গুচ্ছকবিতা ।। উৎপল হালদার
মদিরা মধুর
ময়না ফুলের গয়না গায়
রঙিন নেশা যায় দুলিয়ে ---
বাসন্তিকা রঙ ভরা দুচোখে
স্বপ্ন আমার যায় বুলিয়ে।
ময়না ফুলের কাঁকণ পরা
জোছনা-আঁচল সহচরী ---
বিজন রাতে গোপন মনের
মোহিনী বঁধু , রূপসী পরী।
ময়না ফুলের মোহন মালা
জড়িয়ে খোঁপায় অপরূপ ---
চাঁদনী রাতে মদিরা মৌতাতে
আঁখির পাতে স্বপ্ন আছে চুপ।
ময়না ফুলের নূপুর পায়ে
ফেললে রসিক আলপনা ---
রাগ-রাগিনীর ঐ গুঞ্জরণে
রঙিন মনের কলপনা।
ময়না ফুলের ঝুমকো পাশা
কাজল টানা নয়ন পাতে---
কোন সে নেশায় কিসের টানে
মদির আঁখি চাঁদনী রাতে।
মৌলিক ছড়া
বাজে কেন ঢাক
ওড়ে কেন কাক
কেন ডাক হাঁক
এত কেন জাঁক
ডাকে কেন নাক
মুখ কেন ফাঁক !
কেন এত গন্ধ
চোখ কেন বন্ধ
কর কেন সন্দ
মিছে মিছে দন্দ
ভাগ্য কেন মন্দ
সব দেখি অন্ধ !
আড়া ভরা ধন
অসাধ্য সাধন
ঐ গন্ধমাদন
হবে মহা রণ
শক্ত কর মন
ওড়াবে পবন !
নাক কেন খাঁদা
সব কেন হাঁদা
চোখ কেন বাঁধা
দেখ কেন ধাঁধা
নোট গাদা গাদা
মনে শুধু কাদা !
দিস কেন হামা
দাড়ি-গোঁফ কামা
যারা ধরে ধামা
তারা হয় মামা
নাকে ঘষ ঝামা
বদমাশি থামা !
নয় উপহাস
গরুশালে বাস
কাটে দিন মাস
ঝেড়ে বাপু কাশ
পর্দা হল ফাঁস
ভেসে আসে লাশ !
থোড় বড়ি খাড়া
মাথা কেন নেড়া
জেনে গেছে পাড়া
নেই কেন সাড়া
ভোটে তাই দাঁড়া
কেটে যাবে ফাঁড়া !
ভোজবাজী
বিলাস ব্যসনে মত্ত যত
মোহর লুব্ধ বিলাসী বাঁদর
লালসা কুটিল বিকিকিনি ----
মিথ্যা গৌরবে করে কদর ।
পাওনা-দেনার দমকা সুখে
বেনের সাথে গাঁটছড়া
নারায়ণ বিরস বদন----
নতুন নিয়ম মনগড়া ।
উড়িয়ে দেয় অনুশোচনা
কেমন রসের রসায়ন
ওদের ছলের ঘুর্ণিপাকে---
রিক্তের সিক্ত হল দুনয়ন।
চলছে খুশির সওদাগরী
কুটিল চোখের কৌশলে
দরাজ মনের সদর পথে --
কুলুপ আঁটা আশার ফলে।
দিল্ বিকিয়ে চোরের হাটে
বিসর্জনের ঘুরণ পাকে
পুরনো কেতাব বাতিল করে
ছড়িয়ে দিল পথের বাঁকে।
জুয়াচুরির কারবারে পাকা
মহান দিগ্গজ পাজী
ডিগবাজি খায় ডিক্সনারী
বাক্য-জালের ভোজবাজী।
মর্মভেদী
পাষাণের মর্ম ভেদি উঠিছে রুধিরের ফোয়ারা
সভ্যতার অন্তরে উচ্ছৃঙ্খল ভীষণ কোলাহল !
মৃগতৃষ্ণিকার ক্ষনস্থায়ী আশার দুয়ার রুদ্ধ
মৌন আঁখি ছল ছল সম্মুখে অন্ধ কালো
যবনিকা।
দিকে দিকে কুয়াশার মতো হাহাকার জেগে রয়
ধরণীর নিবিড় বন্ধন শিথিল হয়ে যায় ---
শেষ হয়ে এল বাঁচিবার সব আর্তনাদ
সহসা ফুরিয়ে গেল জীবন খাতার সব পাতা !
সবুজ পাতায় ঘেরা হলুদ ফুলের রূপটান
গভীর শীতের রাতে গোলাপের মায়াবী আঘ্রাণ
অবসাদঘন হৃদয়ে সবই পিপাসার গান----
ব্যথিত অতীত , শত বর্তমান এবং আগামী
সবই আলেয়া বিহীন জীবনের রুক্ষ মরুভূমি।
উদ্বেলিছে মধ্যনিশীথের রহস্যের রাজপথ -
রুঢ় বাস্তবের ছিন্ন বাস , ক্ষুধার্ত জঠরে রয়
সপ্তর্ষি-সাতটি তারার নির্লিপ্ত অমর স্বাক্ষর।
নিশিপদ্ম
বিকেলের কোমল মুহূর্তে ধননন্দ
দেখছেন শোনের তরঙ্গ-মালা ছন্দ।
কাঁকরের পথ ধরে ষোড়শী যুবতী
চলেছে খেয়া ঘাটে, সুন্দরী সুমতি।
ভ্রাতৃ-আলয়ের পথে আজ একাকিনী
বন্ধ্যা অপবাদে বিতাড়িতা অনাথিনী।
নব বধূ সাজে গিয়েছিল এই পথে --
ছিল কত লোক তার পালকির সাথে।
বারো বছরের বালিকা, বধূর বেশে
দুচোখ ভরা কত রঙিন স্বপ্নে ভেসে --
সে স্বপ্ন হারিয়ে গিয়েছে কালের স্রোতে
লাঞ্ছিতা সে আজ,বেঁচে আছে কোনমতে !
যুবরাজ ধননন্দের নয়ন পথে
এল সেই অনাথিনী বধূ আচম্বিতে।
- কাননের মধ্যে সুন্দরী মনমোহিনী !
প্রশ্ন করে যুবক - কে তুমি একাকিনী
কোথা থেকে আসছ, চলেছ কোথায়
এই স্থানে থাকা আর নিরাপদ নয়
সন্ধ্যায় বন্ধ হয়েছে খেয়া পারাপার
স্বাপদপূর্ণ এ বনে নেমেছে আঁধার।
- নাম 'মুরা', আমি মৌরীয়কুলের বধূ
তার কথা বলে মুরা সংক্ষেপে শুধু ।
আঁধারে চলেনা খেয়া বন্ধ পারাপার
কাল প্রভাতে শুরু হবে খেয়া আবার
হে মহাত্মন এখন কি হবে উপায়
কৃপা করে দিন এক রাত্রির আশ্রয়,
মনে হচ্ছে রাজপুরুষ, হে মহামান্য
আপন পরিচয় দানে করুন ধন্য ।
- মগধ প্রাসাদে থাকি, নাম ধননন্দ
এ অরণ্যে করছি শিকারের আনন্দ,
আমার শিবিরে যেতে পার ইচ্ছা হলে
খেয়াঘাটে পৌঁছিয়ে দেব কাল সকালে।
পাবে খাদ্য, শঙ্কাহীণ কাটবে রজনী
নতুবা কোথায় যাবে হে চারুবদনী ?
-যুবরাজ ধননন্দ ! প্রণাম অধমার,
পথশ্রমে ক্লিষ্ট আমি, তায় অনাহার
এ নিবিড় কানন ভয়ংকর অতি
অসীম কৃপা আপনার হে মহামতি
কাটাব নিঃশঙ্কায় আজ এ যামিনী
শরণ নিল আপনার এই অভাগিনী।
এইরূপে আলোচনা হয় দুজনায়
নানা কথায় দ্রুত সময় চলে যায়-
ধননন্দ বলেন , মন হলো উদাসী
তোমায় দেখে মুগ্ধ আমি ওহে রূপসী!
বেড়ে যায় নিশিত হল ঘন আঁধার
আরোহন কর এই ঘোড়াতে আমার।
ঘোড়ায় চড়ে মুরা বলে- হে যুবরাজ
এই নিশিথে হৃদয় হারালাম আজ !
শোনের তীরেতে নিবিড় এই কানন
তার বিস্তার যোজনের পর যোজন
শাল আমলকী জাম মহুয়া গামারি
দেবদারু আর তমালের জড়াজড়ি।
রাত্রিতে জ্বলে উঠলো মশালের সারি
গুটিকয়েক শিবিরকে বেষ্টন করি--
ধননন্দ সেথায় এলেন ঘোড়ায় চড়ি
নিচে নেমে মুরাকে নামান হাত ধরি।
উত্তম আহার ও পানীয় ভৃত্যে আনে
গ্রহন করেন তা' শিবির মধ্যে দুজনে।
নিশি শয্যা রচে ভৃত্যে প্রভুর আদেশে
নারীর শয্যা রচে তাঁর প্রকষ্ঠ পাশে--
উৎসব থেমে গেছে রাত শব্দহীণ
অনুচরেরা মদিরার রঙে রঙিন --
শোনের উষ্ণ শ্রোতের মতো বয়ে যায়
তাঁর শরীরের শিরায় উপশিরায়
অব্যক্ত সেই কামনার মহাকল্লোল--
সহসা নারী কন্ঠের তীব্র আর্তনাদ
দেখেছে স্বপ্নে, ঘটেছে বিষম প্রমাদ
আক্রান্ত হয়ে একটি সিংহের হাতে
ক্ষতবিক্ষত সে নখ-দন্তের আঘাতে।
মুহূর্তের মধ্যে ধননন্দ হাতে অসি
পর্দা সরিয়ে মুরার কক্ষ মধ্যে পশি
দেখলেন এক মায়া হরিণীর প্রায়
বিহ্বল আঁখি মেলে বসে আছে শয্যায়!
আশ্বাসেন ধননন্দ - আমি আছি পাশে
সাধ্য নেই কারোর, এই কক্ষেতে আসে--
মায়া হরিণী দিল ধরা বাহু-বন্ধনে
সে রাতে ধননন্দের দৃঢ় আলিঙ্গনে !
রইল অটুট সারারাত সে বন্ধন--
দুইটি প্রাণে জাগল মধুর স্পন্দন !
সাঁঝের শুকতারা যেন ফুটেছে সদ্য
যুবরাজ বক্ষে নিশিথের 'নিশিপদ্ম' !
...............................

Comments
Post a Comment