নববর্ষের গৌরচন্দ্রিকা
অভীক চন্দ্র
নববর্ষ এলেই আমাদের মধ্যে এক অদ্ভুত আত্মিক জাগরণ ঘটে। এই জাগরণ সাধারণত ঘুম ভাঙার আগেই শুরু হয়। মানে, অ্যালার্ম বাজার সঙ্গে সঙ্গে চোখ না খুলেই ঠিক করে ফেলি, "এই বছর আমি সম্পূর্ণ বদলে যাব!"
যেন গত বছরটা ছিল একেবারে পরীক্ষামূলক খসড়া, আর এবার আমরা ফাইনাল ড্রাফট লিখতে বসেছি। ট্র্যাজেডিটা এখানেই। খসড়া বদলাই ঠিকই, লেখকটা একই থেকে যায়।
নববর্ষের প্রথম সকালটা তাই খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই দিন আমরা নিজেদের সামনে এমন সব প্রতিজ্ঞা করি, যা শুনলে প্রাচীন যুগের তাবড় তাবড় লোকেরাও চমকে উঠতেন।
আমি নিজেও প্রতি বছর একগাদা প্রতিজ্ঞা করি। ভোরে উঠব, নিয়মিত ব্যায়াম করব, প্রতিদিন অন্তত এক ঘণ্টা বই পড়ব, মোবাইল কম ব্যবহার করব, সময়মতো সব কাজ শেষ করব… ইত্যাদি।
সব মিলিয়ে এমন এক জীবনযাত্রার পরিকল্পনা করি, যা বাস্তবে পালন করলে আমি হয়তো 'মানুষ' থেকে সরাসরি 'মহামানব' হয়ে যেতাম। কিন্তু সমস্যাটা হল, এই মহামানব হওয়ার পথে সবচেয়ে বড় বাধা আমি নিজেই।
নববর্ষের প্রথম দিন ভোর পাঁচটায় অ্যালার্ম বেজে ওঠে। আমি চোখ আধখোলা রেখে ভাবি, "এই তো নতুন জীবন শুরু!"
অ্যালার্ম বন্ধ করার পর আমি এমন এক গভীর দার্শনিক স্তরে পৌঁছে যাই, যেখানে ঘুম আর জাগরণের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকে না। পরক্ষণেই আমার পরিশ্রমী মনে আরেকটা চিন্তা আসে, "জীবনটাই তো একটা স্বপ্ন। আজ তো সবে প্রথম দিন, শরীরকে একটু মানিয়ে নিতে সময় দিতে হবে।"
এই 'মানিয়ে নেওয়া' প্রক্রিয়া এতটাই গভীর যে আমি আবার ঘুমিয়ে পড়ি, এবং পরেরবার যখন উঠি, তখন সূর্যদেব বেশ খানিকটা উপরে উঠে গেছেন।
আমি তখন নিজেকে সান্ত্বনা দিই, "আসলে ভোরে ওঠা এতটা জরুরি নয়, নিয়মিত ওঠাটাই আসল!"
সেই সঙ্গে নববর্ষ মানেই পরিকল্পনার বন্যা। যাকে রেজোলিউশন না কি একটা বলে যেন! কোন্ মোটিভেশনাল স্পিকারের মুখে শুনেছিলাম, চিন্তাটাকে বাস্তবে পরিণত করতে হলে আগে নিজে হাতে লিখতে হয়। সে বেচারা তো আর জানত না, যেকোনো মোটিভেশনাল স্পিকারকে ডিমোটিভেট করার সুপারপাওয়ার নিয়ে আমি জন্মেছি!
যাই হোক, মোটা একটা ঝকঝকে ডায়েরি এনে প্রথম পাতায় বড়ো করে লিখি, "এই বছরের লক্ষ্য।"
ডায়েরির প্রথম পাতাটা এত সুন্দর করে সাজাই যে মনে হয়, বাকি পাতাগুলো শুধু এই সৌন্দর্যের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ফাঁকাই থেকে যাবে। আর কখনও কখনও ডায়েরির দিকে তাকিয়ে মনে হয়, "এগুলো আমি লিখেছিলাম, না কোনো অত্যন্ত আশাবাদী অপরিচিত ব্যক্তি আমার ভেতরে ঢুকে লিখে দিয়ে গেছে?"
লিস্টটা এত দীর্ঘ হয় যে সেটাকে বাস্তবায়ন করতে গেলে আলাদা একটা জীবন দরকার। এবার এখানে সমস্যাটা হল, এই ডায়েরিটা প্রথম দুই-তিন দিন খুব যত্ন করে ব্যবহার করা হয়। তারপর সেটা ধীরে ধীরে টেবিলের কোণে সরে যায়, এবং শেষে এমন এক জায়গায় পৌঁছায়, যেখান থেকে তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না।
আমার ধারণা, পৃথিবীর কোথাও একটা 'হারানো নববর্ষের ডায়েরির জাদুঘর' আছে, আর সেখানকার আমি একজন এলিট মেম্বার!
'পরিবর্তন' শুনলেই মনে হয়, জীবনটা একেবারে ইউ-টার্ন নেবে। কিন্তু বাস্তবে দেখি, একই রাস্তায় একটু ধীরে হাঁটা শুরু করেছি, আর মাঝে মাঝে বসে পড়াটাকেই তখন 'স্ট্র্যাটেজিক ব্রেক' বলে চালিয়ে দিয়েছি।
এই যেমন আমি একবার ঠিক করলাম, "এবার থেকে আমি আর কাজ ফেলে রাখব না।"
প্রথম দিনই একটা কাজ পেলাম। আমি ভাবলাম, "এটা তো খুব সহজ, একটু পরে করলেও হবে। সবসময় এত তাড়াহুড়ো করলে হয়!"
তারপর 'একটু পরে' করতে করতে ধীরে ধীরে 'কাল' হয়ে গেল, আর 'কাল' গিয়ে পৌঁছাল 'আগামী সপ্তাহে।' তখন আমার হাতে আর সময় নেই।
আর এইভাবে আমি নতুন করে শিখলাম যে ডেডলাইন আমার কাছে কোনো চাপ নয়, বরং এক ধরনের অনুপ্রেরণা, শেষ মুহূর্তে হঠাৎ করে বুদ্ধি খাটানোর জন্য!
অন্যদিকে, নববর্ষ মানেই ডায়েটের মহাযজ্ঞ। প্রথম দিন আমি খুব স্বাস্থ্যকর খাবার খাই, সালাদ, সবজি, ফল, স্যুপ…
চায়ে এক চামচ চিনি কম খেয়ে, নিজেকে আয়নায় দেখে মনে হয়, "বাঃ! এই তো, পরিবর্তন শুরু হয়ে গেছে!"
প্রথম দু-দিন শাকসবজি খেয়ে মনে হয়, "এই তো! শরীরটা ধীরে ধীরে মন্দির হয়ে উঠছে।"
তৃতীয় দিন মুখরোচক খেয়ে মনে হয়, "মন্দির হলেও পূজারি তো একা আমি, কাজেই মেনু আমিই ঠিক করব!"
আর ডায়েটের সবচেয়ে কঠিন দিকটা হল, নিজেকে বোঝানো যে "আজ চিট্ ডে নয়," যখন মন ইতিমধ্যেই চিট করে ফেলেছে আমার সঙ্গে।
কে বলেছে আমি দুর্বল! আমি প্রথমে প্রতিরোধ করার চেষ্টা অবশ্যই করি। কিন্তু এটাও তো ভাবতেই হয়, "জীবনটা এত কঠোর করে কী লাভ? একটু আনন্দ তো দরকার!"
সেরকমই সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের জীবনের এমন এক সঙ্গী, যাকে আমরা ছেড়ে থাকতে পারি না।
নববর্ষে আমি সিদ্ধান্ত নিই, "আজ থেকে ফোনটা কম ব্যবহার করব।"
ঠিক সেই সময় ফোনে একটা নোটিফিকেশন আসে, "আপনার জন্য নতুন কিছু আছে!"
তখন সোশ্যাল মিডিয়া ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তটা আমি আরও গুরুত্ব সহকারে নিই। এতটাই গুরুত্ব দিয়ে নিই যে, সেটা ঘোষণা করতেও সোশ্যাল মিডিয়াতেই ঢুকতে হয়।
তবে একটা ব্যাপারে আমি নিশ্চিত, আমাদের জীবনে যদি কেউ সবচেয়ে বিশ্বস্ত সঙ্গী হয়, সে হল আলস্য। আলস্য কক্ষনো আমাদের ছেড়ে যায় না। বরং আমরা যখনই কিছু ভালো কাজ করতে যাই, তখনই সে এসে বলে,
"এত কষ্ট করে কী হবে? একটু বিশ্রাম নাও!"
আশ্চর্যের বিষয়, জীবনযুদ্ধে প্রতি বছরই আলস্যকে হারিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করি, আর প্রতি বছরই আলস্য আমাদের হারিয়ে দেয়।
এত ব্যর্থতা, এত ভাঙা প্রতিজ্ঞার পরেও আমরা থেমে যাই না। নববর্ষ আবার আসে, আর আমরা আবার নতুন করে স্বপ্ন দেখি। হয়তো পুরোপুরি বদলাতে পারি না, কিন্তু একটু একটু করে বদলাতে পারি। এই ছোট ছোট পরিবর্তনগুলোই আসলে বড়োসড়ো পরিবর্তনের বীজ।
নববর্ষ আমাদের শেখায়, নতুন করে শুরু করতে কোনোদিন দেরি হয় না। একদিনে সব বদলে ফেলা নয়, বরং নিজের সীমাবদ্ধতাকে বুঝে, হাসতে হাসতে একটু একটু করে এগিয়ে যাওয়া।
আর যদি সব প্রতিজ্ঞাই ভেস্তে যায়? তাহলে অন্তত বলতে পারি, "চেষ্টা তো করেছি!" আর সেই চেষ্টার গল্পটাই হয়তো আগামী বছরের নতুন প্রতিজ্ঞার জ্বালানি হয়ে থাকবে।
=================
অভীক চন্দ্র
তোলাফটক, চুঁচুড়া, হুগলী

Comments
Post a Comment