পহেলা বৈশাখ : অদ্বিতীয় বাঙালির সর্বজনীন উৎসব
অলোক আচার্য
পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ একটি উৎসব, সর্বজনীন এবং সত্যিকার অর্থেই এর দ্বিতীয়টি নেই। কেবল একটি মাস হিসেবেই নয়, বরং জাতি হিসেবে সামগ্রিকভাবে বাংলা বছরের প্রথম দিন বরণ করে নেওয়ার আগ্রহ, উদ্দীপনা এবং ঐতিহ্য—সব মিলিয়েই এটি আমাদের আনন্দের প্রধান উৎস। প্রতিটি জাতির নিজস্ব কিছু প্রচলিত অনুষ্ঠান থাকে, বৈচিত্র্যময়তা থাকে, ধারক থাকে যা দেখলে সেই জাতির ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, কৃষ্টি, প্রথা ফুটে ওঠে। প্রতিটি জাতির নিজস্ব কিছু পোশাক থাকে, গান থাকে, আচার-আচরণ থাকে। সেই জাতি সেই পোশাকে, আচরণে পরিচিত হয়ে ওঠে। যদি পশ্চিমা দেশগুলোর দিকে তাকাই দেখা যায়, এখন আধুনিকতা থাকলেও সেখানেও কিছু নির্দিষ্ট দিনে তারা তাদের প্রথা পালন করে। চীন ও জাপানেও তাদের নিজস্ব পোশাক, আচরণ ধরে রেখেছে। এমনকি তাদের সমৃদ্ধ নৃত্য ও গানও তারা পালন করেন। যদি বাংলাদেশের উপজাতিদের দেখি তাহলেও তাঁরা নিজস্ব অনুষ্ঠানগুলো খুব আনন্দের সাথেই পালন করে। বাঙালির নিজস্ব অনুষ্ঠান বলতে প্রথমেই আসে পহেলা বৈশাখের কথা। এটি বাঙালির একেবারেই নিজস্ব সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। বাঙালির চিন্তা-চেতনায় যে বাঙালিত্ববোধ রয়েছে সেই বোধের উন্মেষ ঘটায় পহেলা বৈশাখ। যদিও এই পহেলা বৈশাখ যে বাঙালির নয় এবং পশ্চিমবঙ্গের দাদাদের সংস্কৃতি এই ধোঁয়া তুলেও কেউ কেউ পহেলা বৈশাখকে কলুষিত করার চেষ্টা করে! এটা দুঃখজনক এবং আমাদের ঐতিহ্যের উপর আঘাত। তবুও সবাইকে নিয়েই বৈশাখ উদযাপন। চৈত্রের তীব্র খরতাপ পেরিয়ে আসে বৈশাখ। বৈশাখ বাঙালির কাছে শুধু একটি মাস নয়, একটি আবেগ। আমাদের দেশেও যখন ভিনদেশী সংস্কৃতির জোয়ারে ভেসে যাচ্ছে তখন পহেলা বৈশাখ তার বাইরে আমাদের নিজস্ব চেতনাবোধের জাগ্রত করে। এটি কেবল একটি অনুষ্ঠান নয় বরং আমাদের অস্তিত্ত্বর সাথে সম্পৃক্ত একটি দিন। বৈশাখকে বরণ করে নিতে বাঙালির থাকে অধীর আগ্রহ, অপেক্ষা। থাকে নানা আয়োজন।
প্রথম দিন থেকেই গ্রীষ্মের সেই রূপ বরণ করে নিতে প্রস্তুতি নিই আমরা। বৈশাখের প্রথম প্রহর থেকেই রমনার বটমূলে ছায়ানটের গানের অনুষ্ঠান থাকে। সূর্য ওঠার সাথে সাথেই নতনু বছরের মঙ্গল কামনায় বটমূল প্রাঙ্গণ মুখরিত হয়ে ওঠে। সবার কন্ঠে একসাথে বেজে ওঠে- ’এসো হে বৈশাখ, এসো এসো।’ চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে বিভিন্ন মুখোশ ও মূর্তি বানিয়ে রাস্তায় শোভাযাত্রা বের করা হয়। এখন দেশের অনেক স্থানে এ ধরনের বর্ণাঢ্য র্যালি বের করে ছাত্রছাত্রীরা। এই শোভাযাত্রার নাম মঙ্গল শোভাযাত্রা। কারণ এই শোভাযাত্রা থেকে বাঙালির ভেতরের সকল অন্ধকার, ভেদাভেদ,বিদ্বেষ ও অপসংস্কৃতির দূর হওয়ার আহ্বান জানানো হয়। শোভাযাত্রায় সকল অমঙ্গল দূর করে বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতিকে তুলে ধরে। বাঙালি তখন এক পরিপূর্ণ বাঙালি হয়ে হৃদয়ে এক সুর ধারণ করে। এই শোভাযাত্রাকে ইউনেস্কো বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয় ২০১৬ সালে। বাঙালির উৎসবের প্রধান উৎস হলো নতুন বছরের প্রথম সূর্য কিরণ বা পহেলা বৈশাখ। চৈত্রের তাপদাহের সাথে বসন্তের বিদায় এবং কালবৈশাখীর ঝড়ো বাতাসে শীতল পরশে নতুন বছরকে বরণ করতে বাঙালির থাকে নানা আয়োজন। বাঙালির জীবনে পহেলা বৈশাখ বা বাংলা বছরের প্রথম দিন আনন্দময় উৎসবগুলোর মধ্যে অন্যতম। কালবৈশাখীর কালো মেঘের মাঝেও মিশে থাকে আনন্দ, মিশে থাকে উদ্দীপনা। প্রতি বছর তো সেভাবেই পহেলা বৈশাখকে বরণ করে নেই। ধর্ম,বর্ণ নির্বিশেষে সকলেই সামিল হয় এই উৎসবে। পহেলা বৈশাখ একটি ঐতিহ্য এবং একটি সুস্থ সাংস্কৃতিক ধারা।
হিন্দু সৌর পঞ্জিকা অনুসারে বাংলা বার মাস অনেককাল আগে থেকেই পালিত হতো। এই সৌর পঞ্জিকার শুরু হতো এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময় হতে। সেসময় অবশ্য এখনকার মত নতুন বছরকে বরণ করে নেওয়ার জন্য নববর্ষ পালন করা হয় তেমন ছিল না। তখন বরং কৃষির সাথে সম্পর্ক থাকায় ফসল ওঠার সাথে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ছিল। অর্থাৎ কৃষি ও কৃষক সংশ্লিষ্ট ছিল বাংলা নববর্ষ। সম্রাট আকবরের সময়কাল থেকেই পহেলা বৈশাখ পালন কর শুরু হয়। মূলত খাজনা আদায় ও শুল্ক পরিশোধে চৈত্র মাসের শেষ দিনে প্রজাদের বাধ্যবাধকতা থাকতো। সম্রাট আকবরের আদেশে সৌর সন ও হিজরি সন এর উপর ভিত্তি করে বাংলা সনের নিয়ম তৈরি করেন। ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দের ১০ই মার্চ বা ১১ই মার্চ থেকে বাংলা সন গণনা শুরু হয়। তবে এই গণনা পদ্ধতি কার্যকর হয় আকবরের সিংহাসন আরোহনের সময় (৫ নভেম্বর, ১৫৫৬) সাল থেকে। বৈশাখের প্রথম দিনে মিষ্টি মুখ করানোর মাধ্যমে নিজ অঞ্চলের অধিবাসীদের মিষ্টি মুখ করাতো। খাজনা আদায়ও চলতো চৈত্র মাসের শেষ দিনে। এ দিনে বিভিন্ন গোষ্ঠি নানা রকম অনুষ্ঠানের আয়োজন করতো। প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলি সন। পরে বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষ নামে পরিচিত হয়। সে সময় থেকে আজ পর্যন্ত বিভিন্ন ভাবে এর গুরুত্ব বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমান সময়ে এসে উপনীত হয়েছে। অর্থাৎ সেদিনকার পহেলা বৈশাখ আজ এক নতুন ধারায় প্রবেশ ঘটেছে। আরও বেশি সাংস্কৃতিক জাগরণ ঘটেছে। একটি দিন পরিবর্তিত হতে, সাংস্কৃতিক জাগরণের কেন্দ্রবিন্দু হতে সময়ের প্রয়োজন। মানুষের হাত থেকে হাতে, মুখ থেকে মুখে ছড়িয়ে পরতে একটি উন্মাদনা প্রয়োজন। যেভাবে আমরা ইংরেজি সংস্কৃতির প্রতি প্রলুদ্ধ হচ্ছিলাম, যেভাবে নিউ ইয়ারকে সম্ভাষণ জানানোর প্রবণতা তৈরি হচ্ছিল তাতে বাঙালির নিজস্ব পরিচয় প্রশ্নের মুখে পরতেই পারে। যেভাবে আমরা ইংরেজি সংস্কৃতির প্রতি ঝুঁকতে শুরু করেছিলাম আজ তার চেয়েও দ্রুত গতিতে নতুন বছরকে অর্থাৎ বাংলা বছরকে আপন করতে শিখেছি। মানুষ আরও আপন করতে শিখেছে। বিশ্বায়নের এই যুগে খুব দ্রুত এই সাংস্কৃতিক অগ্রযাত্রা ছড়িয়ে পরছে। আজ পহেলা বৈশাখ সকলের। সব শ্রেণিপেশার মানুষের, সব বয়সের। সার্বজনীন আনন্দের-অংশগ্রহণের পহেলা বৈশাখ হয়ে উঠতে অনেক সময় পেরিয়ে গেলেও বাঙালি আজ তা পালন করতে শিখেছে। সব পিছুটান থেকে মুক্ত হতে পেরেছে। আজ পহেলা বৈশাখ মানে বাঙালির জীবনে এক উৎসবের দিন। সেই জমিদার নেই, সেই খাজনা আদায়ও নেই। আছে কেবল উৎসব। আর থেকে গেছে প্রথম দিনে মিষ্টি খাওয়ার প্রথা। আর যোগ হয়েছে নিজ ঐতিহ্যকে ধারণ করতে পান্তা-ইলিশ খাওয়ার প্রবণতা।
সারা বাংলা মঙ্গল আলোয় আলোকিত হয়ে উঠুক। উৎসব আরও আছে কিš' পহেলা বৈশাখের মত এমন সার্বজনীন উৎসব আর কয়টি আছে। যেখানে বাঙালির প্রাণই মূল কথা। জাতিভেদ, বর্ণভেদ যেখানে মাথা তুলে দাড়ায় না। যেখানে আমার বলে শব্দ নেই। যেখানে আমরা সবাই বলতে হয়। প্রাণ থেকে প্রাণে আনন্দ ছড়িয়ে দিতে হয়। বাংলা নববর্ষ তাই আমাদের উদার হতে শেখায়। নতুন বছর আমাদের ভালো কাটবে এই আশা নিয়েই আনন্দ নিয়ে বের হই। চারদিকে নতুন করে তাকিয়ে দেখি। জীর্ণতাকে দূরে সরিয়ে রেকে, তারুণ্যকে বরণ করে নেই। পহেলা বৈশাখ হলো প্রকৃতিতে গ্রীষ্মের শুরু। প্রকৃতির রুপের এই পরিবর্তন শুরু হয় চৈত্রেই। বাংলা সাহিত্যে বৈশাখের তুমুল প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। বিশেষত বৈশাখের একটি ভিন্ন রুপ অর্থাৎ কালবৈশাখী যা আসলে একদিকে যেমন প্রলয়ংকরী এবং অন্যদিকে সকল অশুভ শক্তি বিনাশক হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে। আবার এই মাস দিয়েই বাংলাদেশে মধুমাস শুরু হয়েছে। যেখানে বাজারে মৌসুমি ফলের প্রাচুর্য থাকে। শহরাঞ্চলের পহেলা বৈশাখের সাথে গ্রামে-গঞ্জের পহেলা বৈশাখ পালনে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। পহেলা বৈশাখে গ্রামীণ মেলা, লাঠিখেলা, যাত্রাপালার আয়োজন করা হয়। গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী খাবার নাড়ু মোয়া,লাড্ডু, ঝুড়ি, বাঁশি, পুতুল, চরকা প্রভৃতি মেলার প্রধান আকর্ষণ থাকে। এই ভিন্নতা আমাদের সাহিত্যকেও প্রভাবিত করেছে। গ্রাম এবং শহরভিত্তিক কাঠামোতে বিভক্ত করেছে। সাহিত্যে দুটি ধারা তৈরি হয়েছে। একদিকে গ্রামীণ জীবন, উৎসব, সহজ-সাধারণ জীবন যাপন এবং অন্যদিকে শহরের ঘিঞ্জি,গাড়ির হর্ণ এবং এর মধ্যেই জীবনকে নতুনভাবে শুরু করার প্রবল ইচ্ছা বছরের প্রথম দিনেই যে প্রত্যয় নিয়ে শুরু হয়। দুভাবেই জীবন এগিয়ে চলে। সংস্কৃতিতে ভিন্নতা আসে। কবি-সাহিত্যিকের লেখনীতে ফুটে ওঠে সেইসব বৈশাখী ছবি। ছয় ঋতু আর বারো মাসের দেশ বাংলাদেশ। এর মধ্যে প্রতিটি ঋতু ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্য ধারণ করে। অন্য সব মাসের মধ্যে বৈশাখ তাই অনন্য বৈশিষ্ট্য ধারণ করে। বাঙালির নিজস্ব চেতনাবোধের উন্মেষ ঘটায়।
..............................
অলোক আচার্য
শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক
বাংলাদেশ

Comments
Post a Comment