পয়লা থেকে একলা হওয়া
সুকান্ত ঘোষ
মোবাইলের এলার্মের আওয়াজটা বিকট শব্দ করে বেজে উঠতেই রণজয় ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসে। অভ্যস্ত হাতে এলার্মটা বন্ধ করতে যেতেই ফোনের নোটিফিকেশনে চোখ আটকে যায়। শুভ পয়লা বৈশাখের ঢেউ আছড়ে পড়েছে মেসেঞ্জারে।
রণজয়ের মনটা খোলা জানলা পেরিয়ে একলাফে চলে যায় অনেকগুলো বছর আগের এক সকালে। বাবার রেডিওতে প্রাত্যহিকি চলছে, মা কলতলায় বাসন মাজছে আর ছোট বোন মিনু তার প্রিয় নীল স্কার্টটা পরে বাড়ির রোয়াকে তার বন্ধুদের সাথে এক্কাদোক্কা খেলছে।
আজ রণজয়ের বেশ ফুরফুরে লাগছে। পয়লা বৈশাখ মানেই দুপুরে মাংস- ভাত। রণজয়ের বাবা সামান্য বেতনের একজন সরকারি কর্মচারী। তবু রণজয়ের পয়লা বৈশাখের দুপুরের মেনুতে মাংস-ভাত বাধা ছিল। তারপর দুপরে একটু ঘুমিয়ে বিকালে বাবার সাথে দোকানে দোকানে ঘুরে হালখাতা সারা ও জিভের সেবা করা। রণজয়ের কাছে জিভ সেবাই, শিব সেবা। তাই সারা বছর ধরে ও এই দিনের অপেক্ষায় থাকে। আজও সেই জন্য রণজয়ের মেজাজ খুব ফুরফুরে। হটাৎ একটা বিকট শব্দ ও কিছু মানুষের কান্নায় রণজয়ের চিন্তার জট ছিঁড়ে যায়। আর তখনই চোখে পড়ে মিনুর নীল স্কার্টটা রক্তে ভেসে যাচ্ছে, রাস্তায় পড়ে রয়েছে মিনুর নিথর দেহ। ধাক্কা দিয়ে পালনো লরিটার রক্তমাখা টায়ারের দাগ কালো পিচ রাস্তার উপর পয়লা বৈশাখের আলপনা এঁকে দিয়ে চলে গেছে দূরে,আরও দূরে..
মোবাইলের নোটিফিকেশনের আওয়াজে রণজয়ের চমক ভাঙে। দেওয়ালে ঝোলানো মিনুর নীল স্কার্ট পড়া ছবিটার দিকে অপলকে তাকিয়ে থাকে রণজয়ের। মিনুর ছবির পাশে জায়গা করে নিয়েছে আরও দুটো পরিচিত মুখ।নোনা জল রণজয়ের গাল পেরিয়ে চিবুক স্পর্শ করে। পাশে শুয়ে থাকা স্ত্রী মিতালিকে ডাকতে গিয়ে জীবনের রণে হেরে যাওয়া রণজয় দেখে বিছানা শুন্য। পরে রয়েছে শুধু একটা চিরকুট যাতে লেখা -" অনেক ভাবলাম, তোমাকে এভাবে ঠকানো ঠিক হচ্ছে না। আমার অফিসের কলিগ সুতনুর সাথে আমার সম্পর্কটার বিষয়ে হয়তো তুমি জানো। আমি আর পাচ্ছি না দু নৌকায় পা দিয়ে চলতে। তাই শেষ পর্যন্ত সুতনুকেই বেছে নিলাম। আমায় খোঁজার চেষ্টা করো না। ভালো থেকো। ইতি- মিতালি"। চোখ বন্ধ করে রণজয়। পাড়ার মোড়ের দোকান থেকে তখন সুরেলা কণ্ঠে ভেসে আসছে -- এসো হে বৈশাখ, এসো হে...
.................................
সুকান্ত ঘোষ
নারিকেল ডাঙা, পূর্ব বর্ধমান


Comments
Post a Comment