মায়ের আশীর্বাদ
সৈকত প্রসাদ রায়
বাঁকুড়ার এক প্রত্যন্ত গ্রাম জগদল্লা , লাল মাটির বুক চিরে যে মেঠো পথটা চলে গেছে, তারই এক কোণে রজতদের খড়ের চালের ঘর। বাবা অন্যের জমিতে চাষবাস করেন, হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে যখন ঘরে ফেরেন, তাঁর কাশির শব্দে নিস্তব্ধ রাতটা কেঁপে ওঠে। মা সাধারণ গৃহবধূ, কিন্তু অসাধারণ ধৈর্য, সারাটা দিন ভাঙা সেলাই মেশিনে হাত চালিয়ে পাড়ার লোকেদের জামা , প্যান্ট , কাপড় সেলাই করে দু-পয়সা বাড়তি রোজগার করার চেষ্টা করেন। রজত তখন স্থানীয় কলেজে বাংলায় অনার্স পড়ছে। ক্লাসে সে বরাবরই মেধাবী, ফার্স্ট-সেকেন্ড হওয়াটা তার কাছে ছিল অভ্যেস। স্বপ্ন ছিল মাস্টারমশাই হবে। কিন্তু ভাগ্য অন্য কোনো চিত্রনাট্য লিখে রেখেছিল। হঠাৎ একদিন জমিতে কাজ করতে করতে রজতের বাবা অচৈতন্য হয়ে পড়ে গেলেন। ডাক্তার জানালেন, ফুসফুসে গভীর সংক্রমণ, দীর্ঘ বিশ্রাম আর দামি ওষুধের প্রয়োজন।
রজতের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। টিউশনি পড়িয়ে সে নিজের পড়াশোনার খরচ চালাত, কিন্তু এখন সংসারের অগ্নিকুণ্ড সামলানোর দায়িত্ব তার কাঁধে। কয়েক মাস টিউশনির টাকায় টানাটানি করে চলল, কিন্তু বাবার ওষুধের খরচ আর চাল-ডাল কেনার ভার সে বইতে পারছিল না। কোনোমতে দীর্ঘশ্বাসের সাথে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে রজত ঠিক করল, তাকে কলকাতায় যেতেই হবে। এই গ্রাম তাকে ভালোবাসা দিলেও অন্ন দিতে পারছে না। বুকভরা আশা আর সামান্য কিছু টিউশনির টাকা সম্বল করে রজত শিয়ালদহ স্টেশনে পা রাখল। হাতে একগোছা বায়োডাটা, কিন্তু কলকাতা শহরের চাকরির বাজার বড় কঠিন। কোনো বিশেষ 'স্কিল' বা কারিগরি দক্ষতা ছাড়া শুধু একটি আর্টস গ্র্যাজুয়েট ছেলেকে চাকরি দেওয়ার মতো দাতা এখানে বিরল। এক সপ্তাহ ধরে রজত এ-অফিস ও-অফিস ঘুরল। কেউ বলল "পরে দেখা করুন", কেউ মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিল। মেসের টাকা নেই, তাই রাত কাটে শিয়ালদহ স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে। ট্রেনের হুইসেল আর হকারদের চিৎকারের মাঝে রজতের চোখে ঘুম আসে না, পকেটের টাকাগুলোও জলের মতো শেষ হয়ে যাচ্ছে, একদিন মা ফোন করলেন - "হ্যাঁ রে খোকা, শরীর ভালো আছে? চাকরি পেলি কিছু?"
রজতের চোখের জল বাঁধ মানতে চায় না, স্টেশনের পিলারের আড়ালে মুখ লুকিয়ে সে গলায় জোর এনে বলল, "হ্যাঁ মা, খুব ভালো আছি, একটা বড় কোম্পানিতে কাজ পেয়েছি। খুব ভালো মাইনে, তুমি একদম চিন্তা করো না, সামনের মাসের প্রথমেই টাকা পাঠাব।" ফোনটা কেটেই রজত ডুকরে কেঁদে উঠল। মিথ্যা কথা বলার পাপবোধ আর পেটের খিদে - দুটোই তাকে কামড়ে ধরছে। অথচ সে জানে, এই মিথ্যাটুকু না বললে ওদিকে অসুস্থ বাবা আর মা আরো চিন্তায় না খেয়ে মরবে।
টাকা একদম শেষ হয়ে যাওয়ায় রজত বাধ্য হয়ে ভোরের সবজি বাজারে মুটের কাজ শুরু করল। বড় বড় বস্তা পিঠে বয়ে সে সামান্য কিছু রোজগার করতে লাগল। কিন্তু অভুক্ত শরীর এই কঠোর পরিশ্রম সহ্য করতে পারল না। দুদিন পরেই কোমরে অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে সে শুয়ে পড়ল স্টেশনের এক কোণে, বাধ্য হয়েই মুটের কাজ ছাড়তে হলো। অবশেষে খিদের জ্বালায় সে শিয়ালদহের কাছেই এক সস্তা রেস্টুরেন্টে সাফাইওয়ালার কাজে যোগ দিল। এঁটো থালা মাজা আর মেঝে পরিষ্কার করা - যে ছেলেটা কলেজে নজরকাড়া রেজাল্ট করত, তার কাছে এই কাজটা ছিল চরম অপমানের। কিন্তু মা-কে দেওয়া কথা রাখতে হবে। বিকেলে কাজ শেষ করে রজত যখন ক্লান্ত শরীরে কোনো গাছের নিচে বসে, তখন তার মনে হয় সে বেঁচে থেকেও মৃত।
রজত ছোটবেলা থেকেই মা সারদার একনিষ্ঠ ভক্ত। গ্রামের বাড়িতে মা সারদার একটা ছোট ছবি সে সবসময় পূজা করত। এখন সেই মা-ই তার একমাত্র সহায়। নিজের পুরনো মানিব্যাগটিতে মা সারদার একখানা ছোট্ট ছবি সে সযত্নে রেখে দিয়েছে। বিপদে-আপদে ওই ছবিটার দিকে তাকালেই সে যেন নতুন করে লড়াই করার শক্তি পায়।
আজ চৈত্র সংক্রান্তি, কাল পয়লা বৈশাখ। সারা কলকাতা উৎসবে মেতেছে, কিন্তু রজতের জীবনে কোনো উৎসব নেই। আজ বুধবার, তার ছুটির দিন। সকাল থেকে মাত্র দুটো বিস্কুট আর এক কাপ চা খেয়ে সে চারটে জায়গায় ইন্টারভিউ দিয়েছে। কিন্তু অভিজ্ঞতার অভাবে সব জায়গা থেকেই তাকে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।
হতাশা আর ক্লান্তিতে ভেঙে পড়া পা দুটো তাকে টেনে নিয়ে গেল দক্ষিণেশ্বরের দিকে। গঙ্গার ঘাট তখন লোকে লোকারণ্য। কাল ভোরের আলো ফোটার আগেই শুরু হবে নতুন বছরের হালখাতা, লক্ষ্মী-গণেশ পুজো। মা ভবতারিণীর মন্দিরে সাজো সাজো রব। রজত একপাশে ভিড় এড়িয়ে গঙ্গার পাড়ে গিয়ে বসল। সামনে দিগন্ত বিস্তৃত গঙ্গা, আর ওপারে দেখা যাচ্ছে বেলুড় মঠ।
রজত পকেট থেকে মানিব্যাগটা বের করল। সযত্নে বের করে আনল মা সারদার সেই ছোট্ট ছবিখানি। সেটা কপালে ঠেকিয়ে সে ডুকরে কেঁদে উঠল - "মা গো, আমি হেরে গেলাম। সবাই বলে তুমি নাকি বিপদে আগলে রাখো। তবে আমি কেন এভাবে সমস্ত কিছুতে হেরে যাচ্ছি মা ? বাবা-মা আমাকে অনেক আশা নিয়ে মানুষ করেছিল যাতে শেষ বয়সে আমি তাদের লাঠি হতে পারি। কিন্তু আমি আজ এক কুলঙ্গার সন্তান। তাদের মুখে দু-বেলা অন্ন তুলে দেওয়ার ক্ষমতাও আমার নেই। মা, আমি আর পারছি না... আমাকে নিজের কাছে টেনে নাও মা!"
দুই হাতের তালুতে মুখ ঢেকে রজত কাঁদতে লাগল। তার কান্নার শব্দ গঙ্গার ঢেউয়ের শব্দে মিশে যাচ্ছিল।
হঠাৎ এক ঝলক অদ্ভুত ঠান্ডা আর স্নিগ্ধ হাওয়া রজতের ওপর দিয়ে বয়ে গেল। তপ্ত দুপুরে এমন শীতল পরশ কোথা থেকে এলো? রজতের মনে হলো, কেউ যেন খুব পরম মমতায় তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। যেমনটা মা দিত ছোটবেলায়, চমকে চোখ খুলল রজত, সামনে তাকিয়ে সে হতভম্ব হয়ে গেল।
সে মা সারদার ছবিটা মানিব্যাগে ঢুকিয়ে রেখেছিল তার মন বলছে , কিন্তু দেখল মা সারদার ছবিটা তার কোলের ওপর রয়েছে। অবাক হয়ে সে ছবিটা হাতে নিল, মায়ের সেই চিরপরিচিত প্রসন্ন হাসি। রজতের মনে হলো মা যেন বলছেন— "আমি থাকতে তোর ভয় কী?"
ঠিক সেই মুহূর্তে রজতের ছেঁড়া পকেটে থাকা পুরনো ফোনটা বেজে উঠল, স্ক্রিনে অপরিচিত নম্বর। কাঁপাকাঁপা হাতে ফোনটা ধরল রজত।
— "হ্যালো, আপনি কি রজত সেন বলছেন?" ওপাশ থেকে এক গম্ভীর কিন্তু মার্জিত কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।
— "হ্যাঁ বলছি।"
— "আমি সঞ্জয় বোস বলছি, ডোসিপ্লেক্স এন্টারপ্রাইজের এইচআর। গত সপ্তাহে আপনি ইন্টারভিউ দিতে এসেছিলেন। তখন আপনার এক্সপেরিয়েন্স না থাকায় আপনাকে আমরা সিলেক্ট করতে পারিনি। কিন্তু আমাদের ম্যানেজমেন্ট আজ আপনার বায়োডাটা আর একাডেমিক রেকর্ড পুনরায় দেখে ঠিক করেছে, আপনার মতো মেধাবী ছেলেকে আমরা সুযোগ দেব। আপনাকে সাত দিনের একটা ট্রেনিং পিরিয়ডে রাখা হবে, তারপর সরাসরি সেলস ম্যানেজার হিসেবে নিয়োগ করা হবে। স্টার্টিং স্যালারি আঠারো হাজার টাকা, আপনি কি এখনও ইন্টারেস্টেড?"
রজতের কণ্ঠস্বর রুদ্ধ হয়ে এলো। আঠারো হাজার টাকা! এই টাকা দিয়ে বাবার চিকিৎসা হবে, মায়ের সেলাই মেশিনের চাকা আবার ঘুরবে। সে কোনোমতে অস্ফুট স্বরে বলল, "হ্যাঁ স্যার... আমি ইন্টারেস্টেড।"
— "খুব ভালো। আপনি আজই একবার চলে আসুন, আমরা বাই-হ্যান্ড আপনার জয়েনিং লেটারটা দিতে চাই। আগামীকাল নববর্ষের দিন থেকেই আপনার ট্রেনিং শুরু হবে, আসতে পারবেন তো?"
— "আসছি স্যার... আমি এখনই আসছি।"
ফোনটা রেখে রজত বেলুড় মঠের দিকে তাকিয়ে প্রণাম করল। তার দু-চোখ দিয়ে তখন শ্রাবণের ধারার মতো আনন্দাশ্রু ঝরছে। সে বুঝতে পারল, এটা কোনো সংযোগ নয়, এ হলো মা সারদার অলৌকিক আশীর্বাদ। তার কানের কাছে যেন বারবার প্রতিধ্বনিত হতে লাগল সেই অমৃতবাণী— "জানবে তোমার আর কেউ না থাকুক, একজন মা আছেন।"
সূর্য তখন পাটে নামছে, গঙ্গার বুকে প্রতিফলিত হচ্ছে সিঁদুরে আভা। রজত উঠে দাঁড়াল, আজ তার শরীরে কোনো ক্লান্তি নেই। কাল নববর্ষ, কাল থেকে শুরু হবে তার নতুন কর্মজীবন। দক্ষিণেশ্বরের ঘণ্টা ধ্বনি আর শঙ্খনাদের মাঝে রজত অনুভব করল, মা সারদা সর্বদাই তার মতো অবোধ সন্তানকে সযত্নে আগলে রেখেছেন।
--- --- ---
সৈকত প্রসাদ রায়
রানাঘাট, নদীয়া, পশ্চিমবঙ্গ।

Comments
Post a Comment