অসমাপ্ত বর্ষার দীর্ঘশ্বাস
জয় মণ্ডল
আজ পয়লা বৈশাখ। কলকাতার এক ব্যস্ত প্ল্যাটফর্মে যখন শেষ ট্রেনের ঘোষণা প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল, আকাশ তখন ঝাপসা হয়ে এসেছে শ্রাবণের ঘন কালো মেঘে। সেই পুরনো ঘড়িটার নিচে নীলাদ্রি আর অন্তরা দাঁড়িয়ে ছিল—ঠিক যেখানে সাত বছর আগে এমনই এক পয়লা বৈশাখের দিনে তাদের প্রথম আলাপ হয়েছিল। আজ ঘড়ির কাঁটাগুলো যেন একেকটি ধারালো অস্ত্রের মতো তাদের সাত বছরের স্মৃতিগুলোকে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছিল। আজ তাদের বিচ্ছেদের দিন নয়, বরং একে অপরকে জনসমুদ্রে হারিয়ে ফেলার এক নীরব আয়োজন।
অন্তরা নীলাদ্রির চোখের দিকে তাকিয়ে এক চিলতে হাসল। তবে সেই হাসিতে বসন্তের সতেজতা ছিল না, ছিল হেমন্তের ঝরা পাতার শুকনো বিষণ্ণতা। সে নিচু স্বরে বলল, “শহর বদলে যায় নীলাদ্রি, মানুষও বদলে যায়। আমরা কি তবে এই ভিড়ের মাঝে দুটি অচেনা ছায়া হয়েই থেকে যাব?” নীলাদ্রির গলার কাছে যেন এক দলা কান্না আটকে ছিল। শেষ স্মৃতি পকেটে থাকা চিরকুটটা, তাতে লেখা ছিল— ‘একসাথে বুড়ো হওয়ার কথা ছিল আমাদের।’
হঠাৎ আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামল। সেই ঝমঝম শব্দের আড়ালে অন্তরা তার চোখের জল লুকানোর সুযোগ পেয়ে গেল। ট্রেনটা যখন প্ল্যাটফর্মে ঢুকছে, তার তীব্র হেডলাইটের আলো তাদের মাঝখানের শূন্যতাকে আরও প্রকট করে তুলল। অন্তরা ট্রেনের দরজায় পা রেখে শেষবারের মতো পিছন ফিরে তাকাল। নীলাদ্রি দেখল, বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা যেন একেকটি না বলা দীর্ঘশ্বাস হয়ে ঝরে পড়ছে ট্রেনের জানালায়।
ট্রেনটা ছেড়ে দেওয়ার পর প্ল্যাটফর্ম যখন নিস্তব্ধ, নীলাদ্রি তখনও বৃষ্টিতে ভিজছে। সে আজ এক কঠিন সত্য উপলব্ধি করল—প্রেম মানে সবসময় আঁকড়ে ধরা নয়; কখনো কখনো প্রেম মানে প্রিয় মানুষের ভালো থাকার জন্য তাকে মুক্তি দেওয়া। গন্তব্যে পৌঁছানোর চেয়েও বড় সত্য হলো সেই ফেলে আসা পথের ধূলোমাখা স্মৃতিগুলো। শহরটা এখন শান্ত, কিন্তু নীলাদ্রির হৃদয়ে তখনো এক নিঝুম বর্ষার সুর বাজছে, যা শুধু অন্তরার নামেই শেষ হয়। কিছু ভালোবাসা হয়তো পূর্ণতা পায় না বলেই মহাকালের পাতায় অমর হয়ে থেকে যায়।
.........................
Joy Mondal,
Kalimandir purbapara, kalikapur, Near PHC, post- kalikapur, P. S- sonarpur, Dist- South 24 Pgs, W. B- 743330

Comments
Post a Comment