তবুও অপেক্ষা
তুষার মন্ডল
ধুস..ধুস..সিগন্যাল পড়ার আর সময় পেলনা! এই জন্য তোমাকে বারবার বলছিলাম তাড়াতাড়ি কর, তারাতারি কর,নাও বোঝ এখন থাক আধঘন্টা দাঁড়িয়ে।
মম,মম..জল খাব।
এই ,বলছি মেয়ে জল খাবে বলছে তো। জলটাও আনোনি! আজব তুমি।
গাড়িতেই বস রাস্তার ওই পাশের দোকানে থেকে কিনে আনছি আমি।
সিগন্যালটা উঠে যায় যদি?
না না তার আগেই চলে আসব আমি,ওই তো দোকান।
মনে পড়ে খুব ছোট্টবেলায় রাস্তায় যদি হঠাৎ বাস থামত তাহলে বুঝে নিতাম সামনে রেললাইন, কিন্তু এখন ওসব ভাবা মোটেও ঠিক নয়। শহরের যানজট দিনদিন ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়েই চলেছে,যার দরুন গাড়ি-ঘোরা থামতে সামনে আর রেললাইনের প্রয়োজন পরে না।তবে হয়তো সিগন্যাল না পড়লে , মেয়ের জল তৃষ্ণা না পেলে মন থেকে "বিসর্জন" দেওয়া পরিত্যাগ করা প্রানের ক্ষনিকের জন্য সঞ্চার ঘটত না।
আর,আমাদের শহরের সিগন্যাল যা হয়েছে ও আর উঠেছে! বস তোমরা।একটি দোকানের সামনে গাড়িটা লাগিয়ে মনোজ জল আনতে যাবার আগে বলে গেল-
কাঁচটা খুলে দাও বাইরের হাওয়া আসবে।
না বাবা থাক ওই গরম হাওয়ার দরকার নেই আমার, তুমি যাও।
আরে খুলে দাও!
আচ্ছা ঠিক আছে ঠিক আছে,যাও তুমি তারাতারি।কালো কাচটি হাফ নামিয়েই লাবণ্য বাইরের আবহাওয়া অনুভব করতে পারল।
যতটা গরম হাওয়া ভেবেছিলাম ততটা নয় দেখছি, হালকা গরম তবে মন্দ নয়। বাপরে বাপ গাড়ির হর্নের যা শব্দ কানের তালা ধরে যাচ্ছে। হঠাৎ লাবণ্য লক্ষ করল - তার গাড়ির ওপর একটি মানুষের ছায়া পড়েছে যেটি ধীরে ধীরে ক্ষীন হয়ে আসছে,বোধহয় কোন মানুষ এইদিক দিয়েই যাচ্ছে।
ক্ষনিকের মধ্যে সেই ছায়াটি গাড়ির হাফ খোলা কাচের ওপর এসে থেমে গেল। লাবণ্য জানলা দিয়ে সিঁথিতে সিঁদুর রাঙ্গানো ,হাতে শাঁখা পলা সহ-সম্পূর্ণ মুখ বের করতেই চোখ পড়ল-একটি মধ্যবয়েসী ছেলে যার দাড়ি ভরা মুখ টা খুবই পরিচিত লাগছে তার কাছে।গায়ে- সাদা জামা ,একটি নীল রঙের প্যান্ট যে তার দিকেই তাকিয়ে আছে।বাইরে থেকে একসঙ্গে একগুচ্ছ প্রশ্ন আসল তারদিকে। লাবণ্য গাড়ির ভিতর মুখ ঢুকিয়ে নিল ।
হাই,চিন্তে পেরেছিস? কেমন আছিস?কোথায় যাচ্ছিস?
হতবাক হয়ে গেল সে এ কে! এক নিমেষে গায়ের লোম জেগে উঠল তার,কিছুটা ভয়ে ভয়ে কাঁপা স্বরে উওর দিল লাবণ্য-আমি ভালো আছি,তুই?
ভালো।
এটা বুঝি তোর মেয়ে? কিছু সময় চুপ থাকল লাবণ্য।
হ্যাঁ,এটা আমার মেয়ে।আর জল আনতে গেল ওটা আমার হাজবেন্ড।
হাজবেন্ড বাবা ,ভুরুটা হালকা কুঁচকে রাজু জবাব দিল
হ্যাঁ জানি।
তুই কি করে জানিস? আর ভর দুপুরে বেলায় এখানে মানে আমাদের শহরেই বা কি করছিস তুই?
আমি সব জানি ,তোর হাজবেন্ড এর নাম মনোজ তাও জানি।
তুই বুঝি আমার পিছনে গোয়েন্দা লাগিয়েছিস?
না না, গোয়েন্দা কেন লাগাতে যাব?
তাহলে এত সব জানলি কি ভাবে?
আর আমার বিয়ে হয়েছে দুই বছর তোর তো জানবার কথাও নয় , তুই তো আমার ফেসবুক ফ্রেন্ডেও নেই !তাহলে ?
ও জানি আমি।
কী?
হ্যাঁ,এই দোকানটা দেখছিস,এটা আমার দোকান।
লাবণ্য হতবাক হয়ে গাড়ির ভিতর থেকেই একবার রাজুর দিকে আর একবার দোকানটার দিকে তাকাতে লাগল।
তুই এই দোকান!
হ্যাঁ,তোর বিয়ে হল যেই রাতে, সেই রাতেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি পড়াশোনা আর করব না ।তারপর ভাড়া নিয়ে এই দোকানটা শুরু করি। মোটামুটি ভালোই ইনকাম হচ্ছে,একার সংসার ওই জন্য আর চাপ নেই।
তাই বলে শিক্ষিত ছেলে হয়ে একটা জুতোর দোকান দিলি তুই শেষমেষ।
আর বিয়েটা কবে করবি তুই?
রাজু একগাল হেসে জবাব দিল - বিয়ে! সে তো করতে চেয়েছিলাম কিন্তু।
কিন্তু কী? থামলি কেন বল ।
তোর মনে আছে তোকে আমি প্রথম গিফ্ট করেছিলাম একটি জুতো, সেই পরিক্ষা দিতে গিয়ে।
অবশ্য এখনো তাই করি , কিন্তু সেটা একটু আলাদা ভাবেই।
ঠিক বুঝলাম না কী বলছিস তুই!
না মানে তোর বর তো আমার দোকান থেকেই তোর জুতো!
কী!
হ্যাঁ তোর বর আমার কাছ থেকেই তোর,তোর মেয়ের জুতো নেই। আমি কিন্তু অপেক্ষায় থাকি জানিস!
কিসের অপেক্ষা?
এই তোর বর কবে আসবে আমার দোকানে আর বলবে দাদা একটা জুতো দিন তো।
তুই তো আর আমার খবর রাখবি না আর সব ভুলেও গেছিস ।
আমি মেয়ে আমার দিক টা একটু ভেবে দেখ রাজু।
না না ,আমি তোকে দোষ দিচ্ছি না। দোষ তো আমার কপালের,না হলে আজ এই দিন দেখতে হয় নাকি?সব ঠিক ঠাক ছিল কিন্তু কী যে হয়ে গেল। লাবণ্যর সামনে অতীতটা ঝকঝকে সমুদ্রের জলের মতো ফুটে উঠল।কষ্ট যে তার ও হয় কিন্তু কিছুই যে করার নেই তার। রাজুর কথায় কান না দিয়ে সে জিজ্ঞাসা করল -
তুই এখন থাকিস কোথায়?
ওই যেখানে থাকতাম ,তোরা বুঝি সাহা পাড়াতেই থাকিস এখন?
হ্যাঁ, কিন্তু তুই জানলি কি করে আমরা সাহা পাড়ায় থাকি।
সব জানি আমি।
হ্যাঁ,ওই চৌরাস্তার মোড়ে যে হলুদ রঙের তিনতলা বাড়ি ওটাই আমাদের বাড়ি।
তবে ওখানে আর বেশিদিন থাকব না ।
কেন?
দিল্লি যাব।
ওটা এখনো ঠিক হয়নি বুঝি ? রাজুর প্রশ্ন শুনে একটু অবাক হয়ে লাবণ্য জানতে চাইল-
কোনটা ?
ওই,তোর হাজবেন্ডের বুকের সমস্যাটা।
তুই কী করে জানলি ওর ?
জানি আমি।
তুই কি আমাদের ওপর নজর রাখিস ?এটা কিন্তু ঠিক না। রাজু লাবণ্যর কথায় উত্তর না দিয়েই প্রশ্ন করে বসল।
বাচ্চার নাম কি রেখেছিস ?
তুই কিন্তু কথা এড়িয়ে যাচ্ছিস,বল।
তবে কি জানিস লাবণ্য!আমাদের ভালোবাসার এই ভাবে অপেক্ষায় কেটে যাবে আমি ভাবিনি। লাবণ্য দীর্ঘনিশ্বাস ফেলল,একটি হাত হাফ খোলা জানলার ওপর তুললো।আমার শশুর বাড়ির লোকজন ওর এই ব্যাপারটা গোপন রেখেছিল, বিয়ের এক বছর পরে জানতে পারি আমি সব তখন আর আমার কিছুই করার ছিল না।
হ্যাঁ তুই তো চাকরি বলে সব ভুলে গেছিলি।
তুই ভুল ভাবছিস আমাকে আমি যে তোকে !
কী আমাকে বল। লাবণ্যর মুখে আর কথা নেই।
তোকে তো ভুলতে পারিনি লাবণ্য তাই যতটুকু পারি !মনে ধরি,দেখ দেখ আমার দোকানের নামটা দেখ।
স্বপ্না গাড়ির ভিতর থেকেই উঁকি দিয়ে দেখতে পেল দোকানের নামটা তার নামেই খোদাই করা প্লেটে ঝকঝক করছে।
তুই তো আর এদিকে আসিস না।
আর কথা বলিস না , চুপ কর ও আসছে এই ভাবে কথা বলতে দেখলে অসুবিধা হবে।
ভালো থাকিস রাজু ।চোখটা লাল হয়ে উঠলো তার কিন্তু সে জানে একফোঁটা জল সে চাইলেও গাল বেয়ে গড়িয়ে দিতে পারবে না সে।
লাবণ্য!
হ্যাঁ চুপ কর চুপ কর ও আসছে।
আমি তোকে এখনো একইরকম ভালোবাসি রে।
আসলে প্রেম বেশিদিন বাঁচেনা, মায়া বাঁচে । এই মায়া টাকে মেরে ফেলতে হয়েছে লাবণ্যর।
আমাকে ক্ষমা করে দিস রাজু।
না রে তোর কোন দোষ নেই।
চুপ চুপ ..
মনোজ গাড়ির কাছে আসা মাত্রই রাজু বলে উঠলো-
কেমন আছেন দাদা?
চলে যাচ্ছে, তোমার খবর কি বল?
আমারো ওই একই, দাদা জুতো লাগবে নাকি আজ ডিসকাউন্ট আছে।
না ভাই লাগবে না অন্য সময় নেব আজ একটু ব্যাস্ত আছি।
এই নাও জল বলে মনোজ জলের বোতলটা স্বপ্নার হাতে তুলে দিল।মেয়ের মুখে রোদ লাগছে কাচটা উঠিয়ে দাও।বলেই গাড়ির দরজাটা সজোরে আটকে গাড়িতে বসে পরল মনোজ।
লাবণ্য কাচ তুলছে আর এক দৃষ্টিতে রাজুর দিকে তাকিয়ে রয়েছে। ভালোবাসা জলাঞ্জলি দেবার পর এটা ছিল তাদের প্রথম দেখা,তাও সেটা অজান্তেই অবশ্য অজান্তে দেখা হবার ভাবমূর্তি একটু আলাদাই বটে।
আচ্ছা দাদা সাবধানে যান তবে,এই বলে রাজু হাত নাড়ল।
লাবণ্য তখনো মরুভূমিতে মরীচিকার মতো বন্ধ কাচের মধ্যে তাকে দেখেই চলেছে।
কিছুক্ষনের মধ্যেই সিগন্যাল উঠে গেল একে একে সব গাড়িও চলে গেল ।কিন্তু রাজু ঠাঁই হয়ে দাঁড়িয়ে রইল কিছু প্রত্যাশা নিয়ে।
-----------------------------
Comments
Post a Comment