প্রবন্ধ
নববর্ষের স্মৃতি
সোনালী সরকার
নববর্ষ মানে নতুন বছর বা নতুন জন্ম। এপ্রিল মাস মানেই নববর্ষের মাস। চৈত্রের করা বসন কাটিয়ে স্বাগত করি বৈশাখের।আমরা কেউ কেউ একে মহাব্রত ও বলে থাকি। পহেলা বৈশাখ মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বাঙালীর প্রাণের উৎসবে পরিণত হয়। আমাদের বাংলার কেউ কেউ একে মহাব্রত ও বলে থাকেন।আমরা যখন ছোটো ছিলাম তখন কাকুর মুখে শুনেছি মোঘল সম্রাট আকবরের আমলে ফসল কাটার মরসুমে চাষীদের কাছে খাজনা আদায় করা হতো।পরে এটা পরিবর্তিত হয়ে পহেলা বৈশাখের রূপ নেয়। কেউ কেউ মনে করেন গৌড়ের রাজা শশাঙ্কের আমলে নববর্ষ উদযাপন এর রীতি আসে।এই উৎসব লোকসংস্কৃতির মূল দর্শন। নববর্ষের শুভক্ষণ দেখে চাষ করতে হয়।কাকু বলতেন, মাঠের পূর্ব দিক থেকে হাল ধরা উচিত ।তবে কৃষিকাজে উন্নতি ঘটে।চাষীরা এই নিয়ম মেনে চলেন আজ ও।এই উৎসব সব জীর্ণ জরা পেছনে ফেলে নতুন অঙ্গীকার নিয়ে জীবন শুরু করার নিদর্শন।এটা ক্যালান্ডারের একটা মাস কিংবা বছর পরিবর্তন নয় এটা মানুষের জীবনের পরিবর্তন, বাঙালির মিলন উৎসব, সংস্কৃতির উৎসব।ঐ যে। কথায় আছে দূর হলেও বাঙালি তার শেকড় ভোলে না। নতুন বছরে নতুন দিনে আমাদের বাড়িতে বা আমাদের গ্রামে মঙ্গল শোভাযাত্রার মাধ্যমে দিনটি শুরু হতো। বাড়ির পাশে একটা বিরাট বট গাছ ছিল আমাদের। সেখানে তেল সিঁদুর লাগিয়ে নতুন অরুন কে সামনে রেখে নববর্ষের সূচনা হতো।আমরা খুব সকালে স্নান সেরে নতুন জামা-কাপড় পরে মা বাবাদের প্রনাম করে ছুটে যেতাম মঙ্গল শোভাযাত্রায়। সেদিন সকালে মা কাকীমা সবাই খুব ভোরে উঠতেন। ভোরের আলো ফোটার আগেই সব কাজ গুছিয়ে নিতেন। আমাদের আবার একটা রীতি ছিল। নববর্ষের আগের দিন মা কাকু বেশী হওয়া ভাতকে রাতের বেলা জল দিয়ে রাখতেন। নববর্ষের দিন সকাল বেলা ঐ ভাত পান্তা হলে খেতেন ইলিশ মাছের সাথে।তখনকার ইলিশ পাওয়া খুব চাপের ছিল। তবু ও কাকু ওটা ঠিক এদিক ওদিক করে আনিয়ে নিতেন। বটগাছে পূজোর পর সকাল বেলা ঐ পান্তা ভাত আর ইলিশ মাছ খাওয়ায় প্রচলন ছিল,সাথে পেঁয়াজ,আর বেগুন ভাজা। ওগুলো খেয়ে বেরিয়ে পড়তাম দোকানে।
ব্যবসায়ীদের কাছে এটা ছিল টাকা তোলার মাস।যে সব দোকান ধারে মাল দিতো, তারা নিজেদের দোকানে গনেশ পূজোর মাধ্যমে ধার থাকার কারনে কার্ড করতেন। যেটাকে হালখাতা বলা হয়।কোন না কোন দোকানে আমাদের ধার থাকত ই।তাই চলে যেতাম কাকুর সাথে ঐ দোকানে হাল খাতা খেতে। চিঁড়ে, মিষ্টি,মতিচূড়ের নাড়ু আর ও কত কী!কাকু টাকা মিটিয়ে দিয়ে বাড়ি ফিরতেন আর লাল কাপড় বেঁধে নতুন খাতা নতুন বছরের জন্য চালু করতেন।আমাদের কাছে ছিল এটা আনন্দের , আবেগের, ভালোবাসার।এটা ছিল আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের মেলবন্ধন। আমাদের গ্রামে বৈশাখী মেলার আয়োজন করা হতো খুব বড় করে। সেখানে মায়ের সাথে আমরা যেতাম। বৈশাখী মেলায় মুড়ি , মুড়কি, বেত বা বাঁশের তৈরি বাংলা, কুলা,মাছ ধরার ছিপ, বিভিন্ন ধরনের কাঠের তৈরি পুতুল বিক্রি হতো।মা তার মধ্যে থেকে কিছু কিছু জিনিস কিনতেন। ওখানে অনেক রকম পিঠে পুলির স্টল থাকতো, আমরা ভাই বোনরা সবাই মিলে জমিয়ে খেতাম। মা জোর করে আমাদের শপথ করাতেন যাতে সারাবছর আমরা ভালোভাবে পড়া করি।আর বলতেন এটা গনেশ ঠাকুরের মাস,না পড়লে গনেশ ঠাকুরে আমাদের উপর ক্ষিপ্ত হবেন, নতুন ফসল উঠবে না,আর আমরা জামাকাপড় ও পাবো না।এই সময় বাড়িতে বিরাজ করতো নির্মলতা,আর নির্মলতা আর কোমলতা,আমরা নতুন বর্ষকে এইভাবে আহ্বান করি।রবি ঠাকুরের মতো বলতে ইচ্ছে করছে আজ"ঐ পুরাতন বর্ষ হয় গত, আমি আজ ধূলিতে এ জীবন করিলাম নত"।
...................................
সোনালী সরকার
কালিয়াচক, মালদা

Comments
Post a Comment