ক্ষমতার গন্ধ ও গণতন্ত্রের গপ্পো
মেশকাতুন নাহার
ক্ষমতা আমাদের দেশে এমন এক সুগন্ধি—যেটা ব্যবহার করলে মানুষ নিজেকে শুধু মানুষ ভাবে না, সঙ্গে বোনাস হিসেবে “জাতির অভিভাবক”, “এলাকার কর্ণধার”, আর মাঝে মাঝে “বিশ্ব পরিস্থিতির বিশ্লেষক” হিসেবেও আবিষ্কার করে। এই সুগন্ধির মজাটা হলো—এটা যতক্ষণ থাকে, চারপাশের সবাই নাকে রুমাল চেপে বললেও, “কি দারুণ সুবাস!” আর যেই না উড়ে গেল, তখন পাশের লোকই বলে, “ভাই, একটু দূরে দাঁড়ান, বাস্তবতার গন্ধটা লাগছে!”
আমাদের সমাজে ক্ষমতার সংজ্ঞা খুব সহজ—যার ফোন ধরলে সঙ্গে সঙ্গে “স্যার” বলা যায়, তিনি ক্ষমতাবান। আর যার ফোন ধরলে বলা হয়, “কে বলছেন?”, তিনি সাবেক। এই “কে বলছেন?” প্রশ্নটাই আসলে ক্ষমতা হারানোর সবচেয়ে বড় সার্টিফিকেট। আগে যেখানে ফোন ধরার আগেই বলা হতো “জি স্যার”, এখন ফোন ধরার পরেও বলা হয়, “নামটা আবার বলবেন?”
ক্ষমতার চেয়ারেরও নিজস্ব এক চরিত্র আছে। এই চেয়ার কোনো সাধারণ চেয়ার না—এটা এমন এক যাদুকরী আসন, যেখানে বসলে মানুষ নিজের উচ্চতা মেপে ফেলে ভুল স্কেলে। পাঁচ ফুট ছয় ইঞ্চির মানুষও সেখানে বসে মনে করে, সে অন্তত দশ ফুট লম্বা! অথচ চেয়ার থেকে নামলেই দেখা যায়—বাসের হ্যান্ডেলে হাত তুলতে কষ্ট হচ্ছে।
একসময় এলাকার চায়ের দোকানে যিনি ঢুকতেন, দোকানদার ছুটে এসে বলত, “স্যার, আপনার জন্য আলাদা কাপ!” এখন সেই একই দোকানে গেলে দোকানদার বলে, “চা লাগবে? চিনি কম দেবো নাকি বেশি?”—এই প্রশ্নটাই আসলে গণতন্ত্রের সবচেয়ে বাস্তব রূপ।
ক্ষমতার সময় মানুষ যে ভাষায় কথা বলে, ক্ষমতা হারানোর পর সেই ভাষারও পরিবর্তন হয়। আগে যেখানে বলা হতো, “এই কাজটা কালকের মধ্যে শেষ করুন”—এখন বলা হয়, “আপনি যদি একটু দেখতেন, খুব উপকার হতো।” আগে ছিল আদেশ, এখন অনুরোধ; আগে ছিল নির্দেশ, এখন আছে বিনীত নিবেদন।
আর সবচেয়ে মজার বিষয় হলো—ক্ষমতার সময়কার বন্ধুরা। এরা এক বিশেষ প্রজাতির মানুষ, যাদের বৈশিষ্ট্য হলো, তারা সবসময় ক্ষমতার দিকেই ঝুঁকে থাকে—যেন সূর্যমুখী ফুল। সূর্য যেদিকে, তারা সেদিকেই। ক্ষমতা থাকলে তারা বলে, “আপনি না থাকলে দেশ অচল।” আর ক্ষমতা চলে গেলে বলে, “দেশ তো অনেক বড় ব্যাপার, ব্যক্তি বড় নয়!”
ক্ষমতা থাকাকালে মানুষের আত্মবিশ্বাস এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে, সে মনে করে—তার বলা প্রতিটি কথাই ইতিহাসের অংশ। “এই রাস্তা হবে”—বললেই রাস্তা হয়ে যায়, অন্তত কথার জগতে। কিন্তু ক্ষমতা চলে গেলে যখন সে বলে, “এই রাস্তা খারাপ”—তখন পাশের লোক বলে, “আপনি আপনার কাজে মন দিন, রাস্তা নিয়ে আমরা দেখছি।”
ক্ষমতার একটা অদ্ভুত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে—এটা মানুষকে বাস্তবতা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। চারপাশে এত “জি স্যার”, “ঠিক আছে স্যার”, “আপনি যা বলবেন স্যার”—এই শব্দগুলো ঘুরতে থাকে যে, একসময় মানুষ সত্যিই বিশ্বাস করতে শুরু করে—সে ভুল করতে পারে না। অথচ ক্ষমতা চলে যাওয়ার পর প্রথম যে শব্দটি কানে আসে, সেটা হলো—“না”। আর এই “না” শব্দটাই তার কাছে নতুন ভাষার মতো লাগে।
একজন সাবেক ক্ষমতাবান একদিন নিজের পুরোনো অফিসে গেলেন। গেটের সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, “আমি ভেতরে যাবো।” গার্ড তাকিয়ে বলল, “কাজ কি?” তিনি একটু গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, “আমি আগে এখানে…” গার্ড থামিয়ে দিয়ে বলল, “আগে যা ছিলেন, এখন কি কাজ?”—এই প্রশ্নটাই আসলে সময়ের সবচেয়ে বড় ব্যঙ্গ।
ক্ষমতা হারানোর পর মানুষের সময়ও বেড়ে যায়। আগে যিনি বলতেন, “একটু সময় নেই”—এখন তিনি সময়কে ধরে বসে থাকেন। বিকেলে পার্কে হাঁটেন, সকালে পত্রিকা পড়েন, আর দুপুরে বিশ্লেষণ করেন—দেশ কোথায় যাচ্ছে। যেন ক্ষমতা থাকাকালে দেশের গন্তব্য ঠিক ছিল, আর এখন সেটা হঠাৎ হারিয়ে গেছে!
আরেকটা মজার বিষয় হলো—ক্ষমতা থাকলে মানুষ নিজের নামের আগে-পিছে এত উপাধি যোগ করে যে, পুরো নামটাই একটা ছোটখাটো প্রবন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু ক্ষমতা চলে গেলে সেই নামটা আবার ছোট হয়ে যায়—শুধু নাম, কোনো বিশেষণ নেই। যেন অভিধান থেকে বিশেষণগুলো হঠাৎ উধাও হয়ে গেছে।
ক্ষমতার সময় মানুষ যে গাড়িতে চলাফেরা করে, সেটাও যেন তার পরিচয়ের অংশ হয়ে যায়। গাড়ির সামনে-পেছনে নানা চিহ্ন, পতাকা, স্টিকার—সব মিলিয়ে একটা চলন্ত ঘোষণা: “আমি গুরুত্বপূর্ণ!” কিন্তু ক্ষমতা চলে গেলে সেই গাড়িটাও সাধারণ হয়ে যায়। তখন আর কেউ রাস্তা ছাড়ে না, হর্ন দিলেও কেউ তাকায় না। তখন বোঝা যায়—গাড়ি নয়, আসলে ছিল চেয়ারেরই ক্ষমতা।
তবে ক্ষমতা হারানোর মধ্যেও এক ধরনের মুক্তি আছে—যেটা অনেকেই প্রথমে বুঝতে পারে না। আগে যেখানে প্রতিটি কথা মেপে বলতে হতো, এখন সেখানে মানুষ নির্ভয়ে কথা বলতে পারে। আগে যেখানে চারপাশে ছিল ভয়ের আবহ, এখন সেখানে আছে স্বাভাবিকতা। আগে যেখানে মানুষ কাছে আসত স্বার্থ নিয়ে, এখন যারা আসে, তারা সত্যিই মানুষ হয়ে আসে।
একজন সাবেক ক্ষমতাবান একদিন চায়ের দোকানে বসে বললেন, “ক্ষমতা আসলে ক্ষণস্থায়ী।” পাশের একজন হেসে বলল, “ঠিকই বলেছেন, তবে এই কথাটা যদি একটু আগে বুঝতেন, তাহলে আজকে চায়ের দামটা আপনাকেই দিতে হতো না!”—এই কথার মধ্যে যেমন হাসি আছে, তেমনই আছে বাস্তবতার কড়া সত্য।
ক্ষমতা আসলে অনেকটা রিকশার হর্নের মতো—যখন বাজে, সবাই সরে দাঁড়ায়। কিন্তু হর্ন বন্ধ হয়ে গেলে, রিকশাওয়ালাকেই আবার প্যাডেল মারতে হয়। তখন আর কেউ রাস্তা ফাঁকা করে দেয় না। তখন বুঝতে হয়—নিজের শক্তিটাই আসল, হর্নটা শুধু সাময়িক সুবিধা।
আমাদের সমাজে ক্ষমতার প্রতি আকর্ষণটা এতটাই গভীর যে, অনেকেই এটাকে জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য মনে করে। কিন্তু ক্ষমতা আসলে কোনো গন্তব্য নয়—এটা একটা অস্থায়ী স্টেশন মাত্র। এখানে কিছুক্ষণ থামা যায়, কিন্তু স্থায়ীভাবে থাকা যায় না।
শেষমেশ বলা যায়, ক্ষমতা মানুষকে বড় করে না—মানুষই ক্ষমতাকে বড় করে। চেয়ার কখনো নিজে থেকে সিংহাসন হয় না; মানুষই তাকে সিংহাসন বানায়। আর সেই মানুষই একদিন তাকে আবার সাধারণ কাঠের আসনে নামিয়ে আনে।
তাই ক্ষমতা থাকলে একটু কম গম্ভীর হওয়া ভালো, আর ক্ষমতা চলে গেলে একটু বেশি হাসতে পারা আরও ভালো। কারণ, শেষ পর্যন্ত মানুষই টিকে থাকে—চেয়ার নয়, ক্ষমতা নয়, শুধু মানুষ আর তার গল্প।
আর সেই গল্পের সবচেয়ে সুন্দর অংশটা হয়তো এই—চেয়ার বদলায়, ক্ষমতা বদলায়, কিন্তু চায়ের দোকানের আড্ডা বদলায় না। সেখানে সবাই সমান, সবাই মানুষ—আর সেখানেই বোঝা যায়, আসল ক্ষমতা কারও হাতে নয়, আসল ক্ষমতা সময়ের হাতে।
Comments
Post a Comment