মস্তিষ্ক খোলা তবুও জানালা বন্ধ
মেশকাতুন নাহার
সমাজে এমন কিছু জীবাণু আছে, যাদের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে কোনো মাইক্রোস্কোপ লাগে না, কোনো পরীক্ষাগারের দরজাও খুলতে হয় না। তারা বইয়ের পাতায় থাকে না, হাসপাতালের তালিকাতেও নেই—তবু তারা দিব্যি বেঁচে থাকে, বেড়ে ওঠে, এবং এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে নির্বিঘ্নে ছড়িয়ে পড়ে। কুসংস্কার ঠিক তেমনই এক অদৃশ্য জীবাণু। এই জীবাণু এতটাই ভদ্র যে দরজায় কড়া না নেড়েই ঢুকে পড়ে, আবার এতটাই কৌশলী যে আক্রান্ত মানুষ নিজেও টের পায় না—সে কখন সংক্রমিত হয়ে গেছে।
এই ব্যাধির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর নীরবতা। এটি চেঁচিয়ে বলে না, "আমি কুসংস্কার"; বরং ফিসফিস করে বলে, "সাবধান থাকাই ভালো", "আগে থেকে এমনটাই চলে আসছে", কিংবা সবচেয়ে জনপ্রিয় বাক্যটি—"একবার মানলে ক্ষতি কী?" এই 'একবার'-ই বহুবারের ক্ষতির সূচনা করে। সমাজ ধীরে ধীরে এই ফিসফিসানিকে স্বাভাবিক শব্দ বলে মেনে নেয়, আর ঠিক তখনই কুসংস্কার স্থায়ী বাসা বাঁধে মানুষের চিন্তায়।
অনেকেই মনে করেন, কুসংস্কার মানেই অশিক্ষা। বাস্তবে বিষয়টি এত সরল নয়। এই রোগ নিরক্ষরতার ওপর নির্ভর করে না, বরং অনেক সময় এটি শিক্ষার পাশেই বসবাস করে। ডিগ্রি, সনদ, প্রশিক্ষণ—সবকিছুর পাশেই নির্বিকারভাবে দাঁড়িয়ে থাকে কিছু অযাচিত বিশ্বাস। মানুষ যুক্তি দিয়ে কাজ শেখে, কিন্তু বিশ্বাসের বেলায় যুক্তিকে ছুটি দিয়ে দেয়। ফলে এক অদ্ভুত দ্বৈত সত্তা তৈরি হয়—একদিকে আধুনিক চিন্তার দাবি, অন্যদিকে অদৃশ্য আশঙ্কার কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ।
কুসংস্কারের আরেকটি বড় সাফল্য হলো, এটি নিজেকে কখনো প্রশ্নের মুখে দাঁড়াতে দেয় না। কারণ প্রশ্ন তোলাটাই এখানে অস্বস্তিকর কাজ। প্রশ্ন মানেই ভিড় থেকে আলাদা হওয়া, প্রচলিত পথের বাইরে এক পা এগোনো। আর এই এক পা এগোনোর সাহস অনেকেই দেখাতে চান না। ফলে "সবাই তো মানে"—এই যুক্তিটাই হয়ে ওঠে সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। নিরাপদ বটে, কিন্তু বুদ্ধির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
এই ব্যাধি সমাজে ছড়ায় অভ্যাসের মাধ্যমে। ছোটবেলা থেকে দেখা, শোনা, অনুকরণ—এই তিনের সম্মিলিত ফলই কুসংস্কারকে দীর্ঘজীবী করে তোলে। কেউ যখন প্রশ্ন তোলে, তখন তাকে বোঝানো হয়—"এগুলো নিয়ে বেশি ভাবিস না।" ভাবনার এই নিষেধাজ্ঞাই কুসংস্কারের অক্সিজেন। চিন্তা বন্ধ হলেই বিশ্বাস ফুলে-ফেঁপে ওঠে।
সবচেয়ে হাস্যকর দৃশ্য দেখা যায় তখনই, যখন মানুষ এক হাতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে, আর অন্য হাতে অদৃশ্য আশঙ্কার ভার বহন করে। একদিকে তথ্যের পাহাড়, অন্যদিকে শোনা কথার পাহাড়—আর আশ্চর্যজনকভাবে দ্বিতীয় পাহাড়টাই অনেক সময় বেশি শক্ত মনে হয়। কারণ তথ্য যাচাই করতে হয়, কিন্তু বিশ্বাস শুধু মানলেই চলে।
কুসংস্কার খুব ধৈর্যশীল। এটি হঠাৎ করে সমাজ ভেঙে ফেলে না; বরং ধীরে ধীরে ভিতরে ভিতরে ক্ষয় ধরায়। যুক্তির জায়গায় সন্দেহ, আত্মবিশ্বাসের জায়গায় ভয়, সিদ্ধান্তের জায়গায় দ্বিধা ঢুকিয়ে দেয়। ফলে মানুষ নিজের সিদ্ধান্তের দায় নিতে চায় না। সবকিছুর জন্য দায়ী করা হয় পরিস্থিতি, সময়, কিংবা কোনো অদৃশ্য কারণকে। নিজের চিন্তাকে কাঠগড়ায় তোলার অভ্যাস ক্রমশ হারিয়ে যায়।
এই ব্যাধি শুধু ব্যক্তিগত আচরণে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি সামাজিক সিদ্ধান্তেও প্রভাব ফেলে। কখনো উন্নয়নের পথ আটকে দেয়, কখনো মানবিক বোধকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, আবার কখনো অকারণ বৈষম্যকে স্বাভাবিক বলে প্রতিষ্ঠা করে। অথচ এসবের দায় কুসংস্কারের ঘাড়ে না চাপিয়ে দেওয়া হয় ভাগ্যের ওপর। ভাগ্য এখানে নিরাপদ আসামি—কারণ সে কখনো প্রতিবাদ করে না।
কুসংস্কারকে অনেকেই ঐতিহ্যের মোড়কে মুড়ে রাখতে চান। কিন্তু সব পুরোনো জিনিস ঐতিহ্য হয় না, কিছু জিনিস কেবল পুরোনোই থাকে—অকার্যকর, ভারী এবং অপ্রয়োজনীয়। সমাজ যখন পুরোনো জিনিসকে যাচাই না করে বয়ে বেড়ায়, তখন নতুন চিন্তার জায়গা সংকুচিত হয়ে আসে। ফলাফল হিসেবে আমরা পাই এক স্থবির সমাজ, যেখানে পরিবর্তনকে ভয় পাওয়া হয় আর প্রশ্নকে সন্দেহের চোখে দেখা হয়।
এই রোগের চিকিৎসা আসলে খুব জটিল নয়, কিন্তু প্রয়োগের দিক থেকে কঠিন। কারণ চিকিৎসার নাম—চিন্তা। ওষুধের নাম—প্রশ্ন। আর নিয়ম—নিয়মিত অনুশীলন। প্রশ্ন করা মানেই অশ্রদ্ধা নয়, বরং দায়িত্বশীলতা। কিন্তু এই দায়িত্ব নিতে অনেকেই অনিচ্ছুক। কারণ প্রশ্ন করলে অনেক আরামদায়ক বিশ্বাস ভেঙে যায়, অনেক নিরাপদ আশ্রয় ধসে পড়ে।
একটি সুস্থ সমাজ গড়ে ওঠে তখনই, যখন মানুষ বিশ্বাসের আগে যুক্তিকে জায়গা দেয়। যেখানে শোনা কথার চেয়ে প্রমাণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ, আর ভয় নয়—চিন্তাই সিদ্ধান্তের চালক হয়। এই জায়গায় পৌঁছাতে হলে কোনো বিপ্লব দরকার নেই, দরকার প্রতিদিনের ছোট ছোট প্রশ্ন। কেন এমন করি? না করলে কী হয়? এর পেছনে যুক্তি কী?
যে সমাজ প্রশ্নকে ভয় পায়, সে সমাজ কুসংস্কারকে লালন করে—জেনেও, না জেনেও। আর যে সমাজ প্রশ্নকে স্বাগত জানায়, সে সমাজ ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠে। সুস্থতা মানে এখানে ভুল না করা নয়, বরং ভুল হলে তা সংশোধনের সাহস রাখা।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা খুব সহজ—আমরা কি চিন্তাশীল নাগরিক হতে চাই, নাকি অভ্যাসনির্ভর অনুসারী হয়েই সন্তুষ্ট থাকব? কুসংস্কার কোনো গৌরব নয়, কোনো পরিচয়ও নয়; এটি কেবল চিন্তার অলসতার দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণ। এই সংক্রমণ ভাঙতে হলে বড় বড় স্লোগান নয়, দরকার প্রতিদিনের ছোট্ট এক অভ্যাস—ভাবা।
যেদিন সমাজ ভাবতে শিখবে, সেদিন এই অদৃশ্য জীবাণু আর নির্বিঘ্নে বেঁচে থাকতে পারবে না।
Comments
Post a Comment