নববর্ষের রাজপুত্র
রঞ্জন কুমার বণিক
প্রতিবার বাংলা নববর্ষ ধূমধাম পালন করেন বনেদী বাড়ির কর্তা প্রতীক রায়চৌধুরী। আত্মীয় স্বজন মহলে তিনি অবিসংবাদিত কর্তা। সবার মুখে একটাই কথা ঈশ্বর নাকি যাকে ধন দেন তাকে মনও দেন তার সাক্ষাৎ উদাহরণ কর্তাবাবু। শুধু আত্মীয় স্বজন কেন পাড়া প্রতিবেশীদের ডাকে কালবিলম্ব করেন না। সদালাপী এবং অমায়িক ব্যবহারে সহজেই সবার মন জয় করে নিতে পারেন। ঘটকালি, বাদ বিসম্বাদ, আপদ বিপদ সবকিছুতেই তিনি সর্বময় রক্ষাকর্তাও বটে। যে কোনো ঘটনার সহজ সমাধান করে দিতে পারেন কর্তাবাবু। এহেন পরোপকারী সর্বরোগের ওষুধ বাতলে দেওয়া ব্যক্তির নিজের ঘরে একটি অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটে যায়। ঘটনাটি তিনি কিছুতেই মন থেকে মুছে ফেলতে পারছেন না। তিনবছর যাবৎ অযাচিতভাবে মনে আঘাত হানছে বারবার। ইদানিং লোকজন এড়িয়ে চলেন এবং কেমন যেন ভেতর থেকে গুম মেরে যাওয়া ব্যক্তি বনে গেছেন। না গেলে না হয় এমন লোকেদের ডাকে সাড়া দিচ্ছেন। লোকেদের সাথে সতর্কভাবে কথা বলেন এবং সদালাপী থেকে মিতভাষীতে পরিবর্তিত হয়েছেন। এতে লোকের কৌতুহল বাড়ে বৈকি।
সেদিন প্রতিবেশী কমলেশ বাবু গিন্নি সুতপাকে বলে ফেলেন- কী হল? কর্তাবাবু দেখি আমাদের দেখেও না দেখার ভান করছেন! শারীরিক অসুস্থতা নাকি? মনটন এত খারাপ যে!
-আরে না না। ছোট মেয়ে রাইমার জন্য এমন হয়েছে। প্রাণপ্রিয় মেয়ে চলে যাবার পর সম্ভবত একলা হয়ে গেছেন।
সুতপা এভাবেই কৌতুহল দূর করার যথাসাধ্য চেষ্টা করেন সতর্কভাবে। এমনিতে লোকের কত প্রশ্ন! মনটা বিষাদে ভরে যায় যখন দেখেন যারা কাছের লোক, যাদের এতদিন কর্তাবাবু নিজের মনে করে আপদ বিপদে হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন তারা এখন কেমন যেন দূর থেকে বলাবলি করছেন কর্তাবাবু সম্বন্ধে। লোকটা নাকি মানসিক সমস্যায় আছেন। এরকম প্রতিক্রিয়া দেখে সুতপা কর্তাবাবুকে কতবার বুঝিয়েছে লোকের সাথে পূর্বের ন্যায় সহজভাবে মিশতে। যা হবার হয়ে গিয়েছে কিন্তু যা হবার নয় তাকে হতে দেওয়া কেন? এসব কাকস্য পরিবেদনা।
রিদ্ধিমা ও রাইমা প্রতীক বাবুর দুই মেয়ে। জেন জী প্রজন্মের আজকালকার মেয়ে। রিদ্ধিমা যেমন সহজ সরল ঠিক বিপরীত তার ছোট বোন। দুজনেরই দুধে আলতা মেশানো গায়ের রং। বাপের মুখমণ্ডলের ন্যায় মুখের গঠন। বড় মেয়ে মুখ এবং মুখমণ্ডল দুটিই বাপের পেয়েছে। রাইমা পেয়েছে শুধু মুখমণ্ডল। ঠোঁটকাটা স্বভাব। সটান সটান জবাব দেয়। ভেবে চিন্তে কথা বলা ধাতেই নেই। লোকে বলে বাপ মুখো মেয়েরা নাকি সুখী হয় বেশি। কর্তাবাবু অবশ্য এগুলি বিশ্বাস করেন না। আসলে সুতপাকে খুশি করতে লোকে এসব মুখরোচক গল্প ফাঁদে। সুতপার মনটা আনন্দে ভরে যায়। সুতপাকে বোঝায় মেয়েরা এখন যুদ্ধক্ষেত্রে যায়, আকাশ থেকে শত্রুপক্ষে বোমা বর্ষন করে সফলতার সহিত ফিরে আসছে। মেয়েরা এখন মহাকাশে যায়, দেশ চালায় আরও কত কী। কথাগুলি একটিও মিথ্যে নয় সুতপা বোঝে। মোবাইলের যুগে এগুলি অজানা থাকার কথাও নয়। প্রতিবেশীরা আগ বাড়িয়ে এসব কথা বলে সুতপাকে খুশি করার আড়ালে অন্য উদ্দেশ্য আছে সেটা মুখে না বললেও সুতপা অনুভব করতে পারে। যেখানে কর্তাবাবু নিজেকে সমাজসেবী হিসেবে তোলে ধরার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন সেখানে সুবিধাবাদী গোছের দুই একজন তৈরী হলে আশ্চর্য হবার কী আছে? এইতো কমলেশ বাবুর ঘটনাটি এখনও বারে বারে মনে উঁকি দেয়।
-কর্তাবাবু গো, আমার সর্বনাশ হয়েছে। তাড়াতাড়ি বাসায় আসুন।
রাত দশটায় ফোন পেয়ে প্রতীক বাবু হতচকিত হয়ে পড়েন। আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে আর মেঘ স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে অনবরত তর্জন গর্জন করে এখনই যেন আছড়ে পরবে। কী করবেন না করবেন ভেবে পাচ্ছেন না।
-কীরে? কী হল এত রাতে?
-কর্তাবাবু, না আসলে ফোনে বিস্তারিত বলতে পারবো না। বিপদে পড়েছি বলেই তো ঝড় বৃষ্টিতে ডাকতে হল।
একমুহূর্ত কাল বিলম্ব না করে প্রতীক বাবু গাড়ি নিয়ে বেড়িয়ে যান। কমলেশের স্ত্রী কান্নায় ভেঙে পড়েছে। কোনো কথাটেই শান্ত হচ্ছে না।
-কর্তাবাবু, আমার রিতীমা প্রাইভেট টিউশন থেকে এখনও বাড়ি ফিরে আসেনি। ওর সহপাঠী বান্ধবীদের জিজ্ঞেস করায় বলেছে সুমিতের সাথে মাল্টিপ্লেক্সে গিয়েছে। শো আটটায় শেষ। কিন্তু এখনও মোবাইল সুইচ অফ।
প্রতীক বাবু এতক্ষণে বুঝতে পারলেন কী ঘটেছে সপ্তদশী মেয়ে রিতীমার সঙ্গে।
-একটাই মেয়ে, তোরা নজরে রাখতে পারলি না। সুমিতের বাড়িতে খবর নিয়েছিস।
-ওরা বাড়িতে যায়নি। সুমিতের বাবাও বোঝে উঠে পারছেন না ছেলে এমন কাণ্ড কেন ঘটিয়েছে। বারবার অনুরোধ করেছে পুলিশে না জানানোর। নিজেদের মধ্যে মিটমাট করে নিতে বলেছে।
প্রতীক বাবুর কথাটি ভালো লাগেনি। লোকটি আগেই বলছে পুলিশে না জানানোর। কিসের মিটমাট? অপরিণত বয়সে প্রণয় আজকাল ফ্যশনে পরিণত হয়েছে। দায়িত্ববোধ জন্মানোর আগেই প্রেম শুধু বাহ্যিক চেহারার আকর্ষনে আর যৌনলিপ্সার কারণে ঘটে। সামাজিক মাধ্যমের যথেচ্ছাচার আর নিম্নরুচির রীল যুব প্রজন্মকে ধ্বংস করে ফেলেছে বলার অপেক্ষা রাখে না। তাই বলে অবিভাবকদের হাত তোলে দিয়ে বসে থাকলে চলে? মেয়েটিকে উদ্ধার না করলে সর্বনাশ হয়ে যাবে। সারা জীবন কলঙ্কের দাগ বয়ে বেড়াতে হবে। এক্ষুনি কিছু না কিছু করতেই হবে।
-চল্, থানায় যাই। ওসির সাহায্য় ছাড়া খোঁজে পাওয়া অসম্ভব।
ঝড় বৃষ্টি উপেক্ষা করে কমলেশ বাবু আর প্রতীক বাবু থানায় পৌছয়। সেদিন রাতে মোবাইল লোকেশন ট্রেক করে ওসি সাহেব সুমিত আর রিতীমাকে মাল্টিপ্লেক্সের নিচে গ্যারেজ থেকে উদ্ধার করে দিয়েছিল। প্রতীক বাবুর বিচক্ষণতায় ব্যাপারটি পাঁচকান হয়নি। তবে ওসি সাহেবের এসব ব্যাপারে অভিজ্ঞতা দারুন। সুমিতকে এমন মগজ ধোলাই দেয় যাতে বাপের জন্মেও কোনো মেয়ের দিকে কুনজর দিতে সাহস না করে।
সুতপা একটা দীর্ঘ হাই তোলে। সময় বড় বিচিত্র। অনেককিছু কেড়ে নেয়। মানুষ ততোধিক বিচিত্র। সময়ের সাথে সাথে কেমন পাল্টে যায়! রিতীমার ঘটনার সাক্ষী প্রতীক বাবু আজও বাইরের কাউকে কিছু বলেননি। বরং ঘটকালি করে নিজে রিতীমাকে সুপাত্রস্থ করেছেন। অথচ সেই কমলেশ বাবু প্রতীক বাবু সম্বন্ধে পেছন থেকে বলছেন লোকটার নাকি মানসিক সমস্যা।
প্রতীক বাবুর ইদানিং বড় একা একা দিন কাটে। কোনো কিছুতেই মনসংযোগ করতে পারছেন না। অল্পতেই রেগে যাচ্ছেন। বাতের ব্যথাটাও মাথাচারা দিয়ে উঠেছে। সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবারও মহা ধূমধাম করে গজপতির পুজো করবেন। কেন জানি রাইমার কথা বার বার মনে আসছে। অভিমান করে একদিন নিজের প্রাণ অপেক্ষা প্রিয় ছোট মেয়েকে বলে দিয়েছিলেন - তুমি আমার মরা মুখটাও দেখতে আসবে না কিন্তু বলে দিলাম। আজ থেকে আমি তোমার বাপ নই।
প্রতীক বাবুর চোখটা ভিজে উঠে। পিতৃত্ব বড়ই কঠিন। কে যেন হৃদয়ে হাতুরি পেটাচ্ছে ক্রমাগত। মেয়েদের নামকরন নিজেই করেছেন। উভয়ের নামের পশ্চাতে মা জুড়ে দিয়েছেন। বাবাকে দেখেছেন বোনেদের মা বলে ডাকতে। বাবা ভাই না বোনকে বেশি ভালোবাসে জিজ্ঞেস করায় সোজাসুজিই উত্তর দিয়েছিলেন অবশ্যই বোনেদের। কারণ? বাবা বলেছিলেন কারণ কেবল তুমি একজন মেয়ের পিতা হলেই বোঝতে পারবে। আজ প্রতীক বাবুর পিতার বলে যাওয়া কথা মনে আসছে। মা ডাক এক মায়াময়ী ডাক। গর্ভধারিনীকে মা ডাক হোক আর আত্মজ কন্যাকে মা ডাক হোক দুটিতেই আশ্চর্যজনক মিল আছে কারণ দুটি ডাকই হৃদয়ের সঙ্গে সংপৃক্ত। মেয়ের পছন্দ নিজের পছন্দ নয় বলে অভিমান করে তাজ্য করাটা কতটুকু যুক্তিসঙ্গত মনে মনে ভাবেন। রাইমার কথাগুলি স্মৃতিচারণ করেন।
-বাবা, আমি যাকে পছন্দ করি তাকে আমি অনেকদিন থেকেই চিনি। তুমি একদম চিন্তা করো না। হতে পারে নবাগত হিসেবে পেশাগত দিক দিয়ে ততটা প্রতিষ্ঠিত নয় তবে সে যথেষ্ঠ উদ্যমী এবং সৎ। অচিরেই প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে।
সেদিন প্রতীক বাবু কথাগুলি ভালোভাবে নেননি। আত্মমর্যাদায় ঘাঁ দেয়।
সেদিন প্রতীক বাবু কথাগুলি ভালোভাবে নেননি। আত্মমর্যাদায় ঘাঁ দেয়।
-বেশ। তুমি প্রাপ্তবয়স্ক বলে পিতার উপর কথা বলছো। তুমি ভুলে যেও না আজকে যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছো তাতে তোমার প্রেমিকের থেকে আমাদের অবদান বেশি। পিতামাতার একটা নিজস্ব ইচ্ছা মনে মনে থাকতেও তো পারে। তুমি কোকিলের ন্যায় কাকের ঘরে বড় হওনি নিশ্চয়। বাবা মার ভালোবাসার কি দাম নেই?
-বাবা তুমি ভুল বুঝেছো।
-শাটআপ। আমার সাথে আর একটিও কথা নয়। এ সম্পর্কই যদি তোমার শেষ সিদ্ধান্ত হয় তাহলে..........
এটাই ছিল তখনকার মতো প্রতীক বাবুর শেষ কথা। রাইমা মাকে সব কথা খুলে বলে। মায়ের অনুমতি নিয়ে রাইমা অমিতের সাথে গাঁটছাড়া বাঁধে। চলে যায় সুদূর মুম্বাইতে। মা আর দিদির সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছে। জানতে চায় বাবার রাগ কমেছে কিনা। প্রতীক বাবু এ ঘটনা মন থেকে মেনে নিতে পারেননি। একেই বড় মেয়ের এখনও বিয়ে হয়নি তার উপর ছোট মেয়ে অনানুষ্ঠানিকভাবে ঘর ছেড়ে চলে গিয়েছে তা মন থেকে মেনে নেওয়া বড়ই কঠিন। মনে মনে ভাবেন পূর্ব জন্মের কর্মফল ভোগ করছেন। সেই ভাবনা থেকে প্রতীক বাবু আজও বেরিয়ে আসতে পারেননি। তাই নিজের ভিতর নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন।
নববর্ষে পয়লা বৈশাখে গজপতির আরাধনায় সব আত্মীয়কে কাপড় দেবেন মনস্থির করেছেন প্রতীক বাবু। কাপড় কেনার ভার দিয়েছেন গিন্নি সুতপার উপর। লাখ টাকার উপর কাপড় চোপড়ের স্তুপে প্রতীক বাবুর হঠাৎ দৃষ্টি আটকে গেল পাগড়ি সমেত জরির কাজ করা লাল পাঞ্জাবী সেটটির উপর। আয়নার সামনে সুতপা রিদ্ধিমা পাঞ্জাবীটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছে।
-বাবা, দেখো তো পাঞ্জাবীটা তোমার পছন্দ হয়েছে কিনা?
-বাঃ, এটা রাজপুত্রের পোষাক মনে হচ্ছে। কার জন্য কিনেছো মা?
-হ্যাঁ। ঠিকই বলেছো এটা রাজপুত্রের জন্য। বাবা তুমি কথা দাও রাজপুত্রকে তুমি বরণ করবে কারণ তুমি বলেছো এবার সিদ্ধিদাতার কাছে তোমার মানত আগত সব আত্মীয়কে তুমি কাপড় দিয়ে বরণ করবে।
প্রতীক বাবু বড় মেয়ের কথার কাছে হেরে গিয়ে হাসেন।
১লা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ। হালখাতায় স্বস্তিক চিহ্ন এবং হলুদ, লাল সিঁদুরের পাঁচ পাঁচটি করে টীকা দিচ্ছেন পুরোহিত। প্রতীক বাবু নতূন কাপড়ে শুদ্ধচিত্তে একদৃষ্টে গনপতির দিকে তাকিয়ে আছেন। নিমন্ত্রিত আত্মীয় পরিজনেরা গতকাল এসে গিয়েছেন। এখন শুধু পরিচিত পাড়া প্রতিবেশীরা আসছেন একে একে। হঠাৎ সুতপার গেটের সামনে উলুধ্বনি শুনে সম্বিৎ ফেরে। তাকিয়ে দেখেন এক পরিচিত সৌম্য দর্শন যুবক রাইমার সঙ্গে বাড়িতে প্রবেশ করছে। এসেই টুক করে প্রণাম সেরে নিয়েছে। বাবার হা করা মুখের দিকে তাকিয়ে রিদ্ধিমা বলে উঠে- চিনতে পারোনি বোধহয়। উনি হচ্ছেন সেই রাজপুত্র।
......................
রঞ্জন কুমার বণিক
শিলচর-৬, আসাম

Comments
Post a Comment