প্রেমদিবস – বর্তমান ও অতীত
চন্দ্রমা মুখার্জী
লিলি কলেজ থেকে উত্তেজিত হয়ে বাড়ি ফিরল। দাদু জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কি ব্যাপার, দিদিভাই, এতো উত্তেজিত কেন?’ লিলি বলল, ‘আর বলো না দাদু, আজকে তো ভ্যালেন্টাইনস্ ডে, তো রাজদীপ, অনন্যাকে একটা লাল গোলাপ দিয়ে প্রপোজ করেছে – ‘Will you be my valentine। অনন্যা কি বলল জানো দাদু?’
দাদু বললেন, ‘কি বলল?’ লিলি বলল, ‘বলে কিনা, একটা পাতি গোলাপ দিচ্ছিস, ডায়মন্ড রিং দিয়ে প্রপোজ না করলে কে তোর ভ্যালেন্টাইন হবে। কি দেমাক মেয়ের।‘ দাদু বললেন, ‘তুমি তো বলতে দিদিভাই, ওরা আগে থেকেই প্রেমিক – প্রেমিকা, তবে আবার প্রপোজ কিসের?’
লিলি বলল, ‘ও তুমি বুঝবে না দাদু। রিলেশনশিপে থাকলেও আজকের দিনে প্রপোজ করতেই হবে, নাহলে ওদের মধ্যে কত ভালোবাসা আছে সেটা বোঝা যাবে না।‘ ‘হ্যাঁ, কত দামী উপহার দিচ্ছে একে অপরকে, সেটাই ভালোবাসার মাপকাঠি। আর বেশির ভাগ সময়েই ছেলেটাকেই দামী উপহার দিয়ে ভালোবাসার পরীক্ষা দিতে হবে, তাইতো?’ – ঠাম্মা কখন ওদের কথার মাঝে এই ঘরে চলে এসেছেন।
লিলি বলল – ‘ঠিক বলেছো ঠাম্মা, এইরকম ন্যাকা আর দেমাকি ছেলেমেয়েগুলোকে আমার একদম সহ্য হয় না। এদের প্রেম আদৌ টিকবে? এরা কলেজে গিয়ে শুধু এইসব করে নিজেদের আর অন্যদের সময় নষ্ট করে আর বিরক্ত করে। অনন্যার জন্য আজকে সবার মজাটাই নষ্ট হয়ে গেল।‘
দাদু বললেন, ‘আগে তো এসব ভালোবাসার দিন ছিল না, রোজই প্রেমদিবস। আমরা তো কত ভালো ছিলাম।‘ লিলি দাদুর গা ঘেঁষে বসে বলল, ‘বলো না দাদু।‘ দাদু বললেন, ‘আমাদের সময় তো বিয়ের আগে ছেলে-মেয়ের দেখাই হয়তো হতো না, যাদের হতো, সেটাও ওই শুধুমাত্র সামনে থেকে মুখ দেখা, তাও সবার মাঝে। তখন প্রেম হতো বিয়ের পর। একে অপরকে চিঠি দেওয়া প্রেম। ওতেই সবাই ভালো, ভালো ভাষা লিখতো, কবিতাও লিখতো অনেকে।‘
লিলি বলল, ‘তখন তাহলে ব্রেকআপ হতো না বলো?’ দাদু হাসতে হাসতে বললেন, ‘তখন তো প্রেমই বিয়ের পর হতো, তাই সেই অর্থে ব্রেকআপ হতো না। তবে আমাদের ব্রেকআপ অবশ্যই হতো এবং এখনো হয়।‘
লিলি অবাক হয়ে বলল, ‘মানে? কই, দেখিনি তো।‘ দাদু বললেন, ‘কেন, তোর ঠাম্মা যখন রেগে গিয়ে দুদিন কথা বলা বন্ধ করে দেয় বা ভাববাচ্যে কথা বলে তখন তো ব্রেকআপই হয়। আগে যখন রেগে গিয়ে একেকবার বাপের বাড়ি চলে যেতো, সেটা হতো সিরিয়াস ব্রেকআপ। পিছনে দৌড়ে গিয়ে ক্ষমা চেয়ে ঘুষ দিয়ে বাড়িতে ফিরিয়ে আনতে হতো।‘
ঠাম্মা মুচকি হেসে বললেন, ‘আসলে মনের মিলই আসল। তাহলে দূরে থেকেও কাছে থাকা যায় আবার পাশাপাশি থাকলেও দূরত্ব থেকে যায়। আজকালকার জিনিস সর্বস্ব প্রেম আসলে কোন ভালবাসাই নয়। যাদের মনের মিল আছে, তারা কিন্তু, পৃথিবীর দুপ্রান্তে থেকেও এখনো একসাথে আছে।‘
দাদু বললেন, ‘বরদের কি গো, খেয়েছো তুমি? আর বউদের ওগো, আজ তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরো – এইরকম সাধারণ কথাগুলোই ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। কখনো আমাদের I love you বলে প্রমাণ করতে হয় না।‘
লিলি বলল, ‘সত্যি, এটা সবাই বুঝলে তো আর সমস্যাই থাকতো না। যে বুঝবে সে-ই ভালো থাকবে তোমাদের মতো।‘
====================
চন্দ্রমা মুখার্জী
সমরপল্লী, কৃষ্ণপুর, কলকাতা ৭০০১০২
Comments
Post a Comment