পহেলা বৈশাখে আনন্দ নগরের স্মৃতি
সারাবান তহুরা মৌমিতা
পহেলা বৈশাখের সকালটা ছিল অন্যরকম। চারদিকে উৎসবের আমেজ, লাল-সাদা রঙের ঢেউ আর মানুষের মুখে আনন্দের উচ্ছ্বাস—
সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল পুরো শহর যেন নতুন করে জেগে উঠেছে। নতুন বছরের প্রথম দিনটিতে প্রকৃতিও যেন অন্যরকম স্নিগ্ধতায় ভরে ওঠে, আর মানুষের মনেও থাকে এক নতুন সূচনার আশা। এই বিশেষ দিনটি আমি সবসময় পরিবারের সাথে কাটাতে ভালোবাসি। তাই এবারও তার ব্যতিক্রম হলো না।
আগের রাতেই আমরা ঠিক করে রেখেছিলাম—কোথায় ঘুরতে যাব, কী পোশাক পরব, আর কী কী খাবার সঙ্গে নেব। ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথেই ঘুম ভাঙল। চারপাশে উৎসবের আবহ, দূর থেকে ভেসে আসছিল বৈশাখী গানের সুর। এমন সকালে ঘুমিয়ে থাকা যায় না। কিছুক্ষণ পরেই আমার এক কাজিন আপু ডাক দিয়ে উঠলেন, "এই তোরা সবাই কোথায়? আজকে কিন্তু ঘুরতে যাব, তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নে!" আপুটি চাকরি করেন, তাই সবসময় সময় পান না। কিন্তু ছুটি পেলেই আমাদের নিয়ে কোথাও না কোথাও ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। তার এই আগ্রহ আমাদের সবার মধ্যেই আনন্দ ছড়িয়ে দেয়।
আমরা সবাই দ্রুত প্রস্তুতি নিতে শুরু করলাম। সকালের গোসল সেরে একে একে সাজগোজ করতে লাগলাম। আমার আপুর মেয়ের সাথে আমার খুব ভালো বন্ধুত্ব। আমরা প্রায়ই একসাথে সময় কাটাই। সেদিনও আমরা দুজন একরকম পোশাক পরার সিদ্ধান্ত নিলাম। সাদা-লাল রঙের পোশাক পরে আয়নায় নিজেদের দেখে বেশ ভালোই লাগছিল। আমরা দুজন সবার আগে রেডি হয়ে বসে রইলাম, আর শুরু হলো আমাদের গল্প। কোথায় কোথায় ছবি তুলব, কী খাব, কীভাবে দিনটা কাটাব—এসব নিয়েই চলতে থাকল আমাদের পরিকল্পনা।
এরই মধ্যে আপু জানালেন, আজ আমরা যাব রংপুর জেলার পীরগঞ্জের আনন্দ নগরে। জায়গাটি আমাদের বাসা থেকে খুব বেশি দূরে নয়, তাই যাওয়াও সহজ। আমরা সবাই খুব খুশি হলাম। কিছুক্ষণ পরই একটি অটোরিকশা ভাড়া করা হলো। পরিবারের সবাই মিলে আমরা রওনা দিলাম আনন্দ নগরের উদ্দেশ্যে। সঙ্গে করে নিয়ে নিয়েছিলাম নানা রকম খাবার, যেন একেবারে পিকনিকের আমেজে দিনটি কাটানো যায়।
সবার গায়ে ছিল লাল-সাদা পোশাক। আমি সাদা রঙের একটি জামা পরেছিলাম। তবে এই জামা পরেই একটু ভয় লাগছিল—কারণ সাদা জামায় সহজেই দাগ পড়ে। আম্মু আগেই বলে দিয়েছিলেন যেন জামায় কিছু না লাগে। কিন্তু বাইরে বের হওয়ার পরেই সেই ভয়টা সত্যি হতে শুরু করল। রাস্তায় দেখি অনেক মানুষ রঙ নিয়ে খেলায় মেতে উঠেছে। তারা একে অপরের গায়ে রঙ লাগিয়ে আনন্দ করছে। শুধু তাকিয়ে থাকা সম্ভব হলো না—কিছুক্ষণ পর আমরাও সেই আনন্দে যোগ দিলাম। আমার জামা, আপুর জামা, এমনকি আমার ভাগ্নি রিশার জামাও রঙে ভরে গেল।
একদিকে মনে হচ্ছিল—আম্মু বকা দেবেন, আবার অন্যদিকে এই আনন্দ উপভোগ করতে পেরে খুব ভালোও লাগছিল। জীবনের কিছু মুহূর্ত এমনই—যেখানে আনন্দ আর ভয় একসাথে মিশে থাকে।
এভাবে হাসি-আনন্দের মধ্য দিয়ে আমরা পৌঁছে গেলাম আনন্দ নগরের গেটে। সেখানে গিয়ে দেখি মানুষের উপচে পড়া ভিড়। সবাই যেন উৎসব উদযাপনের জন্য এখানে জড়ো হয়েছে। আমরা টিকিট কেটে ভেতরে প্রবেশ করলাম। ভেতরে ঢুকে মনে হলো যেন এক অন্য জগতে চলে এসেছি। চারপাশে সবুজ গাছপালা, খোলা মাঠ, বসার সুন্দর ব্যবস্থা—সব মিলিয়ে পরিবেশটি ছিল অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর।
নদীর পাশের শীতল হাওয়া মনকে প্রশান্ত করে তুলছিল। ছোটদের জন্য ছিল নানা ধরনের রাইড—দোলনা, ছোট নাগরদোলা—যা দেখে বাচ্চারা আনন্দে মেতে উঠছিল। এছাড়াও সাজানো বাগান, ফুলের সৌন্দর্য, আর সুন্দর গেটগুলো ছবি তোলার জন্য ছিল একদম উপযুক্ত। আমরা একে একে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরলাম, ছবি তুললাম, আর মুহূর্তগুলোকে স্মৃতিতে ধরে রাখলাম।
পিকনিকের জন্য নির্দিষ্ট জায়গাগুলোতে অনেক পরিবার বসে খাওয়া-দাওয়া করছিল। আমরাও একটি জায়গা ঠিক করে বসে পড়লাম। বাসা থেকে নিয়ে যাওয়া বিরিয়ানি আর গোশত সবাই মিলে খেতে শুরু করলাম। খোলা আকাশের নিচে, পরিবারের সাথে বসে খাওয়ার আনন্দটাই আলাদা। খাওয়ার পর আমরা কাছের দোকান থেকে কোকা-কোলা আর আইসক্রিম কিনে খেলাম। ছোট ছোট এই মুহূর্তগুলোই দিনটিকে আরও সুন্দর করে তুলছিল।
কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আমরা গেলাম পার্কের ভেতরের মার্কেটে। সেখানে নানা ধরনের জিনিসের দোকান ছিল। ঘুরতে ঘুরতেই আমার একটি মাথার ব্যান্ড পছন্দ হয়ে গেল। আমি আর আমার ভাগ্নি একইরকম দুটি ব্যান্ড কিনলাম। আরও অনেক দোকান ঘুরে দেখলাম। আপু আর আম্মুরা তাদের প্রয়োজনীয় হাড়ি-পাতিল কিনলেন। হস্তশিল্পের দোকানগুলোতে ছিল অসাধারণ সব জিনিস। কাঠের তৈরি একটি সুন্দর কলম আমার খুব ভালো লাগল, সেটিও কিনে নিলাম।
এভাবে ঘুরতে ঘুরতে কখন যে বিকেল হয়ে গেল বুঝতেই পারিনি। হঠাৎ দেখি আকাশ কালো হয়ে আসছে। মনে হচ্ছিল ঝড় আসতে পারে। কিছুক্ষণের জন্য সবাই একটু চিন্তিত হয়ে পড়লাম। তবে সৌভাগ্যক্রমে কিছুক্ষণের মধ্যেই আকাশ আবার পরিষ্কার হয়ে গেল। প্রকৃতির এই পরিবর্তনও যেন দিনটির এক বিশেষ অভিজ্ঞতা হয়ে রইল।
বিকেল প্রায় পাঁচটার দিকে আমরা বাড়ির পথে রওনা দিলাম। সারাদিনের ক্লান্তি থাকলেও মনে ছিল এক অদ্ভুত প্রশান্তি। বাসায় ফিরে আমরা আবার নতুন করে আনন্দে মেতে উঠলাম। রাতে সবাই মিলে পান্তা-ইলিশ খাওয়ার আয়োজন করলাম। সেই খাবারের স্বাদ যেন দিনের আনন্দকে আরও পরিপূর্ণ করে তুলল।
সারাদিনে আমরা অনেক ছবি তুলেছি, অনেক হাসি-আনন্দ ভাগ করে নিয়েছি। এই দিনটি আমার জীবনের একটি স্মরণীয় দিন হয়ে থাকবে। পহেলা বৈশাখ শুধু একটি উৎসব নয়, এটি আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের ঐতিহ্য, আর আমাদের একতার প্রতীক। এই দিন মানুষকে একত্রিত করে, ভেদাভেদ ভুলিয়ে দেয়, আর নতুনভাবে বাঁচার প্রেরণা জোগায়।
আমি মনে করি, এমন দিন আমাদের জীবনে বারবার আসা উচিত—যে দিনগুলো আমাদের ব্যস্ত জীবনের মাঝেও একটু থামতে শেখায়, পরিবারকে সময় দিতে শেখায়, আর আনন্দকে অনুভব করতে শেখায়। পহেলা বৈশাখের সেই আনন্দময় ভ্রমণ আমার হৃদয়ে চিরদিনের জন্য গেঁথে থাকবে।
...........................
সারাবান তহুরা মৌমিতা
অনার্স ৩য় বর্ষ
দিনাজপুর সরকারি কলেজ
সদর, দিনাজপুর

Comments
Post a Comment