মল্লিকা
কাবেরী মিত্র
আজ মল্লিকার খুব সকাল সকাল ঘুম ভেঙে গেছে। বসন্তের হিমেল হাওয়া তাই হালকা একটা চাদর গায়ে দিয়ে বাইরের বারান্দায় এক কাপ চা নিয়ে এসে বসল। একটা উত্তেজনা আর আনন্দ তার সারা মনের মধ্যে খেলা করছে সকাল থেকেই। করবে নাই বা কেন কত ঝড় ঝাপটা সহ্য করে সে তার এক মাত্র সন্তান ঋক কে মানুষের মতো মানুষ করেছে।। জয় তো কবেই তাঁদের একা ছেড়ে না ফেরার দেশে চলে গেলো। তারপর থেকে তো ঋক এর সব দায়িত্ব একাই পালন করে যাচ্ছে। তবে একটাই সান্তনা সে তার দায়িত্ব পালনে সার্থক হয়েছে। আজ ভীষণ জয়ের কথা মনে পড়ছে। প্রথম যেদিন সে তাকে প্রপোজ করে তার তো ভয়ে হাত পা ঠান্ডা হয়েছে গেছিলো। কি করবে বাবা যে ভীষণ রাগী ছিলেন যদি শোনে মেয়ে কলেজে গিয়ে প্রেম করছে তবে তার আর কলেজ আসাই হবে না। কিন্তু জয় ছিল একদম পাগল প্রেমিক যাকে বলে। সে তার হ্যাঁ না শুনে ছাড়বেই না। অগত্যা এমন পাগল কে কি আর ফিরিয়ে দেয়া যায়। চলতে লাগলো তাঁদের প্রেম পর্ব ।
এরপর কলেজ পাস করে সে ইউনিভার্সিটি তে ভর্তি হোলো কিন্তু জয় কিছুতেই আর পড়লো না। শুরু করলো চাকরি খোঁজা ওর একজন রিলেটিভ এর মাধ্যমে একটা ভালো চাকরি পেয়েও গেলো। কিন্তু ওই যে বলে না পাগলে কি না করে। একদিন সোজা ইউনিভার্সিটি এসে তাকে জোর করে ম্যারেজ রেজিস্টারের কাছে নিয়ে যায়। সেখানে আগে থেকেই দুজন রেডি ছিল সাক্ষী দেবে বলে। ব্যস আর কি হয়ে গেলো তাঁদের বিয়ে।
এরপর বহুদিন বাবা তাঁদের সাথে কোনও যোগাযোগ রাখেন নি। কিন্তু জয়ের ভালোবাসা তাকে এমন ভাবে আগলে রেখে ছিল যে সে কষ্ট পেলেও দিব্বি ভুলে তার ছোট্ট সংসার নিয়ে মেতে ছিল। এরপর ঋক এলো সেই দিন জয়ের আনন্দ ছিল দেখার মতো। কি করবে যেন মনে হচ্ছিলো সারা পৃথিবীটা ও জয় করে ফেলেছে।। ঋক এর যখন ছয় মাস বয়েস তখন একদিন বাবা নিজেই ফোন করে তার নাতি কে দেখতে আসবেন বললেন। সে দিন টা ভোলার না বাবা ঋক কে পেয়ে সব কিছু ভুলে আমাদের মাফ করে দিয়ে মহা ধুমধাম করে ঋক এর অন্নপ্রাশন দিলেন।
দিব্বি সুন্দর চলছিল সব কিছু । জয় অফিস থেকে লোন নিয়ে শান্তিনিকেতন এর এই নির্জন নিরিবিলি জায়গায় একটা জায়গা কিনলো। এরপর আস্তে আস্তে বাড়ি করাও শুরু করলো। দেখতে দেখতে দু বছরের মাথায় মনের মতো সাজানো একটা একতলা ছিমছাম বাড়িও তৈরী হয়ে গেলো। সব থেকে সুন্দর এই বাগান টা। কি যে যত্ন করে করেছিল জয়। অফিস থেকে এসেই শুরু করতো বাগান করা। মাঝে মাঝে তো আমি রেগেই যেতাম বলতাম এই বাগান টাকে আমার হিংসে হয়
মনে হয় আমার সতীন। শুনে খুব হাসতো বলতো মলি তাকিয়ে দেখো সব তোমার পছন্দের ফুল লাগিয়েছি। যখন রিটায়ার করবো তখন দুজনে এই বাগানে বসে চা খেতে খেতে তোমার গলায়
রবীন্দ্র সংগীত শুনবো।। তোমার সে ইচ্ছা যে পূর্ণ হোলো না জয়। কেন সেই দিন ওতো জোরে বাইক চালাচ্ছিলে। ঋক এর বারো ক্লাসের রেজাল্ট এতো ভালো হয়েছে শুনে। খুশিতে পাগল হয়ে এমন ভাবে যদি বাইক না চালাতে তাহলে তো আর এক্সিডেন্ট টা হতো না। আমার জীবন টাও অন্য রকম হতো। তুমি চাইতে ঋক অনেক দূর পড়াশোনা করুক। বিদেশ থেকে ডিগ্রী নিয়ে এই দেশে এসে মানুষের সেবা করুক । তোমার সেই ইচ্ছে পূর্ণ করতে আমাকে চাকরি করতে হোলো। কি করবো বলো,,ঋক কে বিদেশে পাঠিয়ে পড়াতে যে অনেক খরচা। তবে আমি পেরেছি জয়। হার মানিনি। তোমার আশীর্বাদ আছে যে আমাদের উপর। আমি জানি তুমি সব সময় আমাদের সাথেই থাকো।
আজ তোমার ঋক তোমার ইচ্ছে পূর্ণ করতে আসছে। আমি কত বার বললাম তু্ই ওই দেশেই স্থায়ী ভাবে থেকে যা। শুনলো না, বললো না মা, আমি বাবার ইচ্ছে মতো নিজের দেশে গিয়েই কাজ করবো। আর তোমার হাতের রান্না খাবো। তোমার ই তো ছেলে তোমার মতোই পাগল হয়েছে। আজ তোমার আমার দুজনের প্রিয় লাল গোলাপ টা ভারী সুন্দর ফুটেছে। জানো তো, আমি ঠিক করেছি ঋক আসলে ওকে বলবো ও যেন ওই ফুল টা তুলে আগে তোমার ছবির কাছে রাখে। আমি জানি তুমি তখন ঠিকই আমাদের সাথেই থাকবে। তোমার ঋক তোমার বাবু যাকে নিয়ে তুমি হাজার একটা স্বপ্ন দেখেছো সে আসবে আর তুমি খুশি হয়ে আমাদের পাশে থাকবে না তাই কি হয়। কি গো বৌদি, সেই কখন থেকে ডাকছি শুনতেই পাচ্ছ না।? মাঝে মাঝে যে তোমার কি হয়। কি যে ভাবো। কাজের মেয়ের চিৎকারে মল্লিকা ফিরে আসে তার ভাবনার ঘোর থেকে। নিজেই হেসে ফেলে বলে ও তু্ই বুঝবি না রে জবা। যাক, তু্ই সকাল সকাল এসে ভালোই করেছিস। তু্ই রান্না ঘরে যা দাদাবাবু কি কি খেতে ভালো বাসে তু্ই তো সব জানিস। ফ্রিজ থেকে সব বার করে নিয়ে যা। ও হ্যাঁ পায়েস টা কিন্তু আমি নিজে করবো। আমি যাই স্নান সেরে ঠাকুর ঘরের কাজ করে তারপর যাচ্ছি রান্না ঘরে। তু্ই বরং আমাকে কড়া করে এক কাপ চা করে দে তো। এই বলে মল্লিকাআস্তে আস্তে ঘরে চলে যায়। তার যে এখন অনেক কাজ।। তার আদরের ঋক তার স্বপ্ন নিয়ে তার কাছেই ফিরে আসছে। কে বলে সন্তান মাত্রেই স্বার্থপর হয়। অনেক ব্যতিক্রম ও থাকে।। আর সেটাই হয় বাবা মায়ের জয়।।
===============
কাবেরী মিত্র
রাজারহাট কলকাতা
৭০০১৩৬

Comments
Post a Comment