশমই হল না। আমার দন্তশূলের জন্যে একটা পেনকিলার আনানো হয়েছিল, সেটা খেয়ে উনি চোখ বন্ধ করে আচ্ছন্নের মত শুয়ে রইলেন সাময়িকভাবে। ওঁকে শহরের আরেকজন ডাক্তার, যাঁর কাছে আমরা আগেও গিয়েছি অবরেসবরে, তাঁর চেম্বারে নিয়ে গেলুম। যথারীতি নোটিশ ঝোলানো আছে, ‘রবিবার বন্ধ।’, এদিকে উনি তখন যন্ত্রণায় প্রায় অজ্ঞান। অটোরিক্সা করে আরো দুজন ডাক্তারের চেম্বারে গিয়েও কাউকে পাওয়া গেল না, তখন উনি অর্ধনিমীলিত চোখে আমাকে বললেন, “কুসুম, চলো, আমরা সদর হাসপাতালের এমার্জেন্সীতে যাই।”
সেই প্রথমবার সাময়িক নিরাময়ের ব্যাকুলতা কাটিয়ে দীর্ঘকালীন স্বাস্থ্য-দুশ্চিন্তা আমার মনে এল। যে লোকটাকে আমাদের বিয়াল্লিশ বছর আটমাসের যৌথজীবনে নিজের জন্যে ডাক্তার, ইঞ্জেকশ্যন, হাসপাতাল - সবরকম আধুনিক চিকিৎসাকে দূরে রাখতে দেখেছি (আমার জন্যে অবশ্য তাঁর আধুনিক চিকিৎসা ও চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে কখনো আপত্তি হতে দেখি নি), সেই মানুষটা কিনা পেটব্যথার জন্যে হাসপাতালের এমার্জেন্সীতে যেতে চাইছে। এ তো কোন সাধারণ অসুখ নয়!
হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা শুরু করতে ঘন্টা দুই লাগলো। ওখানেও কর্মী অপ্রতুল। আরো একঘন্টা পরে মেট্রন এসে ওঁকে ঘুমপাড়ানি ইঞ্জেকশ্যন দিলেন, তখন অসহ্য ব্যথায় তিনিও ধুঁকছেন, তাঁর কষ্ট দেখতে না পেরে আমিও কাঁদছি।
সেদিন দুপুরে আমাদের দুজনের খাওয়া জোটে নি। আমি তো আগে কখনো এরকম মেডিক্যাল এমার্জেন্সী’র সম্মুখীন হইনি। জুনিয়র একজন হাউসস্টাফ রাউন্ডে আসবেন শুনে তাঁর জন্যে হত্যে দিচ্ছিলুম। সেই ডাক্তার ডাক পেয়ে এসে যখন ওষুধ আর অনেক টেস্ট লিখে দিলেন তখন চারটে বেজে গিয়েছে। সেরাতে ওঁকে হাসপাতালে ভর্তি রাখতে আমাকে একবার বাড়ি এসে নিজের আর ওঁর আই-কার্ড নিয়ে গিয়ে সব সইসাবুদ করতে আরো ঘন্টাখানেক লাগলো। তারপরে সকালের মেট্রন নিজে বাড়ি যাওয়ার সময়ে আমাকে বললেন আমার এখানে আজ আর কিছু করণীয় নেই, এলাকাটা খারাপ, আমি যেন বাড়ি গিয়ে রাতে বিশ্রাম নিয়ে কাল আবার আসি।
সেরাতে নিজেকে খুব একাএকা, অসহায় লাগছিল। এই একাকিত্বটা চল্লিশবছর ওঁর পাশে শুয়ে যে একাকিত্ব অনুভব করেছি, তার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
এক হিসেবে, আমাদের চার দশকের বাঁচাটা তো একরকমের মরে থাকাই। আমরা এসে দুজনের নতুন সংসার পেতেছিলুম এক ছোট্ট শহরে, যেখানে একজন মানুষও আমাদের আগে চিনতো না। উনি এই কলেজিয়েট স্কুলে লাইব্রেরিয়ানের চাকরি পেয়েছিলেন বলেই আমরা দু’বাড়িতে নিজেদের বিয়ের সিদ্ধান্ত জানাতে পেরেছিলুম। এখানে এসেই উনি আমাকে প্রাইভেটে ঠেলেঠুলে গ্র্যাজুয়েট বানিয়ে তুললেন, আর তারপরেই পোস্টাফিসের কেরাণির চাকরীটাও আমার কোনও উমেদারি ছাড়াই জুটে গেল। উনি আমাকে সাহিত্য ভালোবাসানোর চেষ্টায় মেতে উঠলেন। আমরা নিতান্তই সাংসারিক প্রয়োজন ছাড়া কটাই বা বাড়তি কথা বলতুম? যেদিন উনি আমার শাশুড়ির অশৌচগৃহ থেকে একজোড়া সোনার বালা হাতে ফিরে এলেন পূর্বাশ্রমের সবকিছু খুইয়ে, আগের চেনা প্রেমিক মানুষটি কেমন যেন অন্যরকম হয়ে গেলেন। নিজের সাধ্যমত যত্নে আমাকে রাখতে কোনোদিন তাঁর ত্রুটী হয় নি। কিন্তু সংসারে, আমি সহজেই টের পেতুম, তাঁর টান নেই। আমরা সহ-বাস করেছি দশকের পর দশক, সহবাসও দাম্পত্যজীবনের প্রাকৃতিক টানে করেছি নাহোক কয়েকশো বার, কিন্তু সহধর্মী বা সহধর্মিণী হয়ে উঠতে কি আমরা উদ্বুদ্ধ হয়েছি, উন্মুখ থেকেছি? এক অদৃশ্য দূরত্ব আমাদের মধ্যে থেকেই গিয়েছে। যে দেড়-কামরার ভাঙা বাড়িটিতে আমরা প্রথম সংসার পেতেছিলুম, সেই বাড়িটিই আমরা পরে সস্তায় কিনে নিই। অথচ, বাড়িটা যে তাঁর কলেজ বা আমার পোস্টাফিস, কারও কাজের জায়গা থেকেই হাঁটাপথের দূরত্ব ছিল - এমন না। আমাদের তখন যা আর্থিক সঙ্গতি, আমরা আরেকটু বড় বাড়ি আরেকটু সম্ভ্রান্ত পাড়ায় কিনতেই পারতুম, কিন্তু আমাদের কারোরই কোনও উৎসাহ ছিল না ব্যাপারটায়।
বিয়ের কিছু বছর পরেও যখন আমরা নিঃসন্তান, তখন আমি ওঁকে ডাক্তার দেখানোর কথা বলেছিলুম। যে ডাক্তারের কাছে আমরা প্রথমবার গিয়েছিলুম তিনি পরীক্ষা করে আমাদের দুজনকেই পাশ করিয়ে দিয়েছিলেন। তারপরেও যখন কিছু হল না, তখন অন্য কোনও ডাক্তার দেখানোর কথা যতবার বলতুম, উনি শুনে প্রতিবারই হুঁ-হাঁ করতেন, কিন্তু তারপরেই আলোচনাটা কেমন পিছলে বা মিইয়ে যেত, ফলপ্রসূ কোনকিছু আর করা হত না। শেষে আমি এই সিদ্ধান্তে আসি, তাঁর মায়ের আত্মহত্যার জন্যে পরোক্ষভাবে হলেও দায়ী মহিলার গর্ভে উনি নিজের বংশের বীজ বপন করতে অনিচ্ছুক। নিজের শারীরিক ক্ষুধা আমার মাধ্যমে তৃপ্ত করতে চাওয়ার ব্যগ্রতা কখনোই আমি তাঁর মধ্যে লক্ষ্য করি নি, অথচ আমার ডাকে সাড়া দিতে তিনি ক্বচিৎ অরাজি হতেন। আমি যে পরিবেশে বড় হয়েছি, সেখানে অন্য জাতের নারী বা পুরুষকে প্রেম নিবেদন করার উদাহরণ সামনে ছিল, কিন্তু স্বামীর সঙ্গে এক বিছানায় শুয়ে, তাঁকে কিভাবে বলতে হয় যে মূল ব্যাপারটায় তিনি উদ্যোগ নিলে, সম্ভোগে আদিম হলে আমার ভালো লাগবে, সেই সোজাসাপ্টা হওয়ার মত নির্লজ্জ প্রগলভতাটা আমার শিক্ষায় ছিল না। তা’বলে কি আমাদের মধ্যে কিছুই হত না? হত তো, আমরা দুজনেই কিভাবে যেন টের পেতুম আজ ‘হওয়ার’ দিন আছে, দুজনেই ঘেঁষে আসতুম, সচেতন উদ্যম ছাড়াই অন্ধকারে আমাদের অভিসাররথ নিজেনিজেই যাত্রাপথ তৈরী করে নিত।
আমার জন্যে ওঁর একটা সর্বব্যাপ্ত আর সহজাত স্নেহ, প্রতিক্ষণে টের পেতুম মানুষটা আমাকে মুড়ে রাখতে চায়, দিতে চায় সার্বিক নিরাপত্তা। আমার ছোটখাটো অসুবিধে নিয়ে তাঁর মাথাব্যথা (অথচ বড় জিনিসগুলোর খেয়াল নেই!) আর এই নরম রক্ষাকর্তার ভূমিকাতেই তিনি আমার মনে চরম ভয় জাগাতেন। একপৃথিবী আত্মীয়-বন্ধু, সমাজ-সংসার, ছোটবেলা ছেড়ে এসেছি যে একটিমাত্র মানুষের কাছে থাকার জন্যে, তাঁকে হারানোর, আঘাত করার, দূরে সরানোর ভয় আমাকে সবসময়ে তাড়িয়ে বেড়াত। এই নিরাপত্তাহীনতার ভয়ের নিরাপত্তাহীনতা আমার ভেতরে জন্ম দিয়েছিল এক বিষাদের, আরো তীব্র, তীক্ষ্ণ করে তুলেছিল আমার একাকিত্বকে। আমি সবসময়ে সচেষ্ট থাকতুম, সম্পর্কের নতুন কোনও মাত্রা আবিষ্কার বা উপভোগ করতে না পারি, এমনকিছু আমার করা চলবে না যাতে এই মানুষটা কষ্ট পেতে পারে। বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাটুকুকেও রুখতে আঁকড়ে ধরার মত অনেককিছুকেই দূরে সরিয়ে রেখেছিলুম!
জানেন, প্রতিবছর আমরা নিয়ম করে দু’বার বেড়াতে যেতুম। সমুদ্রসৈকতের হৈচৈতে, বা নদীকূলবর্তী ভ্রমণকেন্দ্রে, মাঝেসাঝে কোনও পাহাড়ে আমরা কাটিয়ে আসতুম কটা দিন। দেশের প্রায় প্রত্যেকটি রাজ্যেই আমরা গিয়েছি, মন্দির-স্থাপত্য-দুর্গ-মহানগরী-যাদুঘর আমরা কোটি-কোটি বৈশিষ্ট্যহীন ভ্রামণিকের মতই দেখেছি, সামনাসামনি দেখার উচ্ছ্বাস স্মৃতিতে কিছু দাগ রেখেছে বটে, কিন্তু আমাদের সম্পর্ককে নিবিড় করে তোলে নি। বড় সাধ ছিল কোনো নির্জন বনবাংলোতে কটা দিন কাটাবো, যেখানে তখন আমরা ছাড়া কেউ নেই, আদিম হব দুজনে, বিয়ের আগে ভেবেছিলুম যেসব হরকৎ-কসরৎ, প্রকৃতির সান্নিধ্যে সেগুলো নিয়ে মেতে কয়েকটা দিন এমনভাবে কাটিয়ে আসবো যে ফিরে এসেও আমাদের সম্পর্কে থাকবে কিছু বিদ্যুৎঝলক, যা আমাদের প্রতিদিনের জীবনকে দেবে আরেকটু নিবিড়তা। এখন দেখি, অ্যালবামে ধরা পড়া শুধু ঢেউ-স্রোত-গাছপালা-মিনার-সৌধ-প্রত্ননিদর্শন, আমি মানুষটা অদৃশ্য। লাইব্রেরিয়ান মহোদয় প্রত্যেকবার এই ছবিগুলোর মধ্যে থেকেই কেন একটা-দুটো ছবি আলাদা করে অন্য একটা আলবামে সাজিয়ে রাখতেন, আজো বুঝি নি।
বেড়াতে যাওয়ার মাঝের সপ্তাহগুলো আমরা সকালে উঠতুম, দুজনে মিলে জলখাবার তৈরী করতুম আর খেতুম একসঙ্গে, তারপর যে যার অফিসের জন্যে বেরিয়ে পড়তুম। ক্বচিৎ তাঁর আমার আগে ছুটি হ’লে তিনি আমার আপিসের সামনে অপেক্ষা করতেন, দু’হাতে দুটো ভেলপুরির ঠোঙা নিয়ে। ব্যস, ঐটুকুই। তারপরে বাড়ি ফিরে সেই রান্না করা, খাওয়াদাওয়া’র মাঝে টুকটাক কথাবার্তা, খাওয়া শেষ হলেই দু’জনে দুটো বই নিয়ে নিঃশব্দে নিজেদের পড়ার জগতে ঢুকে পড়া। ঠিক এগারটায় ওঁর ঘড়িতে রাতের অ্যালার্ম বাজতো, উনি সেটা বন্ধ করে মুখেচোখে জল দিয়ে বিছানায় শুতে আসতেন। আমার অবশ্য পড়া অত সময় মেনে শেষ হত না। ভালো না লাগলে আমি সাড়ে নটাতেও আলো নিভিয়ে শুয়ে একলা ছটফট করেছি, আবার পাঠ্যবইটির প্রসাদগুণে রাত দেড়টা অব্দি আলো জ্বালিয়েও গোগ্রাসে ছাইপাঁশ গিলেছি। ওঁর তাতে ঘুমের কোনও ব্যাঘাত হত না। যেদিন ফেরোমোন বা টেলিপ্যাথি কিছু একটা থেকে জানতুম, আজ রাতে কিছু ‘হওয়ার’ আছে, সেদিন একসঙ্গে পড়া সাঙ্গ হতো, দুজনে জন্মদিনের পোষাকে একে অপরকে আঁকড়ে ধরতুম, দুজনেরই দীর্ঘশ্বাসে বিষাদ মিশে থাকত অনেকটা করে, কেন কে জানে! জৈবিক যা কিছু হতো, তা দৈবিক না হলেও আধা বেহুঁশে, মাঝরাতে, ঘুমের ঘোরে, স্বপ্নের শুরুতে এমনভাবে মিশে যেত, যে কোনটা ঘটেছিল, আর কোনটা ভেবেছি, স্পষ্ট ফারাক মনে পড়ত না পরদিন সকালে।
খারাপ খবরটা পেলুম ওঁকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়ার দু’দিন পরে। পাকস্থলীর ক্যান্সার, তৃতীয় স্টেজ।
“কুসুম” উনি বাড়ি এসে ভাবলেশহীন গলায় বললেন, “ডাক্তাররা বলছে বটে কেমোথেরাপি করালে আমি এখনো এক বছর বাঁচবো, কিন্তু আমার মন বলছে, একবার ওদের পাল্লায় পড়লে আমার মেয়াদ আর তিন মাসের বেশি নয়। আমি হিমালয়ের একটা আয়ুর্বেদ চিকিৎসাকেন্দ্রের খোঁজ পেয়েছি, ওখান থেকে একবার ঘুরে আসি, তুমি আমাকে পনেরোটা দিন সময় দাও, তাতে আমি হান্ড্রেড পার্সেন্ট রোগমুক্ত হয়ে ফিরে না এলে এসব তো রইলোই।”
আমি তখনো দুঃসংবাদের অভিঘাতে অস্থির, তাছাড়া কোনদিন তো এইসব রোগ, রোগী, চিকিৎসা, হাসপাতাল নিয়ে সেরকম বিপদে পড়তে হয় নি, তাই খুব শক্তভাবে সেই উদ্ভট পরিকল্পনাটাকে উড়িয়ে দিতে পারলুম না তক্ষুণি। আর যাদুকররা যেমন টুপি থেকে খরগোস বের করে, অনেকটা অবিকল সেই ভঙ্গিমায় তিনি নিজের ফতুয়ার পকেট থেকে একটা ট্রেনের টিকিট আমার সামনে মেলে ধরলেন, আর তাঁর গলায় একটা আকুতি ফুটে উঠল, “তুমি যদি একবারও না বলো কুসুম, তাহলে আমার আমার এই যাওয়া সফল হবে না! … তুমি কোন চিন্তা কোরো না, তুমি চাকরি থেকে রিটায়ার করতে করতে আমি ক্যান্সারকে বিসর্জন দিয়ে তোমার কাছেই ফিরে আসবো।”
জামাকাপড় গুছোতে তাঁর আধঘন্টার বেশি সময় লাগল না, সন্ধ্যেবেলা আমরা স্টেশ্যনের কাছে একটা বড় ধাবাতে নৈশভোজ সারলুম, আমরা দুজনে প্রথা ভেঙে রাতের বেলাও মাংস খেলুম। এখানে ওঁর শেষরজনীতে আমার হাতের রান্না আর ওঁর খাওয়া হলো না। এতগুলো বছরের নিত্যিনিশির রান্নায় আমার তরফ থেকে যে দিনগত পাপক্ষয়ের অযত্ন চুইয়ে ঢুকে পড়েছিল, তা শোধরানো আর হল না আমার। তারপর তিনি ট্রেনে উঠে আমাকে চিরকালের জন্যে ফেলে রেখে চলে গেলেন। এবার আমি একলা হলুম আরেকভাবে, অনেক বেশি আক্ষরিক অর্থে, চিরতরে। এখন খুব ইচ্ছে করে জানেন, ওঁর জন্যে যত্ন করে ওঁর প্রিয় পদগুলো আবার রান্না করি। ওঁর শেষ খবর যবে থেকে পেয়েছি, তবে থেকে আর আলাদা করে রাতের রান্না করি না। সারাদিনে একবার চাল-ডাল একসঙ্গে ফুটিয়ে নিই, তাতে অন্যমনস্কভাবে একেকদিন একেকরকম মশলা চিমটিখানেক ফেলে দিই ফুটন্ত হাড়িতে, সেটাই কয়েক হাতা করে খাই এক বা দু’বার, বেশির ভাগটাই ফেলে দিই পরের দিন। এটা করে আমার সন্ধ্যেগুলো আরো ফাঁকা, বিবর্ণ হতে পেরেছে। আরো একলা হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে আমার নিঃসঙ্গতাকে। এই বেঁচে থাকা, যেখানে আমার বিচ্ছেদব্যথার সঙ্গে প্রতি মুহুর্তের সহচর এক অকথ্য সন্দেহ, আমার জীবনকে সত্যিই দুর্বিষহ করে তুলেছে।
আমার স্বামী এই অকালসফরে যাওয়ার পরে প্রথম কদিন আমি নিজেকে চূড়ান্ত ব্যস্ত রেখেছিলুম। অফিসে অ্যাসিস্ট্যান্ট মাস্টার নীরবসাহেবকে কাজ বোঝাচ্ছি, নিজের আর কিষেণের কাজ সামলাচ্ছি, আর ফাঁকেফাঁকে মারণরোগ নিয়ে পড়াশুনো করছি। খোঁজ নিচ্ছি চিকিৎসা-পদ্ধতি আর চিকিৎসকদের নিয়ে। তখনই মনে কু ডাকছিল যে পনেরোদিন দেরী করাটার চড়া দাম দিতে হবে। এদিকে উনি কল করতে বারণ করেছেন, শুধু মেসেজিং ভরসা। ওঁকে বকাবকি করে চলে আসতেও বলতে পারছি না, পুরোপুরি নিঃসংশয়ে। দু-একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট ফোনেই জোগাড় করার উপক্রম দেখছিলুম, কিন্তু যেই তারা শোনে যে রোগী আমার সঙ্গে নেই, আর কবে হিমালয় থেকে নামবে তাও নিশ্চিত নয়, অমনি তারা কথাবার্তা থামিয়ে দেয়। এদিকে আমি এইসব আলোচনা করছি যথাসাধ্য সঙ্গোপণে, আত্মীয় তো আমাদের কেউই ছিলো না কোনদিন, পরিচিত বা প্রতিবেশীদের যাদের সঙ্গে এতদিনেও সখ্য নিতান্তই আলগা-আলগা, তাঁদের মেকী সহানুভূতি, যা আমরা সারাজীবন দূরে-দূরেই রাখতে পছন্দ করেছি, সেসবের যতদূর সম্ভব ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে। তখনও কি জানতুম আমার চল্লিশ বছরের বরটি এইরকম কাপুরুষ! আমি তো আসলে ভুলেই গিয়েছিলুম আত্মহত্যার পাপ ওর রক্তে, মা’র কাছ থেকে পাওয়া স্বভাব আর যাবে কোথায়! মাঝখান থেকে শুধু আমার জন্যই এক সন্দেহের বীজ রেখে গেল বাকী জীবনের জন্য।
আমার ফোন করা বারণ ছিল বটে, কিন্তু ওঁর তো এসব কোন বারণ-বাধা-বিধিনিষেধ কোনকালে ছিল না! শেষ দুদিন উনি খুব ঘনঘন ফোন করছিলেন, মেসেজ পাঠাচ্ছিলেন, কোথাও যেন একটা স্বভাববিরুদ্ধ উচ্ছলতা ফুটে উঠছিল ওঁর মধ্যে। আমি চিকিৎসা-ডাক্তার নিয়ে যতবারই আলোচনা করতে চাইলুম, উনি সব মন দিয়ে শুনলেন, প্রশ্ন করলেন, তারপরে বললেন, “প্ল্যানটা ঠিকই করেছ কুসুম, তবে আমি গিয়ে তারপরে টাকা-পয়সা পেমেন্ট করবো।” আমিও, তা হোক না যতই পোস্টাফিসের কেরাণী, তো ত্রিশ বছরের ওপরে চাকরী করেছি, আমি কি এই খরচটা দিতে পারি না! কিন্তু উনি কিছুতেই রাজি হলেন না, সেই এক কথা, “না কুসুম, পুরো বিশ্বাস না থাকলে এই আধ্যাত্মিক পথে আরোগ্য হয় না। আমি ফেরার আগে তুমি কোনো ডাক্তার বা হাসপাতালকে পয়সা দিও না।” আমি কি তখনও একবারও বুঝেছি ওঁর আসল মতলবটা কী? এর মধ্যে তিনি স্মার্টফোনে ওঁর সেই আশ্রমের পাশের পাহাড়, নদী - এসবের ছবি পাঠাতে শুরু করলেন। সেগুলোর কোনটাতেই ঘরবাড়ি, হাসপাতাল, যোগী, চিকিৎসক কেউ নেই, কিছু নেই, শুধুই সুন্দর, সমাহিত, শান্ত প্রকৃতি। আমি বেশ কয়েকবার জানতে চাইলুম, চিকিৎসা বা নিরাময়ের কতদূর কী হলো, দেখলুম উনি প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাচ্ছেন।
এরপরে ওঁর কাছে ওঁর সেই বোনঝি তরলা’র কথা শুনলুম, যে নাকি ওঁর আশ্রম থেকে মাত্র আধঘন্টার দূরত্বেই থাকে। সন্ধ্যেবেলা একটা ছবি পাঠালেন, সেখানে এই কদিনে প্রথমবার ওঁর মুখ দেখতে পেলুম আর দেখলুম সেই মেয়েটির মুখ, যে মুখ এ জীবনে না দেখলেই বোধ করি বেশি ভালো ছিল!
মেসেজ করে জানতে চাইলুম, “এই কি তরলা?”
উনি জবাবে শুধু একটা হাসি-হাসি স্মাইলি পাঠালেন। দুজনের মুখের কী আশ্চর্য মিল! হঠাৎ আমার এই মারণ রোগাক্রান্ত মানুষটাকে খুব ভালবাসতে ইচ্ছে করল, ভালবাসি জানাতে ইচ্ছে করল। মনে হল, কেন উনি আমার কাছে নেই! আমি নির্লজ্জের মত ওঁকে মেসেজ করলুম, “আই লাভ ইয়ু!” সে মেসেজে পাঠ করার দুটি নীল টিক ফুটে উঠল। তারপর, সব চুপ … পরের দু’দিন কোনও মেসেজ, কল, অন্য ফোন থেকে ওঁকে ফোন বা যোগাযোগ করার চেষ্টা - সব বিফলে গেল।
পুলিশের পক্ষ থেকে তৃতীয়দিন ফোনটা এসেছিল সন্ধ্যে ৬টা ৪৭ মিনিটে। কেজো গলায় আমার পরিচিতি নিশ্চিত করার পরে নিরাবেগ কণ্ঠে আমার স্বামীর পাহাড়ী নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করার খবর জানিয়ে শব মর্গ থেকে সংগ্রহ করার নিয়মকানুন জানিয়ে তারা ফোনটি কেটে দেয়। আমাকে অবশ্য তাঁর নিষ্প্রাণ দেহটি হিমালয় থেকে আবাহন করে আমাদের শহরে আনতে হয় নি। তরলা, ওর মামাতো ভাই সুমিত, সুমিতের বাবা-মা সেই কাপুরুষটার পোস্টমর্টেম করা দেহাবশেষ নিয়ে আমার কাছে হাজির হয়েছিলেন। “আই লাভ ইয়ু” বলার পাওনা-দেনা তো এভাবেই মেটায় চল্লিশ বছরের থাকা ও না-থাকা সম্পর্ক!
অশৌচের সময়টা তরলা আমার এই দেড়কামরার ঘরে রইলো। সুমিতরা সামলালো সমস্ত আয়োজন। আমি বারবার ওদের মুখ দেখছিলুম, আর ভাবছিলুম, ওঁর মুখের সঙ্গে ওদের দুজনেরই কী প্রচন্ড সাদৃশ্য রয়েছে। বিশেষ করে তরলা’র মুখ তো কেটে বসান যেন। আচ্ছা, এতটাই মুখের মিল কি কাকা বা মামাদের সঙ্গে কারুর হয়?
উনি গবেষণার জন্য দেহদান করে গিয়েছিলেন, কিন্তু পুলিশের ছুরিকাঁচি সে সম্ভাবনাকে রদ করেছিল। তবে নিজের অদ্ভুত শেষ ইচ্ছেটুকু উনি একজন লাইব্রেরিয়ানের দক্ষতায় এমনভাবে লিপিবদ্ধ করে গিয়েছিলেন, সেগুলোকে এড়ানোর পন্থা কারো জানা ছিল না। জীবনের শেষ ঝাঁপ দেওয়ার সময়েও তাঁর শরীরে শক্ত করে আটকানো ছিল একটা প্লাস্টিকের চেনবন্ধ বটুয়া, যাতে ছিল ওঁর ভোটার আই-কার্ডের প্রতিলিপি, আত্মহত্যা করার কারণ (সেই রবিবারের এক মাস আগে থেকে তিনি জানতেন এই রোগ তাঁর শরীরে বাসা বেঁধেছে ও কতটা বিস্তার লাভ করেছে, অথচ পাশে শুয়েও আমি কোনদিন তা টেরও পাই নি।), আমার এবং সুমিতের যোগাযোগের নম্বর ও কীভাবে ওঁর শেষ ইচ্ছালিপিখানি খুঁজে পাওয়া যাবে । ঐ একই পাউচে ছিল তাঁর স্মার্ট ফোনটাও। এবং কী আশ্চর্য! যে আছাড়ে একটা মানুষের প্রাণ চলে গেল, সেই পতন এবং দীর্ঘক্ষণ জলের মধ্যে থেকেও সেটাও প্রায় অক্ষতই ছিল। চার্জে বসানো থাকা অবস্থায় ছুঁলে সেটা এখন একটু শক দেয় বটে, কিন্তু যে শক জীবন আমাকে দিয়েছে, সে তুলনায় এ আর কী! এখনও সেখানে আমাদের দুজনের সব বার্তালাপ পড়া যায় ইচ্ছে করলেই।
ওঁর শেষ ইচ্ছালিপি যখন আমাদের বাড়ির দেরাজ থেকে বের করে পড়া হচ্ছে, তখন আমার অস্বস্তি আরো বাড়লো। উনি প্রত্যাশা করেছেন তরলা তাঁর অন্ত্যেষ্টিতে যোগ দেবে, সেটা অবশ্য দুই কাজিনে না জেনেই করেছিল। এই চিঠিতেই আমার জন্যে রাখা ছিল ওঁর শেষ উপরোধ! সেটা পড়ার পরে, বিশ্বাস করুন, আমার যেটুকু জিজীবিষা বাকী ছিল, চলে গিয়েছে। উনি বলেছেন, যদি ওঁর শেষকৃত্যে তরলা আসে, তাহলে আমি, যদি ইচ্ছে করি, তাহলে সেই সোনার বালাদুটো তরলাকে দিতে পারি। আমি কেন সেই আদেশ অমান্য করতে যাবো। ও জিনিশ তো চার দশকে দু’বার পরেছি, একবার ওঁর চাকরীজীবনের রৌপ্যজয়ন্তীপূর্তির সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানে, আর একবার সেই সাহসিকতার জন্যে পুরষ্কার দেওয়ার বেলায়। হুহ! সাহসিকতা! তখন কে জানত, লোকটা একটা ভিতুর ডিম, ঠিক ওর মায়েরই মত! শ্রাদ্ধের দিন ওঁদের দিকের আত্মীয়স্বজন, ওঁর প্রাক্তন সহকর্মী, আমার (বর্তমান, না প্রাক্তন, এখনও জানি না, আমার অবসরের কাগজপত্র, সইসাবুদ এখনও সব ঝুলে আছে) সহকর্মীদের সামনে আমি সেটা তরলার জন্যে তুলে দিয়েছি সুমিতের মা’র হাতে। তরলা কেঁদে আকূল হচ্ছিল, আর ওর কান্নায় ভিজে যাওয়া, ভেঙে চুরমার হতে থাকা মুখে আমি স্পষ্ট হয়ে উঠতে দেখছিলুম আমার স্বার্থপর পতিটিকে, এই দীর্ঘ চার দশকে যে কর্কটরোগ, সমস্ত কান্না ছাড়াও আমার থেকে না জানি আর কীকী লুকিয়ে রেখেছে! তাঁকে আমি কোনদিন কাঁদতে দেখি নি তো! পুরুষমানুষ! সাহসী পুরুষমানুষ!
তরলা ওর ফোনে দেখিয়েছে, ওঁদের দুজনের একসঙ্গে তোলা একটা ছবি। মৃত্যুর তিনদিন আগে তোলা। যে পাহাড় থেকে ঐ কাপুরুষটা ঝাঁপ দিয়েছিল, তার কাছের একটা সরাইয়ে দুজনে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। উনি আমাকে যে ছবিটা পাঠিয়েছিলেন, সেটার সেই একই পোষাক সে এখানেও পরে আছে। পেছনে একই নদীর দুর্দ্ধর্ষ পশ্চাদপট। তরলা’র কথা অনুযায়ী, উনি ওকে ডেকেছিলেন এই বলে যে ‘তোর কলেজের কাছাকাছি আসছি, অমুকদিন সন্ধ্যেবেলা তুই ফাঁকা থাকলে এসে দেখা করিস, কফি খাওয়া যাবে, আর তুই চাইলে আমাদের একসঙ্গে কয়েকটা ছবিও তোলা থাকবে!’ অবিশ্বাস করি নি সে কথা, কিন্তু বড় ধাক্কা লেগেছে, যখন জেনেছি এর আগে ওঁদের দুজনের আরো একবার দেখা হয়েছিল বছরখানেক আগে, নাকি নেহাৎই ঘটনাচক্রে, যখন নিজেদের কলেজের হয়ে তরলা এসেছিল ওঁদের কলেজে একটি সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে।
জানি, মৃত্যু অনেক কিছু মুছিয়ে দেয়, অনেক প্রশ্ন যা ছিল জ্বলন্ত জীবৎকালে, তাকে করে দেয় গুরুত্বহীন, পছন্দের না হলেও অশান্ত, বিক্ষুব্ধ , সন্দিগ্ধ হৃদয়ে ও সম্পর্কের ওপর অনেক সময়েই চাপিয়ে দেয় এক চরম অন্ত, যার বিরুদ্ধে আর কোন আবেদন-নিবেদনেই আর কোন কাজ হওয়ার নয়। কিন্তু যখন মৃত্যু থেকেই জন্ম নেয় সন্দেহ, তখন জীবিত মানুষগুলোর দুর্বিষহ জ্বালা অপনোদনের আর কোনই উপায় থাকে না। ঐ ভিতুটা ঐ কাজটা কেন করেছিল, তার যুক্তিগ্রাহ্য কোন কারণ খুঁজে না পেলেও আমি নিজেকে এই বলে সান্ত্বনা দিই যে যার মা বিংশ শতাব্দীতেও সতীর মৃত্যুবরণে গৌরব পান, তার রক্তেই আছে কাপুরুষতার বীজ, সে না পালিয়ে যাবে কোথায়! কিন্তু তরলা?
এত মুখের মিল, আমার যদি একটা মেয়ে আজ থাকত! তরলাকে দেখার পর থেকেই আমার মনে কুটকুট করা শুরু করেছে। ধরে নিই, যদি ধরে নিই, মাতাপিতৃহীন তরলা নিছকই ওঁর ভাগ্নি নয়, তরলা ওঁর …
এই অনুমানটা বোধহয় ওঁর গত একবছরের অনেক বিদঘুটে আচরণকে চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করে ফেলতে পারে, তাই না! এ এক অদ্ভুত চিন্তা, যা আমি বুঝে ফেলেছি বাকী জীবন আমাকে তাড়া করে বেড়াবে, কুরে কুরে খাবে! সবচেয়ে বড় কথা, এই ভাবনাটা আমি কারো সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারবো না, কারো কাছে চাইতে পারবো না সহানুভূতি বা যৌক্তিক বিশ্লেষণ বা প্রতিকার, কারণ যে একটামাত্র মানুষকে অবলম্বন করে, যাকে সর্বতোভাবে বিশ্বাস করে সমস্ত সামাজিক সম্পর্ককে উপেক্ষা করে গেছি গত চারদশক, সেই লোকটাই আমাকে এই সন্দেহের মধ্যে ডুবিয়েছে। ভিতু! কাপুরুষ! সতীর বাচ্চা!
একা হওয়ার রকমফের আছে। সমস্ত পরিবার, আত্মীয়বন্ধু-চ্যুত হয়ে জীবননির্বাহ করার অভিজ্ঞতা তো আমার কমদিনের নয়। সামান্য সময়ের জন্য হলেও উনি যখন অসুস্থ কিন্তু জীবিত ছিলেন, তখনও অনুভব করেছি এক ভিন্ন ধরণের একাকিত্ব ও অসহায়তা। কিন্তু এই সন্দেহদীর্ণ যাপন অসহনীয়।
মিথ্যে বলবো না, তরলা আর ওর পিসি-কাকিরা আমার নিয়মিত খোঁজ রাখে। রোজকার স্বাচ্ছন্দ্যের খোঁজখবর নেয়, বারবার অনুরোধ করে একবার, অন্ততঃ একবার, ওদের সেই পারিবারিক ভিটেতে গিয়ে দাঁড়িয়ে ওদের ক্ষমা চাইবার সুযোগ করে দিতে। এমনকী তরলা এও বলেছিল, যদি আমি ফিরতে চাই আমার বেড়ে ওঠার সেই গঞ্জশহরটিতে, কাটাতে চাই বাকী দিনগুলো, আমার জন্যে ছোট একটা একতলা বাড়িও নাকি দেখে রেখেছে ওরা, আমার স্বাধীনভাবে থাকবার জন্যে। ভেবেছিলুম জানতে চাইবো ওদের কীসের গরজ আমাকে নিয়ে? কিন্তু সে প্রশ্ন করার আগেই তরলা উপযাচক হয়ে উত্তর দিয়েছে, “তোমার সম্পত্তির লোভে এমনটা করছি মনে হলে আমাকে বিদেয় করে দিয়ো! কিন্তু ঐ একটা সন্ধ্যের আলাপে মামা আমাকে নতুন একরকম শান্তি দিয়ে গিয়েছে মাইমা!”
“শান্তি”? “নতুন শান্তি”? “একরকম নতুন শান্তি”? শব্দেরা মাঝে মাঝে কী অসম্ভব ধারালো হয়, তাই না? এত ভালো মেয়েটা! অথচ তাকে ভালো বাসতেও পারছি না মন খুলে এই দুঃসময়ে!
ইচ্ছে করে, সময়ের কাঁটা উল্টোদিকে ঘুরিয়ে দেখি আমার মন থেকে এই কাঁটাটা উপড়ে ফেলতে পারি কিনা! সেই ধুসর, উষর, একঘেয়ে, ক্লান্তিকর প্রাত্যহিকতাকে কোনওমতে একবার, আরেকটিবার ফিরিয়ে আনা যায় যদি, যেখানে প্রতিমুহূর্তে আমাকে অবাস্তবপ্রায় সন্দেহে জর্জরিত হতে হতো না। কখনো নিজেকে শাসন করার চেষ্টা করি এই বলে যে এগুলো সবই অমূলক দুর্ভাবনা, আর তখন এক অপরাধবোধ আমাকে গ্রাস করে। কে জানে, যদি লোভে পড়ে ঐ “আই লাভ ইয়ু”টুকু না লিখতুম, হয়তো আজ জীবনটা এমন হতো না। আমাদের চল্লিশ বছরের ভালোবাসা, না-বাসার দিনগুলো তো এভাবেই কেটে গেলো, এর আগে শেষবার মুখ ফুটে প্রকাশ করেছিলুম সেই একদিনই মাত্র, যেদিন তিনি আমাকে বিয়ে করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তারপরেই আবার মনে হয়, কে জানে চল্লিশ বছর যে জীবন কাটিয়েছি, তা হয়তো ধোঁকার টাটিই ছিল! পুরুষমানুষ, দিনের শেষে তো পুরুষমানুষই।
আমার জীবনের বাকি দিনগুলো নিয়ে আমার আর কোন আগ্রহ নেই। নিজের অতীত জীবনেই যেখানে এরকম এক অসঙ্গতি, ভয়, নিরাপত্তাহীনতা, সবকিছুই প্রপঞ্চময়, সেখানে আমার বয়সে এসে ভবিষ্যৎ নিয়ে কীইবা ভাবি, বলুন! শুধু জানি, আমার বর্তমানটুকু থেকে আমি ছিটকে বেরোতে চাই, ছিঁড়ে ফেলতে চাই এই দৈনন্দিনকে। কী ভাববো, তা-ই আজকাল আমার মাথায় খেলে না।
ভগবান! আমাকে ঐ ভিতুটার সাহসটুকু দাও! হে ভগবান, আমাকে ঐ কাপুরুষটার কাছে পৌছনোর সম্বলটুকু দাও!
Comments
Post a Comment