গল্প
দহনবৃত্ত
দিব্যেন্দু ঘোষ
গল্পটা শুরু হতে পারত সরাসরি একটা খুন দিয়ে। কিন্তু বাস্তবের মাটিতে অপরাধের শিকড় অতটা সোজাসাপ্টা হয় না; তা ছড়িয়ে থাকে মানুষের মনের অন্ধকার কোণে, অবদমিত কামনায় আর লুকোনো বিশ্বাসহীনতায়।
হাওড়ার পুরনো আবাসনের চারতলার ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে গঙ্গার দিকে তাকিয়ে ছিল অরিন্দম। বয়স উনপঞ্চাশ, পেশায় ইতিহাস ও মনস্তত্ত্বের গবেষক। মানুষ পর্যবেক্ষণ করা তার নেশা। আকাশে তখন মেঘ জমছে। নদীর ওপারে কলকাতার আলো একটু একটু করে জ্বলে উঠছে। ঠিক এই সময়েই অরিন্দমের ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভাসছে ইন্সপেক্টর কিঞ্জল রায়ের নাম।
-অরিন্দমদা, আপনি কি একবার সাউথ সিটির দিকে আসতে পারবেন? একটা ক্রাইম সিন আছে। আপনার অবজারভেশন স্কিলটা আমার একটু দরকার।
কিঞ্জলের গলা অস্বাভাবিক শান্ত, কিন্তু তার মধ্যেই খেলা করছে একটা চাপা উত্তেজনা।
-খুন?
-হ্যাঁ। এবং খুব নিখুঁত একটা খুন। ভিকটিমের নাম শিলাদিত্য বসু। শহরের নামকরা রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী।
আধ ঘণ্টার মধ্যে অরিন্দম যখন ঘটনাস্থলে পৌঁছল, তখন সেখানে পুলিশের আনাগোনা। ফ্ল্যাটের ড্রয়িংরুমটা যেন আধুনিক শিল্পের প্রদর্শনী। দামি ইটালিয়ান মার্বেলের মেঝে, দেওয়ালে হুসেনের পেন্টিং। মেঝের ঠিক মাঝখানে উপুড় হয়ে পড়ে আছে শিলাদিত্য বসুর নিথর দেহ। মাথার পিছন থেকে রক্ত গড়িয়ে জমাট বেঁধেছে কার্পেটের ওপর। কিঞ্জল কাছে এগিয়ে এল।
-অস্ত্রটা এখনও পাওয়া যায়নি। তবে মনে হচ্ছে ভারী কিছু দিয়ে পিছন থেকে আঘাত করা হয়েছে। লোকটা মারা গেছে ঘণ্টা দুয়েক আগে।
অরিন্দমের চোখ ঘুরছিল ঘরের চারপাশে।
-বাড়িতে আর কে কে ছিল?
-শিলাদিত্যের স্ত্রী, মোহিনী আর শিলাদিত্যের পার্সোনাল সেক্রেটারি, কুণাল।
কিঞ্জল একটু গলা নামিয়ে বলল,
-মোহিনী দেবীকে এখন পাশের ঘরে রাখা হয়েছে। উনি নাকি তখন বাথরুমে ছিলেন। কিছুই শুনতে পাননি।
অরিন্দম পা টিপে টিপে মোহিনীর ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। দরজা সামান্য ফাঁকা। সেখান দিয়ে যে দৃশ্যটা সে দেখল, তাতেই গল্পের প্রথম সুতোটা তার হাতে এসে পড়ল। ভেতরে মোহিনী বসে আছে সোফায়। পরনে শিফন শাড়ি, কিছুটা অবিন্যস্ত। চোখেমুখে ভয়ের ছাপ থাকলেও, কান্নার কোনও চিহ্ন নেই। আর তার ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে আছে কুণাল। ছিপছিপে, সুঠাম চেহারার যুবক। কুণালের একটা হাত মোহিনীর কাঁধের ওপর রাখা। শুধু রাখা নয়, আঙুলগুলো যেন মোহিনীর ত্বককে এক অদ্ভুত অধিকারবোধে আঁকড়ে ধরে আছে। মোহিনীও খুব সন্তর্পণে নিজের হাতটা কুণালের হাতের ওপর রেখেছে। ভালবাসা আর কামনার মধ্যে যে একটা সূক্ষ্ম পর্দা থাকে, পরকীয়ার ক্ষেত্রে সেই পর্দাটা ছিঁড়ে যেতে বেশি সময় লাগে না। অরিন্দম গবেষকের চোখ দিয়ে দেখল, ওই বদ্ধ ঘরে মৃত্যু আর লাশের গন্ধের চেয়েও বেশি প্রকট হয়ে উঠেছে আদিম, গোপন শরীরের গন্ধ। শিলাদিত্য বেঁচে থাকতে এই ড্রয়িংরুমেই হয়ত মোহিনী আর কুণালের চোখের ভাষায় চলত নিষিদ্ধ আলাপ। স্বামীর চোখের আড়ালে, সামান্য সুযোগ পেলেই হয়ত লাইব্রেরি ঘরে বা ফাঁকা করিডরে তারা মেতে উঠত বেপরোয়া শরীরী খেলায়। মোহিনীর ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা একটা হালকা কালশিটে দাগ আর কুণালের শার্টের উপরের দিকের খোলা বোতাম যেন সেই রগরগে, নিষিদ্ধ দহনেরই নীরব সাক্ষী।
-কী বুঝছেন?
কিঞ্জল এসে দাঁড়াল অরিন্দমের পাশে।
-খুনটা যে করেছে, সে এই ফ্ল্যাটের ভেতরেরই কেউ।
অরিন্দম শান্ত গলায় বলল,
-শিলাদিত্যকে পিছন থেকে মারা হয়েছে, মানে আততায়ী তার পরিচিত। সে বাধা দেওয়ার সুযোগ পায়নি। আর ওই ঘরে যে দু’জন বসে আছে, তাদের মধ্যে শোকের চেয়ে অনেক বেশি বোঝা যাচ্ছে অপরাধবোধ আর মুক্তির আনন্দ।
-আপনি কি বলতে চাইছেন স্ত্রী আর সেক্রেটারি মিলে...
-আমি এখনই কিছু বলতে চাইছি না কিঞ্জল। তবে একটা ব্যাপার নিশ্চিত, এটা শুধু টাকার জন্য খুন নয়। এর মধ্যে মিশে আছে তীব্র আক্রোশ আর প্যাশন।
অরিন্দম লাশের দিকে আরেকবার তাকাল।
-শিলাদিত্যের ডান হাতের মুঠোটা খেয়াল করেছ? ওটা শক্ত হয়ে আছে। মৃত্যুর ঠিক আগে ও কিছু একটা ধরার চেষ্টা করেছিল।
কিঞ্জল দ্রুত নির্দেশ দিল একজন কনস্টেবলকে। খুব সাবধানে শিলাদিত্যের ডান হাতের আঙুলগুলো ফাঁক করা হল। মুঠো থেকে বেরিয়ে এল একটা ছোট্ট, রুপোলি রঙের কানের দুল। অরিন্দমের ভ্রু কুঁচকে গেল। সে স্পষ্ট দেখেছে, পাশের ঘরে বসে থাকা মোহিনীর কানে বড় সোনার ঝুমকো। তাহলে এই রুপোলি দুলটা কার? কুণালের কানেও কোনও দুল নেই। গল্পটা যে পথে এগোবে বলে অরিন্দম ভাবছিল, হঠাৎ করেই যেন তার মোড় ঘুরে গেল। এই খুনের নেপথ্যে কি তবে তৃতীয় কোনও ব্যক্তি আছে? মোহিনী আর কুণালের পরকীয়ার সমীকরণটা কি শিলাদিত্য জেনে ফেলেছিল? নাকি এই গোটা ছকটার মধ্যে লুকিয়ে আছে আরও গভীর কোনও বিশ্বাসঘাতকতা?
বাইরে তখন বৃষ্টির তেজ বেড়েছে। জানলার কাচে জলের ঝাপ্টা এসে পড়ছে অবিরাম। একটা খুনের কিনারা হতে না হতেই যেন আরও কয়েকটা খুনের মেঘ ঘনিয়ে আসছে শহরের বুকে।
রুপোলি দুলটা একটা স্বচ্ছ প্লাস্টিকের ব্যাগে ভরল অরিন্দম। কিঞ্জল ভ্রু কুঁচকে বলল,
-দামি প্ল্যাটিনামের কাজ। কিন্তু এটা এল কোথা থেকে? শিলাদিত্য তো আর দুল পরত না!
-শিলাদিত্য পরত না, কিন্তু শিলাদিত্য যাকে শেষ মুহূর্তে আঁকড়ে ধরতে চেয়েছিল, সে পরত।
অরিন্দম সোজা হয়ে দাঁড়াল।
-কিঞ্জল, মোহিনী আর কুণালকে আলাদা ঘরে জেরা করো। ওদের দুজনের বয়ান মিলছে কি না দেখতে হবে।
অরিন্দম নিজে ঢুকল মোহিনীর ঘরে। নারীচরিত্র অরিন্দমের কাছে বরাবরই এক জটিল গোলকধাঁধা। মোহিনীর চোখের চাউনিতে এখন আর ভয় নেই, বরং একটা অদ্ভুত মাদকতা রয়েছে। শিলাদিত্যের মৃত্যু তাকে যেন একটা অদৃশ্য লোহার খাঁচা থেকে মুক্তি দিয়েছে। অরিন্দম খুব শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল,
-শিলাদিত্যবাবু ইদানীং কি খুব চাপে ছিলেন?
মোহিনী শাড়ির আঁচলটা একটু টেনে দিল। তার ফর্সা, মসৃণ কাঁধের কাছে একটা লালচে আঁচড়ের দাগ অরিন্দমের নজর এড়াল না। মোহিনী একটু হেসে বলল,
-উনি তো সবসময়ই চাপে থাকতেন। রিয়েল এস্টেটের ব্যবসা, তার ওপর সামনেই তো রাজ্যের নির্বাচন। কোথায় কোন আমলার বদলি হবে, কাকে ফান্ডিং করতে হবে এসব নিয়েই তো ওঁর জগৎ। আমাকে সময় দেওয়ার মতো ফুরসত ওর কোথায়?
অরিন্দম মনস্তত্ত্বের ছাত্র। সে বুঝতে পারছিল মোহিনীর এই নির্লিপ্ততার গভীরে লুকিয়ে আছে দীর্ঘদিনের অতৃপ্তি। শিলাদিত্যের বয়সের ভার আর ক্ষমতার দম্ভ মোহিনীকে সুখী করতে পারেনি, তৃপ্তি দিতে পারেনি। সে চেয়েছিল আদিম, বন্য আসঙ্গসুখ। কুণালের পেশিবহুল, তরুণ শরীর তাকে সেই নিষিদ্ধ তৃপ্তি দিয়েছিল। অরিন্দমের চোখের সামনে যেন দৃশ্যটা পরিষ্কার হয়ে উঠছে, শিলাদিত্য যখন রাজ্যের রাজনৈতিক পালাবদল আর আমলাদের বদলির হিসেব কষতে মগ্ন থাকত, মোহিনীর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বেডরুমে তখন চলত অবদমিত কামনার উদযাপন। স্বামীর অনুপস্থিতিতে কুণাল আর মোহিনীর দুটি নগ্ন শরীরের তুমুল সংঘর্ষ, ঘাম, তীব্র লালসা আর গোঙানির শব্দ হারিয়ে যেত সাউথ সিটির উঁচু দেওয়ালের আড়ালে। কুণাল শুধু শিলাদিত্যর সেক্রেটারি ছিল না, সে ছিল মোহিনীর রগরগে, গোপন অভিসারের একমাত্র সঙ্গী।
-কুণালবাবুর সঙ্গে আপনার সম্পর্কটা ঠিক কেমন, মোহিনী দেবী?
অরিন্দম হঠাৎ প্রশ্নটা ছুড়ে দিল। মোহিনীর চোখের পাতা এক মুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠল। কিন্তু সে সামলে নিল।
-যেমন একজন এমপ্লয়ির সঙ্গে বসের স্ত্রীর থাকে। জাস্ট ফর্মাল।
-তাই বুঝি? তাহলে শিলাদিত্যবাবু খুন হওয়ার পর কুণাল আপনার হাত ধরে বসেছিল কেন? আর আপনার কাঁধের ওই আঁচড়ের দাগটা তো খুব একটা পুরনো নয়।
মোহিনীর ফর্সা মুখটা মুহূর্তে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। অরিন্দম আর কথা না বাড়িয়ে পকেট থেকে প্লাস্টিকের ব্যাগটা বের করল।
-এই দুলটা চেনেন?
দুলটা দেখামাত্র মোহিনীর শরীর যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হল। তার চোখ বিস্ফারিত, ঠোঁট কাঁপছে।
-এটা... এটা তো নিশার!
-নিশা কে?
-শিলাদিত্যের একসময়ের পার্টনার... মানে, বিজনেস পার্টনার। নিশা সান্যাল। কিন্তু নিশা এখানে আসবে কেন? ও তো...
মোহিনীর কথা শেষ হওয়ার আগেই ঘরের দরজা ঠেলে হুড়মুড় করে ঢুকল কিঞ্জল। তার মুখে বিন্দু বিন্দু ঘাম।
-কী হল কিঞ্জল?
-অরিন্দমদা, শিগগির নীচে আসুন। বেসমেন্টের পাম্প রুমে একটা ডেডবডি পাওয়া গেছে!
অরিন্দম আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না। লিফট দিয়ে সোজা বেসমেন্টে। পাম্প রুমের চারপাশটা স্যাঁতসেঁতে, একটা কটু গন্ধ ভাসছে বাতাসে। ভেতরে ঢুকতেই ফ্ল্যাশলাইটের আলোয় যে দৃশ্যটা চোখে পড়ল, তাতে পেশাদার পুলিশ কিঞ্জলেরও গা গুলিয়ে উঠল। পাম্প রুমের বড় পাইপটার সঙ্গে হেলান দিয়ে বসে আছে একটি মেয়ে। বয়স তিরিশের কাছাকাছি। পরনে একটা দামি কালো ড্রেস, যা রক্তে ভাসছে। মেয়েটির গলাটা কান থেকে কান পর্যন্ত নিখুঁতভাবে কাটা। রক্তের ফিনকি দেওয়া দাগ ছিটকে পড়েছে দেওয়ালে। আর মেয়েটির বাঁ কানে ঝুলছে ঠিক মোহিনীর ঘরে পাওয়া সেই প্ল্যাটিনামের দুলের জোড়াটি। ডান কানটা খালি।
-নিশা সান্যাল,
অরিন্দম বলে উঠল।
-আপনি চিনলেন কী করে?
কিঞ্জল অবাক।
-উপরে শিলাদিত্য, নীচে নিশা। একই রাতে, একই বিল্ডিংয়ে দুটো খুন। এবং খুনি এতটাই ঠান্ডা মাথার যে, নিশার কান থেকে একটা দুল ছিঁড়ে নিয়ে গিয়ে শিলাদিত্যের হাতে গুঁজে দিয়ে এসেছে। কেন জানো?
অরিন্দম মৃতদেহের সামনে হাঁটু গেড়ে বসল।
-কেন?
-যাতে আমরা ভাবি, নিশা আর শিলাদিত্যের মধ্যে ধস্তাধস্তি হয়েছে এবং নিশাই শিলাদিত্যকে খুন করেছে। কিন্তু খুনি ভুলে গেছে, একটা মৃত মানুষ কারও হাতে দুল গুঁজে দিতে পারে না। নিশার গলার কাটা দাগটা দেখো। যে অ্যাঙ্গেল থেকে কোপটা মারা হয়েছে, সেটা কোনও সাধারণ মানুষের কাজ নয়। এটা কোনও প্রফেশনাল কিলারের কাজ। এবং সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার কী জানো কিঞ্জল?
-কী?
-খুনি এখনও এই বিল্ডিংয়ের ভেতরেই আছে। আমাদের চোখের সামনে।
অরিন্দমের কথা শেষ হতেই বেসমেন্টের আলোটা হঠাৎ দপ করে নিভে গেল। জমাট অন্ধকারে চারদিক নিস্তব্ধ। শুধু দূরে কোথাও একটা লোহার ভারী দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ প্রতিধ্বনিত হল। পাম্প রুমের জমাট অন্ধকারে কিঞ্জলের শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ অদ্ভুত ভারী শোনাচ্ছিল। অরিন্দম এক মুহূর্ত নড়ল না। তার কান সজাগ। অন্ধকারে মানুষের দৃষ্টিশক্তি যখন কাজ করে না, তখন শ্রবণশক্তি হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। দূরে কোথাও জলের পাইপ চুঁইয়ে ফোঁটা ফোঁটা জল পড়ার শব্দ হচ্ছে। আর তার ঠিক মাঝখান দিয়ে ভেসে এল একটা খুব সন্তর্পণে ফেলা পায়ের আওয়াজ। কেউ একজন বেসমেন্টের অন্ধকার গলি দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে এক্সিট দরজার দিকে।
-কিঞ্জল, ফোন টর্চটা জ্বালাও!
অরিন্দম ফিসফিস করে উঠল। কিঞ্জল পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে ফ্ল্যাশলাইট জ্বালতেই আলোর একটা সরু রেখা অন্ধকারের বুক চিরে দিল। আলোটা সোজা গিয়ে পড়ল বেসমেন্টের শেষ প্রান্তের একটা লোহার দরজার ওপর। দরজাটা তখন ধীরে ধীরে বন্ধ হচ্ছে।
-দাঁড়ান!
কিঞ্জল চিৎকার করে নিজের রিভলভারটা বের করে সেদিকে দৌড়ল। অরিন্দমও ছুটল তার পিছু পিছু। দরজাটা ঠেলে বাইরে বেরোতেই খোলা হাওয়া এসে লাগল চোখেমুখে। এটা আবাসনের পিছনের দিক। একটা সরু গলি গিয়ে মিশেছে মেন রাস্তায়। বৃষ্টির ছাঁটে চারপাশ ঝাপসা। গলির মুখে একটা কালো রঙের এসইউভি গাড়ি স্টার্ট নেওয়ার অপেক্ষায় ছিল। কিঞ্জল পৌঁছনোর আগেই গাড়িটা তীব্র বেগে বেরিয়ে গেল রাস্তার দিকে। বৃষ্টির শব্দের মধ্যে গাড়ির টায়ারের ঘর্ষণের শব্দ মিলিয়ে গেল নিমেষে।
-শিট!
কিঞ্জল রাগে একটা লাথি মারল দেওয়ালের গায়ে।
-খুনি আমাদের চোখের সামনে দিয়ে বেরিয়ে গেল!
অরিন্দম শান্ত চোখে গলির রাস্তার দিকে তাকিয়ে ছিল।
-খুনি শুধু বেরিয়ে গেল না কিঞ্জল, ও আমাদের একটা মেসেজ দিয়ে গেল। ও জানত আমরা বেসমেন্টে আসব। ও অপেক্ষা করছিল আমাদের আসার জন্য।
-অপেক্ষা করছিল? কেন?
-কারণ ও চেয়েছিল নিশার মৃতদেহটা আমরা ঠিক এই অবস্থাতেই আবিষ্কার করি। শিলাদিত্য আর নিশা, দুজনের মৃত্যুই একই সুতোয় গাঁথা। কিন্তু খুনি চাইছে আমরা যেন বিশ্বাস করি এরা একে অপরকে খুন করেছে অথবা মোহিনী আর কুণাল এর পিছনে আছে।
অরিন্দম পকেট থেকে নিশার সেই দুলটা বের করল।
-এই দুলটা শিলাদিত্যের হাতে গুঁজে দেওয়াটা আসলে একটা সাজানো নাটক। আসল খেলা অনেক গভীরে।
তারা আবার লিফটে করে চারতলায় ফিরে এল। ফ্ল্যাটের অবস্থা তখন আরও থমথমে। মোহিনী আর কুণালকে ড্রয়িংরুমের দুটো আলাদা সোফায় বসিয়ে রাখা হয়েছে। দুজনের মুখেই অস্বাভাবিক ফ্যাকাশে ভাব। অরিন্দম সোজা মোহিনীর সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
-নিশা সান্যাল খুন হয়েছেন, মোহিনী দেবী। নীচেই বেসমেন্টে।
মোহিনীর চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। সে অস্ফুট স্বরে বলে উঠল,
-নিশা... মৃত? কিন্তু এটা কী করে সম্ভব! আজ রাতেই তো ওর দিল্লি ফিরে যাওয়ার কথা ছিল।
-দিল্লি?
অরিন্দম ভ্রু কোঁচকাল।
-আপনি জানতেন নিশা আজ শহরে আছে?
মোহিনী কুণালের দিকে একবার আড়চোখে তাকাল। তারপর গলা নামিয়ে বলল,
-হ্যাঁ। নিশার সঙ্গে শিলাদিত্যের একটা বড় প্রোজেক্ট নিয়ে ঝামেলা চলছিল। রাজারহাটের একটা জমির ডিল। নিশা হুমকি দিয়েছিল যে শিলাদিত্য যদি ওকে ওর শেয়ার না দেয়, তাহলে ও শিলাদিত্যের কিছু গোপন ডকুমেন্টস ফাঁস করে দেবে। আজ রাতেই ওদের ওই ডিলটা ফাইনাল করার কথা ছিল।
-সেই ডকুমেন্টসগুলো কীসের?
-আমি ঠিক জানি না। তবে...
মোহিনী একটু ইতস্তত করে বলল,
-কুণাল হয়ত বলতে পারবে। ও তো শিলাদিত্যের সব কাজই দেখত।
অরিন্দম এবার কুণালের দিকে ফিরল। কুণাল এতক্ষণ চুপ করে শুনছিল। অরিন্দমের তীক্ষ্ণ দৃষ্টির সামনে পড়ে সে একটু নড়েচড়ে বসল।
-বলুন কুণালবাবু,
অরিন্দমের গলা শান্ত, কিন্তু ধারালো।
-শিলাদিত্যবাবুর এমন কী গোপন কথা নিশা জানত, যার জন্য নিশাকে আজ রাতে এই ফ্ল্যাটে আসতে হয়েছিল? আর কেনই বা আপনাদের দুজনের মধ্যে এই অস্বাভাবিক নীরবতা?
কুণাল একটা ঢোঁক গিলল। তার চোখের তারায় একটা ভয় আর বেপরোয়া ভাব খেলা করছে।
-স্যার, আমি শুধু এটুকু জানি যে ওই ফাইলটাতে কিছু বেআইনি টাকার লেনদেনের হিসেব ছিল। কিন্তু খুন... বিশ্বাস করুন, আমরা এর বিন্দুবিসর্গও জানি না।
-আপনারা জানেন না?
অরিন্দম একটু হাসল।
-শিলাদিত্য খুন হওয়ার পর আপনারা দুজনে পাশের ঘরে একে অপরের হাত ধরে বসেছিলেন। শোকের চেয়ে আপনাদের মধ্যে মুক্তির স্বাদটাই বেশি প্রকট ছিল। অথচ আপনারা বলছেন কিছুই জানেন না?
কুণালের কপাল ঘেমে উঠল। মোহিনী নিজের মুখটা দু’হাতে ঢেকে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠার ভান করল, কিন্তু অরিন্দম স্পষ্ট বুঝতে পারছিল, এই কান্না আসল নয়, এটা তাদের খোলস।
-কিঞ্জল,
অরিন্দম ঘুরে দাঁড়াল।
-শিলাদিত্যবাবুর স্টাডি একবার সার্চ করতে হবে। আমার মনে হচ্ছে ওই ঘরে এমন কিছু আছে, যা এই চারটে চরিত্র অর্থাৎ শিলাদিত্য, মোহিনী, কুণাল আর নিশার আসল চেহারা আমাদের সামনে খুলে দেবে।
স্টাডির দরজা খুলতেই পুরনো বই আর দামি সিগারের গন্ধ ভেসে এল। অরিন্দম জানে, রহস্যের জাল সবেমাত্র খুলতে শুরু করেছে। আসল অপরাধী শুধু বাইরে থেকে আসেনি, এই ঘরের ভেতরের ছায়াগুলোও সমানভাবে রক্তে রাঙানো। একটা চাপা গুমোট গন্ধ নাকে এল অরিন্দমের। দামি কিউবান সিগার আর পুরনো চামড়ায় বাঁধানো বইয়ের গন্ধ। ঘরের একদিকের দেওয়াল জুড়ে বিশাল বুকশেলফ, অন্য দিকে মেহগনি কাঠের একটা ভারী টেবিল। কিঞ্জল টেবিলের ড্রয়ারগুলো হাতড়াতে শুরু করল। অরিন্দমের চোখ কিন্তু ঘুরছিল বুকশেলফের দিকে। অপরাধীরা সাধারণত সবচেয়ে দরকারি জিনিসটা চোখের সামনেই লুকিয়ে রাখতে পছন্দ করে, যাতে কেউ সন্দেহ না করে। সারি সারি বইয়ের মধ্যে একটা বইয়ের অবস্থান একটু বেমানান ঠেকল অরিন্দমের। ম্যাকিয়াভেলির ‘দ্য প্রিন্স’। বইটা অন্যগুলোর চেয়ে সামান্য এগিয়ে আছে। বইটা টান দিতেই একটা হালকা ক্লিক শব্দ হল। শেলফের ওই অংশটা আসলে একটা পাল্লা, যা খুলে যেতেই ভেতরে একটা ছোট্ট স্টিলের ভল্ট বেরিয়ে পড়ল।
-কিঞ্জল, এদিকে এসো।
কিঞ্জল ছুটে এল।
-ভল্টের পাসওয়ার্ড তো আমরা জানি না।
-শিলাদিত্য খুব হিসেবি লোক ছিল। ও এমন কোনও পাসওয়ার্ড রাখবে যা ওর সবসময়ের চোখের সামনে থাকে, অথচ কেউ ধরতে পারবে না।
অরিন্দম টেবিলের দিকে তাকাল। সেখানে একটা পিতলের ক্যালেন্ডার রাখা। তারিখটা আটকে আছে শিলাদিত্য আর মোহিনীর বিবাহবার্ষিকীর দিনে, ১৪ মে। অরিন্দম কিপ্যাডে ১-৪-০-৫ টিপতেই একটা সবুজ আলো জ্বলে উঠল। ভল্ট খুলে গেল। ভেতরে রাশি রাশি টাকা বা গয়না নেই। শুধু একটা লাল মলাটের ডায়েরি আর একটা পেনড্রাইভ। অরিন্দম খুব সাবধানে ডায়েরিটা বের করে পাতা ওল্টাতে শুরু করল। শেষ যে পাতায় লেখা আছে, সেটার তারিখ গত রবিবারের। অরিন্দমের চোখ দ্রুত লেখাগুলোর ওপর দিয়ে ছুটে গেল। পড়তে পড়তে তার কপালের ভাঁজ গভীর হতে শুরু করল।
-কী লেখা আছে অরিন্দমদা?
কিঞ্জল অধৈর্য হয়ে পড়ল।
-আমরা এতক্ষণ সম্পূর্ণ ভুল পথে হাঁটছিলাম কিঞ্জল।
অরিন্দম ডায়েরিটা বন্ধ করে কিঞ্জলের দিকে তাকাল।
-মোহিনী আর কুণালের পরকীয়া এই খুনের আসল মোটিভ নয়। ওটা আসলে একটা নিখুঁতভাবে সাজানো ফাঁদ।
-ফাঁদ? মানে?
-কুণাল মোহিনীকে ভালবাসে না। কুণাল এই বাড়িতে শিলাদিত্যের সেক্রেটারি হয়ে এসেছিল নিশার লোক হয়ে। শিলাদিত্যের ব্যবসা ধ্বংস করার জন্য নিশা কুণালকে প্ল্যান্ট করেছিল। আর কুণাল খুব ঠান্ডা মাথায় মোহিনীর একাকিত্ব আর অতৃপ্তিকে কাজে লাগিয়ে ওর শরীরে আর মনে নিজের জায়গা করে নেয়, যাতে এই বাড়ির সমস্ত গোপন খবর নিশার কাছে পৌঁছে যেতে পারে।
কিঞ্জল হতবাক।
-তার মানে শিলাদিত্যবাবু এসব জেনে ফেলেছিলেন?
-হ্যাঁ। ডায়েরির শেষ পাতায় শিলাদিত্য লিখেছে, ‘কুণালকে বিশ্বাস করা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল। ও মোহিনীকে ব্যবহার করছে, আর মোহিনী অন্ধের মতো ভাবছে কুণাল ওর জন্যই পাগল। নিশার আসল চালটা আমি এতদিনে বুঝলাম। আজ রাতের ডিলটাতে আমি নিশা আর কুণাল, দুজনকেই শেষ করব’। কিন্তু শিলাদিত্য তার আগেই খুন হয়ে গেল।
-কিন্তু নিশা বেসমেন্টে খুন হল কী করে? আর খুনি কে?
অরিন্দম পেনড্রাইভটা পকেটে ঢোকাল।
-এই সব কিছুর উত্তর ওই ড্রয়িংরুমে বসে আছে। চলো।
তারা যখন স্টাডি থেকে বেরিয়ে ড্রয়িংরুমের দিকে এগোচ্ছে, ঠিক তখনই একটা তীক্ষ্ণ, কান-ফাটানো চিৎকার রাতের নিস্তব্ধতা চিরে দিল। চিৎকারটা মোহিনীর। কিঞ্জল আর অরিন্দম ছুটে ড্রয়িংরুমে ঢুকল। ঘরের দৃশ্য দেখে দুজনেরই রক্ত হিম হয়ে গেল। কুণাল মেঝের ওপর পড়ে আছে। তার পেট থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটছে। আর ঠিক তার সামনে, হাতে একটা রক্তমাখা পেপারওয়েট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মোহিনী। মোহিনীর শাড়ির আঁচল মাটিতে লুটোচ্ছে, চুল এলোমেলো। তার চোখে এখন আর কোনও ভয় বা শোক নেই, আছে শুধু আদিম, ভয়ঙ্কর উন্মাদনা।
-ও আমাকে ব্যবহার করেছে...
মোহিনী হিসহিস করে উঠল।
-ও শুধু নিশার কথায় আমার বিছানায় আসত... ও আমাকে ভালবাসেনি!
অরিন্দম বুঝল, মোহিনী এতক্ষণ পাশের ঘরে বসে শিলাদিত্যের মৃত্যুর জন্য শোক পালন করছিল না। সে অপেক্ষা করছিল সত্যটা নিজের হাতে যাচাই করার। কুণালের খোলস যখন খুলে গেছে, তখন মোহিনীর ভেতরের আহত, অপমানিত নারীসত্তা হিংস্র শিকারির রূপ নিয়েছে। কিন্তু অরিন্দমের মনের মধ্যে তখনও একটা কাঁটা খচখচ করছে। মোহিনী কুণালকে আঘাত করেছে ঠিকই, কিন্তু শিলাদিত্য আর নিশাকে কে খুন করল? মোহিনী কি একাই এত নিখুঁত দুটো খুন করতে পারে? নাকি এই ছকের গভীরে লুকিয়ে আছে এমন কেউ, যার অস্তিত্ব এখনও ধরা পড়েনি?
বৃষ্টির বেগ আরও বেড়েছে। কাচের জানলায় জলের ঝাপ্টার মধ্যে দিয়ে অরিন্দমের মনে হল, বাইরের অন্ধকারে কেউ একজন দাঁড়িয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে হাসছে। মেঝের ওপর ছড়িয়ে পড়া রক্তের গন্ধ ড্রয়িংরুমের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাতাসকে ভারী করে তুলেছে। কুণালের পেট থেকে গলগল করে রক্ত বেরোচ্ছে, তার ফর্সা শার্টটা এখন গাঢ় লাল। অরিন্দম এক লাফে এগিয়ে গিয়ে মোহিনীর হাত থেকে পেপারওয়েটটা ছিটকে ফেলে দিল।
-কিঞ্জল, শিগগির অ্যাম্বুলেন্স ডাকো। আর বিল্ডিংয়ের সব কটা গেট সিল করতে বলো।
মোহিনী মেঝের ওপর হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। তার চোখে এখন আর কোনও আক্রোশ নেই, গভীর এক শূন্যতা সে চোখ গ্রাস করেছে। যে শরীরটাকে সে অন্ধের মতো ভালবেসেছিল, যে পুরুষটার কাছে সে তার সমস্ত অবদমিত কামনা আর গোপন রহস্য উজাড় করে দিয়েছিল, আজ সেই শরীরটাই তার নিজের হাতে রক্তাক্ত। কুণাল হাঁপাচ্ছিল। তার চোখের মণি উল্টে আসছে। সে খুব কষ্টে ডান হাতটা তুলে মোহিনীর শাড়ির আঁচলটা ধরার চেষ্টা করল।
-মোহিনী...
মোহিনী ছিটকে পিছিয়ে গেল।
-ছুঁস না আমাকে। তুই একটা বিশ্বাসঘাতক। তুই নিশার চর হয়ে আমার বিছানায় এসেছিলি...
কুণালের ঠোঁটের কোণ দিয়ে এক ফোঁটা রক্ত গড়িয়ে পড়ল। সে করুণ, যন্ত্রণাক্লিষ্ট হাসি হাসল।
-প্রথমে... হ্যাঁ। প্রথমে নিশার কথাতেই এসেছিলাম... শিলাদিত্যর খবর নিতে। কিন্তু... কিন্তু তারপর যে কখন তোমায় ভালবেসে ফেললাম... বুঝতে পারিনি মোহিনী।
-মিথ্যে কথা!
মোহিনী চিৎকার করে উঠল, কিন্তু তার গলা কেঁপে গেল।
-নিশা... নিশা আজ ওই ডিলটার জন্য আমাকে ব্ল্যাকমেইল করছিল... বলছিল আমি ওর কথা না শুনলে... ও শিলাদিত্যকে আমাদের সব ছবি আর ভিডিয়োগুলো পাঠিয়ে দেবে... আমি চেয়েছিলাম তোমাকে নিয়ে অনেক দূরে চলে যেতে...
কুণালের গলা বুজে এল। তার হাতটা মোহিনীর দিকে বাড়ানো অবস্থাতেই থরথর করে কেঁপে স্থির হয়ে গেল মেঝের ওপর। চোখ দুটো খোলা, কিন্তু দৃষ্টি নিস্প্রভ। কুণালের মৃত্যু মোহিনীর ভেতরে যেন একটা বাঁধ ভেঙে দিল। সে কুণালের লাশের ওপর আছড়ে পড়ে তার রক্তমাখা মুখটায় পাগলের মতো চুমু খেতে শুরু করল। একটা তীব্র, বন্য প্রেম আর অনুশোচনার আর্তনাদ ড্রয়িংরুমে গুমরে মরতে লাগল। অরিন্দম বুঝল, কুণালের এই স্বীকারোক্তি মোহিনীকে সারাজীবনের জন্য একটা অপরাধবোধের নরকে ঠেলে দিয়ে গেল। কিন্তু শোক করার সময় এখন নয়। অরিন্দমের মস্তিষ্ক তখন অন্য সমীকরণ মেলাতে ব্যস্ত। কুণাল যদি নিশাকে সাহায্য না করে থাকে, আর শিলাদিত্য যদি আগেই কুণালের সত্যিটা জেনে গিয়ে থাকে, তাহলে ওই জোড়া খুন কে করল? অরিন্দম পকেট থেকে শিলাদিত্যের ভল্ট থেকে পাওয়া পেনড্রাইভটা বের করল।
-কিঞ্জল, শিলাদিত্যবাবুর ল্যাপটপটা কোথায়?
-স্টাডিতেই আছে।
কিঞ্জল দ্রুত উত্তর দিল। দুজনে আবার স্টাডিতে ঢুকল। পেনড্রাইভটা ল্যাপটপে ঢোকাতেই একটা মাত্র ফোল্ডার ভেসে উঠল। ফোল্ডারের নাম ‘The Endgame’। ফোল্ডারের ভেতরে একটা ভিডিয়ো ফাইল। অরিন্দম প্লে বোতামে ক্লিক করল। ভিডিয়োটা এই স্টাডিরই। শিলাদিত্য বসে আছে টেবিলের ওপাশে। কিন্তু সে একা নয়। ভিডিয়োতে আরও একজনের গলার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে, যদিও তার মুখটা ক্যামেরার ফ্রেমের বাইরে। ‘তুমি কি ভেবেছ শিলাদিত্য, রাজারহাটের ওই হাজার কোটির প্রজেক্টটা আমি তোমাকে আর নিশাকে একা গিলতে দেব?’ কণ্ঠস্বরটা ভীষণ শান্ত, কিন্তু তার মধ্যে একটা হিমশীতল ক্রুরতা লুকিয়ে আছে। শিলাদিত্যকে ভিডিয়োতে বেশ নার্ভাস দেখাচ্ছিল। ‘দেখুন, আপনার যা পাওনা, তা আপনি পেয়ে যাবেন। কিন্তু নিশাকে আমি...’। ‘নিশাকে তুমি সামলাতে পারবে না। আর তোমার ওই স্ত্রী আর ওর প্রেমিক... ওদের খেলাটাও আমি জানি। তুমি একটা বোকা শিলাদিত্য। আজ রাতেই সব হিসেব চুকিয়ে দেব আমি’। ভিডিয়োটা হঠাৎ শেষ হয়ে গেল। অরিন্দমের মেরুদণ্ড বেয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল। এই কণ্ঠস্বরটা তার চেনা। ভীষণ চেনা।
-অরিন্দমদা...
কিঞ্জলের গলাটা অদ্ভুত শোনাল।
-ওই গলাটা কি...
কিঞ্জলের কথা শেষ হওয়ার আগেই পুরো ফ্ল্যাটের আলো দপ করে নিভে গেল। শুধু ল্যাপটপের নীলচে আলোটা জ্বলছে। আর সেই আলোয় অরিন্দম দেখল, স্টাডির দরজার মুখে একটা দীর্ঘ ছায়া এসে দাঁড়িয়েছে। ছায়ার হাতে একটা সাইলেন্সার লাগানো পিস্তল।
-খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন আপনারা, অরিন্দমবাবু।
অন্ধকারে সেই হিমশীতল কণ্ঠস্বরটা আবার শোনা গেল।
-শিলাদিত্য আর নিশা বড্ড বেশি লোভী হয়ে পড়েছিল। আর কুণাল আর মোহিনী নিজেদের নোংরা খেলায় মত্ত ছিল। ওদের পথ থেকে সরানোটা খুব জরুরি ছিল।
অরিন্দম বুঝতে পারল, তারা এখন এমন এক চোরাবালিতে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে আইনের রক্ষক আর ভক্ষক মিলেমিশে এক হয়ে গেছে। খুনি বাইরে থেকে আসেনি, সে এতক্ষণ ছায়ার মতো তাদের সঙ্গেই ঘুরে বেড়িয়েছে। ল্যাপটপের স্ক্রিন থেকে ঠিকরে আসা নীলচে আলো ছায়াটাকে একটু একটু করে স্পষ্ট করছিল। সাইলেন্সার লাগানো পিস্তলটা অরিন্দমের বুক লক্ষ করে ধরা। বন্দুকের নলের পিছনে যে মুখটা ফুটে উঠল, তা দেখে সাধারণ মানুষের হৃদস্পন্দন থেমে যাওয়ার কথা, কিন্তু অরিন্দম শান্ত রইল।
-কিঞ্জল।
অরিন্দমের গলা আশ্চর্য রকম নির্লিপ্ত।
-আমি ভাবছিলাম, এত নিখুঁত একটা খুন কোনও সাধারণ মানুষের পক্ষে করা সম্ভব নয়। যাকে আইনের প্রতিটা ফাঁকফোকর, পুলিশের প্রতিটা পদক্ষেপ আগে থেকে জানা থাকতে হবে। আর তুমি সেই সুযোগটাই নিলে।
কিঞ্জল হাসল। সেই পরিচিত, বন্ধুসুলভ হাসি এখন ক্রুর, বীভৎস রূপ নিয়েছে।
-আপনি বড্ড বুদ্ধিমান অরিন্দমদা। কিন্তু মাঝে মাঝে বেশি বুদ্ধি মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আমি আপনাকে ডেকেছিলাম আমার এই সাজানো ছকটায় একটা সিলমোহর দেওয়ার জন্য। ভেবেছিলাম, আপনার মতো একজন নামকরা গবেষক যখন বলবে যে মোহিনী আর কুণাল মিলে শিলাদিত্যকে খুন করেছে, তখন পুলিশের ওপরমহল আর কোনও প্রশ্ন তুলবে না। কিন্তু আপনি বড্ড বেশি গভীরে খুঁড়তে শুরু করলেন।
-রাজারহাটের জমির ডিল?
অরিন্দম জিজ্ঞেস করল।
-পনেরোশো কোটির প্রোজেক্ট অরিন্দমদা!
কিঞ্জল এক পা এগিয়ে এল।
-শিলাদিত্য আর নিশা মিলে পুরো টাকাটা হজম করতে চেয়েছিল। পলিটিক্যাল কানেকশন আর পুলিশকে ম্যানেজ করার দায়িত্ব ছিল আমার। কিন্তু ওরা আমাকে আমার প্রাপ্য বখরা দিতে অস্বীকার করে। নিশা ভেবেছিল ওর কাছে শিলাদিত্যের সিক্রেট ফাইল আছে বলে ও সবাইকে হাতের পুতুল করে রাখবে। তাই আজ সন্ধেয় প্রথম কোপটা আমি নিশাকেই মারি। বেসমেন্টে। খুব ঠান্ডা মাথায়।
কিঞ্জল বাঁ হাত দিয়ে নিজের কপালের ঘাম মুছল।
-তারপর নিশার কান থেকে দুলটা খুলে নিয়ে সোজা ওপরে আসি। শিলাদিত্য তখন একা ছিল এই স্টাডিতে। ভারী পেপারওয়েট দিয়ে ওর মাথার পিছনে মারতেই লোকটা শেষ। দুলটা ওর হাতে গুঁজে দিলাম, যাতে আপনাদের মনে হয় নিশা আর শিলাদিত্য একে অপরকে খুন করেছে। আর যদি সেটা বিশ্বাসযোগ্য না-ও হয়, মোহিনী আর কুণালের পরকীয়ার গল্পটা তো ছিলই। আমি জানতাম, কুণালের আসল রূপ মোহিনীর সামনে খুলে দিলে মোহিনী ঠিক ওকে শেষ করে দেবে। ঠিক সেটাই হল।
অরিন্দম দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
-আইনের রক্ষক হয়ে তুমি এতগুলো জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেললে?
-আইন? যে দুনিয়ায় হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়, সেখানে আইন শুধু একটা শব্দ। আর আপনি এখন সেই দুনিয়ার এক অবাঞ্ছিত সাক্ষী।
কিঞ্জল বন্দুকের সেফটি ক্যাচ নামাল।
-দুঃখিত অরিন্দমদা। কাল খবরের কাগজে বেরোবে, আততায়ীর সঙ্গে হাতাহাতি করতে গিয়ে গবেষক অরিন্দম বসু আর ইন্সপেক্টর কিঞ্জল রায় দুজনেই আহত হন। আপনি মারা যাবেন, আর আমি হয়ত একটু সাহসিকতার মেডেল পাব।
কিঞ্জলের আঙুল ট্রিগারে চাপ দেওয়ার ঠিক আগের মুহূর্ত। হঠাৎ অন্ধকারের বুক চিরে একটা তীক্ষ্ণ আর্তনাদ আছড়ে পড়ল কিঞ্জলের পিঠের ওপর। মোহিনী! কুণালের রক্তে মাখামাখি মোহিনী আহত বাঘিনীর মতো ঝাঁপিয়ে পড়েছে কিঞ্জলের ওপর। তার দু’হাত শক্ত করে চেপে ধরেছে কিঞ্জলের গলা। এই আক্রমণের জন্য কিঞ্জল মোটেও প্রস্তুত ছিল না। তার হাতের ব্যালেন্স নড়ে গেল। সাইলেন্সার লাগানো পিস্তল থেকে একটা চাপা শব্দ বেরোল। গুলিটা অরিন্দমের কানের পাশ দিয়ে বেরিয়ে গিয়ে সোজা লাগল বুকশেলফের কাচে। ঝনঝন করে কাচ ভেঙে পড়ল। মোহিনী নিজের সমস্ত আক্রোশ, সমস্ত বঞ্চনার জ্বালা দিয়ে কিঞ্জলকে মাটিতে ফেলে দিয়েছে ততক্ষণে। কিঞ্জল মরিয়া হয়ে কনুই দিয়ে মোহিনীর পেটে একটা প্রচণ্ড আঘাত করল। মোহিনী ছিটকে পড়ল মেঝের ওপর। কিঞ্জল টলমল করে উঠে দাঁড়িয়ে আবার বন্দুকটা তোলার চেষ্টা করতেই, অরিন্দম নিজের শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে কিঞ্জলের হাতের কবজিতে লাথি কষাল। পিস্তলটা ছিটকে গিয়ে পড়ল ঘরের আরেক কোণে। অরিন্দম এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে টেবিলের ওপর রাখা ভারী ব্রোঞ্জের ল্যাম্পস্ট্যান্ডটা তুলে নিয়ে কিঞ্জলের মাথায় সজোরে আঘাত করল। কিঞ্জল আর দাঁড়াতে পারল না। একটা অস্ফুট শব্দ করে লুটিয়ে পড়ল কার্পেটের ওপর। জ্ঞান হারাল। অরিন্দম হাঁপাতে হাঁপাতে মোহিনীর দিকে তাকাল। মোহিনী মেঝের ওপর পড়ে আছে। তার শ্বাসপ্রশ্বাস ক্ষীণ। অরিন্দম দ্রুত মোহিনীর পাশে বসল।
-মোহিনী দেবী, চোখ খোলা রাখুন। আমি অ্যাম্বুলেন্স ডাকছি...
মোহিনী ধীরে ধীরে চোখ মেলল। তার ঠোঁটের কোণে একটা অদ্ভুত, তৃপ্তির হাসি। চোখের দৃষ্টি ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসছে। সে অস্ফুট স্বরে বলল,
-কুণাল... আমাকে ডাকছে... ও আমাকে একা ফেলে যায়নি...
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই মোহিনীর মাথাটা ঢলে পড়ল একপাশে। তার চোখ দুটো খোলা, কিন্তু সেখানে আর কোনও যন্ত্রণার ছাপ নেই। ভালবাসা আর বিশ্বাসঘাতকতার যে গোলকধাঁধায় সে পথ হারিয়েছিল, মৃত্যু তাকে সেখান থেকে চিরকালের মতো মুক্তি দিয়ে গেল। অরিন্দম পকেট থেকে ফোনটা বের করে পুলিশ কমিশনারকে ডায়াল করল।
ভোরের আলো ফুটছে শহরের আকাশে। বৃষ্টি থেমে গেছে। হাওড়ার গঙ্গার ঘাট থেকে একটা লঞ্চ সাইরেন বাজিয়ে ছেড়ে গেল। সাউথ সিটির সেই বিলাসবহুল ফ্ল্যাটটা পুলিশ আর ফরেনসিক টিমে ভর্তি। কিঞ্জলকে হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। শিলাদিত্য, নিশা, কুণাল আর মোহিনীর মৃতদেহ সাদা চাদরে ঢেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে মর্গের দিকে। অরিন্দম ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছে একা। তার হাতে সেই লাল ডায়েরি আর পেনড্রাইভটা। মানুষের মন কত বিচিত্র! অর্থের লালসা, কামনার আগুন আর ক্ষমতার দম্ভ কীভাবে মানুষকে একটা অদৃশ্য ছায়াবৃত্তের মধ্যে বন্দি করে ফেলে, আজ তার এক চরম রূপ দেখল সে। শিলাদিত্য চেয়েছিল ক্ষমতা, নিশা চেয়েছিল ব্ল্যাকমেইল করে টাকা, কুণাল চেয়েছিল মোহিনীকে ব্যবহার করে নিজের স্বার্থসিদ্ধি করতে, আর মোহিনী চেয়েছিল একটু উষ্ণতা। কিন্তু শেষে কিঞ্জলের মতো এক অন্ধকারের কারিগর তাদের সবাইকে দাবা খেলার বোড়ের মতো ব্যবহার করে গেল। ঠান্ডা হাওয়া এসে লাগল অরিন্দমের মুখে। সে ডায়েরিটা পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য ঘুরে দাঁড়াল। ছায়াবৃত্তের খেলা শেষ, কিন্তু শহরের কোথাও না কোথাও, অন্য কোনও মোহিনী, অন্য কোনও কুণাল হয়ত আবার নতুন করে ছক কষতে শুরু করেছে। মানুষের মনের অন্ধকার কখনও পুরোপুরি কাটে না।
…………………………………….
Dibyendu Ghosh
Vill & p.o. Sankrail,
Dist. Howrah
Pin- 711313
Opposite to Mumtaz Market and beside Sankrail Automobiles
Mail- aybristijhepe@gmail.com

Comments
Post a Comment