স্বাধীনতার নীরব প্রস্থান
এক প্রেমরাষ্ট্র গড়ে ওঠে অনুভূতির নামে,
সেখানে ক্ষমতা বসে থাকে ভালোবাসার ফ্রেমে।
শাসন চলে হাসিমুখে, আদেশ আসে নরমে,
নরম শব্দের আড়ালেতে স্বৈরাচারই কর্মে।
রাষ্ট্রপ্রধান প্রেমিক বটে, আইন নিজেই লেখে,
যা সে বলে সেটাই সত্য—বাকিটা সে মুছে রাখে।
সংবিধান তার খুবই ছোট, একটিমাত্র ধারা—
ক্ষমতাই যে ভালোবাসা, প্রশ্ন মানে হারার সারা।
নাগরিক আছে, অধিকার নেই—থাকে শুধু দায়,
মতামত দেয় অনুমতিতে, সীমার ভেতর চাই।
নিজস্ব চিন্তা উচ্চারণে রাষ্ট্রদ্রোহ গোনা,
স্বাধীনতার সংজ্ঞাটুকু সন্দেহে ভেজানো সোনা।
"ভালোবাসা মানে অধিকার"—ঘোষণা চলে নিত্য,
সম্মতি সেখানে অপরাধ, 'না' শব্দটি অসত্য।
কখনো কবি হয়ে শাসক ছন্দে রাগ ঝাড়ে,
সমস্যার সব উৎস খুঁজে দুর্বল কণ্ঠে পাড়ে।
কখনো দার্শনিক সেজে বক্তৃতা দেয় ভারী,
স্বাধীনতা নাকি বিলাস, সীমাবদ্ধতাই সারি।
এইভাবে রাষ্ট্র চলে বেশ শান্ত আর গম্ভীর,
ভেতরে ভেতরে শুকিয়ে যায় অন্তর আর শরীর।
হঠাৎ একদিন নাগরিক পাঠ বদলায় ধীরে,
রাষ্ট্র নয়—জীবন পড়তে শেখে নিজের নীড়ে।
দেখে সে মানুষ জন্মেছে, শাসনের জন্য নয়,
ভালোবাসা মানে শৃঙ্খল—এই বোধে জাগে ভয়।
কোনো বিদ্রোহ, কোনো মিছিল, কোনো শব্দের ঝড়—
শুধু নীরব পদত্যাগে ভাঙে ক্ষমতার ঘর।
স্বৈরশাসক রয়ে গেল, সিংহাসনও তাই,
রাষ্ট্র আছে—নাগরিক নেই, ইতিহাস শুধু ছাই।
আর যে বেরিয়ে গেল নীরব সত্য জেনে,
সে এখন স্বাধীন সত্তা—নিজস্ব সীমা বুনে।
কোনো প্রেমরাষ্ট্র নয়, কোনো শাসনজাল নয়,
সে এখন স্বাধীন জীবন—সম্পূর্ণ নির্ভয়।
ভগ্ন প্রতিশ্রুতির প্রহেলিকা
এমন পরিণতি কি অনিবার্য ছিল,
স্বপ্নের অন্তর্গত নক্ষত্রগুলো কি
এভাবেই নিভে যাওয়ার জন্যই জন্মায়?
হৃদয়ের উপকূলে যে রঙিন জোয়ার উঠেছিল,
তা কি কেবলই সময়ের নিষ্ঠুর ভাটার জন্য?
এ তো বিধানের শৃঙ্খলা নয়,
এ যেন নিয়মের ছদ্মবেশে
অনিয়মের দুর্গন্ধময় কারাগার—
যেখানে ন্যায়ের ভাষ্য লেখা হয়,
কিন্তু ন্যায় নিজেই বন্দী অন্ধকারে।
তোমাদের কি তবে মেধাবী বলবো,
নাকি ইতিহাসের নিষ্ঠুর প্রহরী—
যারা জ্ঞানের আলোকবৃত্তে দাঁড়িয়ে
অজ্ঞতার শৃঙ্খলই নির্মাণ করে?
বিস্ময় লাগে—
একই কণ্ঠে ভ্রাতৃত্বের মহিমান্বিত শ্লোক,
আর গোপন প্রাঙ্গণে প্রতারণার কৌশলচর্চা;
স্লোগানে ন্যায়বিচারের দীপ্তি,
কিন্তু ব্যবহারে অন্যায়ের অদৃশ্য সাম্রাজ্য।
মানুষ কি সত্যিই পারে
হিংসা ও অহংকারের অগ্নিবীজ
নিজের অন্তর থেকে নির্বাসিত করতে?
নাকি সভ্যতার আবরণে লুকিয়ে থাকে
প্রাচীন পশুত্বের অবিনাশী ছায়া?
তবুও মনে হয়—
এমন তো হওয়ার কথা ছিল না;
মানুষের ধর্ম তো ছিল আলোর দিকে যাত্রা,
তবু স্বার্থের বেদীতে
ধর্মই কেন বারবার বলিদান হয়?
সময়ের কাছে প্রশ্ন রেখে যাই—
যে পৃথিবী আমরা স্বপ্নে গড়েছিলাম,
সে কি সত্যিই এইরকম হওয়ার কথা ছিল?
দূরের দীপশিখা
তুমি মনে রেখো—
অস্তিত্বের গূঢ় উপকূলে
আমি এক নীরব অনুবাদক,
সময়ের অনির্ণেয় সমীকরণে হারিয়েও
তোমার নামই পাঠ করি অবিরত।
হয়তো আমাদের পথরেখা
কখনও সমাপতিত হবে না একই অক্ষরেখায়,
নিয়তির গুপ্ত লিপিতে
আমরা দু'জন দুই বিপরীত উপপাদ্য;
তবুও চেতনার অন্তর্লোকে
তুমি-ই আমার অনিবার্য পরিভাষা।
দূরত্ব—
ক্রমবর্ধমান এক প্রাচীর,
যার ইট গাঁথা হয়
অপ্রকাশিত বেদনা আর সময়ের স্তবকে;
তবুও অনুভূতির অধিবিদ্যা জানে—
কীভাবে অদৃশ্য স্রোতে ভেসে যেতে হয়
এক হৃদয় থেকে অন্য হৃদয়ের অতল গহ্বরে।
আমার প্রতিটি নিঃশ্বাস
একটি নীরব মন্ত্রোচ্চারণ,
যেখানে তোমার নামই
অনুরণিত হয় মহাকালের প্রান্তে;
প্রতিটি প্রার্থনা—
এক অনামা উপাসনা,
যেখানে তুমি-ই একমাত্র দেবতা,
আর আমি এক নির্বাক আরাধক।
এই ভালোবাসা—
কোনো অর্জনের সমীকরণ নয়,
বরং এক অন্তহীন অন্বেষণ,
যেখানে প্রাপ্তির চেয়ে
অপূর্ণতার দীপ্তিই অধিক উজ্জ্বল।
তুমি মনে রেখো—
না-পাওয়ার এই মহাকাব্যে
আমি এক অনন্ত চরিত্র,
যে শেষ অবধি বেঁচে থাকে
শুধু তোমার প্রতিধ্বনির ভেতরেই—
নিভৃতে, নির্জনে, নিঃশেষে।
মশার গণতন্ত্র
এই শহরে মশা বাহিনীর বাড়ছে খুব দাপট,
দিনে কম, রাত নামলেই বাড়ে তাদের জট।
ড্রেন ভরা, জল জমে—ওদের সুখের ঘর,
আমরা শুধু রক্তদাতা, তারা ধরণীধর।
কানের কাছে গুনগুনিয়ে গায় ভয়ের গান,
ঘুম এসেও আর আসে না,শুনে শ্লোগান।
হুল ফুটিয়ে নেয় যে রক্ত বড়োই অবিচার,
মশার সাথে যুদ্ধে নেমে হারি বারংবার।
কয়েল জ্বালি, স্প্রে ছিটাই—চলছে কত চেষ্টা,
মশা বলে—"এসব দিলে বাড়ে আরও তেষ্টা।
মশারি টানলেও খুঁজে নেয় ওরা গোপন পন্থা,
রক্ত খেয়ে বাড়ায় শক্তি,বাড়ায় দাপট,আস্থা।
ডেঙ্গুর ভয়, চিকুনগুনিয়া—নতুন নতুন চাল,
সাজিয়ে দেয় ডাক্তার বাবুকে অসুখেরই জাল।
আমরা শুধু চুলকাই বসে করি আহাজার,
ওরা নাকি উৎসব করে—"রক্ত আমাদের অধিকার!"
মানুষ নাকি মশার শহর—বুঝা আজকাল দায়,
মশার দাপটে নাগরিক সব আছে বেকায়দায়।
কবে যে মুক্তি মিলবে,মশার রাজত্ব থেকে,
নাকি মশাই শাসন করবে এই শহরটাকে!
ছুটির ডানায় ফিরে দেখা
যদি একটা ছুটি হতো, যেতাম আপন দেশে,
মনের ভিতর জমে থাকা স্বপ্ন হাসত শেষে।
ইচ্ছে গুলো ডানা মেলে উড়ত নীল আকাশে,
মুক্ত হাওয়ায় ভাসত হৃদয় সুখেরই আবেশে।
মাটির গন্ধ ভরিয়ে দিত বুকেরই শূন্যতা,
শেকড় ছুঁয়ে জেগে উঠত হারানো ব্যথার-কথা।
শৈশব ভেজা পথের ধুলো ডাকত নীরব সুরে,
ফিরে যেতাম ফেলে আসা স্মৃতির আপন ঘরে।
নদীর বুকে ভাসত আবার হাসির নৌকা-গান,
চেনা মুখের ভিড়ে পেতাম আপন পরিচয় খান।
মেঠো পথে হেঁটে হেঁটে খুঁজতাম সেইসব দিন,
যেখানে সব স্বপ্নগুলো ছিল রঙিন, অমলিন।
বকুল ফুলের গন্ধ মেখে জেগে উঠত মন,
চাঁদের আলোয় লিখতাম বসে হারানো সেই ক্ষণ।
যদি হতো খুশির ছুটি, মিলত প্রাণের টান,
নিজের ভিটায় গাইতাম আমি জীবনেরই গান।
অস্তিত্বের অন্তরালে সেই তুমি
চৈতন্যের গূঢ় প্রান্তরে যে অবয়ব অদৃশ্য,
তুমি সেই অনামা —
যার স্পর্শে জেগে ওঠে রঙের আদিম অভিধান,
অস্তিত্বের ক্যানভাসে আঁকা হয় অনন্তের প্রথম উচ্চারণ।
রামধনুর বহুরূপী বিভঙ্গে তুমি একক সুর,
অদ্বৈত দর্শনের নীরব অনুরণন—
তোমার উপস্থিতি, যেন সময়ের ভাঁজে লুকানো কোনো সূত্র,
যা উন্মোচিত হলেই সৃষ্টি পায় তার নিজস্ব ব্যাখ্যা।
হৃদয়ের অতল গহ্বরে যে অনুসন্ধান নিরবচ্ছিন্ন,
সেই যাত্রাপথের একমাত্র দিকনির্দেশ তুমি—
অজানার প্রতি যে আকর্ষণ, তারই মহাজাগতিক রূপ,
যেখানে আমি হারাই, আর তোমাতে খুঁজে পাই নিজেকে।
তুমি চন্দ্রালোক নও, তুমি তার উৎসগত ব্যঞ্জনা,
যে আলোতে অন্ধকারও হয়ে ওঠে অর্থবহ—
তোমার নৈঃশব্দ্য, যেন ভাষার অতীত কোনো তত্ত্ব,
যেখানে উচ্চারণ মানেই সীমাবদ্ধতা।
হৃদয়াকাশের অনন্ত বিস্তারে তুমি ধ্রুব,
আমার সকল সংশয় যার চারপাশে আবর্তিত—
তোমার রূপ, কোনো দৃশ্যমান প্রতিমা নয়,
বরং বোধের গভীরে স্থাপিত এক চিরন্তন প্রতীক।
জীবনের সমস্ত ভাঙাগড়া, সকল অস্থির সমীকরণ পেরিয়ে,
তুমি সেই অনিবার্য পুরুষ—
যার জন্যই রঙেরা পায় তাদের পরম সংজ্ঞা,
আর আমি, তোমারই অভিমুখে, হয়ে উঠি পূর্ণতার আরেক নাম।
ধাতব দ্বৈততার মূল্য-ভ্রান্তি
স্বর্ণমুদ্রা ঝলসে ওঠে রাজপথের শীর্ষ আলোয়,
তাম্রমুদ্রা পড়ে থাকে ধুলো জমা পথের ঢালোয়।
দু’টিই গড়া আগুনে, একই দহন, একই ঢালাই,
তবু একটির জন্য মেলা বসে, অন্যটি অবহেলায় ঠাঁই।
স্বর্ণের ঝংকারে খুলে যায় অগণিত দ্বারের কপাট,
তাম্রের স্পর্শে নড়ে না কোনো বন্ধ সম্ভ্রমের আঘাট।
একটি হাতে হাতে ঘুরে ক্ষমতার উষ্ণ পরশে,
অন্যটি হারায় নিঃশব্দে সময়ের দুখের নিঃশ্বাসে।
দু’টিরই ওজন সমান, একই ইতিহাসের রেখা,
তবু রঙের প্রলেপে বদলে যায় মূল্যবোধের লেখা।
স্বর্ণমুদ্রা উঠে যায় সিংহাসনের অলঙ্কার হয়ে,
তাম্রমুদ্রা মিশে থাকে জনতার নীরব ক্ষয়ে।
একটির নামে লেখা হয় কীর্তির দীপ্ত অধ্যায়,
অন্যটির কথা চাপা পড়ে বিস্মৃতির অন্ধকার ছায়ায়।
তবু গভীর খনিতে, সময়ের অদৃশ্য বিচারকালে,
তাম্রমুদ্রাই টিকে থাকে মাটির চিরন্তন জ্বালে।
কারণ স্বর্ণ ক্ষণিক জৌলুস—অবস্থানের উঁচু সিঁড়ি,
তাম্রের বুকে থাকে ইতিহাস—নির্ভীক, নির্লোভ কুঁড়ি।
শেষে সব আলো নিভে গেলে, সব পরিচয় গেলে ঝরে,
ধাতুর সত্যই জাগে—সমতার নির্মম সত্যের নীড়ে।
অনুপস্থিতির অদৃশ্য মহাকর্ষ
পাহাড় ভেঙে পড়লেও
মানচিত্রের রেখা খুব একটা বদলায় না—
শুধু কোনো এক উপত্যকায়
নীরবে জমে ওঠে ধুলো
আর নিঃশ্বাসহীন নীরবতা।
সমুদ্রও তো জানে—
এক ফোঁটা লবণজল শুকিয়ে গেলে
তার নীলত্ব কমে না খুব;
তবু গভীরের অন্ধকারে
কখনো কোনো ঢেউ
নিজেরই নাম ভুলে যায়।
আকাশে একটি তারা নিভে গেলে
রাত্রির অভিধান বদলায় না,
তবু দূরের কোনো নাবিক
হঠাৎ করেই হারিয়ে ফেলে
তার গোপন দিকনির্দেশ।
বনের ভেতর একটি বৃক্ষ ঝরে গেলে
সবুজের সমারোহ কমে না খুব;
শুধু কোনো অচেনা পাখি
খুঁজে পায় না আর
তার বহুদিনের চেনা ডাল।
পৃথিবী তবু পুরোনো ছন্দেই থাকে—
সূর্য ওঠে,
নদী বয়ে যায়,
বৃষ্টি মাটির কপালে
নীরব চুমু এঁকে দেয়।
তবু কোথাও কোথাও
জন্ম নেয় অদৃশ্য শূন্যতা—
যার কোনো নাম নেই,
কোনো ঘোষণা নেই;
শুধু নিঃশব্দে বদলে যায়
কারো অন্তর্গত ঋতুচক্র।
ক্ষমতার পুতুলনাট্য ও নীরব দর্শক
তুমিই তো সর্বজ্ঞতার স্বঘোষিত মন্দির।
প্রায় এক যুগের অনুশীলনে
দরবারি কৌশলের গুপ্ত ব্যাকরণ
তোমার আঙুলে হয়ে উঠেছে নিখুঁত ব্যঞ্জনা।
ক্ষমতার অলিন্দে তুমি নীরব কারিগর—
কলকব্জা নাড়ার সূক্ষ্ম বিদ্যায়
প্রভুর অনুকম্পার তালা খুলে ফেলো
অদৃশ্য চাবির মৃদু ঝংকারে।
আমরা তখনও অপরিণত উচ্চারণ—
স্বাধীনতার প্রথম স্বরবর্ণ
জড়তা নিয়ে লিখতে শিখি কেবল।
তোমরা বলো—
এটাই নিয়ম,
এভাবেই ইতিহাসের রথ চলে।
কিন্তু আমাদের চোখে পড়ে—
রথের লাগামটি
এখনো প্রাচীন প্রভুর হাতেই বাঁধা।
তোমার প্রজ্ঞা নিঃসন্দেহে বিস্ময়কর।
ক্ষমতার পুতুলনাট্যে
তুমি এক অনবদ্য সূতোর জাদুকর।
অদৃশ্য অঙ্গুলিহেলনে
চেয়ারগুলো স্থান পরিবর্তন করে,
আর করতালির প্রতিধ্বনি
দরবারের দেয়ালে
নৈতিকতার ছায়াকে আড়াল করে রাখে।
আমরা তবু প্রশ্নের নবজাত প্রাণ
স্বাধীনতার অভিধান খুঁজি।
ইতিহাসের পাতায় তাকিয়ে ভাবি—
পরাধীনতার শেকল
আসলেই কি কখনো ভেঙেছিল?
নাকি কেবল ধাতুর রঙ বদলে
লোহার স্থলে সোনালি অলঙ্কার?
প্রভুর অবয়ব বদলেছে,
কিন্তু প্রভুত্বের দর্শন
অপরিবর্তিতই রয়ে গেছে।
স্বৈরাচারী মানসের মহড়া
তাই আজও সমবেত শক্তিতে অটল—
যেন এক অদৃশ্য সংহতি,
যেখানে ভিন্ন মুখগুলো
একই ছায়ার অনুগত প্রতিরূপ।
আর আমি—
এই মহৎ প্রজ্ঞার নাট্যমঞ্চে
সম্ভবত একমাত্র অদক্ষ দর্শক।
দরবারি ব্যাকরণের
জটিল রূপতত্ত্ব
আমার আয়ত্তে আসেনি কখনো।
তাই সত্যকে
সরল রেখায় দেখে
নিজেকেই আবিষ্কার করি
নির্বোধের আসনে।
শেষাবধি
বোকা আমিটা বোকাই থেকে যাই—
কারণ আমার বিশ্বাস
এখনো অবিনশ্বর:
স্বাধীনতা কোনো প্রভুর দানপত্র নয়,
এটি মানুষের আত্মমর্যাদার
মৌলিক উচ্চারণ।
যেদিন সেই উচ্চারণ
দরবারি কোলাহল ভেদ করে উঠবে—
সেদিন হয়তো
প্রভুর প্রাঙ্গণে প্রজ্ঞার অভিনয় থেমে যাবে,
আর ক্ষমতার সিংহাসনের নিচে
প্রথমবারের মতো
মানুষের প্রকৃত ছায়া
দৃশ্যমান হবে।
মিষ্টি কথার জটিল গণিত
ভদ্রলোকের ভদ্র বচন—
চিনির থেকেও মিঠে,
শুনলেই মন গলে গিয়ে
হয়রে নরম পিঠে!
যেন শীতে খেজুর-গুড়ে
দুধে ভেজা পায়েস,
কথার ভাঁজে হাসির ঝিলিক—
পরনে স্টাইল-ড্রেস!
"আপনি সেরা! আপনি মহা!"—
বলতে নেই তাঁর জুড়ি,
ফুলতে ফুলতে কর্তা মশাই
বাড়ায় তাঁরই বুড়ি।
রসের ভাঁড়ে চামচ নেড়ে
ঢালেন মিষ্টি ঢেউ,
ক্ষেত্র বিশেষ দেখা যায় যে—
ধরা পড়েন কেউ!
হাসিমুখে চা এগিয়ে
বসুন মহাশয়,স্যার,
পাঁচ মিনিটে স্বাক্ষর সারা-
ফাইল যে করেন পার।
কথার ভিতরে মাখন-ঘি,
আরও কাজু-কিশমিশ,
হিসেব কষা ভদ্রলোকটি -
বড়োই জটিল জিনিস।
সবই কিন্তু ছল নয় ভাই
কথা সত্য মানি,
কিছু মানুষ নির্মল জ্যোৎস্না
অবিমিশ্র প্রাণী।
যার বাক্যে ফাঁদ নেই আর
স্বার্থে ও নেই গন্ধ,
তার মিষ্টতা দীর্ঘস্থায়ী—
মানুষ পায় আনন্দ।
পরিমিতির প্রকোষ্ঠে নির্বাসিত অরণ্য
আমি তখনো মহীরুহের স্বপ্নে উন্মুখ—
মৃত্তিকার অতল গর্ভে শিকড় প্রোথিত করে
অস্তিত্বকে স্থিতির দর্শনে স্থাপন করতে চাইতাম;
প্রখর রৌদ্রে দণ্ডায়মান থেকে
ঝঞ্ঝার সঙ্গে দ্বন্দ্বযুদ্ধে অবতীর্ণ হতে,
পাতার অন্তঃস্রোতে নিজস্ব ভাষ্যের লিপি উৎকীর্ণ করতে।
কিন্তু আমাকে প্রতিস্থাপিত করা হলো এক অলঙ্কৃত সীমানায়—
টবের সুশৃঙ্খল আবদ্ধতায়;
পরিমিত জল,
পরিমিত আলোক,
পরিমিত আকাঙ্ক্ষা—
যেন জীবনও একটি মাপজোখের প্রকল্প।
অদৃশ্য কাঁচির শীতল নিষ্ঠুরতায়
আমার শিকড়সমূহ ছেদন করা হলো নিঃশব্দে;
শাখাপল্লব কেটে দেওয়া হলো শৃঙ্খলার সুমধুর অজুহাতে।
তারা বলেছিল—
"সংকোচই শোভন,
সীমারেখাই সৌন্দর্য,
বিস্তারের স্পর্ধা অশোভন।"
ক্রমাগত নীরবতার অনুশীলনে
আমি রূপান্তরিত হলাম—
অরণ্যের অসীম সম্ভাবনা থেকে
কারুকার্য-নির্মিত এক সুশৃঙ্খল বনসাইয়ে;
বাহ্যিক পূর্ণতায় পরিপাটি,
অন্তর্গত বিস্তারে রুদ্ধ।
আমার উচ্চতা আর নক্ষত্রস্পর্শী নয়,
আমার ছায়া আর কারও ক্লান্তি আশ্রয় দেয় না;
বৃদ্ধির দিগন্তকে নান্দনিকতার নামে
কেউ একদিন পরিকল্পিতভাবে নির্বাসিত করেছে।
তবু এই অবরুদ্ধতার দায়
শুধু আমার নীরবতার উপর ন্যস্ত নয়—
দায় তাদেরও,
যারা শিষ্টতার কাঁটাতারে আমার কণ্ঠ পরিবেষ্টিত করেছিল;
যারা উচ্চারণকে অবাধ্যতা ঘোষণা করে বলেছিল—
"তোমার ক্ষুদ্রতাই তোমার গৌরব।"
আজ আমি অভিযোজিত—
নিস্তব্ধতার অভ্যাসে অর্জিত হয়েছে এক প্রকার স্থৈর্য,
এক প্রকার শূন্য-সমাহিত প্রশান্তি;
যেন আত্মসমর্পণও এক দার্শনিক অবস্থান।
তবু নিশীথের গভীর স্তব্ধতায়,
শুকনো পাতার ক্ষীণ ঘর্ষণে শুনতে পাই—
আমার অন্তঃকরণে এখনো এক সুপ্ত অরণ্য স্পন্দিত।
সে অরণ্য অবগত—
বনসাইয়েরও জিনগত স্মৃতিতে
মহীরুহের বীজ সুপ্ত থাকে;
স্বপ্নের অন্তত ভূগোলে
সে একদিন পূর্ণ বৃক্ষে পরিণত হবেই।
সেই মেয়েটি আজও দাঁড়িয়ে
সেই মেয়েটি আজও দাঁড়ায় শান্তির পথের ধারে,
চোখে তাহার নীরব ভাষা,জমা ব্যথার ভারে।
ভাঙা স্বপ্ন ঢেউ হয়ে যে আছড়ে পড়ে মনে,
তবু বাঁচে এই বিশ্বাসে—আলো আসবেই ক্ষণে।
ঝড়ের পরে ঝড় এসেছে থামেনি তাঁর চলা,
রাতের শেষে রোদের খোঁজে ক্লান্ত দুপুর বেলা।
অশ্রু লুকায় হাসির ভাঁজে শক্ত মুখোশ পরে,
নিজের কষ্ট নিজেই বয়ে নীরব রাখে ধরে।
পথের ধুলো পায়ে মেখে ছুটছে সে অবিরাম,
বুকের ভেতর যুদ্ধ চলে—নেই যে তাঁহার বিশ্রাম।
আপোষ করা শেখেনি সে, ক্লান্তি চোখের নীচে,
লড়াইগুলো নিত্য নতুন বুকের ভিতর ঘুচে।
নির্মম আঘাত, বজ্রাঘাত, ক্ষত হলো গভীর,
তবু আশার প্রদীপটুকু জ্বলছে যে অনড় স্থির।
ভেঙে পড়ার মুহূর্তেও সে খোঁজে ভোরের গান,
বিশ্বাস যে তার রৌদ্র হেসেই ভাঙাবে অভিমান।
কোলাহলে হারায় মেয়ের কণ্ঠ ভরা সে সুর,
তবুও সে তালাস করে বসন্ত ঋতুর।
সব হারানোর ভিড়েও সে হাল ছাড়েনি হায়,
সেই মেয়েটি দাঁড়ায় আছে —ক্ষয়িষ্ণু অসহায়।
প্রতিদিনের ভোটযুদ্ধ
নিত্যই লড়ি—
অবহেলার সঙ্গে,
ব্যঙ্গমুখের সঙ্গে,
অশুভ বার্তার সঙ্গে।
নিত্যই হেরে যাই—
মুখোশের নৃশংসতায়,
অচেনা শব্দের তীক্ষ্ণতায়,
দুঃখের অচেনা ভেলায়।
ভোটের মাঠে যাই না,
তবু প্রতিদিনই ভোট দিই—
ভয়ের পক্ষে,
নীরবতার পক্ষে,
নিজেকেই গুটিয়ে রাখার পক্ষে।
মুখোশেরা দাঁড়িয়ে আছে,
হাসির পেছনে লুকানো নখ,
নৈতিকতার স্লোগানে মোড়া
হিংস্র হিসাব বাক্স খুলে।
অচেনা শব্দ আসে—
"চুপ থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ",
"এতে তোমার কী আসে যায়",
"সবাই তো এমনই।"
ব্যালট পেপার চলে যায়
অচেনা হাতের দখলে,
আমি হেরে যাই
একটু একটু করে।
দিনশেষে দেখি—
স্বপ্নগুলো ক্ষণস্থায়ী,
সত্য দাঁড়িয়ে আছে বিরোধী দলে,
বিকৃত চিন্তার সংখ্যা অনন্ত।
এই শহরে কী হয়?ভোট উৎসব!
এ এক দীর্ঘ ক্ষয়,
যেখানে মানুষ প্রতিদিন
নিজেকেই হারায়—
ফল ঘোষণার আগে।
সত্তার অন্তর্গাথা
তিনি নন দৃশ্যমান প্রতিমা, নন অলংকারের অস্থায়ী প্রলেপ,
নন বাহ্যিক পরিধানের ভাঁজে বন্দী কোনো ক্ষণস্থায়ী রূপমায়া।
তিনি অন্তর্স্বরের গূঢ়তম অনুরণন,
চেতনার আকাশে নিবিড় দীপ্ত এক ধ্রুব নক্ষত্র—
অদৃশ্য অথচ অনিবার্য,
বিশ্বাসের কেন্দ্রস্থিত অচঞ্চল অক্ষ।
রক্তস্রোতের অনুবীক্ষণিক গতিতে তাঁরই স্বাক্ষর,
বিবেকের গভীর কোষে তাঁর নীরব বিধিবাক্য।
চিন্তার মহাশূন্যে তিনি দিকনির্দেশক আলোকবিন্দু,
অবচেতনের অতল স্তব্ধতায়ও তাঁর অমোঘ অধিষ্ঠান।
তিনি আচরণের অবয়বে অদৃশ্য অনুশাসন,
প্রতিটি কর্মের অভিঘাতে প্রেরণার কম্পন।
পথের ধূলিকণায়ও প্রতিফলিত তাঁর পদরেখা,
প্রতিটি পদক্ষেপে অনন্ত প্রত্যয়ের অনুলিখন।
বাহ্যবস্ত্রের আবরণে তাঁকে খোঁজা বিভ্রমমাত্র—
কারণ তিনি অনস্তিত্বের অন্তর্লয়ে সত্তার পরম স্বরূপ।
দেহের প্রদর্শনে নয়,
নীতির গভীরতম অনুরাগে,
নৈতিক স্পন্দনের নিভৃত প্রদেশে
তিনি জাগ্রত অন্তর্জাগতিক শাসনশক্তি।
যেখানে হৃদয় স্বচ্ছ,
সেখানে তাঁর অবিচল আসন;
যেখানে কর্ম নির্মল,
সেখানেই তাঁর উচ্চারণ।
তিনি নন সাময়িক উল্লাসের প্রদর্শনী—
তিনি অন্তর্লিখিত সত্য,
মানবসত্তার নীরব, শাশ্বত ঘোষণা।
নীরব বসন্ত
ফাল্গুন এলে বসন্ত রঙে সূর্যমুখী হাসে,
ঝাঁকে ঝাঁকে ভ্রমর নামে লাজে লুটায় পাশে।
অংশুমালীর একটুখানি চাহনির আশায়,
প্রস্ফুটিত সে প্রতিক্ষণে আলোর অন্বেষায়।
চেরাপুঞ্জির মেঘেরা তাই ঈর্ষায় কালো হয়,
আলোর প্রেমে ডুবে থাকা ফুল চেয়ে রয় বিস্ময়।
পরাগভরা উষ্ণ আবেশ কিরণে কিরণে দোলে,
নিঃশব্দ এক বুদ্ধিহীন প্রতীক্ষার দ্বার খোলে।
রাঙা ওষ্ঠে হাসি জমে কিরণ-নেশার রেশ,
পরিপূর্ণ হয় কি সাধ—জানে না সে বিদ্বেষ।
সূর্যের সাথে বলবার ছিল অগণন না-বলা কথা,
বিন্দু বিন্দু স্বপ্ন বুনে গেঁথেছিল ব্যথা।
কিন্তু হঠাৎ দমকা হাওয়ায় ভাঙল স্বপ্নজাল,
অব্যক্ত সব নীরব ভাষা উড়ল তুলোর পাল।
তবু সূর্যমুখী চেয়ে থাকে সূর্যালোকের পানে,
অন্ধ হয়েও পাপড়ি মেলে অনুরাগের টানে।
একদিন দিবাকর ডোবে অভিমানের ঘোরে,
উপেক্ষাকেই সঙ্গী করে ঝরে পড়ে সে ভোরে।
হারিয়ে যায় অচেনা পথে নিভৃত এক ঘরে,
ভালোবাসার নাম লিখে নীরবতার পরে।
সমুদ্রের নীলছায়া
হে সমুদ্র,
তোমার বিস্ময়কর সৌন্দর্য যেন অজস্র ভগ্নপ্রাণ মনকে ছুঁয়ে যায়,
নিয়মতান্ত্রিক জীবনের ধূসর সীমান্ত ছাড়িয়ে,
দূরত্বের বিভাজন ভাঙি, ছুটে চলি তোমার বিশাল, অজানা বুকের দিকে।
প্রতিটি নজরে আমি মুগ্ধ,
প্রতিটি স্পর্শে হারাই—
তোমার নিসর্গের রূপকথা যেন বুকে বাজে অশ্রু-মধুর নোট।
নীলতার অপূর্ব অন্দরে
তরঙ্গগুলো আছড়ে পড়ে উপকূলে,
সুরের ছন্দে ছড়ায় প্রণয়ের অদ্ভুত ধ্বনি।
ঢেউয়ের রহস্যময় তালে তালে ডাকে আমায়,
কানে কানে ফিসফিস করে শোনায় অচেনা কল্পনার গল্প।
আমি অবিকল মন্ত্রমুগ্ধ, বিমোহিত,
হে সমুদ্র, শুধুই তোমার দিকে।
তোমার বিস্তীর্ণ বুক, হিমছোঁয়া উদারতায় ভরা,
অজস্র জলরাশিতে ডুবে আমি যেন ভুলে যাই দুঃখ, ক্লান্তি, অভিশাপ।
তুমি দাও তৃপ্তির অমৃত,
অন্তরের ক্ষুধা মিটিয়ে দাও অদৃশ্য আলোয়।
তাইতো হৃদয় বারবার চায়—
তোমার কাছে ছুটে আসা, তোমার সঙ্গে একাকার হওয়া।
কখনো তুমি তাণ্ডবী, উত্তাল,
ভয়ংকর হাওয়ায় ঘূর্ণায়মান,
সুনামির মতো আকস্মিক হানা দিয়ে ভাঙো শান্তির দেউল।
বিকট গর্জন, ধ্বংস,
তবু তোমারই লোনা জল টানে বারবার।
পূর্ণিমার স্বচ্ছ আলোয় সিক্ত হয় অন্তর,
লহরীর সঙ্গে মিতালি করে জেগে ওঠে মন,
যন্ত্রণা, বেদনা ভেসে যায়,
হৃদয় সমুদ্রের তরে ছড়িয়ে দেয় সহস্রবার, সহস্র ক্ষণ।
হে সমুদ্র,
তোমার রহস্যময়, নাটকীয় সৌন্দর্য,
শান্তি ও তাণ্ডবের এক অবিরাম মেলবন্ধন,
আমায় ডেকে নেয় বারবার,
যেন একটি নতুন দিগন্ত,
যেখানে লহরীর সাথে মিলিত হয় মন,
যেখানে সমুদ্রের নীলেতে হারায় আমি।
ঘূর্ণিবায়ুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে
তুমি যখনই—
কালবৈশাখীর উন্মত্ত আহ্বান,
আমার নীরব ধরণী কেঁপে ওঠে
অস্থির অনুরণনে।
তুমি যখনই—
নির্দয় বজ্রাঘাতের তীব্রতা,
আমি হতে চাই
প্রশান্ত, শীতল—
অবিরল জলপ্রপাত।
তুমি যখনই—
অদম্য, ঘন অন্ধকার মেঘমালা,
আমি উন্মোচন করি
এলোমেলো আবেগের
রঙিন কাব্যকথা।
তুমি যখনই—
দগ্ধ উষ্ণতায়
শত ফারেনহাইটের সীমা,
আমি তখনই—
হাওয়াই মিঠাই,
শীতল স্বপ্নের নরম ছোঁয়া।
তুমি যখনই—
তেজস্বী ঘূর্ণিঝড়ের অহংকার,
আমি প্রার্থনা করি
এক মুঠো
নিঃস্বার্থ ভালোবাসার ধার।
তুমি যখনই—
রুদ্ধ দ্বার,
অনমনীয় প্রতিরোধ,
আমি নতশিরে মেনে নিই
তোমাতেই—
পরাজয়ের বোধ।
তুমি যখনই—
উত্তাপভরা এক উন্মত্ত নদী,
আমি খোলা চুলে
ঝাঁপ দিই—
অবাধে নিরবধি।
তুমি যখনই—
বৈরিতার বিবর্ণ,
ক্লান্ত সিন্ধু,
আমি হই—
অমত্ত, নির্ভীক
বৃষ্টিবিন্দু।
তুমি যখনই—
অশান্ত প্রবল স্রোতের ডাক,
আমি তখন
নববর্ষের পুষ্পিত বসুন্ধরা,
রঙিন পোস্টারে করি
নতুন শপথ।
তুমি যখনই—
ঘূর্ণিবায়ুর শনশন হাহাকার,
নব রূপে
আমি ছড়িয়ে দেই-
ভালোবাসার শিশির
সহস্রবার।
ধূলির স্বপ্ন
আমি তো চাইনি ঐ আকাশ টা ছুঁতে,
চাইনি ঐ চাঁদটার সঙ্গী হতে,
চাইনি তারাগুলো গুনতে;
চেয়েছি মাটির ধূলিকণার সাথে গড়াগড়ি করতে।
তবুও কেন ধূলো ঝড়ে হই বিধ্বস্ত,
তবুও কেন আকাশ ফুড়ে বজ্রধ্বনি করে উত্তাল।
আমি শুধু চেয়েছি নিশ্বাসে মাটির গন্ধ শুঁকে,
হাসি খুঁজে পেতে ধূলির মাঝে,
প্রতিটি কাঁটাতারের মাঝেও শান্তির অশ্রু ফোটাতে।
কিন্তু অচেতন বাতাসে ঝড় ওঠে,
থরথরে কাঁপে মন;
ধূলির গন্ধে ভেসে যায় আগুনের স্মৃতি,
আমার ক্ষুদ্র হাতেও আলোর চুম্বন পৌঁছায় না।
তবু আমি শিখেছি—
বজ্রধ্বনির মধ্যেও লুকিয়ে আছে মৃদু রাগ,
ধূলি ঝরে গেলেও জন্মায় নতুন পথের সূচনা।
আমি ঘুমিয়ে থাকি মাটির কোলে,
তবু স্বপ্ন বুনে যায় আকাশের বুকে—
চুপচাপ, অবাধ্য, অচেনা,
যেখানে ধূলির রঙে মিশে যায় আকাশের নীল।
নীরব অনশনের পদচিহ্ন
বহুদূর হেঁটে হেঁটে ক্লান্ত নাগরিক আমি,
সময়ের কংক্রিট পথে ক্ষয়ে যায় পদচিহ্ন
রাষ্ট্র জুড়ে ঘোষণার জল, তবু গলায়
তৃষ্ণা জমে থাকে নীরব অনশন।
কে দেবে জল?
এ প্রশ্ন আজ নিষিদ্ধ শব্দ,
বুকের ভিতর পুড়ে খাক হয়
নৈতিকতার অনির্বচনীয় দগ্ধবর্ণ।
মরুর বুকে শহর গজায়,
শহরের বুকে মরু—
মানুষ নামে প্রতীকগুলি
লাভের অক্ষরে আত্মহারা, শ্রুতি ও শ্রুতিহীন।
জিরোয় বসে শ্বাস নেই,
বাতাসে ভেজানো নেই কোনো সহমর্মিতা,
ভাবনার মেঘ রাষ্ট্রীয় বেগে
বিষণ্নতা ঢুকে পড়ে ব্যক্তিগত কোষে।
মাস পেরোয়, বছর বদলায়,
প্রতিশ্রুতির ক্যালেন্ডার ফুরোয়
স্বপ্নগুলো বজ্রাহত ফাইলে
নথিভুক্ত হয় অপ্রয়োজনীয় ঘোষণা হিসেবে।
জনশূন্য নয়—
তবু জনবিরল মনুষ্যত্ব,
শ্যাওলা ধরা নৈতিকতায়
পিছলে পড়ে পড়ে উঠি, আহত বিবেক নিয়ে।
বালুকাময় ভবিষ্যৎ পথে
ছায়া খুঁজি কোনো বৃক্ষের—
কিন্তু কংক্রিট সভ্যতায়
শেকড়হীন উন্নয়ন দাঁড়িয়ে থাকে নির্বিকার।
রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে
চোখ রাখি দৃঢ় রাখার অভিনয়ে,
মায়া আজ বিলাসী শব্দ—
সংবিধানে লেখা নেই তার ব্যবহারবিধি।
স্বেদে নিঃশেষিত দেহে
পানির চেয়ে ভারী হয়ে ওঠে প্রশ্ন,
আছে কীকোন পথিক?
এখনো মানুষ—
যে হাত বাড়ালে জল নয়,
ফিরে আসবে বিশ্বাস।
নীরবতার ভিতরে তুমি
অনুভূতিকে মাপার কোনো যন্ত্র নেই।
প্রতিদিন আমি তার ভার বয়ে চলি।
কিন্তু শব্দগুলো—
তার কাছে ছোট হয়ে পড়ে।
নীরবতা—
এটাই সবচেয়ে বড় ভাষা।
আমি থেমে থাকি,
শুধু তাকিয়ে থাকি।
ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই,
চোখ মেললেই তোমাকে দেখি।
তুমি জেগে থাকো
নিঃশ্বাসের পাশে,
জানালার ফাঁকে ফেলে আসা হালকা আলোয়।
কখন যে তুমি ঢুকে পড়ো
চুপিচুপি ভেতরে—
আমি টের পাই না।
তুমি থাকো খাবারের টেবিলে,
চায়ের গরম চুমুকে,
প্রতিটি পদচারণায়-
প্রতিটি ছায়ায়,
প্রতিটি নিঃশ্বাসে।
হৃদয়ের ভেতরে কতটা স্পন্দন হয়—
কীভাবে জানাই?
শব্দগুলো সেখানে পৌঁছানোর আগেই ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
শুধু জেনে নিও—
ভেজা চুলের ভাঁজে ভাঁজে
তুমি দোলা দাও,
ক্ষণে ক্ষণে।
অদৃশ্য স্পর্শে
মনে করিয়ে দাও তোমার অস্তিত্ব।
এখন আর শব্দের প্রয়োজন নেই।
তোমার নীরবতা
নিজেই একটি ডাকে পরিণত হয়েছে।
হৃদয়ের ভেতরে বাজে অদৃশ্য ধ্বনি,
যা শূন্যতার মাঝেও প্রতিধ্বনিত হয়।
তোমার নাম—
প্রতিটি নিঃশ্বাসে
নীরব অনশনের পদচিহ্ন
বহুদূর হেঁটে হেঁটে ক্লান্ত নাগরিক আমি,
সময়ের কংক্রিট পথে ক্ষয়ে যায় পদচিহ্ন
রাষ্ট্র জুড়ে ঘোষণার জল, তবু গলায়
তৃষ্ণা জমে থাকে নীরব অনশন।
কে দেবে জল?
এ প্রশ্ন আজ নিষিদ্ধ শব্দ,
বুকের ভিতর পুড়ে খাক হয়
নৈতিকতার অনির্বচনীয় দগ্ধবর্ণ।
মরুর বুকে শহর গজায়,
শহরের বুকে মরু—
মানুষ নামে প্রতীকগুলি
লাভের অক্ষরে আত্মহারা, শ্রুতি ও শ্রুতিহীন।
জিরোয় বসে শ্বাস নেই,
বাতাসে ভেজানো নেই কোনো সহমর্মিতা,
ভাবনার মেঘ রাষ্ট্রীয় বেগে
বিষণ্নতা ঢুকে পড়ে ব্যক্তিগত কোষে।
মাস পেরোয়, বছর বদলায়,
প্রতিশ্রুতির ক্যালেন্ডার ফুরোয়
স্বপ্নগুলো বজ্রাহত ফাইলে
নথিভুক্ত হয় অপ্রয়োজনীয় ঘোষণা হিসেবে।
জনশূন্য নয়—
তবু জনবিরল মনুষ্যত্ব,
শ্যাওলা ধরা নৈতিকতায়
পিছলে পড়ে পড়ে উঠি, আহত বিবেক নিয়ে।
বালুকাময় ভবিষ্যৎ পথে
ছায়া খুঁজি কোনো বৃক্ষের—
কিন্তু কংক্রিট সভ্যতায়
শেকড়হীন উন্নয়ন দাঁড়িয়ে থাকে নির্বিকার।
রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে
চোখ রাখি দৃঢ় রাখার অভিনয়ে,
মায়া আজ বিলাসী শব্দ—
সংবিধানে লেখা নেই তার ব্যবহারবিধি।
স্বেদে নিঃশেষিত দেহে
পানির চেয়ে ভারী হয়ে ওঠে প্রশ্ন,
আছে কীকোন পথিক?
এখনো মানুষ—
যে হাত বাড়ালে জল নয়,
ফিরে আসবে বিশ্বাস।
আসনের আলো ছায়া
চেয়ার পেলাম অনেক সাধের—
মনে এখন জোয়ার,
গতকালও ছিলাম তুচ্ছ
আজকে আমি স্যার,
চেয়ারের ওই চারটি পায়ে
দাপট চারিধারে,
বসে বসে দেই যে হুকুম—
চা আনো তো তেড়ে।
আগে যখন কাজে যেতাম
ঘাম ঝরত ক্লেশে,
এখন দেখি সবাই আসে—
আমার এক নির্দেশে!
চেয়ার যেন জাদুর ছোঁয়া
বদলায় যে কথার সুর,
“আপনি” ছেড়ে “তুমি”ডাকে
ক্ষমতার কেমন নূর!
ফাইল দেখে মাথা নাড়ে,
ভ্রুটা একটু কুঁচকে,
চেয়ার হেলান দিয়ে বলে
“লাঞ্চ আজ কি মুচমুচে?”
চেয়ার যত সাধের হোক,
মনে রেখো কথা—
চেয়ার থাকে,পাত্র বদলায়
এই তো জীবন প্রথা।
অনুরাগের নিঃশব্দ প্রত্নচিহ্ন
আমি—
অবহেলিত এক উদ্যানের নীরব বৃক্ষ,
ঋতুচক্রের ভিড়ে
যার দিকে ফেরে না কোনো দৃষ্টি।
কখনো—
অচেনা কোনো পথিক আসে,
ক্ষণিক মুগ্ধতায় থামে;
আমারই কোনো পুষ্প ছিঁড়ে নেয়,
সৌরভে ভিজে
ফিরে যায় নিজস্ব গতিপথে।
আমি তখন—
অপূর্ণতার দীর্ঘ প্রতিধ্বনি বুকে নিয়ে
দাঁড়িয়ে থাকি স্থির;
ঝরে পড়া পাপড়ির শব্দে
গুনি নিজের ক্ষয়।
আমার অস্তিত্ব—
স্পর্শের আগেই বিস্মৃত উচ্চারণ,
অথবা ব্যবহারের পর পরিত্যক্ত উপমা;
যেখানে ফিরে আসে না
অর্থের কোনো আলোকরেখা।
তবুও—
মাটির গভীরে জেগে থাকে অন্য সঞ্চার;
শিকড়েরা শেখায় স্থিতির দর্শন,
নির্লিপ্ততার গোপন অনুশীলন,
আর অব্যক্ত শক্তির সংহতি।
এখন আর আমি পুষ্প নই—
আমি হতে চাই অবিনশ্বর বৃক্ষ;
যার কাছে আসা যায়,
কিন্তু ছিন্ন করা যায় না সত্তা।
আমি দাঁড়িয়ে থাকি—
সময়ের অবিরাম স্রোতের বিপরীতে,
নিজস্ব নীরবতায় পূর্ণ,
অনাহত স্বাতন্ত্র্যের দীপ্তিতে অমলিন।
শূন্যতার গূঢ় অনুরণন
কাঁচ ভাঙে ঝনঝনে—ধ্বনি বাজে চারিধার,
মন ভাঙে নীরবতায়—শূন্যে ঢাকে অশ্রু-ভার।
দীপ নেভে দমকা হাওয়ায়—জ্বলে ওঠে ছাইয়ের গন্ধ,
হৃদয় নেভে অচেনা ক্ষয়ে—থাকে শুধু নীরব দ্বন্দ্ব।
চোখের জলে বৃষ্টি নামে—দেখে সবাই ভেজা পথ,
মনের জলে ডুবে থাকে—অদৃশ্য এক গহীন রথ।
ফুল ঝরে রঙ হারিয়ে—বাগান জুড়ে পড়ে রেশ,
স্বপ্ন ঝরে নিস্তব্ধতায়—শূন্যতায় অনিমেষ।
বীণার তার ছিঁড়ে গেলে—কাঁপে সুরের কান্না-রেখা,
প্রাণের তার ছিঁড়ে গেলে—কে শুনেছে সেই ব্যথা?
আকাশ ফেটে বজ্র নামে—চমকে ওঠে দিগন্ত-প্রান্ত,
অন্তর ফেটে অন্ধকারে—নামে রাত্রি অগাধ শান্ত।
শঙ্খ ভাঙে শব্দ তুলে—কাঁপে মন্দির, কাঁপে দ্বার,
বিশ্বাস ভাঙে নিঃশব্দে—ঝরে শুধু অদৃশ্য অশ্রুধার।
পাতা ঝরে শরৎ শেষে—দেখে সবাই ঋতুর রূপ,
মায়া ঝরে হৃদয়-ভেতর—ভেঙে হয় শূন্য কূপ।
মুক্তির বৃষ্টি
বন্দিদশার ক্ষতচিহ্ন এখনও বুকে জাগে নিঃশব্দ ব্যথা,
তবু মুক্তির বাতাসে জেগে ওঠে জীবনের গোপন ব্যাকুলতা।
দীর্ঘদিনের অবদমিত শ্বাস আজ ছন্দ খুঁজে পায় প্রাণে,
নিভে যাওয়া প্রদীপ আবার জ্বলে ওঠে আলোর টানে।
অশ্রুসিক্ত চোখে যে নীরবতা ছিল দীর্ঘ রজনীজুড়ে,
আজ সেখানে স্বপ্নেরা খেলে মুক্ত আকাশের নীল সুরে।
বেদনাঘন স্মৃতিরা ভেসে যায় সময়ের অনন্ত স্রোতে,
নতুন সুখের আলপনা আঁকে হৃদয়ের অনুভূতিতে।
শৃঙ্খলভাঙা পদচারণায় সে এগোয় দূর অনিশ্চিত পথে,
প্রতিটি ধাপে খুঁজে পায় হারানো সত্তা নতুন রথে।
যে হৃদয় ছিল স্থবির নির্যাতনের নিষ্ঠুর ভারে,
আজ সে হৃদয় সুর তোলে জীবনের অনাবিল আহ্বানে।
ঝরাপাতার মতো ঝরে পড়ে গ্লানির কালো স্মৃতি,
শ্রাবণের ধারায় ধুয়ে যায় যন্ত্রণার ক্লান্ত গীতি।
অশ্রু আর বর্ষার জল মিশে এক পবিত্র স্রোতধারায়,
পরিশুদ্ধ করে প্রাণ, জাগায় আশার দীপ্তিময় মায়ায়।
আজ সে দাঁড়ায় অনন্ত আকাশের অবাধ বিস্তারে,
নেই কারাবাস, নেই আর অমানিশার অন্ধকারে।
মুক্তির স্পর্শে জেগে ওঠে প্রতিটি অনুভব,
জীবন যেন নতুন লেখা এক অনন্ত কবিতার বৈভব।
তবু স্মৃতির গভীরে লুকিয়ে থাকে বন্দিশালার ছায়া,
মনে করিয়ে দেয়—অন্ধকারও ছিল এক নীরব মায়া।
সেই মায়া ভেঙে আজ সে আলোর পথের অভিযাত্রী,
দুঃখকে জয়ে রূপ দিয়ে হয়ে ওঠে নিজেই মুক্তির শ্রী।
----------------------
মেশকাতুন নাহার
প্রভাষক সমাজকর্ম
কচুয়া সরকারি ডিগ্রি কলেজ
চাঁদপুর।
Comments
Post a Comment