আটান্নতম 'সুচেতনা' : একটি মূল্যবান সংখ্যা
— অরবিন্দ পুরকাইত
আটান্নতম সংকলন 'সুচেতনা' পড়লাম। গৌতম মণ্ডল সম্পাদিত পত্রিকাটির এবারের বিষয় : চেতনা-চৈতন্যে :: বাংলার কথকতা :: শতবর্ষে সুকান্ত। ভাল লাগল সংখ্যাটি।
সুকান্তকে নিয়ে সুকান্ত রায়ের লেখাটি খুব ভাল লাগল। দৃষ্টান্ত-সহ বিশ্লেষণ তো আছেই, তার থেকেও বড় কথা, এ লেখা গভীর অনুভূতিজাত। কথকতা নিয়ে পরিমল চক্রবর্তীর লেখা অনবদ্য। আগেও এবিষয়ে 'সুচেতনা'তেই বোধহয় পড়েছি তাঁর লেখা। অন্যান্য শিল্পমাধ্যমে কথকতার প্রভাব প্রসঙ্গে নাটকের কথাও আসতে পারত। মনে পড়ে পঞ্চম বৈদিকের প্রযোজনায় জুড়িদার সহযোগে শাঁওলী মিত্রের একক অভিনয়ে অনবদ্য 'নাথবতী অনাথবৎ' বা 'কথা অমৃতসমান'। আমরা দু-একজন কথকের কথকতা শুনেছি, কারও কারও পরিবেশনে নাটকীয়তা দেখেছি। রতনচন্দ্র সরদারের ধরতাই ভাল।
চৈতন্যদেবের উপর লেখাগুলো ভাল লাগল। তবে স্বাভাবিক কারণেই বিভিন্ন লেখায় একই কথার পুনরাবৃত্তি আছে, বিশেষত যেখানে তাঁর মৃত্যুরহস্য নিয়ে বলা হয়েছে। বিশেষত শ্রীচৈতন্যের নীলাচলযাত্রার সূত্র ধরে গর্বের চৈতন্য-পদচিহ্ন আদি অনুসন্ধান এতদঞ্চলের একটি অবশ্যকৃত্য সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। দেবীশঙ্কর মিদ্যার 'সুন্দরবনে মহাপ্রভু', রতনচন্দ্র সরদারের 'শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর প্রভাব ভিন্ন ধর্মীয় ক্ষেত্রে', অলোককুমার শর্মার 'আদিগঙ্গার পূর্বতীরে পড়েছিল তাঁর চরণ-চিহ্ন', দেবপ্রসাদ পেয়াদার 'আটিসারায় অনন্ত সন্নিধানে শ্রীচৈতন্যদেব', বিশ্বজিৎ ছাটুইয়ের 'মহাপ্রভুর চরম স্পর্শে মহিমান্বিত আটিসারা ও মাহিনগর', মদনমোহন মাহাতার 'শ্রীচৈতন্যের যাত্রাপথ ছত্রভোগ ও শ্রীমতি উদ্ধার কথা', সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের 'শ্রীচৈতন্যদেব প্রভাবিত গ্রামনাম', ভোলানাথ মণ্ডলের শ্রীচৈতন্যদেবের বিশ্রামস্থল বলে কথিত গ্রাম বড়ুক্ষেত্র' লেখাগুলিতে তা এসেছে কমবেশি।
চৈতন্যেদেবের হয়ে-ওঠার পর্ব বা প্রকৃত অবদান বিষয়ে তেমন বিশ্লেষণাত্মক অবলোকন পেলাম না। অলোককুমার শর্মার লেখায় চৈতন্যের পুরীযাত্রার কারণ অসম্পূর্ণ, মায়ের দিকটা এলই না! প্রাচীনপন্থী শাস্ত্রজ্ঞদের আক্রোশে উদ্ভুত প্রতিকূল পরিস্থিতি— যাতে করে প্রাণনাশও হয়ে যেতে পারত— এল, শচীদেবীর কাছে চৈতন্যের পুরী যাওয়াটা মন্দের ভাল, তাই তিনি এটাই চেয়েছিলেন। তিনি মাঝে মাঝে খোঁজ পেতে পারবেন কারও কারও যাতায়াতের মাধ্যমে; গৌরাঙ্গও চাইলে চলে আসতে পারবেন, গঙ্গাস্নান করতে পারবেন— এই ছিল অভিলাষ। বিশ্বজিৎ ছাটুইয়ের লেখা ক্ষেত্রসমীক্ষা ও বইপত্রের আলোকে আরও বেশি যাচাই করে নেওয়ার দিকে যাচ্ছে দেখে ভাল লাগছে। প্রয়োজনে মান্য মত বা এমনকি মান্যজনের মতকে যথাযোগ্যভাবে দেখার মাধ্যমে সম্মানের সঙ্গে একপাশে সরিয়ে রাখছেন এটা আশ্বস্ত হওয়ার মতো। রতনচন্দ্র সরদারের লেখাটি ভাল, তবে আপ্লুতি খানিক ঢেকে ফেলেছে প্রকৃত চৈতন্য ও তাঁর সমসাময়িক বা পরবর্তী কাল তথা কালের মানুষ সম্বন্ধে ধারণাকে। দ্বেষ-বিদ্বেষ, ঈর্ষা-হিংসা, ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত, পরাজিত পাণ্ডিত্যের অহঙ্কারী প্রভাবশালী পদক্ষেপ, প্রবল প্রাদেশিকতাপ্রীতি ইত্যাদির কোনোটারই অভাব হয়নি, কি তাঁর সমকালে, অন্তর্ধানের অব্যবহিত পরে বা পরবর্তীতে। স্বয়ং চৈতন্যই তার ভুক্তভোগী। তাতে অবশ্য চৈতন্য-মহিমা ক্ষুণ্ন হওয়ার নয়। সচেতনভাবে ভক্তিপথের পথিক হয়ে, আচণ্ডাল মানুষকে মর্যাদার সরণিতে সামিল করার একাধারে বলিষ্ঠ ও ভক্তি-আকুল পদক্ষেপ ইত্যাদি 'চৈতন্যচর্চার পাঁচশো বছর' পরেও আজ মানুষ সসম্ভ্রমে স্বীকার করে— করে যেতে হবে।
মহাশ্বেতা দেবীর একটি গল্পের একটু অংশ তুলে ধরি, তাঁকে নিয়ে আমারই এক লেখা থেকে, যা নিছক গল্প বলে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না বোধহয় :
ঘন ক্ষীরে লুচি চুবিয়ে খাচ্ছে কেউ আর কারও সামান্য খুদকুড়োও জুটছে না! 'বান' গল্পটির কথা উল্লেখ করি। গৌরাঙ্গ-প্রেম থাকলেও গৌরাঙ্গের তথাকথিত নিচু জাত-প্রেম মেনে নিতে পারেননি বর্ণগৌরবে গরীয়ান বেশির ভাগ লোকই। গৌরাঙ্গ গৌড় থেকে শান্তিপুর গিয়ে মাতৃদর্শন করে আবার নীলাচলে যাওয়ার সময়, পূর্বস্থলীর আচার্য পরিবারের বড় আচার্যের বড় ইচ্ছা, তাঁর বাড়িতে দুটি দিন থেকে যান নিমাই। তো সেই উপলক্ষ্যে ব্রাত্যদের ভোজনের আয়োজন। কিন্তু যখন জানা গেল নিমাইয়ের সে গ্রামের কাছাকাছিও আসা সম্ভব হল না, অবেলায় দেওয়া হল মুড়ি-বাতাসা! মুড়ি-বাতাসার ধামা-হাতে নেমে-আসা মাহিন্দাররা জানাল, 'তিনি যদি আসত, তবে পেসাদ নিশ্চয় রান্না হত। ইদিকে কীত্তন হত, হতে হতে পেসাদ রান্না হত। তোমরা সবাই পেসাদ পেতে। যোগাড় ছিল, সরঞ্জাম ছিল, সবই ছিল গো! তা তিনি যখন এল না, তখন আর পেসাদ কেমন করে হয় বল?' সেই ভিড়ের কিশোর চিনিবাস আবার অচ্ছুৎ রূপসী বাগদিনীর গর্ভে একদা বড় আচার্যেরই দান! চরম হতাশ সে বাড়ি ফিরে মাকে মারধোর করে মুড়ি-বাতাসা ফেলে দিয়ে পালিয়ে যায়!
একটা কথা বলা যায়, বিভিন্ন মত একত্র হওয়ায়, অনেকে মোটামুটি একটা চিত্র পাবেন। রামচন্দ্র নস্করের 'শ্রীচৈতন্য অপ্রকট-লীলা ও অনুসারী লোকায়ত কর্তাভজাধর্ম' লেখাটিতে তো ওই বিষয়ে প্রায় পূর্ণচিত্রের আভাস। সব মত উল্লেখের সঙ্গে সঙ্গে মূল কথা বলা হয়েছে। এই প্রসঙ্গে কিছু তথ্য রয়েছে জ্যোতির্ময় সরদারের 'শ্রীচৈতন্যই কি কর্তাভজাধর্মের ফকিরচাঁদ— কিছু আলোকপাত' লেখাটিতেও।
চৈতন্যচর্চার আরও অন্তত দুটি বই এক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক হত, কালকূটের 'জ্যোতির্ময় শ্রীচৈতন্য' ও ইদানীংকার নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ীর 'চৈতন্যদেব'। শেষের বইটিতে মৃত্যুরহস্য নিয়ে অবশ্য কিছুই প্রায় বলেননি লেখক ইচ্ছে করেই, কিন্তু অন্য অনেক ভাল বিশ্লেষণ আছে।
নিবন্ধোপম সম্পাদকীয়টি যথোপযুক্ত।
.............................

Comments
Post a Comment