মনোকষ্টে বাবলা
দীপক পাল
পয়লা বৈশাখে হালখাতা করতে গিয়ে যা বেহাল অবস্থায় পরেছিল তিন মক্কেল তারপরে বাড়ীতে মা বাবার যা বকুনি জুটেছে তা আর বলার নয়। তিন মক্কেলও ঘর থেকে বেরোয়নি। তৃতীয় দিন সকালে বাবলার বাবা বাবলাকে বলে,
- ' জানিস আজ সকালে দিদি ফোন করেছিলো আমরা কেউ গিয়ে একবারও দেখা সাক্ষাত করি না কোন খোঁজ খবর করিনা আমরা কেমন আছি। তাই আমি ঠিক করেছি এই টাকাটা নিয়ে তুই একবার ঘুরে আয় সোনারপুর। '
-' আজ যাবনা বাবা। একা যেতে ইচ্ছে করেনা , কাল বিশ্বরূপ ও সৌম্যকে নিয়ে যাব।'
- ' আচ্ছা তাই যাস যদি ওরা যায়। তবে আরো কটা টাকা নে।'
বাবলা সৌম্য ও বিশ্বরূপকে ফোনে সন্ধে সাতটার সময় পার্কে আসতে বলল। বললো অনেক কথা আছে।
যথারীতি সন্ধে সাতটায় পার্কে সবার দেখা হলো। কিছুক্ষণ সাধারন কথাবার্তা চলার পর অটোমেটিক হালখাতার সন্ধের ঘটনার কথাটা উঠলো। এবার আর কোন বিরক্তি বা রাগের কথাতো উঠলেই না কোন দোষারোপ না। সবাই খানিক মজা আর হেসে লুটোপুটি খেলো। এর মধ্যে সৌম্য হঠাৎ বলে উঠলো,
- ' আচ্ছা বাবলাদা তুমি হঠাৎ আমাদের পার্কে ডেকে পাঠালে কেনো, কি ব্যাপার?'
- ' কেন, আমি তোদের ডাকতে পারি না? তিনদিন আমাদের দেখা নেই।' বিশ্ব বলে,
- ' কিন্তু কোন কারন ছাড়া তো বাবা তুমি কোনদিন আমাদের ডাকনা। কারনটা কি?'
- ' বলছি রে বাবা বলছি। অবশ্য ঠিকই ধরেছিস বাবার কারণেই ও বাবার ইচ্ছের ঠেলাতেই আমি বাবা তোদের ডেকে পাঠিয়েছি।'
- ' আচ্ছা বাবলাদা তুমি হঠাৎ আমাদের পার্কে ডেকে পাঠালে কেনো, কি ব্যাপার?'
- ' কেন, আমি তোদের ডাকতে পারি না? তিনদিন আমাদের দেখা নেই।' বিশ্ব বলে,
- ' কিন্তু কোন কারন ছাড়া তো বাবা তুমি কোনদিন আমাদের ডাকনা। কারনটা কি?'
- ' বলছি রে বাবা বলছি। অবশ্য ঠিকই ধরেছিস বাবার কারণেই ও বাবার ইচ্ছের ঠেলাতেই আমি বাবা তোদের ডেকে পাঠিয়েছি।'
সৌম্য বলে, - ' কিন্তু তোমার বাবার আমাদের নিয়ে কি ইচ্ছে করেন?'
- ' আরে বাবা, বাবা তোদের নিয়ে কোন ইচ্ছের কথা বলেনি। বাবার ইচ্ছেটা বাবা আমার ঘাড়ে চাপিয়ে নিশ্চিন্ত ছিল। কিন্তু আমি মোটামুটি নিশ্চিন্ত হতে পারছি না। তোদের ফেলে আমি একা মজা করতে কেমন যেন লাগে। আমি আমার ইচ্ছের কথাটা বাবাকে বলেই ফেললাম। বললাম আমি সৌম্য আর বিশ্বকে নিয়ে যেতে চাই। বাবা তখন বলে ওরা যদি তোমার সাথে যেতে চায় আমার আপত্তি নেই।'
- ' কিন্তু আমরা কেন তোমার সাথে ? আমাদের কি লাভ?' দুজনেই বলে ওঠে।
- ' আসলে কি জানিস হালখাতার দিনটা যে হালত আমাদের হয়েছিল এর পর আমাদের একটা আউটিংয়ের খুব জরুরী। আর সেই আউটিংটা যদি মজার হয় তাহলেতো কোনো কথাই নেই। হঠাৎ এই বাড়ী আর রাস্তার জঙ্গল ছেড়ে যদি একদিনের জন্য হলেও শহর ছেড়ে একটু দুরে গ্রাম গ্রাম পরিবেশে খোলা আকাশে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখিদের ওড়া উড়ি, জঙ্গলে পাখিদের কিচিরমিচির কি যে আনন্দের তোদের কি বলবো বুঝলি।' সৌম্য ও বিশ্ব হেসে উঠে বললো,
- ' বাঃ বাবলাদা বাঃ কি বর্ননা দিলে একেবারে কবির চোখে।' সৌম্যের পর বিশ্ব বললো, ' তবে বাবলাদা সোনারপুরও এখন শহরের মতো হয়ে গেছে বুঝলে।'
- ' আরে আমি সব জানি। আসলে কি ব্যাপার জানিস পিসির বাড়ী স্টেশনের থেকে অনেকটা দুরে একটু ফাঁকা ফাঁকা। চল চল আমরা আগামী কাল দশটার মধ্যে খেয়ে দেয়ে শিয়ালদহ স্টেশন থেকে ট্রেনে চেপে সোনারপুর যাবো।'
- ' ভালো করে বলো।' বিশ্ব বললো। ' আমরা কাল সকাল দশটায় ঘর থেকে বেরবো না শিয়ালদহ স্টেশনে পৌছবো না সকাল দশটায় সোনারপুর পৌছবো।'
- ' আরে বাবা সকাল দশটায় ঘর থেকে বেরোবি খেয়ে দেয়ে।'
পরদিন সকালে শিয়ালদহ স্টেশন থেকে বারুইপুর লোকাল ধরে সোনারপুর স্টেশনে পৌছতে আবার সেখান থেকে বাবলার পিসেমশাইর বাড়ীতে পৌঁছতে বারোটা বাজলো। একতলা বাড়ী বেশ পুরনো হয়ে গেছে। দরজাটা ঠেলতেই দরজাটা খুলে গেল। ভেতরে ঢুকতে দেখা গেল একটা গেঞ্জী ও লুঙ্গি পরে পিসেমশাই একটা হাতলয়ালা চেয়ারে চুপচাপ বসে আছে। দরজার আওয়াজে সামনে তাকিয়ে বাবলাকে দেখে বলে,
- ' কে তুমি, কে তোমরা?' বাবলা বলে,
- ' কিগো আমায় চিনতে পারছো না আমিতো বাবলা।'
- ' হাবলা ' পিসেমশাই আকাশ বাতাস চিন্তা করে বললো, ' কৈ আমি তো
হাবলা নামে কাউকে চিনি না।'
- ' পিসেমশাই আমার নাম বাবলা। আমার বাবা পরেশ, এন্টালিতে থাকি।'
- ' ও.... তুই পরেশের ছেলে। কত বড় হয়েছিস। বেশ লায়েক হয়েছিস।'
- ' শুভ নববর্ষ, প্রণাম নাও। পিসি কৈ?'
- ' শুবই বা কে আর নবই বা কে, কি প্রমান দেব অ্যাঁ?'
শুভ চট করে নিচু হয়ে পিসেমশাইয়ের দু পায়ে প্রণাম করে বললো, - ' প্রমান না প্রণাম। আর শুভ ও নব না কথাটা বলেছি শুভ নববর্ষ।'
- ' ও হো হো হো , ঐ দেখ কি শুনতে কি শুনি। তোমরা এই চৌকির ওপরে বিছানার ওপরই বসো। কিছু হবেনা।'
- ' কিন্তু পিসি কই তাকে তো দেখছি না।'
- ' কোথায় আবার যাবে রান্না ঘরেই আছে। বাড়ীতে যদি একটা বোম পরে তাহলেও তার হুস্ ফিরবে না। ঘন্টা খানেক আগে তাকে গিয়ে বললাম একটু চায়ের জল বসাবে। বলে দাঁড়াও দিচ্ছি। একটু পরে আমাকে এসে বলে বাথরুমে তোমার জল দিয়েছি। আজকে এত তাড়াতাড়ি স্নান করছো যে। বোঝ তোরা এবার এর কি উত্তর দেব। কিছু যদি বলি সেটা আবার কি শুনবে কে জানে। তাই বাথরুমে ঢুকে স্নানই করে নিলাম।' বাবলা সোজা রান্নাঘরে গিয়ে দেখে উনুনে ছোট্ট একটা কড়াইতে ছ্যাচরা মতো কি একটা বসিয়ে খুন্তি দিয়ে অলসের মতো নাড়ছে আর তা থেকে পোড়া গন্ধ বেরোচ্ছে। বাবলা, - ' কিগো পিসি, তোমার কড়াই তো পুরে গেল। তুমি কি করছো?'
- ' তাই নাকি।' কাঁপা হাতে কোন মতে উনুনের ওপর থেকে কড়াইটা নামিয়ে পেছন দিকে তাকিয়ে একগাল হেসে ফোকলা দাঁত বার করে বলে, ' ও তুই বুলু এসেছিস। এখন এলি?'।
- ' না পিসি বেশ কিছুক্ষণ আগে এসেছি।'
- ' আমাকে ডাকিসনি কেন? তোর পিসের ঐ এক হয়েছে চানের জল চাইল তা দিলাম। চান করে এখন ঘুমুচ্ছে বুঝি। বোমের আওয়াজে তার ঘুম ভাঙবে না এখন। কিযে করি আমি।'
- ' না পিসি পিসেমশাই ঘুমায় নি। আমি আমার দুজন বন্ধুকে নিয়ে এসেছি তোমার বাড়ী। আমরা পিসেমশাইয়ের সাথে গল্প করছিলাম।'
- ' ওরে মুখপোড়া তুই আমাকে না জানিয়ে ঐ কানে কালা লোকটার সাথে এতক্ষণ কথা বলে কি মজা পেলি।'
- ' না শোন পিসি আমি তো তাই পিসেমশাইয়ের সাথে খুব জোরে জোরে কথা বলছিলাম। ভাবলাম তুমি বোধহয় বাড়ীতে এই মূহুর্তে নেই। পিসেকে তোমার কথা জিগ্গেস করতেই জানতে পারলাম তুমি রান্নাঘরে আছো আর পিসে নাকি তোমাকে একটু চায়ের জল বসাতে বলেছিল আর তুমি নাকি পিসেকে স্নানের জল দিয়েছিলে।'
- ' ওমা তাই নাকি। আমি ভাবলাম বুঝি রাতে হয়তো ভাল ঘুম হয়নি তাই স্নান করে একটু ঘুমাবে। তোর পিসেও এমন মিন মিন করে কথা বলে তা আমার কানে ঠিক ঠাক ঢোকে না।'
- ' যাকগে তোমার রান্না কখন শেষ হবে?'
- ' আমার রান্না শেষ হয়ে গেছে। আর রান্নার কিছু থাকলে তো। এখন উনুন নিবিয়ে দিয়ে স্নান করতে যাবো।'
- ' তুমি কি রান্না করেছ আজকে দেখি।'
- ' কি আর দেখবি। এই দেখ ডাল আর এই ছ্যাঁচরা। বাজার করার লোক কৈ।'
- ' কেন এখান থেকে বাজার কি খুব দুর। পিসেমশাই বাজারে যান না?'
- ' না আমি যেতে দিই না। দেবো কি বাজারে যেতে গিয়েইতো কতবার পড়লো।'
- ' যাও তুমি স্নানে। আমরা বন্ধুরা আশপাশটা একটু ঘুরে টুরে আসি। স্নান করে তোমরা খেয়ে নাও। আমাদের কথা চিন্তা করোনা। আমরা ভাত খেয়ে এসেছি।'
বাবলা ফিরে এসে সৌম্য ও বিশ্বরূপকে হাত ধরে তুলে পিসেমশাইকে একটু ঘুরে আসি বলে ছিটকে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লো। ওরা দুজনে অবাক হয়ে বলে, ' এখুনি বেরিয়ে পড়লে যে।' ' দেখি কাছাকাছি খাবার কিছু পাওয়া যায় কিনা। পিসি পিসেমশাইদের অবস্থা এতো খারাপ আমার জানা ছিলোনা।
ওই জন্যই বাবা আমাকে পাঠালো।' এই রোদে ওরা কিছুটা ঘুরে টুরে একটা বাড়ীর দোকান থেকে আলু পটল মুসুর ডাল চিনি পাঁউরুটি আর একটা মিষ্টির দোকান থেকে কিছু মিষ্টি কিনে গলদ ঘর্ম হয়ে ফিরে এল। পিসিদেরগ খাওয়া হয়ে গেছে ততক্ষণে। বলে, 'কোথায় গিয়েছিলি তোরা, হাতে করে এত
কি এনেছিস?'
- ' এমন কিছুনা। নাও এগুলো সব ঠিক করে রাখো আর এই এক হাজার টাকা বাবা তোমায় দিয়েছে ধরো। এবার আমরা যাই।'
- ' সেকিরে এত কিছু আনলি নাখেয়ে চলে যাবি।'
- ' না, এগুলো তোমাদের জন্য এনেছি। সব দোকান বন্ধ বিশেষ কিছু পেলাম না, কি আর করবো। চলি।' পিসি পিসেমশাইকে প্রণাম করতেই বাবলার হাত ধরে দুজনেই ডুকরে ওঠে। বাবলার মনটা তখন খুব খারাপ। কোনরকমে হাত ছাড়িয়ে ' আসি ' বলে দরজা খুলে বেরিয়ে এলো। হাঁটতে হাঁটতে বাবলা বলে,
- ' জানিস সৌম্য, জানিস বিশ্ব, ভেবেছিলাম এখানে এসে বেশ মজা হবে, কেন জানিস আমি জানতাম পিসি-পিসেমশাই দুজনেই কানে খুব কম শোনে তাই দুজনের মধ্যে যা হবার তাই হয়। ঝগড়া মান অভিমান কথা বন্ধ লেগেই থাকে। তাই ভাবলাম ওখানে গেলে একটু মজা হবে। কিন্তু গিয়ে যা দেখলাম
মনটা দুঃখে ভরে গেল। রান্নাঘরে গিয়ে কি দেখলাম জানিস, একতো আমরা এসেছি পিসিমা কিছুই শুনতে পায়নি, তার ওপর কড়াইতে ছ্যাচরা বসিয়ে পোড়া গন্ধ বেরিয়েছে তাতে কোন হুঁশ নেই। আমি বলাতে তাড়াতাড়ি কড়াই নামিয়ে ফেললো। তারপর দেখলাম ডাল হয়েছে একেবারে জল। আর কিছু
হয়নি। হবে কি কিছু থাকলে তো। এত খারাপ লাগলো যে কি বলবো। তাই এই দুপুরে যা পেলাম তাই নিয়ে দিলাম। বাবার দেওয়া টাকাটা দিলাম। না দাঁড়িয়ে চলে এলাম কারণ যা মিস্টি এনেছি ওদের জন্য ওগুলো আমাদের জোর করে খাওয়াবে। জোর করে তোদের নিয়ে এলাম বলে তোরা কিছু মনে করিস না। জানতামনা যে আমি। ওরা দুজনেই বাবলাকে আশ্বাস করলো যে তারা কিছু মনে করেনি বাবলাদা যা করেছে ঠিক করেছে।
__________________________
Dipak Kr. Paul, DTC, Joka, Kol - 700104.
- ' আরে বাবা, বাবা তোদের নিয়ে কোন ইচ্ছের কথা বলেনি। বাবার ইচ্ছেটা বাবা আমার ঘাড়ে চাপিয়ে নিশ্চিন্ত ছিল। কিন্তু আমি মোটামুটি নিশ্চিন্ত হতে পারছি না। তোদের ফেলে আমি একা মজা করতে কেমন যেন লাগে। আমি আমার ইচ্ছের কথাটা বাবাকে বলেই ফেললাম। বললাম আমি সৌম্য আর বিশ্বকে নিয়ে যেতে চাই। বাবা তখন বলে ওরা যদি তোমার সাথে যেতে চায় আমার আপত্তি নেই।'
- ' কিন্তু আমরা কেন তোমার সাথে ? আমাদের কি লাভ?' দুজনেই বলে ওঠে।
- ' আসলে কি জানিস হালখাতার দিনটা যে হালত আমাদের হয়েছিল এর পর আমাদের একটা আউটিংয়ের খুব জরুরী। আর সেই আউটিংটা যদি মজার হয় তাহলেতো কোনো কথাই নেই। হঠাৎ এই বাড়ী আর রাস্তার জঙ্গল ছেড়ে যদি একদিনের জন্য হলেও শহর ছেড়ে একটু দুরে গ্রাম গ্রাম পরিবেশে খোলা আকাশে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখিদের ওড়া উড়ি, জঙ্গলে পাখিদের কিচিরমিচির কি যে আনন্দের তোদের কি বলবো বুঝলি।' সৌম্য ও বিশ্ব হেসে উঠে বললো,
- ' বাঃ বাবলাদা বাঃ কি বর্ননা দিলে একেবারে কবির চোখে।' সৌম্যের পর বিশ্ব বললো, ' তবে বাবলাদা সোনারপুরও এখন শহরের মতো হয়ে গেছে বুঝলে।'
- ' আরে আমি সব জানি। আসলে কি ব্যাপার জানিস পিসির বাড়ী স্টেশনের থেকে অনেকটা দুরে একটু ফাঁকা ফাঁকা। চল চল আমরা আগামী কাল দশটার মধ্যে খেয়ে দেয়ে শিয়ালদহ স্টেশন থেকে ট্রেনে চেপে সোনারপুর যাবো।'
- ' ভালো করে বলো।' বিশ্ব বললো। ' আমরা কাল সকাল দশটায় ঘর থেকে বেরবো না শিয়ালদহ স্টেশনে পৌছবো না সকাল দশটায় সোনারপুর পৌছবো।'
- ' আরে বাবা সকাল দশটায় ঘর থেকে বেরোবি খেয়ে দেয়ে।'
পরদিন সকালে শিয়ালদহ স্টেশন থেকে বারুইপুর লোকাল ধরে সোনারপুর স্টেশনে পৌছতে আবার সেখান থেকে বাবলার পিসেমশাইর বাড়ীতে পৌঁছতে বারোটা বাজলো। একতলা বাড়ী বেশ পুরনো হয়ে গেছে। দরজাটা ঠেলতেই দরজাটা খুলে গেল। ভেতরে ঢুকতে দেখা গেল একটা গেঞ্জী ও লুঙ্গি পরে পিসেমশাই একটা হাতলয়ালা চেয়ারে চুপচাপ বসে আছে। দরজার আওয়াজে সামনে তাকিয়ে বাবলাকে দেখে বলে,
- ' কে তুমি, কে তোমরা?' বাবলা বলে,
- ' কিগো আমায় চিনতে পারছো না আমিতো বাবলা।'
- ' হাবলা ' পিসেমশাই আকাশ বাতাস চিন্তা করে বললো, ' কৈ আমি তো
হাবলা নামে কাউকে চিনি না।'
- ' পিসেমশাই আমার নাম বাবলা। আমার বাবা পরেশ, এন্টালিতে থাকি।'
- ' ও.... তুই পরেশের ছেলে। কত বড় হয়েছিস। বেশ লায়েক হয়েছিস।'
- ' শুভ নববর্ষ, প্রণাম নাও। পিসি কৈ?'
- ' শুবই বা কে আর নবই বা কে, কি প্রমান দেব অ্যাঁ?'
শুভ চট করে নিচু হয়ে পিসেমশাইয়ের দু পায়ে প্রণাম করে বললো, - ' প্রমান না প্রণাম। আর শুভ ও নব না কথাটা বলেছি শুভ নববর্ষ।'
- ' ও হো হো হো , ঐ দেখ কি শুনতে কি শুনি। তোমরা এই চৌকির ওপরে বিছানার ওপরই বসো। কিছু হবেনা।'
- ' কিন্তু পিসি কই তাকে তো দেখছি না।'
- ' কোথায় আবার যাবে রান্না ঘরেই আছে। বাড়ীতে যদি একটা বোম পরে তাহলেও তার হুস্ ফিরবে না। ঘন্টা খানেক আগে তাকে গিয়ে বললাম একটু চায়ের জল বসাবে। বলে দাঁড়াও দিচ্ছি। একটু পরে আমাকে এসে বলে বাথরুমে তোমার জল দিয়েছি। আজকে এত তাড়াতাড়ি স্নান করছো যে। বোঝ তোরা এবার এর কি উত্তর দেব। কিছু যদি বলি সেটা আবার কি শুনবে কে জানে। তাই বাথরুমে ঢুকে স্নানই করে নিলাম।' বাবলা সোজা রান্নাঘরে গিয়ে দেখে উনুনে ছোট্ট একটা কড়াইতে ছ্যাচরা মতো কি একটা বসিয়ে খুন্তি দিয়ে অলসের মতো নাড়ছে আর তা থেকে পোড়া গন্ধ বেরোচ্ছে। বাবলা, - ' কিগো পিসি, তোমার কড়াই তো পুরে গেল। তুমি কি করছো?'
- ' তাই নাকি।' কাঁপা হাতে কোন মতে উনুনের ওপর থেকে কড়াইটা নামিয়ে পেছন দিকে তাকিয়ে একগাল হেসে ফোকলা দাঁত বার করে বলে, ' ও তুই বুলু এসেছিস। এখন এলি?'।
- ' না পিসি বেশ কিছুক্ষণ আগে এসেছি।'
- ' আমাকে ডাকিসনি কেন? তোর পিসের ঐ এক হয়েছে চানের জল চাইল তা দিলাম। চান করে এখন ঘুমুচ্ছে বুঝি। বোমের আওয়াজে তার ঘুম ভাঙবে না এখন। কিযে করি আমি।'
- ' না পিসি পিসেমশাই ঘুমায় নি। আমি আমার দুজন বন্ধুকে নিয়ে এসেছি তোমার বাড়ী। আমরা পিসেমশাইয়ের সাথে গল্প করছিলাম।'
- ' ওরে মুখপোড়া তুই আমাকে না জানিয়ে ঐ কানে কালা লোকটার সাথে এতক্ষণ কথা বলে কি মজা পেলি।'
- ' না শোন পিসি আমি তো তাই পিসেমশাইয়ের সাথে খুব জোরে জোরে কথা বলছিলাম। ভাবলাম তুমি বোধহয় বাড়ীতে এই মূহুর্তে নেই। পিসেকে তোমার কথা জিগ্গেস করতেই জানতে পারলাম তুমি রান্নাঘরে আছো আর পিসে নাকি তোমাকে একটু চায়ের জল বসাতে বলেছিল আর তুমি নাকি পিসেকে স্নানের জল দিয়েছিলে।'
- ' ওমা তাই নাকি। আমি ভাবলাম বুঝি রাতে হয়তো ভাল ঘুম হয়নি তাই স্নান করে একটু ঘুমাবে। তোর পিসেও এমন মিন মিন করে কথা বলে তা আমার কানে ঠিক ঠাক ঢোকে না।'
- ' যাকগে তোমার রান্না কখন শেষ হবে?'
- ' আমার রান্না শেষ হয়ে গেছে। আর রান্নার কিছু থাকলে তো। এখন উনুন নিবিয়ে দিয়ে স্নান করতে যাবো।'
- ' তুমি কি রান্না করেছ আজকে দেখি।'
- ' কি আর দেখবি। এই দেখ ডাল আর এই ছ্যাঁচরা। বাজার করার লোক কৈ।'
- ' কেন এখান থেকে বাজার কি খুব দুর। পিসেমশাই বাজারে যান না?'
- ' না আমি যেতে দিই না। দেবো কি বাজারে যেতে গিয়েইতো কতবার পড়লো।'
- ' যাও তুমি স্নানে। আমরা বন্ধুরা আশপাশটা একটু ঘুরে টুরে আসি। স্নান করে তোমরা খেয়ে নাও। আমাদের কথা চিন্তা করোনা। আমরা ভাত খেয়ে এসেছি।'
বাবলা ফিরে এসে সৌম্য ও বিশ্বরূপকে হাত ধরে তুলে পিসেমশাইকে একটু ঘুরে আসি বলে ছিটকে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লো। ওরা দুজনে অবাক হয়ে বলে, ' এখুনি বেরিয়ে পড়লে যে।' ' দেখি কাছাকাছি খাবার কিছু পাওয়া যায় কিনা। পিসি পিসেমশাইদের অবস্থা এতো খারাপ আমার জানা ছিলোনা।
ওই জন্যই বাবা আমাকে পাঠালো।' এই রোদে ওরা কিছুটা ঘুরে টুরে একটা বাড়ীর দোকান থেকে আলু পটল মুসুর ডাল চিনি পাঁউরুটি আর একটা মিষ্টির দোকান থেকে কিছু মিষ্টি কিনে গলদ ঘর্ম হয়ে ফিরে এল। পিসিদেরগ খাওয়া হয়ে গেছে ততক্ষণে। বলে, 'কোথায় গিয়েছিলি তোরা, হাতে করে এত
কি এনেছিস?'
- ' এমন কিছুনা। নাও এগুলো সব ঠিক করে রাখো আর এই এক হাজার টাকা বাবা তোমায় দিয়েছে ধরো। এবার আমরা যাই।'
- ' সেকিরে এত কিছু আনলি নাখেয়ে চলে যাবি।'
- ' না, এগুলো তোমাদের জন্য এনেছি। সব দোকান বন্ধ বিশেষ কিছু পেলাম না, কি আর করবো। চলি।' পিসি পিসেমশাইকে প্রণাম করতেই বাবলার হাত ধরে দুজনেই ডুকরে ওঠে। বাবলার মনটা তখন খুব খারাপ। কোনরকমে হাত ছাড়িয়ে ' আসি ' বলে দরজা খুলে বেরিয়ে এলো। হাঁটতে হাঁটতে বাবলা বলে,
- ' জানিস সৌম্য, জানিস বিশ্ব, ভেবেছিলাম এখানে এসে বেশ মজা হবে, কেন জানিস আমি জানতাম পিসি-পিসেমশাই দুজনেই কানে খুব কম শোনে তাই দুজনের মধ্যে যা হবার তাই হয়। ঝগড়া মান অভিমান কথা বন্ধ লেগেই থাকে। তাই ভাবলাম ওখানে গেলে একটু মজা হবে। কিন্তু গিয়ে যা দেখলাম
মনটা দুঃখে ভরে গেল। রান্নাঘরে গিয়ে কি দেখলাম জানিস, একতো আমরা এসেছি পিসিমা কিছুই শুনতে পায়নি, তার ওপর কড়াইতে ছ্যাচরা বসিয়ে পোড়া গন্ধ বেরিয়েছে তাতে কোন হুঁশ নেই। আমি বলাতে তাড়াতাড়ি কড়াই নামিয়ে ফেললো। তারপর দেখলাম ডাল হয়েছে একেবারে জল। আর কিছু
হয়নি। হবে কি কিছু থাকলে তো। এত খারাপ লাগলো যে কি বলবো। তাই এই দুপুরে যা পেলাম তাই নিয়ে দিলাম। বাবার দেওয়া টাকাটা দিলাম। না দাঁড়িয়ে চলে এলাম কারণ যা মিস্টি এনেছি ওদের জন্য ওগুলো আমাদের জোর করে খাওয়াবে। জোর করে তোদের নিয়ে এলাম বলে তোরা কিছু মনে করিস না। জানতামনা যে আমি। ওরা দুজনেই বাবলাকে আশ্বাস করলো যে তারা কিছু মনে করেনি বাবলাদা যা করেছে ঠিক করেছে।
__________________________
Dipak Kr. Paul, DTC, Joka, Kol - 700104.
Comments
Post a Comment