সেবার চড়কে
সত্যজিৎ প্রামানিক
আমাদের গ্রামে নববর্ষকে কেন্দ্র করে নানান উৎসব ও অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। তবে চড়কের মেলা আমার কাছে অন্যতম, অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই মেলার সাথে। তবে এখন কাজের সূত্রে দূরে থাকায় আর গ্রামে ফেরা হয় না।
চড়ক হল বাঙালি হিন্দুদের অন্যতম প্রাচীন লোক উৎসব, যা চৈত্র সংক্রান্তি অর্থাৎ নববর্ষের ঠিক আগের দিন অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। চৈত্র মাসের প্রথম থেকেই সন্ন্যাসীরা নিরামিষ ভোজন করে ও নানান কঠোর নিয়মের মধ্যে দিয়ে শিবের গাজন পালন করে থাকে। এবং চৈত্র সংক্রান্তির দিন চড়ক গাছ থেকে দড়ির সাহায্যে সন্ন্যাসীদের পিঠে বড়শি গেঁথে ঘোরানো হয়। আর এটাই ছিল আমার কাছে মূল আকর্ষণের কারণ।
চড়ক পূজা কে কেন্দ্র করে বিরাট মেলা বসত। সেখানে রকমারি খাবার যেমন থাকত, তেমনি মাটির তৈরি আসবাবপত্র, বাঁশ-বেতে সামগ্রী, পটের শিল্প কর্ম, কাঁচের চুরি, না জানি আরো কত কি পাওয়া যেত। মেলায় অনুষ্ঠিত হতো বাউল গান, যাত্রা পালা, পুতুল নাচ, লোকনৃত্য আর গ্রামের মানুষ সারা রাত জেগে সেসব উপভোগ করত। সত্যিই ওই দিনগুলো ছিল একদমই অন্যরকম।
প্রথমদিকে পরিবারের সাথে, পরে একটু বড় হতে বন্ধুদের সাথে ভালই কাটতো দিনগুলো।
কিন্তু সেবার চড়কে ঘটলো এক ভয়ঙ্কর অঘটন। সব ঠিকই চলছিল একদিকে চড়কের প্রস্তুতি, অন্যদিকে মেলায় ধীরে ধীরে মানুষের ভিড় জমে উঠছে, শুরু হয়েছে দোকানে দোকানে কেনাকাটার তোড়জোড়।
হঠাৎ মাইকে শোনা গেল এখনই চড়ক শুরু হবে, ফলে সবাই ছুটে গেল চড়ক গাছের দিকে। আমিও ভিড় ঠেলে কোন রকমে, সামনের দিকে গেলাম ঠিকই, তবে বেগ পেতে হলো বেশ।
যাইহোক শুরু হলো চড়কে বড়শি গেঁথে সন্ন্যাসীদের ঘোরানো। এক এক করে সন্ন্যাসীরা আসে কেউ দুটো, কেউ দশটা, কেউবা ষোলটা বড়শি গেঁথে ঘুরতে লাগল। আবার কেউ গলায় ঢাক ঝুলিয়ে নিচ্ছে, কেউ আবার দর্শকদের উদ্দেশ্যে ফল, বাতাসা ছুড়তে লাগল। মেলায় উপস্থিত মহিলারা উলুধ্বনি দিতে লাগল। এবার দেখি একজন সন্ন্যাসী একটি ছোট্ট শিশুকে কোলে নিয়ে ঘুরতে লাগলো, দেখতে যেমন ভাল লাগছিল তেমন শিহরণও হচ্ছিল।
হঠাৎ চড়ক গাছ হুরমুড় করে ভেঙে পড়ল। সে এক হলূস্থুল কান্ড। চড়ক গাছের নীচে চাপা পড়লো ছোট থেকে বড় অনেকেই। কয়েক মিনিটের ব্যবধানে চোখের সামনে কি যে ঘটে গেল, সে কল্পনার অতীত।যখন একটু ধাতস্থ হলাম, দেখলাম আমি মাটিতে পড়ে আছি, সবাই দৌড়দৌড়ি করছে, কান্নার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি।
কি করবো, কি করা উচিত কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না। হঠাৎ মাথার এক কোনে চিন্চিন্ করে উঠলো। মাথায় হাত দিতেই কেমন ভেজা ভেজা লাগলো, ভাবলাম মাটিতে পড়ে গেছি কিছু লেগেছে বোধহয়।কিন্তু হাতটা সামনে আনতেই বুঝলাম সেটা আর কিছু নয় রক্ত। তখনই অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন কানে এলো, আর আমিও জ্ঞান হারালাম।
যখন জ্ঞান ফিরলো দেখি আমি হসপিটালের বেডে। সামনে বসে আছে মা-বাবা দাদা আরো অনেকে। পরে জেনেছিলাম অনেকের হাত, পা ভেঙে গেছিল, এমনকি দুজন মারা গেছিল।
আজও চড়ক এলে ওই দিনের স্মৃতি আমাকে তাড়া করে বেড়ায়, গায়ে কাঁটা দেয়।
.............................
Satyajit Pramanik
Narayan Polly, Durganagar P.O- Nimta, Dist- North 24 Pargana
Kolkata- 700049

Comments
Post a Comment