দু’টাকা
অনিন্দ্য পাল
ট্রেন থেকে যখন বাসব প্ল্যাটফর্মে নামল, তখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধে নামছে। শিয়ালদহ মেইন লাইনের লোকাল ট্রেন মানেই এক নরককুণ্ড, আর আজ যেন সেই নরকের উত্তাপ আরও কয়েক গুণ বেশি। অফিস ফেরত আর কলেজ ফেরত মানুষের কনুইয়ের গুঁতো, ঘামের গন্ধ আর চড়া গলার চিৎকারে বাসবের মাথাটা ঝিমঝিম করছিল। ভিড়ের চাপে ট্রেনের হাতল ধরে ঝুলতে ঝুলতে হাত দুটো অবশ হয়ে গেছে। প্ল্যাটফর্মে পা দিয়েই সে একটা থামের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। বুকটা ধকধক করছে, ফুসফুস দুটো যেন একটুখানি টাটকা বাতাসের জন্য হাঁসফাঁস করছে।
কিন্তু বাতাসের চেয়েও এই মুহূর্তে যা বাসবকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিচ্ছিল, তা হল তার পেটের ভেতরের এক তীব্র, অসড় করা খিদে। দুপুরের দিকে কলেজের ক্যান্টিনের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় সিঙ্গাড়ার গন্ধ পেয়েছিল, কিন্তু পকেটে হাত দেওয়ার সাহস হয়নি। আজ সকাল থেকেই তার পকেট একেবারে গড়ের মাঠ। মেসের শেষ টাকাটা কালই চুকে গেছে। বাড়ি থেকে মানি-অর্ডার আসতে আরও অন্তত দুটো দিন বাকি। কলেজ থেকে স্টেশন পর্যন্ত টানা আধ ঘণ্টা হেঁটে আসতে আসতে পা দুটো ভারী হয়ে আসছিল, এখন মনে হচ্ছে শরীরটা যেন অবাধ্য হয়ে কাঁপছে। চোখের সামনে স্টেশনের হলুদ আলোগুলো কেমন যেন আবছা, ধোঁয়াটে ঠেকছিল।
বাসব একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে প্ল্যাটফর্মের বাইরের দিকে পা বাড়াল। পকেটে হাত দিয়ে দেখল—কিচ্ছু নেই, শুধু একটা রুমাল আর লাইব্রেরির কার্ড। একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে সে যখন স্টেশনের এক নম্বর প্ল্যাটফর্মের টিকিট কাউন্টারের পাশ দিয়ে চত্বরের দিকে বেরোচ্ছে, ঠিক তখনই শব্দটা হল।
*ঠং!*
একটা ধাতব শব্দ। প্ল্যাটফর্মের সিমেন্টের মেঝেতে পড়ে কোনো একটা শক্ত জিনিস বেশ কয়েকবার ডিগবাজি খাওয়ার চেনা আওয়াজ। বাসব চমকে উঠে নিজের পায়ের দিকে তাকাল। একটা চকচকে কয়েন ঘুরতে ঘুরতে এসে ঠিক তার ডান পায়ের জুতোটার গা ঘেঁষে স্থির হল। বাসব থমকে দাঁড়াল। চারপাশের ব্যস্ত মানুষগুলো যে যার মতো ছুটে চলেছে। কেউ ট্রেনের দিকে দৌড়োচ্ছে, কেউ স্টেশনের বাইরে যাওয়ার জন্য উদগ্রীব। কারও পায়ের দিকে তাকানোর অবকাশ নেই, কেউ এই সামান্য শব্দটায় কান দেওয়ার প্রয়োজনও বোধ করেনি। বাসব কয়েক মুহূর্ত ইতস্তত করল। তারপর এদিক-ওদিক তাকিয়ে চট করে নীচু হয়ে কয়েনটা তুলে নিল।
হাতের তালুতে কয়েনটা রাখতেই বাসবের চোখে এক চিলতে আলো ফুটে উঠল। একটা দু’টাকার কয়েন। ভারতের মানচিত্রে খোদাই করা, রুপোলি রঙের একটা সামান্য দু’টাকার কয়েন। এই কোটিপতিদের শহরে দু’টাকার কোনো মূল্য নেই হয়তো, কিন্তু এই মুহূর্তে বাসবের কাছে ওটা যেন আলাদিনের চেরাগ। পেটের ভেতর খিদের যে বাঘটা এতক্ষণ গর্জন করছিল, সে যেন হঠাৎ একটু শান্ত হল। মনটা এক অদ্ভুত, অনাবিল খুশিতে ভরে উঠল বাসবের। অন্তত একটা কিছু পেটে পড়বে এবার।
স্টেশনের বাইরেই লাইন দিয়ে সারিসারি সস্তার হোটেল আর খাবারের দোকান। উনানের ধোঁয়া, ফুটন্ত তরকারির গন্ধ আর চড়বড় করে ভাজার শব্দে চারপাশটা ম ম করছে। বাসব একটা ছোট, টিমটিমে আলো জ্বলা হোটেলের সামনে এসে দাঁড়াল। হোটেলের নামটা ঝাপসা হয়ে গেছে, তবে বাইরে একটা ব্ল্যাকবোর্ডে চক দিয়ে লেখা—'রুটি-ঘুগনি ৪ টাকা'।
বাসব মনে মনে একটা হিসেব কষে নিল। চার টাকায় এক প্লেট ঘুগনি আর দুটো রুটি পাওয়া যায়। তার কাছে আছে ঠিক দু’টাকা। সে যদি দুটো রুটি না নিয়ে একটা রুটি আর সামান্য একটু ঘুগনি চায়, তবে দোকানদার নিশ্চয়ই ফিরিয়ে দেবে না? দুটো রুটি তো তার লাগবেও না, একটা রুটিতেই আপাতত খিদের জ্বালাটা একটু শান্ত হবে, মেস পর্যন্ত পৌঁছানোর শক্তিটুকু পাওয়া যাবে। নিজেকে আশ্বস্ত করে বাসব হোটেলের ভেতরে ঢুকল।
কোণের দিকে একটা খালি টেবিল পেয়ে সে বসল। টেবিলের ওপর তেলচিটে সস্তার সানমাইকা। পাশে একটা নোংরা বেসিন। বাসব প্রথমে বেসিনের কলে হাতটা ভালো করে ধুয়ে নিল। তারপর এসে নিজের সিটে বসতেই একটা ছায়া এসে দাঁড়াল টেবিলের পাশে।
বাসব তাকিয়ে দেখল, একটা বেশ ঢ্যাঙা আর রোগা মতন ছেলে। বয়স আঠারো-উনিশের বেশি হবে না। পরনে একটা ময়লা হাফ প্যান্ট আর গেঞ্জি, কাঁধে একটা নোংরা গামছা গোঁজা। ছেলেটা কোনো ভূমিকা না করে টেবিলের ওপর একটা কাঁচের জলের গ্লাস “ঠক” করে নামিয়ে রাখল। গ্লাসের জলটা সামান্য ছিটকে পড়ল টেবিলে।
ছেলেটা রুক্ষ, ক্লান্ত চোখে বাসবের দিকে তাকিয়ে উদাসীন গলায় বলল, "কী দেব?"
বাসব নিজের শুকনো ঠোঁট দুটো জিভ দিয়ে একবার ভিজিয়ে নিল। তারপর মৃদু স্বরে বলল, "আমাকে একটা রুটি-ঘুগনি দিন।"
ছেলেটা বাসবের দিকে এক পলক তাকাল। বাসবের জীর্ণ জামাকাপড় আর ক্লান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে তার গলার স্বর আরও কর্কশ শোনাল, "একটা মানে? এক প্লেট তো? দুটো রুটি আর ঘুগনি?"
"না, না," বাসব একটু আমতা আমতা করে বলল, "দুটো রুটি আমার লাগবে না। আমি একটা রুটি নেব। একটা রুটি আর অল্প একটু ঘুগনি দিলেই হবে।"
বলতে বলতে বাসব নিজের পকেট থেকে সেই ঘামে ভেজা, এতক্ষণ মুঠোয় চেপে রাখা দু’টাকার কয়েনটা বের করল। কয়েনটা আলতো করে টেবিলের ওপর, ঠিক সেই জলের গ্লাসটার পাশে রাখল সে। কয়েনের গায়ে বাসবের হাতের ঘাম লেগে চকচক করছে।
ঢ্যাঙা ছেলেটা কয়েক মুহূর্ত স্থির দৃষ্টিতে প্রথমে কয়েনটার দিকে, তারপর বাসবের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখে কোনো দয়া বা সহানুভূতি জাগল না, বরং এক চরম অবজ্ঞা আর বিরক্তি ফুটে উঠল। যেন বাসব কোনো অপরাধ করে ফেলেছে, কিংবা তাকে অপমান করেছে।
ছেলেটা একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। তারপর অত্যন্ত রূঢ় আর কর্কশ স্বরে বলল, "উঠে যাও এখান থেকে। একটা রুটি বিক্রি নেই আমাদের। চার টাকার নিচে এখানে কিছু পাওয়া যায় না।"
বাসব হকচকিয়ে গেল। সে বিনীতভাবে বলল, "ভাই, আজ আমার কাছে আর টাকা নেই। খুব খিদে পেয়েছে, একটা রুটি দিলেই..."
"বললাম তো হবে না!" ছেলেটা এবার প্রায় ধমকে উঠল। "এখানে দয়া-দাক্ষিণ্য করতে বসিনি। একটা রুটি দিলে বাকি রুটিটা কাকে বেচব? ফালতু ঝামেলা কোরো না, ওঠো।"
কথাটা শেষ করেই ছেলেটা টেবিল থেকে জলের গ্লাসটা এক ঝটকায় তুলে নিল। যেন বাসব এই হোটেলের জল খাওয়ারও যোগ্য নয়। তারপর হনহন করে ভেতরের দিকে চলে গেল।
হোটেলের বাকি দু-চারজন গ্রাহক আর কাউন্টারে বসা মালিক ভদ্রলোক একবার বাসবের দিকে তাকালেন, কিন্তু কেউ একটা কথাও বললেন না। সবাই যে যার খাবারে মগ্ন হয়ে গেলেন।
বাসবের বুকের ভেতরটা এক তীব্র কষ্টে মোচড় দিয়ে উঠল। খিদের জ্বালাটার চেয়েও এই চরম অপমানটা তার বুকটাকে যেন পিষে দিল। একটা রুটি, যার দাম মাত্র দুটো টাকা, তা পাওয়ার যোগ্যতাও কি তার নেই এই সমাজে? মানুষের দারিদ্র্য কি এতটাই উপহাসের বস্তু? বাসবের চোখ দুটো জ্বালা করে উঠল, কিন্তু সে কান্নাটা চেপে রাখল। টেবিল থেকে নিজের সেই অপয়া দু’টাকার কয়েনটা তুলে নিয়ে সে ধীর পায়ে হোটেল থেকে বেরিয়ে এল।
বাইরে তখন অন্ধকার আরও ঘন হয়েছে। স্টেশনের আলো আর রাস্তার নিয়ন বাতিগুলো মিলেমিশে এক অদ্ভুত মায়াজাল তৈরি করেছে। কিন্তু বাসবের চারপাশটা যেন ঘোর অন্ধকার। সে আবার হাঁটতে শুরু করল স্টেশনের দিকেই। পেটের খিদেটা এখন আর মোচড় দিচ্ছে না, সেটা যেন একটা অসাড় ব্যথায় পরিণত হয়েছে। মাথাটা হালকা লাগছে, পা দুটো যেন নিজের ইচ্ছায় চলছে না, শুধু অভ্যাসের বশে এগিয়ে চলেছে।
স্টেশনের কাছাকাছি আসতেই একটা চেনা সুর বাসবের কানে ভেসে এল। স্টেশনের প্রবেশদ্বারের একপাশে, একটা নোংরা চটের ওপর বসে আছে এক অন্ধ ভিখারী। রোজই বসে। তার গলায় একটা জীর্ণ হারমোনিয়াম ঝোলানো। সে আপন মনে, ব্যাকুল সুরে গাইছে:
"আমায় একটু জায়গা দাও মায়ের চরণে..."
সেই অন্ধ গায়কের খসখসে অথচ দরদী গলার আওয়াজটা এই জনাকীর্ণ, নির্মম স্টেশনের কোলাহল ভেদ করে বাসবের কানে এসে লাগল। গানটার সুর যেন বাসবের ভেতরের সমস্ত জমে থাকা কষ্ট আর একাকীত্বকে নাড়া দিয়ে গেল। এই বিরাট পৃথিবীতে, এত মানুষের ভিড়ে, সত্যিই কি তার মতো এক সামান্য ছাত্রের কোনো জায়গা নেই? একটুখানি সহানুভূতির কোনো স্থান নেই?
বাসব হঠাৎ থমকে দাঁড়াল। সে পকেটে হাত দিল। আঙুলের ডগায় ঠেকল সেই দু’টাকার কয়েনটা। যে কয়েনটা তাকে একটু আগে চরম অপমান এনে দিয়েছিল, যে কয়েনটা তার খিদের অন্ন জোগাতে পারেনি। বাসব অন্ধ ভিখারীটির দিকে তাকাল। লোকটার সামনে একটা ছোট অ্যালুমিনিয়ামের বাটি রাখা, তাতে মাত্র গোটা কয়েক পয়সা আর একটা ১০ টাকার ময়লা নোট পড়ে আছে। লোকটা পরম শান্তিতে, সমস্ত ক্ষুধা আর অপমানকে তুচ্ছ করে গান গেয়ে চলেছে।
বাসব আর এক মুহূর্তও ভাবল না। সে দ্রুত পায়ে ভিখারীটির সামনে এগিয়ে গেল। তারপর হাতের মুঠো থেকে সেই দু’টাকার কয়েনটা আলতো করে বাটিটার মধ্যে ফেলে দিল।
“টুং” করে একটা মৃদু শব্দ হল।
কয়েনটা পড়ার শব্দ পেয়ে অন্ধ ভিখারীটি গান থামাল না, তবে তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠল। সে বাসবের দিকে না দেখতে পেয়েও শূন্যে মাথাটা একটু ঝুঁকিয়ে যেন এক নীরব আশীর্বাদ জানাল।
বাসব একটা অদ্ভুত হালকা বোধ করল। তার পেটের খিদেটা ম্যাজিকের মতো গায়েব হয়ে যায়নি ঠিকই, কিন্তু মনের ভেতরের সেই ভারী পাথরটা যেন এক ঝটকায় নেমে গেল। এই দু’টাকা হয়তো তার একটা রুটির সংস্থান করতে পারেনি, কিন্তু কারও রাতের খাবারের আশাটুকু তো জাগিয়ে রাখতে পারল।
বাসব এবার দ্রুত পা চালাল প্ল্যাটফর্মের দিকে। মেসের দূরত্ব অনেকখানি, হেঁটেই যেতে হবে। কিন্তু এখন আর তার শরীর কাঁপছে না। অন্ধ গায়কের গানের সুরটা তখনও তার পিছু পিছু আসছিল—"আমায় একটু জায়গা দাও..."। বাসবের মনে হল, এই নিষ্ঠুর শহরের বুকেও কোথাও না কোথাও ঠিক জায়গা হয়ে যাবে তার। অন্তত নিজের বিবেকের কাছে তো সে হেরে যায়নি।
Comments
Post a Comment