পয়লা বৈশাখের স্মৃতি
সুজিত চক্রবর্তী
আমার জন্ম হয়েছিল কলকাতায়। এরপর শৈশব, কৈশোর আর প্রথম যৌবনের দীর্ঘ সময়ও কেটেছে এই শহরেই। যতদূর মনে পড়ে, এখানে নববর্ষের অনুষ্ঠান বলতে ছিল মূলত বিভিন্ন দোকানের "হালখাতা" অনুষ্ঠান। বাবার কাছে শুনেছি এই অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্য ছিল আসলে বিগত বছরের ধারবাকি মিটিয়ে পুরনো হিসেবের খাতা বন্ধ করে নতুন বছরে নতুন খাতা চালু করা পরের দিন অর্থাৎ ২ রা বৈশাখ থেকে। আর এই দিন যা কিছু বেচাকেনা সবটাই নগদে করাটাই রীতি ছিল। দোকানের মালিক এই দিন খরিদ্দারের হাতে তুলে দিতেন তাঁর সামর্থ্য অনুযায়ী ছোট বড় মিষ্টির বাক্স । এই দোকানের তালিকায় মিষ্টির দোকান থেকে সোনার দোকানও থাকত মনে আছে। শেষ পর্যন্ত, সব দোকানের সাথে যে ধারের খাতায় জিনিষ নেওয়া হতো তেমন নয়, এটাই ছিল দস্তুর।
এছাড়া সন্ধ্যার দিকে কোথাও কোথাও আলো দিয়ে সাজানো হতো, হয়ত সঙ্গে একটা মাইক লাগিয়ে হিন্দি সিনেমার গান শোনানোর ব্যবস্থা করা হতো, যা বাংলা নববর্ষের সাথে মোটেই সম্পর্কযুক্ত ছিল না। আর বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সন্ধ্যার দিকে কালবৈশাখীর ঝড় বৃষ্টি শুরু হতো।
এরপর কেন্দ্রীয় সরকারের চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর এক সময় বদলি হয়ে আসলাম উত্তরবঙ্গে তিস্তার পারে দাঁড়িয়ে থাকা ঐতিহ্যের শহর জলপাইগুড়িতে। এই শহর বা জেলা পূর্ববঙ্গের (আজকের বাংলাদেশ) গা ঘেঁষে অবস্থিত এবং এখানকার ভাষাতেও সম্পূর্ণরূপে পূর্ববঙ্গের ছাপ। এখানেই আবিষ্কার করেছিলাম বাংলা নববর্ষের প্রকৃত মাহাত্ম্য। তাহলে, সেকথা খুলেই বলি।
একটা কথা এখানে বলে নেওয়া প্রয়োজন, যেহেতু ছোটবেলা থেকেই সাহিত্যের প্রতি টান ছিল সেকারণে জলপাইগুড়িতে আসার পরে এখানকার বেশ কিছু সাহিত্য প্রেমী মানুষ ও কয়েকটি সাহিত্য গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ হতে আমার খুব বেশি সময় লাগে নি। সেই সূত্র ধরেই ডাক এসে যেত নববর্ষের দিনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যাওয়ার জন্যে। শুধুমাত্র যাওয়া নয়, আমন্ত্রণ জানানো হতো সেইসব অনুষ্ঠানে স্বরচিত কবিতা বা ছড়া পাঠেরও। ঐদিন দুপুর একটা কি দুটো পর্যন্ত সে একেবারে ঠাসা প্রোগ্রাম যাকে বলে, যার শুরু হতো ভোরবেলা ছড়ার আসর থেকে আর শেষ হতো দুপুরে আদর্শ ব্যায়ামাগরের অনুষ্ঠানে। এই ব্যায়ামাগারের অনুষ্ঠানে প্রতি বছর প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকতেন ভারতবর্ষ থেকে দ্বিতীয় বিশ্বশ্রী শিরোপা পাওয়া বিখ্যাত মনোহর আইচ।
সেদিনটা সত্যিই আমরা নিশ্বাস ফেলার সময় পেতাম না। এরপর বিকেল বেলা থেকে আর কোনও অনুষ্ঠান রাখা হতো না, বলা হতো এই সময়ে যে যার নিজের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ইচ্ছামত সময় কাটাবে বা নববর্ষ উদযাপন করবে।
জলপাইগুড়িতে এই নববর্ষের দিনই যেন মনে হতো সবচাইতে বড় উৎসব। আর একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আবিষ্কার করেছিলাম, অন্যান্য উৎসবের থেকে নববর্ষ উদযাপন উৎসবের একটা বড় পার্থক্য এই যে একে ধর্ম নিরপেক্ষ উৎসব বলা যায় এবং এটা এপার ওপার দুই বাংলার প্রধান উৎসবের মর্যাদা পেতেই পারে।
আরও পরে বদলি হয়ে এলাম মহারাষ্ট্রে, আরব সাগরের পারে মুম্বই মহানগরীতে। আর এখানেই কেটে গেল পরের ২৫ বছর। তাই এখানকার কথাও স্মৃতির পাতায় উঁকি দিয়ে যাবে বৈকি। প্রথমেই বলি, এখানকার অধিবাসীদের কাছে পয়লা বৈশাখের যে কোনও গুরুত্ব থাকবে না, সে তো বলাই বাহুল্য। প্রসঙ্গত জানাই, মহারাষ্ট্র এবং গোয়াতে (কোঁকন অঞ্চল) নববর্ষ পালন করা হয় চৈত্র মাসের শুক্লা প্রতিপদ তিথিতে আর অনুষ্ঠানের নাম 'গুডি পাড্ওয়া'। তবে, এটা হিন্দুদের উৎসব হিসেবেই পালিত হয়।
প্রশ্ন উঠতেই পারে, তবে কি মুম্বইয়ে পয়লা বৈশাখের অনুষ্ঠান একেবারেই হয় না? উত্তরে বলি, অবশ্যই হয়। যদিও প্রবাসী বাঙালিদের বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির জ্ঞান নিয়ে অনেক কৌতুহল বা কৌতুক শোনা যায়, তবে নিজস্ব অভিজ্ঞতার আলোয় দেখেছি বয়স্ক বাঙালিদের মধ্যে শেকড়ের টান পশ্চিমবঙ্গে বসবাস করা বাঙালিদের চেয়ে বেশি বই কম নয়। নবীন প্রজন্মের তরুণ যারা তেমন ভাবে বাংলা সংস্কৃতির সাথে পরিচিত নয়, তাদের কাছ থেকে এতটা শেকড়ের টান আশা করার পেছনে বিশেষ যুক্তি আছে বলে আমার মনে হয় না। যদিও ১লা বৈশাখকে 'একলা বৈশাখ' পড়া বা বাংলা নববর্ষ কবে হয়, এই প্রশ্নের জবাবে '১৪ই অথবা ১৫ই এপ্রিল' শোনা যেতেই পারে। কিন্তু আমার মনে হয় এমন জবাব কলকাতার অভিজাত পরিবারের ইংরেজি মাধ্যমে পাঠরত তরুণ তরুণীদের থেকেও শোনা যেতে পারে।
এবার বলি আরব সাগরের তীরে এই শহরে পয়লা বৈশাখের অনুষ্ঠান কোথায় হয় ও কেমন হয় সেই সব কথা। এখানে বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে আছে বেঙ্গলী ক্লাব বা অ্যাসোসিয়েশন। তাদের থাকে একটা কালী মন্দির এবং আনুষঙ্গিক আয়োজন। এইসব জায়গাতে মঞ্চস্থ করা হয় বাংলা নববর্ষের সান্ধ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এবং, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বেশ ঘটা করেই করা হয়। এর মধ্যে রবীন্দ্রসংগীত থেকে শুরু করে আধুনিক বাংলা কবিতার নৃত্য ও সঙ্গীতের মাধ্যমে পরিবেশিত মনোগ্রাহী অনুষ্ঠানও থাকে। লক্ষ্য করেছি, প্রায় রাত দশটা পর্যন্ত দর্শক আসনগুলোতে মানুষের ভীড় থাকে। যদিও এই অনুষ্ঠান সর্বদা পয়লা বৈশাখের দিন হয় না, হয় পরের শনি কিম্বা রবিবার।
আরও অনেক কিছু আছে। অনেক বেঙ্গলী অ্যাসোসিয়েশন থেকে এই দিনেই প্রকাশিত হয় তাদের বাংলা পত্রিকার নববর্ষ সংখ্যা। এছাড়াও থাকে বিভিন্ন স্টল বা বিপনী যেখানে মূলত বাংলার জিনিষ বা খাবার পাওয়া যায়। এদের মধ্যে অবশ্য উপছে পড়া ভীড় দেখেছি খাবারের স্টলে, যেখানে সবচাইতে বেশি বিক্রি হয় ফিস্ ফ্রাই, ফিস্ ফিঙ্গার, মোচার চপ, ডিমের ডেভিল, বিভিন্ন ধরনের রোল্ ইত্যাদির। এগুলো প্রতিদিন পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। থাকে বাঙালি মিষ্টির দোকানও। এদেরই কেউ থাকে অনুষ্ঠানের স্পন্সর।
না, এখানেই শেষ নয়। এরপর আছে উপস্থিত প্রত্যেকের জন্যে বাঙালি খাবার ও মিষ্টির বাক্স, যা ক্লাবের সদস্য না হলেও পাওয়া যায়, মাথা পিছু একটা করে। সঙ্গে বাংলা ক্যালেন্ডার। এরপর গান আর কবিতার রেশ নিয়ে ফুরফুরে মনে আমরা বাড়ি ফেরার পথে যাত্রা করে থাকি।
এই হলো মোটামুটি আমার স্মৃতিচারণে নববর্ষ উদযাপনের কাহিনী। পড়ে আপনাদের কেমন লাগল জানালে বিশেষ আনন্দ পাবো, একথা বলে আমার লেখা এখানেই শেষ করলাম।
-------------------
SUJIT CHAKRABORTY
NEW PANVEL (E)
NAVI MUMBAI.
PIN 410 206.
MAHARASHTRA
NEW PANVEL (E)
NAVI MUMBAI.
PIN 410 206.
MAHARASHTRA

Comments
Post a Comment