নববর্ষের আগের দিন
প্রবীর কুমার চৌধুরী
বৈশাখ আসতে আর মাত্র তিনদিন বাকি। শহরের অলিগলিতে তখন নতুন রঙের গন্ধ - দোকানের সাইনবোর্ডে তাজা রঙ, ফুটপাথে বিক্রি হচ্ছে লাল-সাদা শাড়ি, পাঞ্জাবি, মাটির বাঁশি। কিন্তু এই উৎসবের আড়ালে কোথাও যেন একটা অদৃশ্য অপেক্ষা জমে ছিল রুদ্রর মনে।
রুদ্র একজন নবীন লেখক। বহুদিন ধরেই সে লিখতে চায় নববর্ষকে কেন্দ্র করে। মানুষের জীবন, গ্রাম আর শহরের পার্থক্য, হারিয়ে যাওয়া রীতি-প্রথার কথা। কিন্তু লেখার টেবিলে বসলেই শব্দগুলো যেন মুখ ফিরিয়ে নেয়।
সেই দিন দুপুরে, মোবাইল স্ক্রিনে চোখ পড়তেই তার সামনে ভেসে উঠল একটি "লেখা-আহ্বান" বাংলা নববর্ষকে কেন্দ্র করে লেখা পাঠানোর আমন্ত্রণ। সেখানে লেখা "শব্দ বা লাইনের কোনো বাধন নেই।" এই একটি লাইন যেন রুদ্রর বুকের ভেতরে কোথাও আলো জ্বেলে দিল। সে ভাবল "যদি সত্যিই কোনো বাঁধন না থাকে, তাহলে আমি কেন নিজেকেই বেঁধে রাখছি?"
সন্ধ্যার দিকে সে বেরিয়ে পড়ল। শহরের ভিড় পেরিয়ে হেঁটে গেল গঙ্গার ঘাটের দিকে। সেখানে বসে ছিল এক বৃদ্ধ, মাটির প্রদীপ আর রঙিন পুতুল বিক্রি করছিলেন। রুদ্র দাঁড়িয়ে দেখল, খুব একটা ক্রেতা নেই। তবুও বৃদ্ধের মুখে একরকম শান্ত হাসি।
রুদ্র এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, "কাকু, বিক্রি কেমন?"বৃদ্ধটি হেসে বললেন, "বাবা, নববর্ষ এলেই মনে হয় এই বছরটা ভালো যাবে। সেই আশাতেই বসে থাকি।"
- "কিন্তু যদি না যায়?"
- "তবুও আশা ছাড়ি না। নববর্ষ মানে তো নতুন করে শুরু করার সাহস।"
এই কথাগুলো যেন রুদ্রর ভেতরে ঢেউ তুলল। সে হঠাৎ বুঝতে পারল নববর্ষ মানে শুধু পান্তা-ইলিশ বা নতুন জামা নয়, এটা মানুষের ভেতরের পুনর্জন্ম।
পরদিন সে চলে গেল নিজের গ্রামে। অনেকদিন যায়নি। সেখানে এখনো নববর্ষ মানে মেলা, নাগরদোলা, ঢাকের শব্দ। তার ছোটবেলার বন্ধু সুমন তাকে নিয়ে গেল মাঠের ধারে, যেখানে গ্রামের মানুষজন মেলা বসানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এক বৃদ্ধা পিঠে বানাচ্ছিলেন, আর পাশেই কয়েকজন কিশোর মঞ্চ বানাচ্ছে নাটকের জন্য। রুদ্র অনুভব করল শহরের ঝলমলের মধ্যে যে উষ্ণতা নেই, তা এই সরলতায় ভরপুর।
সে রাতে রুদ্র লিখতে বসল। তার লেখায় উঠে এল সেই বৃদ্ধ বিক্রেতার কথা, গ্রামের মেলার উচ্ছ্বাস, শহরের ব্যস্ত মানুষের ক্লান্তি, আর সবকিছুর মাঝেও এক অদ্ভুত আশার আলো।
সে লিখল "নববর্ষ মানে শুধু নতুন ক্যালেন্ডার নয়,
এটা পুরোনো ক্লান্তিকে বিদায় দিয়ে এক মুঠো আশাকে বুকে জড়িয়ে ধরা।"
লেখা শেষ করে সে আর কিছু ভাবল না। ই-মেইল করে পাঠিয়ে দিল।
দিন কেটে গেল। নববর্ষের সকালে রুদ্র যখন বারান্দায় দাঁড়িয়ে সূর্যের দিকে তাকাচ্ছিল, তখন তার ফোনে একটি মেইল এল।
তার লেখা নির্বাচিত হয়েছে।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এই খবরটা পেয়ে রুদ্র যতটা খুশি হল, তার চেয়েও বেশি আনন্দ পেল সে এইভেবে যে, সে অবশেষে নিজের ভেতরের বাঁধন ভেঙে লিখতে পেরেছে।
সেদিন বিকেলে সে আবার সেই ঘাটে গেল। বৃদ্ধ তখনও বসে আছেন।
রুদ্র একটা প্রদীপ কিনে বলল, "কাকু, এই বছরটা ভালোই যাবে।"
বৃদ্ধ হেসে বললেন, "দেখেছো, আশা করলে ঠিকই আলো জ্বলে ওঠে।"
রুদ্র মনে মনে বলল—
"হ্যাঁ, নববর্ষ আসলে বাইরে নয়,এটা জ্বলে ওঠে মানুষের ভেতরেই।"
=================
প্রবীর কুমার চৌধুরী
গড়িয়া, কলকাতা

Comments
Post a Comment