Skip to main content

বাঙালি আইকন ও বিরল প্রতিভার অধিকারী সত্যজিৎ রায়

বাঙালি আইকন ও বিরল প্রতিভার অধিকারী সত্যজিৎ রায়


পাভেল আমান -হরিহরপাড়া- মুর্শিদাবাদ:

আরো একটা ২ মে অর্থাৎ বাঙালি আইকন তথা বিরল প্রতিভার অধিকারী বাঙালি জাতিসত্তার অনন্য প্রতিভূ সত্যজিৎ রায়ের জন্মদিন আমরা পেরিয়ে এলাম। তাকে নিয়ে এখনো বাঙ্গালীদের মধ্যে জারি আছে নিরন্তর আলোচনা চর্চা ও গবেষণা । যে কজন প্রতিভাশীল ব্যক্তিত্ব কে নিয়ে বাঙালি গর্বিত প্রশংসিত সম্মানিত তন্মধ্যে সত্যজিৎ রায় একজন। বাংলা ভাষা সংস্কৃতি সাহিত্য তথা বাঙালি জাতিকে পৌঁছে দিয়েছিলেন বিশ্বের দরবারে  একজন বাঙালি জাতিসত্তার প্রতিভূ ও বার্তাবাহক হিসাবে। একথা জোর গলায় বলা যেতে পারে রবীন্দ্রনাথের পর তিনিই একমাত্র বহুমুখী প্রতিভা যার কাজে সারা বিশ্ব মোহিত হয়েছিল। তাঁর সিনেমা, গল্প, গান, ছবি – সব কিছুই মুগ্ধ করেছিল ভারত তথা গোটা পৃথিবীকে।ভারতবর্ষের প্রথম অস্কার জয়ী এই বাঙালি চিত্র পরিচালক বাংলা সিনেমার ইতিহাসকে পৌঁছে দিয়েছিলেন এক অন্য স্তরে। তাঁর প্রতিটি সিনেমাই সর্বকালীন। কোন নির্দিষ্ট যুগ বা সময়ে কখনোই বেঁধে রাখা যায়নি মানিক বাবুকে। তাঁর স্বতন্ত্র বাংলা সিনেমাগুলি বাঙালি ছাড়াও সমানভাবে স্পর্শ করেছিল বিভিন্ন কালের সমস্ত বিশ্ববাসীকে। সত্যজিৎ রায় জন্মেছিলেন বঙ্গীয় নবজাগরণের আলোয় উদ্ভাসিত এক পরিবারে। 
১৯২১ সালের ২মে, কলকাতার এক শিল্প ও সাহিত্য সমাজের বাঙ্গালি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন সত্যজিৎ রায়। তার পূর্বপুরুষরা ছিলেন বর্তমান বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদি উপজেলার মসূয়া গ্রামের অধিবাসী। তার দাদা উপেন্দ্রকিশোর রায় ছিলেন উনিশ শতকের বাংলার একজন বিখ্যাত লেখক, চিত্রকর ও দার্শনিক। উপেন্দ্রকিশোরের ছেলে সুকুমার রায় ছিলেন সত্যজিতের বাবা, যিনি ছিলেন বাংলা শিশু সাহিত্যের এক কিংবদন্তী শিল্পী।মাত্র তিন বছর বয়সেই বাবা সুকুমার মারা যান। মা সুপ্রভা দেবী বহু কষ্টে তাকে লালনপালন করেছেন। চারুকলার প্রতি প্রবল আগ্রহ থাকলেও তিনি কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে অর্থনীতি নিয়ে পড়েছেন। এরপর মায়ের উৎসাহ-উদ্দীপনায় রবি ঠাকুরের শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যান। এখানে থাকার সময়ই ভারতীয় শিল্প ও সংস্কৃতির ওপর সত্যজিতের গভীর শ্রদ্ধা ও অনুরাগ জন্মায়।১৯৪৩ সালে তিনি কলকাতায় ফিরে আসেন এবং মাত্র ৮০ টাকা বেতনে একটি বিজ্ঞাপন সংস্থায় ‘ভিজুয়ালাইজার’ হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। এখানে কাজ করার সময় তিনি অসংখ্য বইয়ের প্রচ্ছদ আঁকার সুযোগ পান। এসময় বিভূতিভূষণের বিখ্যাত উপন্যাস পথের পাঁচালীর একটি শিশু সংস্করণ নিয়ে কাজ করেন। এটি নিয়ে কাজ করতে গিয়ে তিনি খুবই অনুপ্রাণিত হন, যা পরে তিনি তার প্রথম চলচ্চিত্রে ব্যবহার করেন।পারিবারিক পরম্পরা ও পরিবেশ অবশ্যই অনুকূল ছিল তাঁর বড় হওয়ার পর্বে কিন্তু প্রতিভা তো শুধুমাত্র বংশপ্রবাহে বিচ্ছুরিত হয় না, তাকে আবাদ করতে হয়। সৃষ্টিশীলতার ক্ষেত্রে সত্যজিতের প্রস্তুতিপর্ব ছিল অসাধারণ। একজন মেধাবী ছাত্রের মতো মনঃসংযোগ করে শিখেছিলেন সঙ্গীত, চিত্রকলা, সাহিত্য, বিজ্ঞান ও সিনেমা। যেহেতু সিনেমার সঙ্গে সব ক’টি শিল্পমাধ্যমের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যোগাযোগ আছে তাই সত্যজিতের সিনেমাযাত্রা ছিল অনায়াস ও অনাবিল। অথচ নতুন কিছু শেখার তাগিদ ছিল জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। ‘অসম্ভব’ শব্দটা ওঁর অভিধানে ছিল না। শিখে, জেনে, অধ্যয়ন করে সৃষ্টিশীল কাজকে সম্ভব করতে হবে, এই ছিল তাঁর জীবনের মূলমন্ত্র। শিশু সাহিত্য ও গোয়েন্দা গল্পেও তিনি ছিলেন অসাধারণ তার শ্রেষ্ঠ চরিত্র ফেলুদা এখনো আপামর বাঙ্গালীদের কাছে সমানভাবে জনপ্রিয়।বাঙালির হলেও তিনি সর্বজনীন। ছবি তৈরিতে মহারাজা। যে কাহিনি পছন্দের তাকে নিয়ে সিনেমা বানিয়েছেন। যে শিল্পী উপযোগী, তাঁকে দিয়ে অভিনয় করিয়েছেন। তাঁর পরশে নবাগতরাও বিখ্যাত হয়েছেন। সংস্কৃতির বিভিন্ন শাখায় অবাধে ঘুরেছেন তিনি।সত্যজিৎ-ই প্রথম ভারতীয় পরিচালক যিনি চার্লি চ্যাপলিনের পরে সিনেমার জন্যে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পেয়েছেন ডক্টরেট ডিগ্রি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, জার্মানি, ইংল্যান্ড, জাপান প্রভৃতি দেশে আজও তিনি অম্লান।১৯৯২ সালের ২৩ এপ্রিল না ফেরার দেশে চলে যান এই কিংবদন্তি চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলা চলচ্চিত্র কেবল একজন কিংবদন্তী ব্যক্তিত্বকেই হারায়নি, সমাপ্তি ঘটে এক বর্ণিল ইতিহাসের। বাংলা চলচ্চিত্রে যার শূন্যতা আজও পূরণ হয়নি। বাঙালি মননে তিনি এখনো চির স্মরণীয় সম্মানিত আলোচিত ও প্রশংসিত তার ব্যক্তি সত্তা আদর্শ দেখানো পথকে অনুসরণে। মনে প্রানে প্রগতিশীল ও আধুনিক চিন্তাভাবনার অনুসারী হলেও তিনি ছিলেন পুরোদস্তুর বাঙালি যার পরতে পরতে বাংলা সাহিত্য সংস্কৃতি কৃষ্টি, সমন্বয়ের চেতনা সম্প্রীতির ভাবনা জাগরুক। সত্যজিৎ রায় চিরকালীন বিশ্বজনীন সর্বজন প্রিয় ও শ্রদ্ধেয় এক ব্যক্তিত্ব। তার সৃষ্টিশীল চেতনা ভাবনা প্রগতিশীল আদর্শ অনুসরণে বাঙালিরা উৎকর্ষতাকে নিয়ে এগিয়ে যাবে সম্মুখে। 


Comments

বিধিবদ্ধ স্বীকার্য :

লেখার বক্তব্যের দায়িত্ব লেখকের, পত্রিকার নয়। আমরা বহু মতের প্রকাশক মাত্র।

সাম্প্রতিক বাছাই

বছরের বাছাই

মাসের বাছাই