খেলায় রাজনীতি
ভাস্কর সিনহা
বাগুইআটির খেলার মাঠে দুটো দল – গুপ্ত নগর একাদশ আর বাবলাতলা ক্লাব। একাদশের জার্সি সাদা, ক্লাবের নীল। দল দুটির না দেখায় কোন দ্বন্দ্ব, কারণ বাবলাতলার ক্যাপ্টেন উত্তম এবং গুপ্ত নগরের ক্যাপ্টেন বাদল একসময় বন্ধু ছিল। সেখানেই রাজনীতি – পাড়ার চেয়ারম্যান বানাতে দুটি পক্ষ ভাগ হয়ে যায়। গ্রামের ওয়ার্ড থেকে শুরু, শেষে মাঠে এসে পড়ে এই শত্রুতা।
ট্রফির দৌড়ে বাদল আর উত্তম মুখোমুখি হয়। বাদল বলে, “তোর দলের ছেলেরা আমায় গালি দেয়।” উত্তম বলে, “তোর কাউন্সিলরের লোকেরা আমার বাপের দোকান ভাঙচুর করেছে।” কথায় কথায় মেজাজ চড়ে। খেলার মাঝপথে হৈ চৈ। পুলিশ এসে বাধা দেয়। কিন্তু পরদিন আবার শুরু হয়।
এই খেলা মন দিয়ে খেলে তন্ময়। বয়স চোদ্দ, গুপ্ত নগরের খেলোয়াড়। তার বন্ধু সজল বাবলাতলা ক্লাবের। দুজনের সাক্ষাৎ রাস্তায় নিষিদ্ধ। পাড়া বলে, “ওদিকের ছেলে?” তন্ময় মাথা নিচু করে চলে যায়। একদিন সজল হাত ধরে বলে, “আমাদের তো কোনো শত্রুতা নেই। ওরা নেতাদের ঝগড়া, আমাদের খেলা।” তন্ময় রাজি হয়।
তারা মাঠের মাঝে বসে মিটিং ডাকে। দুই দলের খেলোয়াড়রা আসে। শুরুর দিকে চিৎকার চেঁচামেচি। তন্ময় দাঁড়িয়ে বলে, “আমরা খেলতে চাই। খেলা হারাতে চাই না। কিন্তু নেতাদের ঝগড়ায় আমাদের জিততে হবে কেন?” উত্তম চুপ করে যায়। বাদল বলে, “ওর কথা ঠিক। আমরা প্রাণ খুলে খেলি, না খেললে জীবন বৃথা।”
দুদিন পর মাঠে খেলা বসে। বাবলাতলার জার্সি নীল, গুপ্ত নগরের সাদা। প্রথমার্ধে উত্তম গোল করে। দ্বিতীয়ার্ধে বাদল গোল শোধ করে। শেষদিকে তন্ময় বক্সের বাইরে থেকে শট নেয়, সজল জাম্প দিয়ে বাধার চেষ্টা করে, বল ছুঁয়ে যায় – গোলকিপার ধরতে পারে না। গোল! গুপ্ত নগর জেতে। সজল মাটিতে পড়ে যায়, উত্তম তাকে ওঠায়। খেলা শেষে একে অপরের গলা জড়িয়ে ধরে।
পাড়ার লোকেরা তাকিয়ে থাকে। গাছতলার চা বিক্রেতা বলে, “আরে, এরা আবার জড়িয়ে ধরল নাকি?” চেয়ারম্যান প্রার্থী দুজন এসে বলল, “তোমরা আমাদের স্লোগান মেনে খেলবে?” তন্ময় সাহস করে বলে, “আমরা খেলি বলেই, তোমরা নেতা, আমাদের খেলা বন্ধ করলে, তোমাদের ভোট নেই।”
হাসি পড়ে যায়। তার পর থেকে খেলায় আর পাড়ার রাজনীতি মেশে না। শুধু প্রতিযোগিতা, উত্তেজনা, জয়ের সম্ভাবনা। তন্ময় আর সজল এখন বড় হয়েছে। কলকাতা লিগে এক দলে খেলে। পাড়ার লোকেরা বলে, “ঐ দুজনেই একদা শত্রু ছিল।” তন্ময় হেসে বলে, “আমরা কখনো শত্রু ছিলাম না, শত্রু ছিল আমাদের ভেতরের রাজনীতি, যে আমাদেরকে হিংসা শিখিয়েছিল।” খেলার মাঠে ফিরে আসে সম্প্রীতি। নীল আর সাদা জার্সি এখন পাশাপাশি জমে। ক্ষুদ্র প্রাণের বড়ো আশা – খেলার মাঠে রাজনীতি নয়, প্রতিভার স্বীকৃতি পাওয়া। তন্ময় আজ বিশ্বাস করে, খেলার ফাঁকে রাজনীতি যে বাসা বাঁধে, তা খেলোয়াড়দের কাছ থেকে তাড়িয়ে দেওয়া গেলে খেলা শুধু খেলা থাকে, আর খেলোয়াড়রা থাকে ভাই- ভাই।
==============
Comments
Post a Comment