অপূর্ণতা
মোঃআরিফুজ্জামান সোহাগ
বৃষ্টি সেদিন অদ্ভুত রকমের নীরব ছিল। আকাশ কাঁদছিল ঠিকই, কিন্তু তার সেই কান্নায় কোনো শব্দ ছিল না—শুধু একটানা ঝরছিল, যেন ভিতরের সব জমে থাকা ভার ধীরে ধীরে নামিয়ে দিচ্ছে পৃথিবীর বুকে।
ঢাকার এক কোণে, উঁচু একটি অ্যাপার্টমেন্টের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল সৌরভ। তার হাতে এক কাপ চা, যেটা অনেক আগেই ঠান্ডা হয়ে গেছে। একসময় ধোঁয়া উঠছিল, গরম ছিল—এখন শুধু এক কাপ নিস্তেজ পানীয়, ঠিক তার জীবনের মতোই।
নিচে শহরটা আগের মতোই ব্যস্ত। গাড়ির হর্ন, মানুষের দৌড়ঝাঁপ, দোকানের আলো—সব কিছু চলছে একই ছন্দে। কিন্তু এই সব কিছুর মাঝেও সৌরভ নিজেকে যেন আলাদা করে ফেলেছে। সে দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু তার ভেতরের সময় যেন অনেক আগেই থেমে গেছে।
তার চোখ সামনে তাকিয়ে আছে, কিন্তু সে আসলে কিছুই দেখছে না। তার ভেতরে শুধু একটা নাম ঘুরপাক খাচ্ছে—নীহারিকা।
কয়েক বছর আগেও এই নামটা তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অংশ ছিল। এখন সেটাই হয়ে গেছে সবচেয়ে বড় শূন্যতা।
সৌরভ এখন সফল মানুষ। নিজের একটা প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি আছে, সমাজে তার একটা পরিচয় আছে। মানুষ তাকে দেখে সম্মান করে, তার মতো হতে চায়। কিন্তু দিনের শেষে, যখন সে একা হয়ে যায়, তখন এই সব অর্জন তার কাছে অর্থহীন মনে হয়।
তার মনে প্রায়ই একটা প্রশ্ন জাগে—সব কিছু পেয়েও কেন সে এত ফাঁকা অনুভব করে?
সে জানে, এর উত্তর খুব সহজ। কিছু জিনিস টাকা দিয়ে কেনা যায় না। আর কিছু মানুষ জীবনে একবার চলে গেলে, তাদের জায়গা আর কেউ নিতে পারে না।
ঠিক তখনই তার ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল নাম—রিয়াদ।
সৌরভ ফোনটা রিসিভ করল।
রিয়াদের কণ্ঠে হালকা বিরক্তি—
“কোথায় তুই? আজ অফিসে আসিস নাই কেন?”
সৌরভ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “মনটা ভালো না।”
রিয়াদ একটু থেমে আবার বলল, “তুই এখনো ওই মেয়েটার জন্য এমন করে আছিস?”
সৌরভ কোনো উত্তর দিল না। কারণ সে জানে, এই প্রশ্নের উত্তর শব্দে দেওয়া সম্ভব না। কিছু অনুভূতি থাকে, যেগুলো ব্যাখ্যা করতে গেলেই ছোট হয়ে যায়।
ফোনটা কেটে দিয়ে সে আবার সামনে তাকাল। বৃষ্টি তখনো পড়ছে। সেই বৃষ্টির ফোঁটাগুলো যেন তাকে ধীরে ধীরে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল কয়েক বছর আগের এক বিকেলে—যেদিন প্রথম দেখা হয়েছিল নীহারিকার সাথে।
সেদিনও এমনই হালকা বৃষ্টি ছিল। বইমেলায় মানুষের ভিড়, চারদিকে বইয়ের গন্ধ আর একটা অদ্ভুত উষ্ণতা।
সৌরভ সাধারণত এসব জায়গায় আসে না। কিন্তু সেদিন রিয়াদের জোরাজুরিতে এসেছিল। রিয়াদ বলেছিল, “চল না, একটু ঘুরে আসি। সারাক্ষণ কাজ করলে মানুষ থাকা যায় না।”
সৌরভ তখন হেসে বলেছিল, “বইমেলায় গিয়ে কী হবে?”
রিয়াদ মজা করে বলেছিল, “জীবনে একটু রোমান্স আন।”
সেই কথাটা তখন শুধু মজা মনে হয়েছিল। কিন্তু সে জানত না, সেদিনই তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে।
ভিড়ের মাঝে হঠাৎ একটা ধাক্কা লাগে।
একটা মেয়ের কণ্ঠ ভেসে আসে—“সরি!”
সৌরভ তাকিয়ে দেখে, একদম সাধারণ একটা মেয়ে। সাদা সালোয়ার কামিজ, ভেজা চুল, হাতে একটা বই। কিন্তু তার চোখে ছিল অদ্ভুত এক শান্তি, যা খুব সহজে চোখ এড়িয়ে যায় না।
মেয়েটা বইটা এগিয়ে দিয়ে বলল, “আপনি কি এই বইটা পড়েছেন?”
সৌরভ বইটার দিকে তাকাল, তারপর মেয়েটার দিকে।
“না, তবে আজ থেকে পড়তে পারি,” সে বলল।
মেয়েটা হালকা হাসল। সেই হাসিতে কোনো বাড়াবাড়ি ছিল না, কিন্তু অদ্ভুত একটা টান ছিল।
“আমি নীহারিকা,” সে বলল।
“সৌরভ,” সে উত্তর দিল।
সেই ছোট্ট পরিচয় থেকেই শুরু হয়েছিল এক দীর্ঘ গল্প।
প্রথমে মাঝে মাঝে কথা, তারপর নিয়মিত দেখা। বইমেলা শেষ হয়ে গেল, কিন্তু তাদের যোগাযোগ থামল না।
তারা প্রায়ই একটা ছোট ক্যাফেতে দেখা করত। খুব সাধারণ জায়গা—কিন্তু তাদের কাছে সেটাই ছিল বিশেষ।
এক কাপ চা আর দীর্ঘ কথোপকথন—এই ছিল তাদের সম্পর্কের ভিত্তি।
নীহারিকা খুব সাধারণ জীবনযাপন করত, কিন্তু তার চিন্তাধারা ছিল গভীর। সে বলত, “জীবনে বড় কিছু হওয়া জরুরি না, সুখী হওয়াটা জরুরি।”
সৌরভ সবসময় এর বিরোধিতা করত। তার বিশ্বাস ছিল, সফলতা ছাড়া সুখ আসে না।
এই নিয়ে তাদের অনেক তর্ক হতো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নীহারিকার হাসির কাছে সব যুক্তি হার মেনে যেত।
ধীরে ধীরে, তাদের সম্পর্কটা আরও গভীর হয়ে উঠল।
কিন্তু সেই গভীরতার মাঝেই কোথাও একটা অদৃশ্য ভয় লুকিয়ে ছিল—যেটা সৌরভ তখন বুঝতে পারেনি।
একদিন নীহারিকা হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, “যদি একদিন আমরা আর না থাকি?”
সৌরভ হেসে উড়িয়ে দিল, “এইসব আজগুবি কথা বলো না।”
নীহারিকা চুপ করে রইল। তার চোখে তখন এক ধরনের অজানা দুঃখ ছিল।
কিছুদিন পর থেকেই সব বদলাতে শুরু করল।
নীহারিকা ধীরে ধীরে দূরে সরে যেতে লাগল। ফোন কম করত, দেখা করতে চাইত না। কথাবার্তার মাঝেও একটা দূরত্ব স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।
সৌরভ বুঝতে পারছিল, কিছু একটা ঠিক নেই। কিন্তু যতই জিজ্ঞেস করত, নীহারিকা শুধু বলত, “সব সত্যি বললে সব ঠিক থাকে না।”
এই অস্পষ্ট উত্তরগুলো তাকে আরও অস্থির করে তুলছিল।
শেষ পর্যন্ত একদিন, নীহারিকা স্পষ্ট করে বলল—“আমরা এখানেই শেষ করি।”
সেই মুহূর্তটা সৌরভের জীবনে এক অদ্ভুত শূন্যতা তৈরি করে দেয়।
সে অনেক প্রশ্ন করেছিল, অনেক চেষ্টা করেছিল বোঝার। কিন্তু নীহারিকা কিছুই পরিষ্কার করে বলেনি।
পরদিন, একটা চিঠি।
সেই চিঠিতে নীহারিকা লিখেছিল, সে সৌরভকে ভালোবাসে। কিন্তু সেই ভালোবাসার কারণেই সে চলে যাচ্ছে।
কারণ সে বিশ্বাস করত, সে থাকলে সৌরভ তার স্বপ্ন পূরণ করতে পারবে না।
এই সিদ্ধান্তটা হয়তো যুক্তিসঙ্গত ছিল, কিন্তু তা মেনে নেওয়া সহজ ছিল না।
বর্তমানে ফিরে এসে সৌরভ গভীর একটা নিঃশ্বাস ফেলল।
বৃষ্টি তখন থেমে গেছে।
কিন্তু তার ভেতরের শূন্যতা এখনো একই রকম রয়ে গেছে।
সে জানে, কিছু গল্প কখনো শেষ হয় না। শুধু সময়ের কোনো এক জায়গায় থেমে যায়—অপূর্ণ থেকে যায় |
বৃষ্টি থেমে যাওয়ার পর শহরটা যেন একটু অন্যরকম হয়ে যায়। বাতাসে একটা ভেজা গন্ধ থাকে, রাস্তায় জমে থাকা পানিতে আলো প্রতিফলিত হয়, আর মানুষগুলোও যেন একটু ধীর হয়ে যায়।
সৌরভ বারান্দা থেকে ভেতরে ঢুকল। ঘরের ভেতরটা অস্বাভাবিক নীরব। এত বড় ফ্ল্যাট, কিন্তু শব্দ বলতে কিছুই নেই। সে ধীরে ধীরে সোফায় গিয়ে বসল।
টেবিলের উপর রাখা ফোনটা তুলে আবার রেখে দিল। কারও সাথে কথা বলার ইচ্ছে নেই। অথচ ভেতরের একাকীত্বটা যেন আরও ভারী হয়ে উঠছে।
হঠাৎ তার চোখ পড়ল বুকশেলফের দিকে।
সে উঠে গিয়ে ধীরে ধীরে একটা বই বের করল। বইটা অনেক পুরনো, পাতাগুলো একটু হলদে হয়ে গেছে। প্রথম পাতাটা খুলতেই তার চোখ থেমে গেল।
ছোট্ট করে লেখা—
“প্রথম দিনের জন্য — নীহারিকা”
সৌরভ কিছুক্ষণ চুপ করে সেই লেখাটার দিকে তাকিয়ে রইল। তার আঙুল হালকা কেঁপে উঠল। যেন কয়েকটা অক্ষর হঠাৎ করে তাকে বহু বছর পেছনে টেনে নিয়ে গেল।
সেই দিনটার পর থেকে তাদের দেখা হওয়া যেন খুব স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছিল। কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই, কোনো চাপ ছাড়াই—শুধু একসাথে সময় কাটানো।
নীহারিকার একটা অদ্ভুত অভ্যাস ছিল—সে কথা বলার মাঝখানে হঠাৎ থেমে যেত। যেন কোনো গভীর চিন্তার ভেতরে ঢুকে পড়েছে।
একদিন সৌরভ তাকে জিজ্ঞেস করেছিল,
“তুমি হঠাৎ হঠাৎ চুপ হয়ে যাও কেন?”
নীহারিকা হেসে বলেছিল,
“সব কথা বলার জন্য না। কিছু কথা নিজের ভেতরে রাখাই ভালো।”
সৌরভ তখন হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু এখন সে বুঝতে পারে—নীহারিকার ভেতরে অনেক কিছু ছিল, যা সে কখনো বলেনি।
দিন যেতে লাগল। সম্পর্কটা আরও গভীর হতে লাগল। তারা একে অপরের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠল।
কিন্তু সেই গভীরতার ভেতরেই ধীরে ধীরে একটা অদৃশ্য দূরত্ব তৈরি হচ্ছিল—যেটা প্রথমে খুব ছোট ছিল, কিন্তু সময়ের সাথে সাথে বড় হতে লাগল।
একদিন সৌরভ লক্ষ্য করল—নীহারিকা আগের মতো হাসছে না।
সে জিজ্ঞেস করল,
“কিছু হয়েছে?”
নীহারিকা মাথা নেড়ে বলল,
“না, কিছু না।”
“তাহলে এমন চুপচাপ কেন?”
নীহারিকা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
“সবকিছু সবসময় একরকম থাকে না, সৌরভ।”
এই উত্তরটা সৌরভকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি। বরং তার মনে সন্দেহ আরও বেড়ে গেল।
এরপর থেকে নীহারিকা ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে নিতে শুরু করল।
ফোন করলে আগের মতো দীর্ঘ কথা হতো না। দেখা করতে বললে নানা অজুহাত দিত।
সৌরভ বুঝতে পারছিল—সে ইচ্ছে করেই দূরে সরে যাচ্ছে।
একদিন সে আর নিজেকে থামাতে পারল না।
“তুমি কি আমাকে এড়িয়ে যাচ্ছ?”
নীহারিকা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর বলল,
“না… আমি শুধু চাই না তুমি আমার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ো।”
“মানে?”
“মানে… যদি আমি না থাকি?”
সৌরভ বিরক্ত হয়ে বলল,
“আবার সেই একই কথা! তুমি কেন বারবার এমন বলো?”
নীহারিকা তার দিকে তাকাল। সেই দৃষ্টিতে এক ধরনের অসহায়তা ছিল।
“কারণ… সবকিছু আমাদের হাতে থাকে না।”
সেই দিনটার পর সৌরভের মনে একটা অদ্ভুত ভয় ঢুকে গেল।
সে বুঝতে পারছিল—নীহারিকা কিছু একটা জানে, যেটা সে জানে না।
কিন্তু সেটা কী?
সে অনেকবার চেষ্টা করেছে জানতে। কিন্তু প্রতিবারই নীহারিকা এড়িয়ে গেছে।
একদিন রাতে হঠাৎ নীহারিকা ফোন করল।
তার কণ্ঠটা কেমন যেন ভারী শোনাচ্ছিল।
“তুমি ব্যস্ত?”
“না, বলো।”
“একটা কথা জিজ্ঞেস করবো?”
“করো।”
“তুমি কি আমাকে বিশ্বাস করো?”
সৌরভ এক মুহূর্তও দেরি না করে বলল,
“অবশ্যই।”
নীহারিকা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর ধীরে বলল—
“তাহলে আমার একটা কথা রাখবে?”
“কি কথা?”
“যদি কোনোদিন আমি হঠাৎ করে তোমার জীবন থেকে চলে যাই… তুমি আমাকে খুঁজবে না।”
সৌরভ রেগে গেল।
“তুমি কি পাগল নাকি? এসব কী বলছো!”
নীহারিকা আর কিছু বলল না। শুধু ফোনটা কেটে দিল।
সেই রাতটা সৌরভ ঘুমাতে পারেনি।
সৌরভ হঠাৎ চোখ খুলল। সে বুঝতে পারল—সে আবার অতীতের ভেতরে ডুবে গিয়েছিল।
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল—রাত অনেক হয়ে গেছে।
ঘরের ভেতরের নীরবতা আরও ঘন হয়ে উঠেছে।
সে উঠে গিয়ে জানালার পাশে দাঁড়াল। বাইরে রাস্তার আলো জ্বলছে। মাঝে মাঝে গাড়ি যাচ্ছে।
সব কিছু স্বাভাবিক।
শুধু তার ভেতরটা ছাড়া।
তার মনে হলো—নীহারিকার সেই কথাগুলো সে তখন বুঝতে পারেনি।
এখন বুঝতে পারে—
সে ইচ্ছে করেই দূরে সরে গিয়েছিল।
কিন্তু কেন?
এই প্রশ্নটার উত্তর এখনো অজানা।
আর সেই অজানার ভেতরেই আটকে আছে সৌরভ।
রাতটা কেটে গেল অদ্ভুত এক অস্থিরতায়।
সৌরভ অনেকবার চেষ্টা করেও ঘুমাতে পারল না। চোখ বন্ধ করলেই নীহারিকার সেই কথাগুলো মাথায় ফিরে আসছিল—
“যদি কোনোদিন আমি হঠাৎ করে চলে যাই…”
ভোরের দিকে একটু ঘুম এসেছিল, কিন্তু সেটা ছিল অস্থির আর ভাঙা।
সকালে ঘুম থেকে উঠে সে নিজেকে অদ্ভুত ক্লান্ত লাগল। যেন শরীর না, মনটাই বেশি ক্লান্ত।
অফিসে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হতে গিয়ে সে হঠাৎ থেমে গেল। আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ।
চোখের নিচে কালি পড়েছে। মুখে এক ধরনের শূন্যতা।
সে নিজেই বুঝতে পারল—সে আর আগের মতো নেই।
সেই দিন অফিসে গিয়েও কাজের প্রতি মন বসাতে পারল না সৌরভ।
মিটিং চলছিল, কেউ কিছু বুঝিয়ে বলছিল—কিন্তু সে কিছুই ঠিকভাবে শুনতে পাচ্ছিল না।
শেষ পর্যন্ত সে হঠাৎ করে সিদ্ধান্ত নিল—আজ সে সবকিছু পরিষ্কার করবে।
সে সরাসরি নীহারিকার বাসার দিকে রওনা দিল।
ঠিকানাটা তার জানা ছিল। আগে কয়েকবার গিয়েছে।
কিন্তু আজ সেখানে পৌঁছে সে থমকে গেল।
গেট বন্ধ।
বাড়িটার সামনে তালা ঝুলছে।
পাশের দোকানদারকে জিজ্ঞেস করল—
“এই বাসার লোকজন কোথায় গেছে জানেন?”
লোকটা বলল—
“ওরা তো কয়েকদিন আগেই চলে গেছে।”
সৌরভের বুক ধক করে উঠল।
“কোথায় গেছে?”
লোকটা কাঁধ ঝাঁকাল—
“ঠিক জানি না। শুনলাম অন্য কোথাও উঠেছে।”
সেই মুহূর্তে সৌরভের মনে হলো—মাটি যেন একটু সরে গেল তার পায়ের নিচ থেকে।
সে তাড়াতাড়ি ফোন বের করে নীহারিকার নম্বরে কল দিল।
“দ্য নম্বর ইউ হ্যাভ ডায়ালড ইজ সুইচড অফ।”
একবার, দুইবার, তিনবার—
একই উত্তর।
তার মাথার ভেতর হঠাৎ একটা অদ্ভুত ভয় ঢুকে গেল।
সে রিয়াদকে ফোন করল।
“তুই কোথায়?”
“অফিসে। কেন?”
“আমি একটু পরে আসছি… একটা কথা আছে।”
রিয়াদের সামনে বসে সৌরভ সব বলল।
রিয়াদ চুপচাপ শুনল।
তারপর ধীরে বলল—
“তুই কি কখনো ওর ফ্যামিলির সাথে ঠিকভাবে কথা বলেছিস?”
সৌরভ মাথা নাড়ল—
“না… খুব বেশি না।”
“তাহলে তুই আসলে ওকে কতটুকু চিনতিস?”
এই প্রশ্নটা সৌরভকে থামিয়ে দিল।
সে বুঝতে পারল—সে সত্যিই অনেক কিছু জানে না।
সেই রাতে বাসায় ফিরে সে আবার চিঠিটা বের করল।
অনেকবার পড়েছে, তবুও আবার পড়তে লাগল।
হঠাৎ তার চোখ একটা লাইনে আটকে গেল—
“আমি থাকলে তুমি পূর্ণ হতে পারবে না…”
এই লাইনটা আগে সে শুধু আবেগ দিয়ে দেখেছিল।
কিন্তু আজ—
এটার মধ্যে যেন অন্য কোনো অর্থ লুকিয়ে আছে মনে হলো।
সে আবার পুরো চিঠিটা মন দিয়ে পড়ল।
কোথাও কি কোনো ইঙ্গিত ছিল?
কোনো লুকানো কথা?
হঠাৎ তার মনে পড়ল—
একদিন ক্যাফেতে বসে নীহারিকা বলেছিল—
“আমার সময় খুব বেশি না।”
তখন সে ভেবেছিল—এটা শুধু কথার কথা।
কিন্তু যদি—
এটা সত্যি হয়?
সৌরভের বুকের ভেতর ঠান্ডা একটা শূন্যতা তৈরি হলো।
সে হঠাৎ করে উঠে দাঁড়াল।
তার মাথায় এখন শুধু একটা চিন্তা—
নীহারিকা কি কিছু লুকাচ্ছিল?
পরদিন সে আবার সেই ক্যাফেতে গেল।
ওই একই টেবিল।
সব কিছু আগের মতোই আছে—
শুধু নীহারিকা নেই।
ক্যাফের একজন পুরনো ওয়েটার তাকে চিনতে পারল।
“স্যার, অনেকদিন পর!”
সৌরভ সরাসরি জিজ্ঞেস করল—
“এই যে… আমার সাথে যে মেয়ে আসত… তাকে দেখেছেন?”
ওয়েটার একটু চুপ করে থেকে বলল—
“ও তো অনেকদিন আগে এসেছিল… একা।”
“কখন?”
“আপনার সাথে শেষ দেখা হওয়ার কিছুদিন পর।”
“কিছু বলেছিল?”
ওয়েটার মাথা নাড়ল—
“হ্যাঁ… একটা খাম রেখে গিয়েছিল।”
সৌরভের বুক ধক করে উঠল।
“কোথায় সেটা?”
ওয়েটার কাউন্টারের ভেতর থেকে একটা পুরনো খাম বের করল।
“বলেছিল—আপনি যদি কখনো আসেন, এটা দিতে।”
সৌরভ কাঁপা হাতে খামটা নিল।
খামটা এখনো খোলা হয়নি।
কিন্তু তার ভেতরে কী আছে—
সেটাই বদলে দিতে পারে সবকিছু।
সৌরভ কিছুক্ষণ খামটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তার মনে হচ্ছিল—এই খামটা খোলার পর সবকিছু বদলে যাবে।
হয়তো সে এমন কিছু জানতে যাচ্ছে, যেটা জানার পর আর আগের মতো থাকতে পারবে না।
তার হাত কাঁপছিল।
ধীরে ধীরে খামটা খুলল।
ভেতর থেকে একটা ভাঁজ করা চিঠি বের হলো।
চিঠিটা খুলতেই প্রথম লাইনে চোখ আটকে গেল—
“এই চিঠিটা তুমি যখন পড়বে, আমি তখন তোমার নাগালের অনেক বাইরে।”
সৌরভের বুকটা ধক করে উঠল।
সে পড়তে লাগল—
“সৌরভ,
আমি জানি তুমি আমাকে খুঁজবে।
তুমি থামবে না—তুমি এমনই।
কিন্তু এই চিঠিটা তোমাকে থামানোর জন্যই লেখা।
তুমি বারবার জানতে চেয়েছো—আমি কেন বদলে যাচ্ছি।
আমি কেন দূরে সরে যাচ্ছি।
আজ বলছি।
কারণ—আমার সময় খুব কম।
আমি অসুস্থ, সৌরভ।
অনেকদিন ধরেই।
প্রথমে আমি নিজেও বিশ্বাস করিনি।
ভেবেছিলাম ঠিক হয়ে যাবে।
কিন্তু ধীরে ধীরে বুঝতে পারলাম—সবকিছু ঠিক হওয়ার জন্য না।
আমি চাইনি তুমি জানো।
কারণ তুমি জানলে—
তুমি সব ছেড়ে আমার পাশে দাঁড়াতে।
তুমি তোমার স্বপ্ন থামিয়ে দিতে।
আর আমি কখনো চাইনি—
আমি তোমার জীবনের বাঁধা হয়ে যাই।
তাই আমি দূরে সরে গেছি।
ইচ্ছে করে।
নিজেকে খারাপ বানিয়ে।
তোমাকে কষ্ট দিয়ে।
কারণ এই কষ্টটা সাময়িক—
কিন্তু তুমি যদি আমার জন্য থেমে যেতে, সেই কষ্টটা সারাজীবনের হতো।
আমি জানি তুমি আমাকে ঘৃণা করার চেষ্টা করবে।
কিন্তু তুমি পারবে না।
কারণ আমাদের ভালোবাসাটা সত্যি ছিল।
শুধু সময়টা আমাদের ছিল না।
আমি হয়তো তোমার সাথে শেষবারের মতো দেখা করতে পারতাম।
কিন্তু আমি চাইনি তুমি আমাকে সেই অবস্থায় দেখো।
আমি চাই—
তুমি আমাকে সেই মেয়েটা হিসেবেই মনে রাখো,
যে বৃষ্টির দিনে বই হাতে দাঁড়িয়ে ছিল।
আমি তোমাকে ছেড়ে যাইনি, সৌরভ।
আমি শুধু চাইনি তুমি আমার সাথে ডুবে যাও।
তুমি বাঁচো।
তুমি এগিয়ে যাও।
কারণ তোমার পূর্ণতা—
আমার অপূর্ণতা হয়ে থাকলেও,
তোমার থেমে যাওয়াটা আমি সহ্য করতে পারতাম না।
ভালোবাসি।
সবসময়ই বাসবো।
— নীহারিকা”
চিঠিটা পড়ে সৌরভের হাত ধীরে ধীরে নিচে নেমে গেল।
চারপাশের শব্দ যেন হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেছে।
ক্যাফের ভেতরে মানুষ কথা বলছে, কেউ হাসছে—
কিন্তু তার কানে কিছুই আসছে না।
তার মনে হলো—
সে এতদিন একটা ভুল গল্প বিশ্বাস করে ছিল।
সে ভেবেছিল—
নীহারিকা তাকে ছেড়ে গেছে।
কিন্তু সত্যিটা—
নীহারিকা তাকে বাঁচাতে চলে গেছে।
সৌরভ চুপচাপ চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল।
তার চোখে পানি ছিল—কিন্তু সে কাঁদছিল না।
এই কষ্টটা কান্নার থেকেও ভারী।
সে ধীরে ধীরে ক্যাফে থেকে বেরিয়ে এল।
বাইরে আকাশ আবার মেঘলা হয়ে গেছে।
হালকা বাতাস বইছে।
তার মনে পড়ল—
নীহারিকা বলেছিল,
“সবকিছু আমাদের হাতে থাকে না।”
আজ সে বুঝল—
সেটা কতটা সত্যি।
সেদিন রাতে সৌরভ আবার বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল।
হাতে চায়ের কাপ।
আকাশে আবার বৃষ্টি নামতে শুরু করেছে।
কিন্তু আজকের বৃষ্টি অন্যরকম।
আজ সে শুধু শূন্যতা অনুভব করছে না—
সে একটা সত্য মেনে নিচ্ছে।
সব ভালোবাসা একসাথে থাকার জন্য না।
কিছু ভালোবাসা—
শুধু ত্যাগের জন্য।
সৌরভ আর কখনো নীহারিকাকে খুঁজেনি।
কারণ সে জানে—
কিছু মানুষকে খুঁজে পাওয়া যায় না,
তাদের শুধু মনে রাখা যায়।
সে তার জীবন নিয়ে এগিয়ে গেছে।
সফল হয়েছে।
কিন্তু তার ভেতরের একটা অংশ চিরকাল ফাঁকা থেকে গেছে।
সেই ফাঁকা জায়গাটার নাম—
নীহারিকা।
আর সেই শূন্যতার নাম—
অপূর্ণতা।
===================
মোঃআরিফুজ্জামান সোহাগ
গ্রামঃদ্বীপনগর
থানাঃকাহারোল
জেলাঃদিনাজপুর
বিভাগঃরংপুর
দেশঃবাংলাদেশ
Comments
Post a Comment