কবি কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার
সুমন বিপ্লব
ছাত্র জীবনে প্রায় সবাই পড়েছেন যে কবিতাগুলো "যে জন দিবসে মনের হরষে/জ্বালায় মোমের বাতি অথবা, চিরসুখী জন ভ্রমে কি কখন..."; এই বিখ্যাত কবিতার কবি ছিলেন কবি কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার।
বাংলা সাহিত্যের অমর কবি কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদারের তিনি ছিলেন একাধারে শিক্ষক, কবি, সাংবাদিক এবং পত্রিকা সম্পাদক। তিনি এমনই একজন কবি; যিনি বাংলার সাহিত্য ভাণ্ডারকে তার লেখনীর মাধ্যমে সমৃদ্ধ করেছেন।
কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার ১৮৩৪ সালে খুলনা জেলার ৩১ মে (Wikipedia অনুযায়ী) মতান্তরে ১০ জুন (Banglapedia) ভৈরব নদের তীরে খুলনার দিঘলিয়া উপজেলার সেনহাটি গ্রামে নীতিকবি কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মাণিক্য চন্দ্র দাস (পরবর্তীতে মজুমদার) এবং মাতা ছিলেন ব্রক্ষ্মময়ী।
আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে তাঁর পক্ষে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। মূলত কীর্তিপাশার জমিদারের অর্থানুকূল্যে তিনি জীবনযাপন করেন।একসময় তিনি জমিদার-পুত্রের সঙ্গে ঢাকা আসেন এবং তাঁর এক জ্ঞাতি ঢাকা জজকোর্টের উকিল গৌরবচন্দ্র দাসের আশ্রয়ে থেকে ঢাকার নর্মাল স্কুলে শিক্ষালাভ করেন। এখানে তিনি সংস্কৃত ও ফারসি ভাষা শেখেন। এ সময় থেকেই তাঁর কাব্যচর্চা শুরু হয়। ঈশ্বর গুপ্তের উৎসাহে সংবাদ সাধুরঞ্জন ও সংবাদ প্রভাকর পত্রিকায় তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়। কৃষ্ণচন্দ্র এক সময় স্বধর্ম ও ঈশ্বরের বিরোধিতা শুরু করেছিলেন; পরে আবার শাক্ত, বৈষ্ণব ও ব্রাহ্মধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হন।
কৃষ্ণচন্দ্র ১৮৫৪ সালে বরিশালের কীর্তিপাশা বাংলা বিদ্যালয়ের প্রধান পন্ডিতপদে যোগদানের মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে তিনি ঢাকার নর্মাল স্কুল, মডেল স্কুলে শিক্ষকতা করেন। তিনি দীর্ঘ ১৯ বছর শিক্ষকতার পেশায় নিয়োজিত ছিলেন।
তাঁর প্রথম ও শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ ‘সদ্ভাব শতক’ যা ১৯৬১ সালে ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয়। এই বইটির অধিকাংশ কবিতা নীতিমূলক, যা সুফি এবং হাফিজের ফার্সি কবিতার অনুসরণে রচিত।বাল্যকালে তাঁর একটি ছদ্মনাম ছিল রামচন্দ্র দাস, সংক্ষেপে রাম। তাই পরিণত বয়সে তিনি রামের ইতিবৃত্ত নামে একটি আত্মচরিত রচনা করেন।
মহাভারতের ‘বাসব-নহুষ-সংবাদ’ অবলম্বনে রচিত তার আরেকটি গ্রন্থ হলো মোহভোগ, কৈবল্যতত্ত্ব নামে তিনি একটি দর্শনবিষয়ক গ্রন্থ লেখেন। এছাড়াও তার অপ্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা পনেরো।
তিনি ১৮৬০ সালে মাসিক 'মনোরঞ্জিকা' ও 'কবিতা কুসুমাবলী' নামক পত্রিকার সম্পাদক নিযুক্ত হন। ১৮৬১ সালে ‘'ঢাকা প্রকাশ' প্রকাশিত হলে তিনি তার সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৮৬৫ সালে বিজ্ঞাপনী নামক পত্রিকার সম্পাদক হন। ১৮৮৬ সালে যশোর থেকে তিনি সংস্কৃত ও বাংলা ভাষায় দ্বৈভাষিকী নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা ও প্রকাশ করেন। কবিতাকুসুমাবলী ছিল পদ্যবহুল মাসিক পত্রিকা। তার সদ্ভাবশতক কাব্যের অধিকাংশ কবিতাই এ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
শেষ জীবনে কৃষ্ণচন্দ্র খুলনার সেনহাটিতে বসবাস করেন এবং বিভিন্ন সঙ্গীত রচনা করে অবসর জীবন কাটান। তাঁর লেখা কবিতা পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত ছিল। বর্তমানে এগুলো আর নেই! শেষ বয়সে কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার নিদারুণ অর্থ কষ্টে থাকলেও অত্যন্ত সৎ জীবন যাপন করতেন তিনি। কথিত আছে- একবার ভৈরব নদী পার হওয়ার জন্য খেয়াঘাটে এসে দেখলেন নৌকা আছে মাঝি নেই। মাঝির অবর্তমানে সবাই মিলে খেয়া পার হয়ে যে যার মতো চলে গেলেও একমাত্র কবিই মাঝির অপেক্ষায় বসেছিলেন।
শেষ বয়সে কবি বাড়ির সামনে তার প্রিয় দুটি কামিনী ফুল গাছের নিচে ধ্যানমগ্ন হয়ে দীর্ঘ সময় কাটিয়ে গেছেন। এর আগে সেখানে বসে রচনা করেছেন কবিতা। ১৯০৭ সালে ৬ জানুয়ারি কবি জ্বরে অসুস্থ হয়ে পড়েন। কবিরাজের চিকিৎসায় একটু সুস্থ হলেও সাতদিন পর অর্থাৎ ১৯০৭ সালের ১৩ জানুয়ারি সকালে তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন।
কবির সেই প্রিয় ফুলগাছ, বসতভিটার চিহ্ন আর সেই মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি আজ আর নেই! বর্তমানের কোলাহলে ভক্তরা খুঁজে পায় না সেই সুর। ১৯১৪ সালে স্থাপিত কবি কৃষ্ণচন্দ্র ইনস্টিটিউটটিও আজ অন্তঃসারশূন্য। এখানে একটি লাইব্রেরি ছিল; যেখানে ছিল অনেক দুর্লভ ও মূল্যবান গ্রন্থ। বর্তমানে সেখানে তেমন কিছুই নেই! এমনি করেই আমাদের অনেক গুণী মানুষ আর সমৃদ্ধ ইতিহাস অযত্ন অবহেলায় হারিয়ে যাচ্ছে। এসবের যথাযথ সংরক্ষণ প্রয়োজন।
Comments
Post a Comment