“নির্ভুল মহারাজ ও আত্মঅন্ধতার সাম্রাজ্য”
মেশকাতুন নাহার
সমাজের বুকে এক বিশেষ প্রজাতির মানুষের বসবাস আছে—যাদের আত্মবিশ্বাস এতটাই অতিরঞ্জিত যে, তাদের কাছে ভুল একটি কাল্পনিক ধারণা মাত্র। তারা মনে করেন, ভুল নামক শব্দটি মূলত অন্যদের জন্য তৈরি হয়েছে; নিজের অস্তিত্বে তার কোনো প্রবেশাধিকার নেই। এদেরকেই আধুনিক সমাজের ব্যঙ্গাত্মক অভিধানে বলা যেতে পারে—“নির্ভুল মহারাজ”।
এই মহারাজদের রাজত্বে একটি অলিখিত সংবিধান আছে—“আমি যা বলি, তাই সত্য; আমি যা করি, তাই মানদণ্ড; আর আমি যা ভুল করি, তা আসলে ভুল নয়—ব্যাখ্যার অভাবমাত্র।” এই সংবিধানের বাইরে কোনো যুক্তি, তথ্য বা বাস্তবতা প্রবেশ করলে তা সঙ্গে সঙ্গে “অপ্রাসঙ্গিক” ও “অপমানজনক” ঘোষণা করা হয়।
তাঁদের আত্মজ্ঞান এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে আত্মসমালোচনা একটি নিষিদ্ধ বিলাসিতা। যেন আত্মসমালোচনা একটি দুর্লভ রোগ, যা কেবল সাধারণ মানুষদেরই হয়; মহারাজদের শরীরে তার অ্যান্টিবডি আগে থেকেই তৈরি।
এদের সবচেয়ে বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য হলো—তাঁরা নিজের ভুল দেখার ক্ষমতা রাখেন না, কিন্তু অন্যের সামান্য অসঙ্গতিকে মহাবিশ্ব-সমান অপরাধে রূপান্তর করার এক অলৌকিক দক্ষতা রাখেন। অন্যের একটি শব্দের ভুল উচ্চারণ তাঁদের কাছে ভাষা-সংস্কৃতির ধ্বংসযজ্ঞ, অথচ নিজের বহুদিনের ভুল সিদ্ধান্তকে তাঁরা বলেন—“পরিস্থিতির প্রজ্ঞাপূর্ণ সমন্বয়”।
তাঁদের চোখ যেন এক বিশেষ ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক দূরবীন। সেই দূরবীনে তাঁরা অন্যের ক্ষুদ্রতম ত্রুটিকে মহাকাব্যিক পরিসরে দেখেন—যেন সেটি মানবসভ্যতার পতনের পূর্বাভাস। অথচ নিজের ভুল? সেটি তাঁদের কাছে অদৃশ্য নয়, বরং “স্বাভাবিক বৈচিত্র্য” হিসেবে সংরক্ষিত।
এই মহারাজদের মুখে প্রায়ই একটি চিরপরিচিত বাক্য শোনা যায়—
“আমি তো কখনো ভুল করি না।”
এই বাক্যটি উচ্চারিত হওয়ার মুহূর্তেই যুক্তিবোধ মাথা নিচু করে বসে পড়ে। কারণ এটি এমন এক ঘোষণা, যার মধ্যে আত্মবিশ্বাসের অতিরিক্ত মাত্রা বিজ্ঞানকেও লজ্জা দেয়। বাস্তবতা সেখানে দাঁড়িয়ে কেবল নীরব দর্শক।
এদের আরেকটি অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য হলো—উপদেশ প্রদানের প্রতি অসীম আসক্তি। তাঁরা এমনভাবে অন্যকে শেখান, যেন মানবজাতির ইতিহাস তাঁদের হাত দিয়েই শুরু হয়েছে এবং তাঁদের হাতেই শেষ হবে। অন্যকে কীভাবে চলতে হবে, কীভাবে বলতে হবে, কীভাবে ভাবতে হবে—সবকিছু তাঁদের নির্দেশনার অধীন।
কিন্তু আত্মপ্রয়োগ? সেখানে প্রবেশ করলে দেখা যায় এক ভয়ানক শূন্যতা। তাঁদের উপদেশের রাজ্য বিশাল, কিন্তু আত্মচর্চার ঘরটি সম্পূর্ণ তালাবদ্ধ।
এই শ্রেণির মানুষদের মানসিক গঠন এক ধরনের আয়নার মতো—কিন্তু সেই আয়না শুধু বাইরের মানুষকে প্রতিফলিত করে। নিজের প্রতিচ্ছবি সেখানে নিষিদ্ধ। ফলে তাঁরা আজীবন অন্যকে দেখে সিদ্ধান্ত নেন, কিন্তু নিজেদের দিকে তাকানোর সুযোগ পান না—অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে তাকান না।
বর্তমান ডিজিটাল যুগে এই “নির্ভুল মহারাজ” প্রজাতি আরও শক্তিশালী হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তাঁদের জন্য এক উর্বর ভূমি। এখানে তাঁরা প্রতিদিন নতুন নতুন বিচারক হয়ে ওঠেন—একটি পোস্ট, একটি বাক্য, একটি মতামত—সবকিছুই তাঁদের “চূড়ান্ত বিশ্লেষণ” এর অধীন। মন্তব্যের জগতে তাঁরা যেন একেকজন ক্ষুদ্র স্বৈরাচার, যেখানে ভিন্নমত মানেই অপরাধ, আর সংশোধন মানেই অপমান।
তাঁদের যুক্তির কাঠামো সাধারণত তিন স্তরে বিভক্ত— প্রথম স্তর: “আমি যা বলছি, সেটাই চূড়ান্ত সত্য।”
দ্বিতীয় স্তর: “যারা আমার সাথে একমত নয়, তারা অজ্ঞ।”
তৃতীয় স্তর: “আমাকে প্রশ্ন করা মানেই সমাজকে প্রশ্ন করা।”
এই তিন স্তরের বাইরে কোনো চিন্তা প্রবেশ করলে তা সঙ্গে সঙ্গে “অশিক্ষা” বা “অবিবেচনা” হিসেবে চিহ্নিত হয়।
সবচেয়ে মজার বিষয় হলো—এই মহারাজরা নিজের ভুলকে কখনো “ভুল” বলেন না। সেটি হয় “পরিস্থিতির চাপ”, “তথ্যের ঘাটতি”, “প্রসঙ্গের ভুল ব্যাখ্যা” কিংবা “অন্যের ভুল বোঝাবুঝি”। অর্থাৎ ভুলেরও এক উন্নত সংস্করণ তাঁদের অভিধানে বিদ্যমান, যেখানে দায় সবসময় বাইরে যায়, ভেতরে কখনো নয়।
সমাজে তাঁদের উপস্থিতি একদিকে যেমন কৌতুকের উপাদান, অন্যদিকে তেমনি এক ধরনের মানসিক ক্লান্তির উৎস। কারণ এদের সাথে যুক্তি দিয়ে আলোচনা করা মানে সমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে শুকনো থাকার চেষ্টা করা।
তবুও এই চরিত্রগুলো সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় নয়। কারণ তাঁদের মাধ্যমে আমরা একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য উপলব্ধি করি—যে মানুষ নিজের ভুল দেখতে শেখেনি, সে অন্যের উন্নতির পথও বুঝতে পারে না। এবং সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার হলো—সে নিজের অজান্তেই এক অদৃশ্য কারাগারে বন্দী থাকে, যেখানে দরজার চাবি তার হাতেই, কিন্তু সে জানে না কোথায় সেটা রাখা আছে।
আত্মসমালোচনা তাঁদের কাছে দুর্বলতা নয়, বরং অপ্রয়োজনীয় বিলাসিতা। ফলে তাঁরা যত বেশি কথা বলেন, তত বেশি নিজেদের অজান্তেই নিজেদের সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করে ফেলেন। কিন্তু আত্মঅহংকারের মোহ এত গভীর যে, সেই প্রতিফলনও তাঁরা দেখতে পান না।
শেষ পর্যন্ত সত্যটি খুব সরল, কিন্তু তেতো—
যে মানুষ নিজের ভুলকে চিনতে পারে না, সে যতই “নির্ভুল মহারাজ” হোক না কেন, বাস্তবে সে নিজের অজান্তেই ভুলের সবচেয়ে বড় রাজ্যে বসবাস করে।
আর সেই রাজ্যের নামই হলো—
আত্মঅন্ধতার সাম্রাজ্য।।
-----------------------
মেশকাতুন নাহার
প্রভাষক সমাজকর্ম
কচুয়া সরকারি ডিগ্রি কলেজ
কচুয়া, চাঁদপুর।।
Comments
Post a Comment