চা দিবস
অশোক বন্দ্যোপাধ্যায়
আজ ১ লা জুন। চা দিবস। মানে চা পানকে সেলিব্রেট করার দিন। তা আমরা কে কবার সারা দিনের মধ্যে চা খাই সেটা এই সুযোগে মনে করা যেতে পারে। নিজের কথাই বলি। সেই ছোট বেলায় বাবা মায়ের দেখা দেখি চা খেতে শুরু করে আজও এই অমৃত পানীয়টির মোহ ত্যাগ করে উঠতে পারিনি। হ্যাঁ সারা দিনের মধ্যে পাঁচ থেকে ছয় কাপ চা পান করা চাই আমার সকাল থেকে সন্ধ্যা রাত পর্যন্ত। আগে শুধু মাত্র সকাল ও বিকালে দুই বার মাত্র চা খেতাম। তারপর যতো বড়ো হয়েছি, চা খাওয়ার মাত্রাটাও ক্রমশঃ বেড়েছে। আমার ডাক্তার পুত্র বেশি বার চা খেতে মানা করা সত্ত্বেও সে অভ্যাস ছাড়তে পারিনি।
কিন্তু এই চা পান ব্যাপারটি তো আর এদেশের ছিল না আগে। সম্ভবতঃ চীন দেশেই চায়ের উৎপত্তি ও প্রসার। ক্রমশঃ এই চা পানের অভ্যাস সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। জাপানিদের কাছে চা এক পরম পবিত্র পানীয়। তাদের চা পানের পর্বটিও অতি সুন্দর এক প্রথার মতো। আমাদের দেশে চা পানের চল শুরু হয়েছে সম্ভবতঃ স্কটিশ সায়েব স্যার ওয়াল্টার রেলের মাধ্যমে।
এক সিনিয়র সহকর্মী দাদার কাছে সেই চা পানের অভ্যাস এই দেশে প্রথম প্রথম চালু হবার সময়ের একটি বাস্তব তথা মজার ঘটনা বলি। সেই ভদ্রলোকের দাদুকে পাড়ার কোন সম্ভ্রান্ত পরিবারে আপ্যায়ণ করে বসিয়ে এক কাপ চা খেতে দিয়েছে। কিন্তু সেই দাদু জানতেন না যে চা এমন একটি পানীয় যা গরম করে পান করতে হয়। তো উনি সেখানে যা হোক কষ্ট করে বাধ্য হয়ে ঐ গরম চা কোন মতে গলা দিয়ে নামাতে গিয়ে ঠোঁট, জিভ ও গলা পুড়িয়ে কাঁদো কাঁদো হয়ে অনুযোগ করে গৃহকর্তাকে নাম ধরে ডেকে বলেন, " চা খাইয়েছো বেশ করেছো, তা বলে গরম খাওয়ালে? ঠান্ডা করে চা খাওয়াতে পারলে না ভায়া?" আসলে তখন মানুষ জানতোই না যে চা গরম করে ই পান করতে হয়, ঠান্ডা চা খাওয়াটা রীতি নয়।
চায়ের সঙ্গে টা কবে থেকে শুরু হয়েছে জানা নেই। তবে এখনকার মতো প্রথম থেকেই আমরা চায়ের সঙ্গে বিস্কুট খেতে শুরু করিনি। তখন আমাদের অভ্যাস ছিল এক বাটি মুড়ি নিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে তার ফাঁকে ফাঁকে চা পান করার। পরবর্তী সময়ে চায়ের সঙ্গে টা মানে বিস্কুট মাস্ট হয়ে গেছে।
চায়ের হয়তো অনেক ক্ষতিকারক দিক আছে। অনেকেই চা খায় না কারণ বেশি চা খেলে না কি গায়ের চামড়া কালো হয়। কিডনির উপর চাপ পড়ে বা সুগারের রোগীর চায়ের সঙ্গে চিনি চলে না। এটা ঘটনা যে বারবার চা খেলে শরীরে শর্করার পরিমাণ বৃদ্ধি পায় যেহেতু চায়ে চিনি দিতে হয় তৈরী করতে। অনেকে চিনির বদলে স্যাকারিন দিয়ে চা পান করে। কিন্তু চায়ের বেশ কিছু উপকারিতাও রয়েছে। চা এক নেশার মতো। চা পান করলে শরীরে ও মনে একটা উত্তেজনা বা হরমোনের সক্রিয়তা বৃদ্ধি পায়। কাজে এনার্জি মেলে। ঘুম কাটানোর জন্য চায়ের কোন জুড়ি নেই। তবে খালি পেটে চা পান করা ঠিক নয়। আমার ছোট বেলায় দেখেছি এমন এক প্রৌড় ব্যাক্তিকে যে সারা দিনের মধ্যে মাত্র একবার খাবার খেতো এবং বাকি সারা দিন চা খেয়েই কাটিয়ে দিতো। সেই প্রায় অভুক্ত মানুষটির শক্তি দেখে অবাক হয়েছিলাম যখন আমাদের হাইস্কুলের মাঠে সে তার চুলে বেঁধে একটা আস্ত গরুর গাড়িকে বেশ কয়েক হাত টেনে নিয়ে গেছলো।
সবাই ঠিক মতো চা বানাতে জানে না। সবার তৈরী চা মুখে রোচেও না সেভাবে তৈরী না করতে পারলে। আর কিছু তেমন না পারলেও চা টা অন্ততঃ এই অধম বানাতে পারে। যাই হোক, বড়ো ছেলে কয়েক মাস আগে মালয়েশিয়া থেকে ভালো চা নিয়ে এসেছিলো। খেয়ে বেশ তৃপ্তি পেয়েছি। তবে আজও মনে পড়ে ট্যুইশনী পড়তে গিয়ে একবার আমার স্যার প্রোফেসর সুরাল বাবুর বাড়িতে খাওয়া সেই স্পেশ্যাল চা। যেমনি ছিল সে স্বাদ, তেমনি ফ্লেভার।
বাঁকুড়া শহরের বিখ্যাত ফেমাস টি স্টলের চা খেতে একসময় সারা শহরের যুবকরা হামলে পড়তো। চায়ের সঙ্গে চাইলে গরম সিঙ্গাড়াও মিলতো। ওখানে চা খেতে যাওয়ার মূল আকর্ষণ ছিল যে সেখানে একটি ঢাউস রেডিওতে সারা দিন গমগম করে গান বাজনা খবর চলতো। আয তখন তো অন্য কিছু বিনোদন যন্ত্র ছিল না শুধু মাত্র রেডিও এবং গ্রামোফোন রেকর্ড বাজানোর যন্ত্র ছাড়া। এছাড়া আরেক আকর্ষণ ছিল যে ওখানে কফি হাউসের মতো তুমুল আড্ডা জমতো। এছাড়াও কৃশ্চান কলেজের সামনে চ্যাটার্জী টি স্টলেও কলেজ পড়ুয়াদের ভীড় লেগে থাকতো। ছোট বেলায় আমার পুরানো গ্রামের কুলি রাস্তায় এমন একটি চায়ের দোকানে খদ্দেরদের দিন রাত ভীড় আর তুমুল আড্ডা কোলাহল দেখেছি। এবার বলবো বর্ধমান শহরের কার্জন গেটের রাস্তায় এক অপরিসর দোকানে সকাল থেকেই শুধু চা আর টোস্ট পাঁউরুটি খাবার জন্য রাস্তার ধারে মানুষের ভীড় আর লাইন। অবাক হয়ে যেতাম ঐ ছোট্ট চায়ের দোকানে প্রতিদিন সকাল সন্ধ্যা এতো চাখোর মানুষের ভীড় দেখে। জিও চা, যুগ যুগ জিও।
==================
অশোক বন্দ্যোপাধ্যায়,
শুভঙ্কর সরণী, প্রতাপ বাগান,
ডাক ও জেলা - বাঁকুড়া,
পিন - ৭২২১০১
Comments
Post a Comment