সংশোধন
কৌশিক দরিপা
সংশোধানাগার এক অন্য পৃথিবী। বাইরের লোক অনুমান করতে পারবে না ভিতরের জগৎ এর মানুষের তিক্ততার বিষয় গুলি।সবাই ভাবে ভিতরে হয়তো বন্দিরা চিন্তা,ভাবনাহীন,উদ্দেশ্যহীন ভাবে বাঁচে।জীবন দর্শন তাদের ভবিষ্যতের হয়তো একদম শেষ হয়ে যায়।যারা দাগী অপরাধী তাদের ব্যাপার আলাদা,মানে যারা ধারাবাহিক ভাবে কালো জগতের সাথে যুক্ত ছিলো,তাদের শাস্তি সময়ের অপেক্ষা থাকে।তারা জানেই,একদিন না একদিন এই বন্দি জীবন তাদের আপন করে নিতেই হবে।কিন্তু যারা জীবনে অপরাধ করেনি কোনোদিন,সুস্থ জীবন যাপনের মাঝে হঠাৎ কোনো দোষ করে বসে,শাস্তির পর তাদের অনুতপ্ত জীবন হার মানে বেঁচে থাকা আয়ুর কাছে।কিন্তু যারা তারপরেও জীবনে সৎ আদর্শের অনুভূতি নিয়ে বেঁচে থাকতে চায়,তারাই একমাত্র জীবনে সংশোধনের মানে বুঝতে পারে।যেমন বুঝতে পেরেছিলো অনিল।
অনিল পান্ডে।মফস্বল শহরের নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে।বাবা,মা ও ছোট বোন কে নিয়ে তাদের দিন আনা দিন খাওয়া সংসার।বাবা ট্রাক ড্রাইভারি করে টেনে নিয়ে যেতো তাদের সংসার।ড্রাইভারি লাইনে মদ বিলাসিতা নয়,প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছিল তার বাবার।প্রতিদিন এই নিয়ে মায়ের সাথে ঝগড়াও কম হতো না।যদিও বস্তি পরিবেশের বাড়ি গুলোতে এই ধরনের ঝগড়া কিছুটা গা সওয়া ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।অনিলেরও অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো, প্রতিদিন বাবার মদ খেয়ে এসে মায়ের সাথে ঝগড়া করতে দেখা।সে কিন্তু বাঁচতে চেয়েছিলো একটু অন্যরকম ভাবে।সে চেয়েছিলো পড়াশুনা করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে।সে নিজেও পড়তো আর বোন কেও পড়াশুনা শেখাতো।বস্তির পাশেই প্রাইমারি স্কুলের গন্ডি পার করে হাইস্কুলে সে পড়াশুনা করেছিল।রেজাল্টে প্রথম বা দ্বিতীয় না হলেও ,মেধা তালিকাতে বরাবরই সবার নজর কাড়তো।
স্কুলের গন্ডি পার করে কলেজে ভর্তি হয় সে।কলেজের শেষ বছরে ঘটে অঘটন টি।তার বাবা মধ্য রাতে মদ খেয়ে ট্রাক চালানোর সময় ধাক্কা মারে অন্য একটি লরিকে।দুর্ঘটনার সাথে সাথেই তার বাবার মৃত্যু হয়।তার বাবার গোটা শরীর টা আর পাওয়া যায়নি।বিক্ষিপ্ত শরীরটার অংশ গুলো এক করে দাহ করতে হয়েছিল তাকে।কলেজের পড়া শেষও হলো না,তার মাথায় এসে পড়লো সংসারের দায়িত্ব।মা ও বোনকে সামলে জীবনে টিকে থাকার এক পরীক্ষা নেয় বিধাতা তার কাছে।
সে হার মানে নি।জীবনে ভালো ভাবে বাঁচার যে স্বপ্ন সে দেখেছিল- পড়াশুনা ছাড়িয়ে গেলেও, তা পূরণ করতে সে নেমে পড়ে জীবন সংগ্রামে।বাবার সাথে সে মাঝে মাঝেই ট্রাক চালানোর তালিম নিতো।বাবা বলতো,শিক্ষা কখনো বিফলে যায় না।কখন কোন শিক্ষা কাজে লাগে কেও বলতে পারে না।অনিলেরও কাজে লেগে গেছলো সেই ট্রাক চালানোর শিক্ষা।বাবার ট্রান্সপোর্ট কোম্পানি তে ওই শিক্ষার জেরেই সে চাকরি পেয়ে ছিলো।প্রথম কয়েক বছর খালাসি হিসাবে ছিলো গাড়িতে,পরে হাত পাকা হয়ে গেলে সে পাকা ড্রাইভার হয়ে ওঠে।সামলে নেয় সে তার ভেসে যাওয়া সংসারটিকে। প্রায় দশ বছর ট্রাক চালিয়ে সে জায়গা কিনে এক তালা পাকা বাড়ি বানায়,বোন কে পড়াশুনা করিয়ে সু পাত্রের সাথে বিয়ে দেয়।মা ও ছেলের সুখের সংসারে যদি কিছু কম ছিলো-তা হলো এক বৌমার।
বয়স টা একটু বেশি হয়ে যাওয়ায় বিয়ের ইচ্ছা অনিলের অনেকটাই কমে গেছলো।মায়ের জেদে অবশেষে সে রাজি হয় বিয়েতে।নেশাহীন,কর্মঠ,অল্প শিক্ষিত সুপাত্রের জন্য মেয়ের অভাব হয় নি তাদের সমাজে।বোনের শ্বশুর বাড়ির দূর সম্পর্কের এক ননদ রুপার সাথে তার বিয়ে সম্পন্ন হয়।
গ্রাজুয়েশন করা রূপা যেমন ছিলো রূপবতী,তেমনি ছিলো গুণবতীও।পয়ত্রিশ বছরের অনিলের থেকে প্রায় দশ বছরের ছোট রূপার বিয়েতে মত ছিলো না।কিন্তু বাড়ির আর্থিক অবস্থা খারাপ হওয়ায় বাড়ির চাপেই রাজি হয়েছিলো সে।রূপা এই বিয়েকে নিজের ভবিতব্য মেনে নিয়ে অনেকটা মানিয়ে নিয়েছিলো।পাঁচ বছরের সংসার জীবন পার করে সে,এক বাচ্চার মা হয়ে সংসার কে বেশ ভালো ভাবেই আঁকড়ে ধরেছিল।শাশুড়ি মারা যাওয়ার পর সংসারের পুরো দায়িত্ব এসে পড়ে রুপার উপর।
অনিলের গাড়ি চালানোর অনেক দিনের অভিজ্ঞতা হওয়ার জন্য তাকে দূরের অন্য রাজ্যের লম্বা কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়।কখনো উত্তর ভারত,কখনো দক্ষিণ ভারত সে ছুটে বেড়াতো মাল পৌঁছাতে বা কখনো আনতে।একেক বারের লম্বা যাত্রায় কখনো পনেরো দিন বা কখনো কুড়ি দিন তার সময় লেগে যেতো।দূর রাজ্যে যাওয়ার দরুন তার পরিশ্রম অনেকটা বেড়ে গেলেও আয়টাও অনেক টা বেড়ে যায়। বেতন,খাওয়া খরচ সব বাদেও উপরি কিছু পাওনাও পাওয়া যেতো একেকটা যাত্রায়।এই লোভনীয় রোজগার অনিল তাই ছাড়তে রাজি ছিলোনা। একেক যাত্রার পর পাঁচ -ছয় দিন বাড়িতে থাকা,আবার গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়া -এই হয়ে গেছলো অনিলের জীবন।রূপা অনেক বার মানা করেছিল,কাজটা ছেড়ে দিয়ে অন্য কোনো কাজ জোগাড় করতে।কিন্তু অনিল বলতো,আমার বাবা আমাকে যা দিতে পারে নি,আমি তা আমার ছেলেকে দিয়ে যেতে চায় -এক সুন্দর ভবিষ্যত।
প্রথম প্রথম রুপার খারাপ লাগলেও,রূপা ধীরে ধীরে মন কে মানিয়ে নেয়।ছেলেকে নিয়ে তার একা থাকাটা অভ্যাসে দাঁড়িয়ে পড়ে।ধীরে ধীরে অনিলের উপর টানও কমতে থাকে তার।অনিল কিন্তু রূপা ও ছেলের কোনো শখ সাধ পূরণ করতে বাকি রাখে নি।রূপা অনেক দিন ধরে দাবি করেছিল একটা ভালো দামি স্মার্ট ফোনের।ছেলে স্কুলে চলে গেলে আমি খুব একা হয়ে পড়ি,ফোন সাথে থাকলে একটু সময় কাটাতে পারবো নিজের মত করে।অনিল না করেনি।রুপার এক জন্মদিনে তাকে বেশ দামি মোবাইল কিনে দেয়।
এই ফোনই কাল হল রুপার জীবনে।ফোনের আসক্তি ধীরে ধীরে রূপা কে অনেক দুরে নিয়ে চলে গেলো অনিলের থেকে।আগেই অনিলের উপর টান কমে গেছল।এখন অনিল বাড়িতে থাকলেও যা ,আর না থাকলেও একই অনুভূতি হয় রুপার।অনিল বুঝতে পারে ,রূপা অনেক দূরে চলে যেতে বসেছে তার থেকে।সে অনেক চেষ্টা করে রুপাকে বোঝাবার কিন্তু বারে বারেই সে ব্যর্থ হয়।পায় শুধু অশান্তি।ঠান্ডা মাথার অনিল সাধারণত রাগে না,কিন্তু মাথায় যদি রাগ উঠে যায়,সে আর নিজেকে সামলাতে পারে না।
অনেক দিন ধরেই অনিল লক্ষ্য করছে রূপা কারো সাথে ফোনে কথা বলে।মনের সন্দেহ আরো বাড়ে যখন, সে বাড়িতে না থাকা অবস্থায় মধ্য রাতে ফোনে রুপাকে ব্যস্ত পায়।পাড়ার লোকের কাছেও কানাঘুষো অনেক কথায় তার কানে আসে।তার অবর্তমানে বাড়িতে কেও আসে।রুপাকে সে জিজ্ঞাসা করলে,সে বলে- কখনো মাসতুতো দাদা,কখনো বলে- ছোট বেলার বন্ধু।অনিলের সন্দেহ ক্রমশ বাড়তে থাকে।সে হাতে নাতে তাদের ধরতে চায়।বাড়িতে অনিল একদিন রুপার ফোন হাতে পেয়ে মেসেজে দেখে,মেসেজে লম্বা লম্বা কথোপোকথন।অনিল রূপা কে ওগুলো দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করলে,রুপা বলে-বেশ করেছি,ও আমার প্রেমিক রাজেশ।মাথায় যেন বজ্রাঘাত হয় অনিলের ।রুপার সাথে তর্কাতর্কি বেড়েই চলে।অনিলের মাথা তপ্ত হয়ে যায়,যখন সে রুপার কাছে জানতে পারে যে, তারা বিয়ে করতে চায়।
অনিল কি করবে,কিছু বুঝতে পারে না।রাগে সে রুপাকে চড় থাপ্পড় মারতে থাকে।রূপা নিজেকে বাঁচাতে চেষ্টা করে।জোরাজুরিতে অনিল ধরে ধাক্কা মারে রুপাকে।দেওয়ালে প্রচন্ড জোরে রুপার মাথা ধাক্কা লাগে।গোটা দেওয়াল ভরে যায় রক্তের দাগে।রূপা লুটিয়ে পড়ে মাটিতে।ছেলে পাশের রুমে ঘুমোচ্ছিল,জোর চিৎকারে সে দৌড়ে এসে দেখে ,মা লুটিয়ে পড়েছে মাটিতে।তার মা আর নেই।
অনিল থানায় গিয়ে নিজেকে আত্মসমর্পণ করে।ছেলেকে তার মামাবাড়িতে নিয়ে যায় তার মামারা।কয়েক বছর আদালতে মামলা চলতে থাকে।অনিল নিজের দোষ স্বীকার করে অনুতপ্ত ভাবে।আদলতে সে কোনো লুকায়নি।সব সত্য জানার পর আদালত তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়।অনিলের ঠায় হয় এই সংশোধনাগারে।অনিলের জীবন একেবারে পাল্টে যায়।
সেখানে কয়েদিদের অনেক দল ছিলো।তাদের প্রভাব প্রতিপত্তিও অনেক উপর পর্যন্ত ছিলো।মাঝে মাঝেই কারারক্ষীদের অজান্তে ঝামেলা লেগে যেতো তাদের মধ্যে।নতুন কোনো কয়েদি এলে কে তাকে দলে নেবে এই নিয়ে ছিলো ঝামেলা।অনিল কেও সবাই নিজের দলে টানার চেষ্টা করে। ঠান্ডা মাথার,ভালো ব্যবহারের জন্য সবাই তাকে একটু আলাদা নজরে দেখতে থাকে।সে সবাই কে বোঝাতে থাকে,আমরা সবাই এখানে কোনো না কোনো অপরাধ করে তার শাস্তি ভোগ করছি।তাই নতুন ভাবে আর কোনো অপরাধ করে নিজেদের পাপের ভাগ বাড়িয়ে কোনো লাভ নেই।সবাই বুঝতে পারে অনিলের কথা গুলো,সবাই দল ভেঙে একসাথে থাকতে থাকে।
সেখানে সবার কাজ আলাদা করা থাকতো।কেও রান্নার,কেউ সবজি কাটার,কেও বাসন মাজার, কেও খাবার পরিবেশনের-এই ভাবে দায়িত্ব ভাগ করা ছিলো।সারাদিন কাজের পর তাদের নিজ নিজ কুঠুরিতে রাখা হত।সন্ধ্যার থেকে তারা নিজের নিজের কারাগারে নিস্তেজ ভাবে বসে বা শুয়ে থাকতো।অনিল লক্ষ করেছিলো- সেখানের বন্দিরা কেউ পড়াশুনা জানতো না।অনিল একদিন সুপার কে বলেন- স্যার,সন্ধ্যে থেকে আমরা তো সবাই ফাঁকা থাকি।তাই সন্ধ্যাবেলায় যদি কয়েদিদের পড়াশুনার ব্যবস্থা করা যায়,তাহলে আমি সবাই কে পড়াতে চায়।সুপার খুশি হয়ে,ব্ল্যাক বোর্ড ও বই খাতার সব ব্যবস্থা করে দেন।শুরু হয় সেখানে সন্ধ্যাকালীন বিদ্যালয়।অনিল সেখানে নিরক্ষর বন্দি গুলো কে পরিচয় করায় অক্ষরের সাথে।সেখানে পরিবেশ ধীরে ধীরে বদলাতে থাকে।পড়াশুনার প্রতি তাদের আগ্রহ বেড়ে যায়।পাপের অধিকারীরা ধীরে ধীরে ফিরে আসতে থাকে শিক্ষার আলোয়।
বছরের পর বছর এভাবেই সেখানে পড়াশোনার পরিবেশ স্থায়ী ভাবে বিরাজ করে।শিক্ষা দফতরের অনুমোদনে সেখানে স্থায়ী ক্লাস ও পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়।অনিল সহ আরো বাইরের দুই শিক্ষক কে নিযুক্ত করা হয়।এই বছর প্রথম সেখান থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষা দেবে কিছু জন কয়েদি,যাদের সবাই কে অনিল অক্ষর জ্ঞান শিখিয়েছিল।তারা দিন রাত এক করে পড়াশুনা করে।ফল বেরোলে সবাই প্রথম বিভাগে পাশ করে।এই প্রথম এই সংশোধনাগারে কেউ মাধ্যমিক পাশ করায় সেখানে খুশির হাওয়া বয়েছিল।
আজ পনেরো আগস্ট,স্বাধীনতা দিবস।প্রতি বছরের মত এবারেও সেখানে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল।সেখানে প্রধান অতিথি হিসাবে এসেছিলেন জেলার এস,পি সাহেব।অনিল ও তার মাধ্যমিক পাশ করা ছাত্রদের সংবর্ধনা দেন তিনি।অনুষ্ঠান শেষে এস,পি সাহেব জানান যে,এখানের পুলিশ সুপার ভালো কাজের জন্য অনিলের নাম সরকারের কাছে পাঠিয়েছিলেন মুক্তির জন্য।সরকার তার এই মহান কাজের জন্য অনিলকে মুক্তি দিতে সম্মতি জানিয়েছে।
অনিল কে মঞ্চে কিছু বলার জন্য অনুরোধ করা হলে,অনিল বলে-এই মুক্তি আমি চায় না।আমি এখানেই থাকতে চায়।আমি চলে গেলে হয়তো বন্দিরা আবার আগের মত অশিক্ষার অন্ধকারে ডুবে যাবে।যেখানে অশিক্ষা সেখানেই কালো অপরাধ,আর যেখানে শিক্ষার আলো সেখানেই মুক্তি।আমার মুক্তি এই সংশোধানারগারেই।আমি আজীবন এখানে পাপের অন্ধকার থেকে সবাই কে মুক্তির আলো দেখাতে চায়।মানুষ মাত্রই ভুল করে,অপরাধ করে,কিন্তু যে নিজের ভুলকে স্বীকার করে, ভুলকে শুধরে নিতে পারে সেটাই তো আসল জীবনের সংশোধন।আজ তার বাবার কথা গুলো খুব মনে পড়ছে অনিলের -শিক্ষা কখনো বিফলে যায় না,কখন তা কিভাবে কাজে লেগে যায়....তা কেউ জানে না।
............................................
Kousik Daripa
Court More,Asansol
Paschim Barddhaman
Pin-713304
West Bengal
Comments
Post a Comment