অহনার দুর্গ
জয় মণ্ডল
উত্তর কলকাতার মল্লিক লেন। এই গলির ভেতরের ‘সিংহী বাড়ি’ যেন একটা থমকে যাওয়া সময়। পুরনো আমলের খড়খড়ি দেওয়া জানলা, চুন-সুরকির খসে পড়া দেওয়াল আর শ্যাওলা ধরা উঠোন। এই বনেদি বাড়ির বড় ছেলে সায়ন। সায়নের বয়স যখন বারো, তখন তার চোখের সামনে এক পথ দুর্ঘটনায় তার বাবা-মা মারা যান। সেই গভীর মানসিক আঘাত বা ট্রমা সায়নের মনটাকে চিরতরে এক লাজুক, গুটিয়ে থাকা, নরম কোণ তৈরি করে দিয়েছিল। সে বাইরের পৃথিবীর রূঢ় বাস্তবতাকে ভয় পেত। কর্পোরেট অফিসের অজস্র ফাইলের ভিড়ে সায়ন ছিল এক কোণে বসে থাকা এক নিরীহ কর্মী, যাকে সবাই খাটিয়ে নিত, কিন্তু কেউ সম্মান করত না।
কিন্তু সায়নের জীবনের এই শূন্যতা আর অন্ধকারকে এক লহমায় আলোয় ভরিয়ে দিয়েছিল অহনা। অহনা পেশায় একটি নামী স্কুলের ইতিহাসের শিক্ষিকা। কিন্তু তার ব্যক্তিত্ব সাধারণ নারীদের মতো নয়। অহনা তীক্ষ্ণ, বুদ্ধিমতী এবং স্বভাবগতভাবেই অত্যন্ত ডমিন্যান্ট বা আধিপত্যবাদী। সে যখন কথা বলে, চারপাশের মানুষ শুনতে বাধ্য হয়। বিয়ের পর যখন অহনা এই বাড়িতে পা রাখল, সে প্রথম দিনই সায়নের ভেতরের সেই অসহায়, ভীত শিশুটিকে চিনে নিয়েছিল। সে সায়নকে ভালোবেসেছিল—তবে সেই ভালোবাসা সাধারণ ছিল না, তা ছিল এক তীব্র অধিকারবোধ, ডমিন্যান্স এবং গভীর কামনার এক অদ্ভুত মিশেল।
রাত তখন এগারোটা। উত্তর কলকাতার বুকে তখন নিঝুম শান্তি। চারদিকের জানলাগুলো বন্ধ করে অহনা যখন তাদের বিশাল খাটের ওপর এসে বসল, তখন ঘরের পরিবেশটাই বদলে গেল। সায়ন ধুতি-পাঞ্জাবি ছেড়ে একটা সাধারণ ট্রাউজার্স পরে খাটের এক কোণে বসে ছিল, তার চোখে এক চেনা সমীহ আর ব্যাকুলতা।
অহনা তার পরনের ঢাকাই শাড়িটা এক ঝটকায় শরীর থেকে সরিয়ে দিল। মোমবাতির হালকা আলোয় অহনার সুডৌল, ফর্সা এবং দৃঢ় শরীরটা এক অলৌকিক সৌন্দর্যের সৃষ্টি করল। সে সায়নের দিকে তাকিয়ে তার গম্ভীর অথচ কামার্ত গলায় বলল, "কাছে এসো, সায়ন।"
সায়ন মন্ত্রমুগ্ধের মতো অহনার দিকে এগিয়ে গেল। অহনা সায়নের চুল মুঠো করে ধরে তাকে বিছানায় শুইয়ে দিল। এই দাম্পত্য জীবনে অহনাই পরিচালক, আর সায়ন তার বাধ্য অনুগত। অহনার ব্যক্তিত্ব সায়নের ভেতরের সমস্ত পুরুষত্বকে এক অদ্ভুত উদ্দীপনায় জাগিয়ে তুলত। সে নিজের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ অহনার হাতে সঁপে দিয়ে এক পরম শান্তি পেত।
অহনার উত্তপ্ত ঠোঁট আর ধারালো নখগুলো সায়নের পিঠে আর ঘাড়ে নিজের অধিকারের দাগ এঁকে দিতে লাগল। "তুমি শুধু আমার, সায়ন। এই বাইরের পৃথিবীটা তোমাকে চেনে না, কিন্তু এখানে তুমি আমার দাস, আমার রাজা," অহনা ফিসফিস করে বলল।
কিন্তু বাইরের পৃথিবীটা বড় নিষ্ঠুর। সায়নের এই নরম এবং লাজুক স্বভাবের সুযোগ নিল তার অফিসের কিছু কুচক্রী সহকর্মী। সায়ন যে ব্যাঙ্কে চাকরি করত, সেখানকার ম্যানেজার এবং তার কিছু সঙ্গী মিলে কোটি টাকার এক লোন কেলেঙ্কারি ঘটায়। আর সমস্ত জাল দস্তাবেজ এবং ফাইলে সায়নের সরলতার সুযোগ নিয়ে তার সই করিয়ে নেয়।
একদিন বিকেলে হঠাৎ করেই সায়নের ফ্ল্যাটে হানা দিল ভিজিল্যান্স ডিপার্টমেন্ট এবং পুলিশ। সায়নকে চোর, জালিয়াতি এবং অপরাধী বলে সবার সামনে হেনস্থা করা হলো। অফিসের ম্যানেজার সায়নের ওপর সমস্ত দোষ চাপিয়ে দিয়ে নিজে সাধু সেজে রইল। সায়ন এতটাই ভয় পেয়ে গিয়েছিল যে সে পুলিশের সামনে নিজের পক্ষে একটা কথাও বলতে পারল না। সে শুধু কাঁপছিল আর কাঁদছিল।
খবর পেয়ে অহনা যখন থানায় পৌঁছাল, তখন সায়নের অবস্থা দেখে তার বুকটা ফেটে গেল। লক-আপের এক কোণে সায়ন নগ্নপ্রায় অবস্থায়, অপমানে আর আতঙ্কে গুটিসুটি মেরে বসে আছে। সমাজের চোখে সে এখন এক দাগী আসামি। আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-পড়শি সবাই সিংহী বাড়ির দিকে আঙুল তুলছে।
"অহনা... আমি কিছু করিনি... ওরা আমার সই জালিয়াতি করেছে... আমাকে বাঁচাও..." সায়ন অহনার পা জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল।
অহনার চোখ দুটো রাগে আর প্রতিজ্ঞায় জ্বলজ্বল করে উঠল। তার ভেতরের ডমিন্যান্ট সত্তাটি এবার বাইরের পৃথিবীর সাথে যুদ্ধ করার জন্য জেগে উঠল। সে সায়নের মাথায় হাত রেখে বলল, "উঠে দাঁড়াও, সায়ন। অশ্রু মুছবে না। যারা তোমার এই চোখের জলের কারণ, তাদের আমি এই সমাজের সামনে নগ্ন করব। এটা অহনার প্রতিজ্ঞা।"
অহনা বুঝতে পেরেছিল, শুধু আইনি লড়াইয়ে এই প্রভাবশালী অপরাধীদের হারানো যাবে না। এর জন্য প্রয়োজন এক চরম বুদ্ধিমত্তার চাল। সে স্কুল থেকে কয়েকদিনের ছুটি নিল। তারপর সায়নের অফিসের সেই মূল চক্রী ম্যানেজার প্রদীপের ওপর নজর রাখতে শুরু করল।
অহনা তার এক প্রাক্তন ছাত্র, যে এখন একজন সাইবার এক্সপার্ট, তাকে সাথে নিয়ে প্রদীপের ফোন এবং ল্যাপটপ হ্যাক করল। সে আবিষ্কার করল, প্রদীপ শুধু ব্যাঙ্কের টাকাই চুরি করেনি, সে বিভিন্ন নারীদের ব্ল্যাকমেইল করত এবং তার ল্যাপটপে বহু আপত্তিকর ভিডিও ছিল।
একদিন রাতে অহনা প্রদীপকে একটা বেনামী নম্বর থেকে ফোন করে বলল, "প্রদীপ বাবু, সায়নকে তো ফাঁসালেন, কিন্তু আপনার ল্যাপটপের ‘গোপন ফোল্ডার’টা যদি এখন সিবিআই-এর কাছে চলে যায়? আজ রাত বারোটায় বালিগঞ্জের সেই পুরনো ফ্যাক্টরিতে একা আসুন, নয়তো কাল সকালে আপনার জগৎ শেষ।"
প্রদীপ ভয় পেয়ে একা সেই পরিত্যক্ত ফ্যাক্টরিতে পৌঁছাল। ঘরটা ছিল অন্ধকার। প্রদীপ ভেতরে ঢুকতেই পেছন থেকে একটা ভারী রড দিয়ে তার পায়ে আঘাত করা হলো। প্রদীপ আর্তনাদ করে মেঝেতে পড়ে গেল।
লাইটটা জ্বলে উঠল। প্রদীপ অবাক হয়ে দেখল সামনে দাঁড়িয়ে আছে অহনা, তার হাতে একটা লোহার চেইন। অহনা প্রদীপকে কোনো দয়া না দেখিয়ে, তাকে সেই ফ্যাক্টরির পিলারের সাথে শক্ত করে বেঁধে ফেলল। প্রদীপ যতই চিৎকার করার চেষ্টা করছিল, অহনা তার চাবুক আর রড দিয়ে প্রদীপকে পশুর মতো পেটাতে লাগল।
"সায়নের মতো একটা সরল ছেলেকে ফাঁসানোর সাহস কী করে হলো তোর?" অহনার প্রতিটা চাবুকের ঘায়ে প্রদীপের অহংকার চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছিল। সে যন্ত্রণায় অহনার পা চাটতে বাধ্য হলো। অহনা প্রদীপের সেই রক্তাক্ত অবস্থার ভিডিও রেকর্ড করল এবং তার মুখ থেকে সমস্ত সত্যি অপরাধের স্বীকারোক্তি ক্যামেরায় বন্দি করল।
পরদিন সকালে সেই ভিডিও এবং সমস্ত ডিজিটাল প্রমাণ সিবিআই এবং মিডিয়ার কাছে পৌঁছে গেল। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সায়ন সসম্মানে জেল থেকে খালাস পেল, আর প্রদীপ ও তার সঙ্গীদের সারাজীবনের জন্য জেল হলো।
সমাজ স্তব্ধ হয়ে গেল। যে প্রতিবেশীরা সিংহী বাড়ির দিকে থুতু ফেলছিল, তারা আজ অহনার সাহসিকতার সামনে মাথা নত করল।
বিকেলে সায়ন আর অহনা যখন তাদের ঘরের বারান্দায় এসে দাঁড়াল, কলকাতার বুকে তখন এক শান্ত গোধূলির আলো। সায়ন অহনার হাতটা শক্ত করে ধরে নিজের চোখের জল মুছল। সে বলল, "অহনা, তুমি না থাকলে আজ আমি শেষ হয়ে যেতাম। সমাজ আমাকে কাপুরুষ বলতে পারে, কারণ আমি নিজেকে রক্ষা করতে পারিনি। কিন্তু আমি গর্বিত যে তুমি আমার স্ত্রী।"
অহনা সায়নকে নিজের বুকে টেনে নিল। তার চোখ দুটোতে তখন এক পরম তৃপ্তি।
এই গল্পটি সমাজকে এক অত্যন্ত জরুরি বার্তা দিয়ে যায়। আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ মনে করে, একজন পুরুষকে সবসময় ‘সবল’, ‘আক্রমণাত্মক’ এবং ‘ডমিন্যান্ট’ হতে হবে, আর নারীকে হতে হবে ‘নরম ও পরনির্ভরশীল’। কিন্তু প্রকৃতি সবাইকে এক ছাচে গড়ে না। কোনো পুরুষ যদি স্বভাবগতভাবেই নরম, লাজুক বা মানসিকভাবে দুর্বল হয়, তবে সে সমাজ থেকে বাতিল হয়ে যায় না। আর একজন নারী যদি ডমিন্যান্ট বা আধিপত্যবাদী হয়, তার মানে এই নয় যে সে ঘর ভাঙবে।
প্রকৃত দাম্পত্য হলো পারস্পরিক পরিপূরক। অহনা দেখিয়ে দিল, শয়নকক্ষে যে নারী তার স্বামীর ওপর আধিপত্য বিস্তার করে আনন্দ পায়, সে-ই বাইরের নিষ্ঠুর পৃথিবীর বুকে তার দুর্বল স্বামীর জন্য এক দুর্ভেদ্য দুর্গ বা ঢাল হয়ে দাঁড়াতে পারে। সবল স্ত্রী কখনও দুর্বল স্বামীর খামতি নয়, বরং সে তার জীবনের সবচেয়ে বড় অহংকার এবং শক্তি। শয়নকক্ষের সেই আদিম তীব্র ভালোবাসার রসায়নই বাইরের পৃথিবীর সমস্ত ঝড়ঝাপটা থেকে তাদের দাম্পত্যকে চিরকালের জন্য সুরক্ষিত করে রাখল।
......................................
Joy Mondal,
Kalimandir purbapara, kalikapur, Near PHC, post- kalikapur, P. S- sonarpur, Dist- South 24 Pgs, W. B- 743330
Email id : joymondal274@gmail.com

Comments
Post a Comment