নববর্ষের স্মৃতিচারণা
রিয়া চ্যাটার্জী
বাংলা নববর্ষ প্রতিটা বাঙালির কাছে এক বিশেষ দিন। প্রত্যেকেই এই দিনটায় নতুন জামাকাপড় পড়ে, সুন্দর,সুন্দর পদ রান্না করে উৎযাপন করে। আমার বা আমার পরিবারের কাছেও এটা ব্যতিক্রম না। বাংলা নববর্ষের দিনটা ছিলো নতুন জামা, ভাত,মাছ,মাংস নানান তরি-তিরকারী যেমন মোচার ঘন্ট, শাক , গন্ধরাজ লেবু, মিষ্টি দই ইত্যাদির। ছিলো কলা পাতায় খাবার খাওয়া।
সেই সাথে এটা ছিলো হাল খাতার দিন। সারা বছর যে সমস্ত মুদিখানা, জামাকাপড়ের , চাল ইত্যাদির দোকানে জিনিসপত্র নেওয়া হত, সেখানে সেদিন নিমন্ত্রণ থাকতো। সেই সমস্ত দোকানগুলো সুন্দর করে সাজানো হত ফুল,মালা দিয়ে। পুরানো ধার বাকি যদি কারুর কিছু থেকে সেইসব মিটিয়ে তৈরি করা হত নতুন খাতা। নতুন বছরে নতুন শুরু! সেইদিন তারা মিষ্টির প্যাকেট বা ফলমূল ইত্যাদি উপহার দিত তাদের খরিদ্দার দের। এই সখ্যতা বিনিময়ের মাধ্যমে সেই ব্যবসায়িক সম্পর্ক যেনো আরো নিবিড় হত।
তবে এই সবের মধ্যে আমার একটা বিশেষ পাওনা ছিলো পয়লা বৈশাখ। কারণ সেদিন আমার জন্মদিন।
সাত সকালে নতুন জামা পড়ে বেরোতাম রাস্তায়। ভীষণ চাইতাম পাড়ার কেউ আমায় জিজ্ঞেস করুক, " কি ব্যাপার সকাল সকাল এতো সেজেছিস যে?"
অন্যদের হয়ত লক্ষ্যই পড়তো না। বা পয়লা বৈশাখে তো এমনি নতুন পড়ার নিয়ম।
এমন সময় মাংস বা মাছ কেনার বাজারে আমি হয়ত বাবার কাছে দাঁড়িয়ে আছি , কেউ দৈবাৎ বললো, " কি ব্যাপার আজ যে প্রচুর বাজার চলছে? পয়লা বৈশাখে প্রচুর রান্না হবে তাই না?"
এই সুযোগের অপেক্ষাতেই আমি থাকতাম। সাথে সাথে হাসি মুখে, আহ্লাদী হয়ে বলতাম, " আজ আমার জন্মদিন। "
সাথে সাথে এক বিস্ময়পূর্ণ অভিব্যক্তি আসতো, " বাহ! তোর তো খুব সুন্দর দিনে জন্মদিন। "
এই বিস্ময়টুকু আমি আমার প্রাপ্য বলে মনে করতাম। সব্বাইকে খুব গর্ব সহকারে জানাতে চাইতাম , আমার বাংলা নববর্ষের দিনে জন্মানোর কথা।
ছোট থেকে অনেক কে বলতে শুনেছি, তোর তো খুব সুন্দর দিনে জন্মদিন, কখনও ভুলবো না, এমন একটা দিন।
আমাদের ছোট বেলায় জন্মদিনে কেক কাটার নিয়ম ছিলো না। অন্যান্য মেনুর সাথে পায়েস হতো। ঠাকুমা বলতেন , পরমান্ন। সেই পরমান্ন আবশ্যিক ছিলো জন্মদিনে।
ঠাকুর বাড়িতে পূজো দিতে যাওয়া ছিলো। এমনি সেদিন পূজো দেওয়ার লম্বা লাইন হত,বছরের প্রথম দিন ঈশ্বর সাধনা দিয়ে শুরু হওয়ার কথা। পূজার পুষ্প, বেলপাতা মাথায় ঠেকিয়ে দিতেন ঠাকুমা। হাতে তারপর পায়েস দিতেন মা।
বর্ধিত পরিবারের ছোট ছোট সমবয়সী বা ছোট সব্বাই কে নিমন্ত্রণ করা হত। সেদিন সবার খুব আনন্দ। কতো গল্প, কত খেলা।
সেদিন বাড়ির সবার আড়ালে - আলোচনা চলত নিজেদের গোপন ভালোবাসা নিয়ে। আগেরদিন সবাই জিজ্ঞেস করত, " কাল তোর জন্মদিন, আমায় নিমন্ত্রণ করবি তো? " চুক্তি করে আলোচনা গুলো আগেই ঠিক হয়ে যেতো। "
দামি দামি উপহার দেওয়ার ক্ষমতা কারুর ছিলো না। কেউ ছোট একটা পেন, বা দশ কুড়ি টাকা। এই ছিলো উপহার। তবু তাই পেয়েই খুব খুশি হতাম আমরা। একটা দিন উৎসবের আনন্দে কাটতো।
আজ জন্মদিনে দেখি অনেক অনেক গিফট এর তোড়জোড়। কেক কাটা বেলুন ফোলানো ইত্যাদি । এই প্রাচুর্যের যুগে, এই সব সহজ সরল স্মৃতি গুলো যেনো আজও উজ্জ্বল নক্ষত্রের মত জাজ্জ্বল্যমান।

Comments
Post a Comment