ফেরা
মিঠুন মুখার্জী
তখন দেশটা সবে ভাগ হয়েছে। সালটা ১৯৪৭। পূর্ববঙ্গ হয়ে যায় পূর্ব পাকিস্তান। বহু হিন্দুরা পূর্ববঙ্গ ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গে, তথা ভারতবর্ষে। কিন্তু ভারতবর্ষ ছেড়ে মুসলমানরা খুব একটা পূর্ব পাকিস্তানে যায়নি। জাতীয় কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের হঠাৎ দেশভাগের সিদ্ধান্তে বহু হিন্দু-মুসলমান হারিয়েছিলেন তাদের মাতৃভূমি, ঘরবাড়ি ও প্রিয় মানুষজন। এমনই একজন মুসলিম হলেন কাদের আলী খান। পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বসিরহাটের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান ছিলেন তিনি। পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে তিনি একাই তার দুই ছেলেকে নিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের বরিশালে চলে এসেছিলেন। মুসলিম হলেও তিনি পূর্ব পাকিস্তানে তার মাতৃভূমি ছেড়ে যেতে চাননি। কিন্তু পরিস্থিতি তাকে বাধ্য করেছিল। এ দেশে তিনি জাতীয় কংগ্রেসের একজন নেতা ছিলেন। যথেষ্ট দাপট ছিল তার। কিন্তু এক বিশ্বাসঘাতক বন্ধু পার্টির উচ্চ পদস্থ নেতাদের কাছে এই তথ্য দিয়েছিলেন যে, "কাদের আলী জাতীয় কংগ্রেস ছেড়ে মুসলিম লীগের হয়ে কাজ করছেন।" নিজের ও সন্তানদের প্রাণ বাঁচাতে তাকে বাংলা ছেড়ে পূর্ব পাকিস্তানে যেতে হয়েছিল।
বরিশালে গিয়ে একপ্রকার বাধ্য হয়েই মুসলিম লীগে যোগ দিয়েছিলেন কাদের আলী খান। পশ্চিম পাকিস্তানীদের অত্যাচার থেকে বাঁচতে তিনি এই কাজ করেছিলেন। হিন্দু মুসলমানদের মধ্যে সেই সময় দাঙ্গা শুরু হয়েছিল। বহু হিন্দুর প্রাণ তিনি বাঁচিয়েছিলেন। তিনি হিন্দুদেরকে শত্রু মনে করতেন না। কারণ তার জন্মই ছিল হিন্দুদের পাড়ায়। হিন্দুরা তাদের বহু উপকার করেছিলেন একসময়। তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বরূপ এমন করেছিলেন তিনি।
কাদের আলী খানের বউ ছিলেন বসিরহাটের এক হিন্দু পরিবারের মেয়ে। প্রেম করে বিয়ে করায় কাদের আলীর বাবা তার সঙ্গে সম্পর্ক রাখেননি। বাবা মারা যাওয়ার পর বাড়িতে জায়গা হয়েছিল তার। বাবা বেঁচে থাকাকালীন তিনি বাড়ির চৌহদ্দির মধ্যে কোনদিন আসেননি। বউ অনিমা মন্ডলকে নিয়ে তিনি বসিরহাটের একটা ভাড়া বাড়িতে দীর্ঘদিন ছিলেন। রাজনৈতিক দলের নেতা হলেও বাবা তাকে হিন্দু মেয়ে বিয়ের জন্য কোন মূল্য দিতেন না। অমর ও আকবর হওয়ার পর কাদের আলীর মা লুকিয়ে লুকিয়ে একবার তাদের দেখতে এসেছিলেন। নাতিদের মুখ দেখে দুজনকে দুটো সোনার চেন দিয়েছিলেন। ছেলেকে বলেছিলেন--- "কাদের, বাবারা রাগের মাথায় অনেক কথাই বলেন। কিন্তু সেগুলো তার মনের কথা নয়। তুই ও অনিমা ওনার পা ধরে তোদের কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চাইলে, আমার বিশ্বাস উনি তোদের অবশ্যই মেনে নেবেন। মনের মধ্যে রাগ পুষে না রেখে যত তাড়াতাড়ি পারিস বাড়িতে আসিস। কদিনই বা আমরা বাঁচবো।" এই কথাগুলো বলতে গিয়ে কাদের আলীর মায়ের দুচোখে জল দেখা গিয়েছিল। সেই দিন রাতে বাবা জানতে পেরে মাকে খুবই বকাবকি করেছিলেন। অতিরিক্ত উত্তেজনার কারণে হার্ট অ্যাটাকে মারা যান তিনি। খবর পেয়ে দীর্ঘদিন বাদে বউ বাচ্চাদের নিয়ে বাড়িতে ফিরে আসেন কাদের আলী খান। চার ভাইয়ের সঙ্গে বাবার কবরে মাটি দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু অনিমাকে কেউই কবরে মাটি দিতে দেননি। কাদের আলীর খুব খারাপ লেগেছিল তার বিবির প্রতি এমন আচরণ দেখে। তবুও দাঁতের উপর দাঁত চেপে তার বউয়ের উপর ভাইদের ও ভাই বউদের খারাপ আচরণ তিনি মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু মাত্রা অতিরিক্ত হয়ে উঠলে তাদের প্রতি হওয়া অন্যায়ের বিরুদ্ধে তিনি তীব্র প্রতিবাদ করেন এবং সকল ভাইদের থেকে আলাদা হয়ে যান। তারপর কংগ্রেসের জেলা সভাপতি হন তিনি। সেই সময় পার্টির জন্য প্রাণও দিতে পারতেন তিনি। তার রাজনীতি করাটা অনিমা মন থেকে মেনে নিতে পারেননি। সব সময় তিনি ভয়ে ভয়ে থাকতেন। তিনি প্রায়ই ভাবতেন কোনদিন তারা পুরো পরিবার রাজনীতির শিকার না হয়ে পড়েন। একদিন কলকাতায় পার্টির মিছিলে বোমা পড়েছিল, গুলি চলেছিল। একটুর জন্য গুলি খাওয়ার হাত থেকে বেঁচে যান কংগ্রেস নেতা কাদের আলী খান। গুলি তার কান ঘেঁষে বেরিয়ে গিয়েছিল। সেই সভায় বোমার আঘাতে একশো জন মানুষ মারা গিয়েছিলেন এবং আহত হয়েছিলেন কয়েকশো। এরপর কয়েকদিন রাজনীতি থেকে কিছুটা সরে এসেছিলেন তিনি। সেই সুযোগে তার রাজনৈতিক জীবনের ইতি টেনে দেওয়ার আভিলাষে রাজীব শর্মা নামের একজন কংগ্রেস কর্মী তার বিরুদ্ধে দলের নেত্রী স্থানীয়দের কাছে বলেন,--- " কাদের আলীকে মুসলিম লীগের নেতাদের সঙ্গে দেখা গিয়েছে। কাদের আলী আমাদের দলের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছেন।" একজন বিশ্বস্ত সূত্রে কাদের আলী জানতে পেরেছিলেন ওই দিন রাত্রেই দলের অনুমতি পেয়ে রাজীব শর্মার দল তাকে মার্ডার করার জন্য আসছে। এক কাপড়ে কিছু টাকা সঙ্গে নিয়ে বউ ও সন্তানদের নিয়ে সেই রাতেই তিনি পূর্ব পাকিস্তানে পা বাড়ান।
বরিশালে একটা তেলের মিলে কাজ পেয়েছিলেন তিনি। মাসে চল্লিশ টাকা বেতন দিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছিল। ভাগ্যকে মেনে নিয়েছিলেন তারা। বউ বাড়িতে জামাকাপড় সেলাইয়ের কাজ করতেন। মুসলিম লীগকে সমর্থন করায় ও একজন নেতাগোছের হওয়ায় গ্রামের মানুষজন তাকে একটু মান্য করতে থাকেন। দেখতে দেখতে কয়েকটা বছর অতিক্রান্ত হয়ে যায়। পূর্ব পাকিস্তানের ভাষাকে যখন উর্দু করার জন্য পশ্চিম পাকিস্তানের সেনাবাহিনী সিদ্ধান্ত নেয়, তখন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষেরা তা মেনে নেননি। তারা তাদের মাতৃভাষা বাংলাকেই তাদের স্থায়ী ভাষা হিসেবে গ্রহণ করতে চায়। এর ফলে ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলন এক বিরাট আকার ধারণ করে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে।
মুসলিম লীগের হয়ে নানান মিছিল মিটিংয়ে গেলেও কাদের আলী খুব একটা মাথা গলাতেন না। পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বুঝেছিলেন, রাজনীতি করতে হবে ক্ষমতা হস্তগত করার জন্য। খুব বেশি মাথা ঘামালে এখানেও ভারতের মতো অবস্থা হতে পারে। আকবর ও অমরকে একটা স্কুলে ভর্তি করা হয়। তাদের কথা চিন্তা করে ধীরে ধীরে রাজনীতি থেকে সরে এসে সংসারে মন দেওয়ার কথা বলেন অনিমা। তিনি তার কথা শুনে বলেন--- "একেবারে রাজনীতি ছেড়ে দিলে লোকে কোনো মূল্য দেবে না। ক্ষমতাই এখন সব। রাজনৈতিক ক্ষমতা অনেক আপদ বিপদে সাহায্য করে। তুমি খুব বেশি চিন্তা করো না। আমার কিছু হবে না।" এই ঘটনার কয়েকদিন পর পূর্ব পাকিস্তানের অর্থাৎ পূর্ববঙ্গের সাধারণ মানুষের সঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর ভাষা নিয়ে মারামারি, গুলি ছোড়াছুড়ি ও তুমুল আন্দোলন চলে। বেশ কয়েকজন যুবক মাতৃভাষাকে বাঁচাতে গিয়ে গুলি খান। সারাদেশে আন্দোলনের হাওয়া ছড়িয়ে পড়েছিল। রাজনীতি করলেও কাদের আলী খানের মানবিকতাবোধের অপমৃত্যু ঘটেনি। পশ্চিম পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর নিষ্ঠুর অত্যাচারকে তিনি মেনে নিতে পারেননি।
এরপর থেকে প্রতিটি মুহূর্তে পূর্ব পাকিস্তান পশ্চিম পাকিস্তানের সেনাদের শাসনে গরম থাকত। মাঝে মাঝে কার্ফু জারি করা হয়। শুধু পুরুষ নয় নারীদের উপরও চলতে থাকে নৃশংস অত্যাচার। কোন পার্টির লোকেরা বাদ যায়নি। সব পার্টির বাড়ির মেয়েদের উপর এই অত্যাচার চলতে থাকে। কাদের আলী পশ্চিম পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে মাইক ধরেন। তাদের এই নোংরা আচরণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন। তার ফল ভোগ করতে হয় তাকে। মুসলিম লীগ করলেও তাকে ক্ষমা করেনি তারা। প্রকাশ্যে সভার সকলের সামনে কাদের আলীর বুক ঝাঁঝরা করে দিয়েছিল পশ্চিম পাকিস্তানের সেনাবাহিনীরা। মাটিতে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে একটা কথাই তার মুখ দিয়ে বেরিয়েছিল 'ভারত মাতা কি জয়'। এই ধ্বনি শুনে সকলে অবাক হয়েছিলেন। বুঝতে পেরেছিলেন কাদের আলী খানের এখনো ভারত ভূমির প্রতি রয়েছে অকৃত্রিম ভালবাসা। তার বউ অনিমা ও দুই ছেলেকে হত্যা করার জন্য বাড়িতে গুলি চালিয়েছিল শয়তান বাহিনীর দল। কিন্তু আগেই খবর পেয়ে অনিমা তার দুই সন্তানকে নিয়ে একজনের বাড়িতে গা ঢাকা দেন। গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে সেনাবাহিনীরা তান্ডব চালায়। তবুও তাদের খুঁজে পাইনি। যে বাড়িতে তারা গা ঢাকা দিয়েছিল সেই বাড়ির বাইরে থেকে তালা লাগানো থাকায় সেনাবাহিনীর দল বাড়িতে কেউ নেই ভেবে চলে গিয়েছিল। এরপর বরিশাল থেকে অনিমা বিবি তার দুই সন্তানকে নিয়ে ঢাকায় পৌঁছান। সেখানে একজন পরিচিত মানুষের বাসায় উঠেছিলেন তারা। কাদের আলীর সঙ্গে এই ব্যক্তিরও খুব ভালো পরিচয় ছিল। দেশভাগের সময় বসিরহাট থেকে এসে এরা ঢাকায় উঠেছিলেন। তার ঠিকানা একবার কাদের আলী খানকে একটা চিঠিতে লিখে জানিয়েছিলেন তিনি। সেই চিঠিটা অনিমা বিবির কাছেই ছিল। এরপর পূর্ব পাকিস্তানের মানুষেরা জয়ী হন। তাদের ভাষা বাংলা থেকে যায়। রক্তের বিনিময়ে নিজেদের মাতৃভাষাকে বাঁচিয়েছিলেন বরকত, আলী, জব্বর এই সকল যুবকেরা। তারা এই আন্দোলনে শহীদ হয়েছিলেন। অনিমা বিবি চাননি অমর ও আকবর বড় হয়ে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হোক। কিন্তু রক্তে যে তাদের রাজনীতি ছিল। তাদের আব্বা কাদের আলী খানকে পশ্চিম পাকিস্তানের সেনাবাহিনীরা নৃশংসভাবে হত্যা করেছিল তা তিনি তার সন্তানদের কখনো বলতে চাননি। কারণ তাদের হারানোর ভয় অনিমা বিবির মধ্যে কাজ করেছিল।
দেখতে দেখতে আঠার বছর অতিক্রান্ত হয়ে যায়। এই সময়ের মধ্যে অনেক কিছুই পরিবর্তন হয়। দুই পাকিস্তানের মধ্যে লড়াই শুরু হয়। পূর্ব পাকিস্তানের মানুষেরা শেখ মুজিবর রহমানের নেতৃত্বে বিরাট আন্দোলনে যুক্ত হন। তাদের একটাই দাবি, 'বাংলাদেশ নামক স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম এবং পাকিস্তান থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে যাওয়া।' এই সময় ঢাকা কলেজে অমর ও আকবর পড়াশোনা করে। বাবার কথা তারা তাদের মায়ের কাছে বারবার জিজ্ঞাসা করে। কিন্তু মায়ের কাছ থেকে কোন সদুত্তর তারা পায়না। একদিন তাদের অনেক জোরাজোরিতে অনিমা বিবি কাদের আলী সম্পর্কে সব বলেন। যখন কাদের আলী মারা যান তখন অনিমার দুই ছেলে খুবই ছোট ছিল। ফলে বাবার মরে যাওয়াটা তাদের কাছে খুব একটা প্রভাব ফেলে নি। মরে যাওয়ার ইতিহাস তাদের অজানা ছিল। ফলে আজ মায়ের মুখে সব শুনে তাদের দুচোখে জল দেখা যায়। অমর ও আকবর মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে এই দেশকে তারা স্বাধীন করবেই। এদেশ থেকে পশ্চিম পাকিস্তানের সেনাদের তাড়িয়ে ছাড়বে। মাকে না জানিয়ে অমর ও আকবর শেখ মুজিবরের দলে যোগদান করে। সেই সময় পূর্ব পাকিস্তানের যুবকেরাও দলে দলে মুজিবরের দলে যোগ দিতে থাকে। প্রানের ভয় না করে ঢাকার বিভিন্ন প্রান্তে আন্দোলন চলতে থাকে। পশ্চিম পাকিস্তানের সেনাবাহিনীরা আন্দোলনের উপর লাঠি চালায়, গুলি করে। কয়েকজন প্রান হারায়, কয়েকজন আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। তবু আন্দোলনকে দমিয়ে রাখতে পারে নি পশ্চিম পাকিস্তানের সেনারা। তারা পুরুষদের পাশাপাশি মেয়ে - বউদের উপর কঠোর অত্যাচার চালাতে থাকে। শ্লীলতাহানি , ধর্ষণের বলী হতে হয় তাদের। মুজিবর সহ্য করতে না পেরে আন্দোলনের পথ বেছে নেন।
সালটা ১৯৭১। স্বাধীন বাংলাদেশের দাবিতে সমগ্ৰ পূর্ব পাকিস্তানে আন্দোলনের আগুন জ্বলে ওঠে। পশ্চিম পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে জেলায় জেলায় প্রতিরোধ গড়ে তোলে শেখ মুজিবর রহমানের নেতৃত্বে । জায়গায় জায়গায় ভাষণ, মারামারি, গুলি চলতে থাকে। পূর্ব পাকিস্তানের মানুষেরা মারা যায়। মারা যায় পশ্চিম পাকিস্তানের সেনারা। এই আন্দোলনে যোগ দেয় কাদের আলী খানের দুই ছেলে অমর আলী খান ও আকবর আলী খান। ঢাকার একটা স্কুল মাঠে পঞ্চাশজন যুবককে নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের সেনাদের সামনে রুখে দাঁড়ান অমর ও আকবর। গুলির লড়াই চলে দুই পক্ষের। প্রায় দুই ঘন্টা এই লড়াই চলেছিল। আকবরের ডান পায়ে গুলি লেগেছিল। তবে আকবরের বন্দুকের গুলিতে পাঁচ জন সেনার প্রাণ গিয়েছিল। প্রতিটি পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের মধ্যে দীর্ঘ দিনের জমা হওয়া ক্ষোভ প্রতিশোধস্পৃহা হৃদয়ে আগুন হয়ে জ্বলেছিল। নিজেদের পরিনতির কথা বুঝতে পেরে পশ্চিম পাকিস্তানের সেনাবাহিনী একটা সময় পূর্ব পাকিস্তান ত্যাগ করে চলে যায়। শেখ মুজিবরের নেতৃত্বে এই আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালি জাতির জয়লাভ হয়। স্বাধীন দেশের নাম হয় বাংলাদেশ। অমর ও আকবরের দুর্দমনীয় সাহস দেখে সকলে প্রশংসা করেন। যারা এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তাদের মুজিব সরকার মুক্তিযোদ্ধার সম্মান দেন। অমর ও আকবরের মা গ্ৰামবাসীর কাছ থেকে তার ছেলেদের সাহসের গল্প শুনে আনন্দে অশ্রু ফেলেন। মনে মনে বলেন "কাদের আলী বেঁচে থাকলে আজ ভীষণ খুশি হতেন। তার হত্যাকারীদের এই দেশ থেকে তাড়াতে পেরেছেন যারা, তাদের মধ্যে তার অমর আকবর অন্যতম দেখে তিনি নিশ্চয় আনন্দ পেয়েছেন।"
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার কয়েকদিন পর একদিন রাতে কয়েকজন অচেনা মুসলিম যুবক কাদের আলীর পরিবারের উপর আক্রমণ করে। গুরুতর আহত হয় তিন জনেই। পাশের বাড়ির লোকেরা তাদের গ্ৰামীণ হাসপাতালে ভর্তি করে। কয়েকদিনের মধ্যে সুস্থ হয়ে তারা বাড়ি ফিরে আসে।
অমর ও আকবর অনেক খোঁজ খবর করে জানতে পারে তাদের বাবা কাদের আলীর গোপন শত্রুরা তাদের উপর আক্রমণ করেছে। অনিমা বিবি তার দুই ছেলেকে জানান ----- " বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও গোপন শত্রুদের মধ্যে থাকাটা ঠিক হবে না। আমরা খুব তাড়াতাড়ি ভারতবর্ষে ফিরে যাব। সেখানে আমাদের আপনজনরা আছেন। দীর্ঘদিন তাদের সংস্পর্শে না থাকায় কেমন আছেন তারা আমরা কিছুই জানি না। এতদিন পর আমাদের পেয়ে তারা যেমন খুশি হবেন, আমাদেরও ভালো লাগবে। আজ প্রাণে বাঁচলেও কাল বিপদ আরো গুরুতর হতে পারে।" মায়ের সিদ্ধান্ত শুনে দুজনেই চুপচাপ থাকে। তারা অনুভব করে "মা সঠিক কথাই বলেছেন। গোপন শত্রু বুঝতে পারা কঠিন। তাদের মুক্তিযোদ্ধার সম্মান গোপন শত্রুদের গা জ্বলার আরো একটি বিষয়। নিজেদের মানুষদের ও নিজেদের দেশে ফিরে যাওয়াই সমীচীন হবে।"
একসপ্তাহ পর অনিমা তার দুই ছেলেকে নিয়ে বসিরহাটের উদ্দেশ্য রওনা হন। ঘরবাড়ি পরিচিত মানুষজনদের ছেড়ে আসতে সকলের মন খারাপ লাগছিল। মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে পড়েছিল অমর ও আকবরের। তবে বর্ডার পার করে এদেশের মাটিতে পা ফেলতেই নিজের দেশে আসার আনন্দে ও আপনজনদের সঙ্গে দেখা করার উৎকণ্ঠায় সব ফেলে আসার দুঃখ দূর হয়ে গিয়েছিল।
MITHUN MUKHERJEE
C/O-- GOBINDA MUKHERJEE
VILL -- NABAJIBAN PALLY
P.O + P.S --- GOBARDANGA
DIST -- 24 PGS (N)
PIN -- 743252
MOB + WHATSAPP : 9614555989
Comments
Post a Comment