
মুখে বাঙালি
বিবেক পাল
অমলবাবু আজ নববর্ষ। ভেবেছিলেন একটু দেরি করেই উঠবেন। গতকাল বাংলার সেরা এক মেগা সিরিয়াল চ্যানেল তাঁকে "সেরা বাঙালি মধ্যবিত্ত ২০২৫" সম্মানে ভূষিত করেছে। জীবনে এ এক অকল্পনীয় প্রাপ্তি। তবে এটুকু বলা অন্যায় হবে যে, তাঁর নিজের কোনো ভূমিকা নেই—ছিল, এবং তা যথেষ্টই ছিল।
বাঙলার এক প্রথম সারির দৈনিকে— "বাঙালি মধ্যবিত্তের মতো এত সাহসী আর কোনো জাতির মধ্যবিত্তদের মধ্যে পাওয়া যাবে না"—শীর্ষক প্রবন্ধে প্রথম হয়ে তিনি আলোচনায় আসেন। সেই সূত্রে নন্দনে বক্তৃতা দেওয়ার সুযোগ, সেখানেও প্রথম। আর সেই ধারাবাহিক সাফল্যেরই চূড়ান্ত রূপ—টেলিভিশনের পর্দায় উঠে আসা এই সম্মান।
পুরস্কার পাওয়ার পর তিনি মনে মনে কয়েকবার হেসেছেন—একটা অদ্ভুত আত্মতৃপ্তির হাসি। যেন নিজেরই বানানো কথার ওপর দাঁড়িয়ে নিজেই নিজেকে অভিনন্দন জানাচ্ছেন।
এখন তিনি পাড়ার গর্ব।
এ পাড়ায় কেউ কোনোদিন টিভির পর্দায় ভাসেনি। কেউ লাখ টাকার লক্ষ্মীলাভে নাম লেখাতে পারেনি। সেখানে অমলবাবু—"সেরা বাঙালি"—বুকটা একটু বেশিই ফুলবে, সেটাই স্বাভাবিক।
তবু ভেতরে ভেতরে তাঁর একটা ক্ষীণ আশা ছিল—আজ থেকে সৌদামিনী হয়তো একটু অন্য চোখে দেখবে। হয়তো কথার সুর বদলাবে, হয়তো আচরণে আসবে সামান্য সমীহ। স্বামীর জন্য একফোঁটা গর্ব—এইটুকুই তো চাওয়া।
কিন্তু সকাল না হতেই সেই আশার বেলুন ফেটে গেল।
—"কি হল? একটা টিনের চাকতি পেয়ে মনে হচ্ছে বিশ্ব জয় করে এসেছ! বাজারের মাছওয়ালা, সবজিওয়ালা বাড়িতে এসে বিনে পয়সায় জিনিস দিয়ে যাবে নাকি?"
অমলবাবু চুপ করে শোনেন।
—"আজ যদি অফিস কামাই করো, ঘোষালবাবু ফুল দিয়ে পূজা করবেন? শোনো, ব্যাগ রেডি। আমি চায়ের জল চাপাচ্ছি। এসে যদি দেখি বিছানার ষাঁড়ের মতো পড়ে আছো—আমি কিন্তু সোজা দাদার বাড়ি চলে যাব! বলব—তোমার জামাইবাবু এখন বিখ্যাত হয়েছেন, ছাপোষা গিন্নি আর মানায় না, এবার মেমসাহেব চাই!"
সৌদামিনীর গলায় তীক্ষ্ণ বিদ্রূপ, কিন্তু তার ভেতরে লুকোনো আছে সংসারের বাস্তবতার নির্মম সত্য।
অমলবাবু আর কথা বাড়ান না। ব্যাগ তুলে নেন। মুখে কোনো প্রতিবাদ নেই—শুধু একটুখানি চাপা দীর্ঘশ্বাস।
দরজার বাইরে পা রাখতেই দৃশ্য বদলে যায়।
পাড়ার মেয়েরা তাঁকে ঘিরে ধরে। গলায় মালা পরিয়ে দেয়, কেউ হাততালি দেয়, কেউ মজা করে বলে—"আমাদের অমলদা এখন বড় মানুষ!"
এই সামান্য অভিনন্দনেই অমলবাবুর বুক যেন আবার ফুলে ওঠে। কয়েক মুহূর্তের জন্য তিনি সত্যিই বিশ্বাস করতে শুরু করেন—তিনি আলাদা, তিনি বড়।
কিন্তু এই দৃশ্য যদি চায়ের দোকানের বন্ধুরা না দেখে—তবে সেই গৌরব যেন অপূর্ণ থেকে যায়।
তাই বাজারে যাওয়ার আগে তিনি সোজা গিয়ে বসেন গোপালের চায়ের দোকানের সামনে বেঞ্চে। লুঙ্গির কোঁচা একটু আলগা করে, গলার মালাটা ঠিকঠাক করে এমনভাবে বসেন—যাতে পথচারীর চোখে পড়ে।
চায়ের কাপে ধোঁয়া উঠছে।
দোকানের নিয়মিত আড্ডাবাজরা ধীরে ধীরে জড়ো হচ্ছে।
অমলবাবু নিজেই শুরু করেন—
—"গোপালদা, কী দেখছ? বুঝতে পারছ না? তোমরা সিরিয়াল দেখার সময় পাও না, তাই জানো না…"
তারপর গলা চড়িয়ে—
—"আমরা বাঙালিরা ভীরু নই। আমরা সাহসী, যুক্তিবাদী, সহিষ্ণু। ইতিহাস সাক্ষী—প্রতিটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমরা মাথা তুলে দাঁড়িয়েছি! আর এই যে স্বীকৃতি—এই মালা, এই সম্মান—সেটাই তার প্রমাণ!"
দোকানের সবাই প্রথমে মুগ্ধ হয়ে শোনে।
তারপর ধীরে ধীরে সেই মুগ্ধতার জায়গায় জায়গা নেয় এক চেনা, তীক্ষ্ণ হাসি।
শম্ভু চায়ের কাপ নামিয়ে বলল,
—"দেখলাম অমল, কাল টিভিতে তোকে। বুকটা গর্বে ভরে যাচ্ছিল—আমাদের অমল, সেলিব্রিটি হয়ে গেছে!"
অমলবাবু হেসে বললেন,
—"আরে, আমি তোদেরই লোক…"
হাততালি পড়ে। ঠিক সেই সময় শম্ভু হঠাৎ এক চিমটি কাটে—কাঠপিঁপড়ের মতো জ্বালা।
—"বলছি অমলভাই, আজকের এই আনন্দের দিনে—তোর নিজের জীবনের একটা-দুটো সাহসের কাহিনি শোনা যাক না?"
অমলবাবুর গলার জোর এক মুহূর্তে কমে যায়।
—"মানে… এইসব তো সামগ্রিক কথা…"
বিপ্লব এগিয়ে আসে—
—"না না, ব্যক্তিগত। ধর, বাড়িতে বৌদি রেগে গেলে?"
অমলবাবুর মনে পড়ে যায় সেই দুপুর—
একটু নুন বেশি হওয়ার জন্য তিন দিনের নির্বাসন।
—"সংসারে একটু সমঝোতা…"—তিনি বলেন।
—"প্রথম যুদ্ধে আত্মসমর্পণ!"—শম্ভু।
হাসি।
নিতাই বলে—
—"অফিসে বসের অন্যায়?"
—"সব জায়গায় লড়াই করা যায় না…"
—"দ্বিতীয় যুদ্ধে পতাকা নামানো!"—বিপ্লব।
হাসি এবার ধারালো।
রঘু বলে—
—"পাড়ার চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে?"
—"সব সময় ঝুঁকি নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়…"
—"তৃতীয় ক্ষেত্রেও পলায়ন!"—নিতাই।
এবার হাসি কমে যায়।
শেষ প্রশ্ন—
—"ট্রেনে টিকিট না কেটে উঠেছিলি তো?"
অমলবাবুর মুখ শুকিয়ে যায়।
চেকারের সামনে দাঁড়িয়ে কাঁপতে থাকা সেই লজ্জা, সেই ভয়—সব আবার ফিরে আসে।
তিনি চুপ করে থাকেন।
শম্ভু ধীরে বলে—
—"দেখেছিলাম—কেমন নাস্তানাবুদ হচ্ছিলি…"
নীরবতা।
অমলবাবুর নিজের লেখা শব্দগুলো যেন ফিরে এসে তাঁকে আঘাত করে—
"সাহস"… "বিচক্ষণতা"… "সহিষ্ণুতা"…
তিনি ধীরে বলেন—
—"তোরা ভুল বলছিস না। আমরা সাহসী—কিন্তু মুখে। কাজের সময় এসে আমরা হিসেব করি, ভয় পাই, মানিয়ে নিই…"
বিপ্লব এবার শান্ত—
—"তোর লেখা মিথ্যে নয় অমল। ওটা আমাদের সম্ভাবনা। কিন্তু আমরা এখনও সেখানে পৌঁছইনি।"
চায়ের দোকানের কোলাহল আবার স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।
কিন্তু অমলবাবুর ভেতরে নেমে আসে এক গভীর নীরবতা।
বুক দশ হাত চওড়া করে বসা মানুষটা ধীরে ধীরে সঙ্কুচিত হয়ে যায়।
গলার মালাটা তখনও ঝুলছে—কিন্তু তার ওজন যেন হঠাৎ বেড়ে গেছে।মনে হচ্ছে আজকের এই নববর্ষের মতো কেউ কোনদিন এমনি করে চোখে আঙুল দিয়ে পরম সত্যটা দেখিয়ে দেয় নি
অমলবাবু উঠে দাঁড়ান।
আজ আর কোনো বক্তৃতা নেই।
শুধু একটাই প্রশ্ন—
মুখে যে বাঙালি, সে কি কোনোদিন কাজে বাঙালি হতে পারবে?
.............................
বিবেক পাল
নেতাজী পল্লী ,সোনারপুর , কোলকাতা -৭০০১৫০
Comments
Post a Comment